চীনের রমজান: ভৌগোলিক বৈচিত্র্যে গড়া এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা

গুয়াংজুতে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা ইফতারি খাচ্ছেনছবি: লেখকের পাঠানো

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম সভ্যতার দেশ চীন। হাজার বছরের ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় ভূগোল এবং অসংখ্য জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দেশ সব সময়ই বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদা বহন করে আসছে। চলতি বছর চীনের ইতিহাসে এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অবতারণা ঘটল। চীনের চান্দ্রপঞ্জিকা অনুযায়ী ১৮ ফেব্রুয়ারি, যা ছিল চীনা নববর্ষের (বসন্ত উৎসব) দ্বিতীয় দিন, ঠিক সেই দিন থেকেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো চীনেও শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। চীনে এই প্রথম দুই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপলক্ষ একসঙ্গে উদ্‌যাপিত হচ্ছে, যা শেষবার ১৯৯৫ সালে ঘটেছিল।

চীনা নববর্ষ যেখানে পারিবারিক মিলনমেলা ও নতুন যাত্রার প্রতীক, সেখানে রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। এই দুই ভিন্ন মেরুর সংমিশ্রণ চীনের জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রকাশ পায়। ইসলাম চীনে একটি প্রাচীন ধর্ম এবং চীনের মুসলিম সম্প্রদায় পবিত্র রমজান মাস অত্যন্ত গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। চীনে পবিত্র রমজানের অভিজ্ঞতা শুধু ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন। চীনের পটভূমি অন্যান্য দেশ থেকে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় এখানে পবিত্র রমজানের অভিজ্ঞতাও আলাদা হয়ে থাকে।

চীনা মুসলিমরা সাহ্‌রিতে সাধারণত ভারী খাবার এড়িয়ে চলেন, সাধারণত পুষ্টিকর ও হালকা খাবার খেয়ে থাকেন, যেমন দুধ, ফল ও রুটি। তবে হুই ও উইঘুর মুসলিমরা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পছন্দ করেন। উইঘুর মুসলমানরা পোলাও, কাবাব, নানরুটি ও বিভিন্ন ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন। হুই মুসলমানরা গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস ও স্থানীয় সবজি দিয়ে তৈরি খাবার পছন্দ করেন।

চীনের জনমিতি ও মুসলিম সম্প্রদায়—

চীন একটি বহুজাতিক ও বহুসংস্কৃতির দেশ, যেখানে সরকারিভাবে মোট ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯১ দশমিক ৬০ শতাংশ হান চায়নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তবে চীনের বৈচিত্র্যের মূল চাবিকাঠি নিহিত আছে অবশিষ্ট ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে। ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠী রয়েছে, যেমন হুই, উইঘুর, কাজাখ, ডংশিয়াং, কিরগিজ, সালার, তাজিক, উজবেক, বনান ও তাতার। এই বৈচিত্র্যই চীনের মুসলিম সংস্কৃতিকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছে।

চীনে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। এদের অধিকাংশই শিনচিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বাস করে, যেখানে উইঘুর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এ ছাড়া নিংশিয়া হুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, গানসু, ছিংহাই প্রদেশ এবং বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু ও শেনজেনের মতো বড় শহরগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। সপ্তম শতাব্দীতে রেশমপথের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে ইসলাম চীনে প্রবেশ করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চীনের মাটিতে ইসলামের শিকড় গভীর হয়েছে। ইসলামের ইতিহাস চীনে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো, যা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে।

আরও পড়ুন
চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রবাসেও দেশীয় আমেজে ইফতার ও সময় কাটাচ্ছেন।
ছবি: লেখকের পাঠানো

রমজান ও চীনা নববর্ষের বিরল সমন্বয়—

২০২৬ সালের রমজানের একটি ‘ব্যতিক্রমী’ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কারণ, এটি চীনা নববর্ষের (বসন্ত উৎসব) সঙ্গে মিলে গেছে। চলতি বছরের এই সময় চীনের মুসলিমদের কাছে তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সাধারণত চীনা নববর্ষ (স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল) এবং রমজান মাসের সময়সূচি ভিন্ন হয়। চীনা ক্যালেন্ডার চান্দ্র হলেও এর গণনাপদ্ধতি ইসলামি চান্দ্রপঞ্জিকার থেকে কিছুটা ভিন্ন। এর ফলে এই দুই উৎসবের মিলন খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু চলতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি চীনা নববর্ষের দ্বিতীয় দিনেই রমজানের চাঁদ উদিত হয়েছে। এই মিলন দেশটির দুই প্রধান জাতিগোষ্ঠী—হান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।

চীনের চিয়াংশি প্রদেশের নানছাং শহরে অবস্থিত একটি অন্যতম প্রধান মসজিদ হলো নানছাং কুশিয়াং মসজিদ
ছবি: লেখকের পাঠানো

এই মিলন কেবল ক্যালেন্ডারের মিল নয়, এটি সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। চীনা নববর্ষে পরিবারের সবাই একত্র হন, নতুন পোশাক পরেন, বিশেষ খাবার খান এবং বড়দের সম্মান জানান। অন্যদিকে রমজানে মুসলিমরা রোজা রাখেন, তারাবিহ পড়েন এবং কোরআন তিলাওয়াত করেন। নববর্ষে যেমন রঙিন লন্ঠন দিয়ে ঘর ও রাস্তা সাজানো হয়, তেমনি রমজানেও মুসলিম এলাকাগুলো উৎসবের চেহারা নেয়। এ বছর চীনের মুসলিমরা এই দুই অনুভূতিকে একসঙ্গে উপভোগ করছেন। নববর্ষের আনন্দের পাশাপাশি রমজানের পবিত্রতা তাঁদের জীবনে এক অনন্য প্রশান্তি এনে দিয়েছে। স্থানীয় অমুসলিম প্রতিবেশীরাও এ উপলক্ষে মুসলিমদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উচ্চতম পর্যায়ের বহিঃপ্রকাশ।

এ বছরের রমজান নিয়ে চীনের শেনজেন শহরের একটি মসজিদের ইমাম হাজি ইসহাক ঝং দ্য নিউ আরবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চীনে একসময় রমজান ‘সংযমের মাস’ এবং ‘ফেং জাই’ নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ রোজা সম্পন্ন করার মাস। উত্তর-পশ্চিম চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের বিভিন্ন তুর্কিভাষী মুসলিম জাতিগোষ্ঠী এই মাসকে ‘রো জি’ নামে ডাকেন। প্রতিবছরই রমজানকে আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে বরণ করা হয় এবং সব জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানরা একে অপরকে ইবাদত পালনে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি আরও বলেন, এবারের রমজান বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী, কারণ চীনা চান্দ্র নববর্ষ ও রমজান একই সঙ্গে শুরু হয়েছে। এতে দেশের প্রধান দুটি জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের মধ্যে সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হয়েছে।

চীনে রমজান মাস পালন শুধু একটি ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্য, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন। চীনে রমজান মাসে মুসলিমরা তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং একই সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন।
চীনের স্থানীয় মুসলিমদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রমজানের ইফতারে অংশগ্রহণ করেছেন সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
ছবি: লেখকের পাঠানো

চীনা-মুসলিম খাদ্যসংস্কৃতি, সাহ্‌রি ও ইফতার—

চীনা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎস হলো খাবার এবং এই খাদ্যসংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। চীনের বিশাল ভৌগোলিক পরিসর এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রমজানের খাদ্যাভ্যাসেও প্রতিফলিত হয়। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী হালাল খাবারকে চীনে ‘ছিংঝেন’ (Qingzhen) বলা হয়। রমজানে ইফতারের সময় চীনের মুসলিমরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো পরিবেশন করেন, যা তাঁদের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি রীতির মিশ্রণ। দিন শুরু হয় সাহ্‌রির মাধ্যমে, যা সূর্যোদয়ের আগে গ্রহণ করা শেষ খাবার। অতীতে সাহ্‌রির সময় জানান দিতে ঢোল বাজানোর প্রচলন ছিল, যা এখনো কিছু কিছু জায়গায় টিকে আছে, যদিও এর ব্যবহার আগের তুলনায় কমে গেছে।

মুসলিম পরিবারগুলো ইফতার ও সাহ্‌রির জন্য বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও স্বাদের প্রতিফলন ঘটায়। চীনা মুসলিমরা সাহ্‌রিতে সাধারণত ভারী খাবার এড়িয়ে চলেন, সাধারণত পুষ্টিকর ও হালকা খাবার খেয়ে থাকেন, যেমন দুধ, ফল ও রুটি। তবে হুই ও উইঘুররা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পছন্দ করেন। শিনচিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলমানরা পোলাও, কাবাব, নানরুটি ও বিভিন্ন ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন। নিংশিয়া অঞ্চলে হুই মুসলমানরা গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস ও স্থানীয় সবজি দিয়ে তৈরি খাবার পছন্দ করেন।

ছিংহাই প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে রয়েছে তেলের পিঠা (একধরনের ভাজা মিষ্টি), গমের স্যুপ, মাংস ও সবজি দিয়ে তৈরি মিশ্র স্যুপ। এ ছাড়া ভেড়ার মাংস, মরিচ, ভিনেগার ও মসলা দিয়ে তৈরি নুডলস এবং তাপানজিও (মুরগির মাংস ও আলু দিয়ে তৈরি করা তরকারি) খুব জনপ্রিয়। অন্যদিকে ইউনান প্রদেশে ভাতের নুডলস এবং গরুর মাংসের পদ ইফতার ও সাহরি—দুই সময়েরই প্রধান আকর্ষণ।

আরও পড়ুন

চীনে পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে প্রদেশভিত্তিক ইফতার আয়োজনে দেখা যায় নানা বৈচিত্র্য। মসজিদে সুবিন্যস্ত টেবিলে রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। মাগরিবের আজানের সময় মোনাজাত করে কেবল খেজুর, চা ও একপ্রকার স্যুপ খেয়ে রোজা ভাঙেন মুসল্লিরা। এরপর সবাই নামাজে অংশ নেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও নামাজের ব্যবস্থা থাকে। নামাজের পর মুরগি ও গরুর মাংসের পাশাপাশি নুডলসসহ মসজিদ থেকে নানা পসরা পরিবেশন করা হয় মুসল্লিদের জন্য। চীনের মসজিদগুলো পবিত্র রমজান মাসে বিশেষভাবে সজ্জিত হয় এবং মুসল্লিদের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকে। বিশেষ করে তারাবিহর নামাজে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন।

বিশেষ করে এ বছর চীনা নববর্ষের সঙ্গে রমজানের মিলনের কারণে ইফতারের মেনুতে কিছু বিশেষত্ব যোগ হয়েছে। নববর্ষের প্রতীকী খাবার যেমন ‘ফিশ’ (প্রাচুর্যের প্রতীক) বা ‘ডাম্পলিংস’ (সম্পদের প্রতীক) হালাল পদ্ধতিতে তৈরি করে ইফতারে পরিবেশন করা হচ্ছে। এটি দেখিয়ে দেয় যে কীভাবে ধর্মীয় বিধিনিষেধ মেনেও স্থানীয় উৎসবের আনন্দে অংশ নেওয়া সম্ভব।

সামাজিক সম্প্রীতি ও সরকারি অবস্থান—

চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা স্বীকার করে, তবে তা রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। শুধু মুসলিম সম্প্রদায় নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নির্দিষ্ট সরকারি নিয়মকানুনের মধ্যে ধর্মীয় রীতিনীত পালন করতে হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কার্যক্রম, যেমন মসজিদে নামাজ, রোজা পালন এবং হজ পালন নির্দিষ্ট নিয়মকানুনের মধ্যে অনুমোদিত। রমজান মাসে সরকারি পর্যায়ে কোনো বাধা দেওয়া হয় না, বরং স্থানীয় প্রশাসন মসজিদগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে।

সামাজিক স্তরে সম্প্রীতি লক্ষ করার মতো। চীনের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিমদের রোজা পালনকে শ্রদ্ধা করেন। অফিস বা স্কুলে মুসলিম সহকর্মী বা সহপাঠীরা রোজা রাখলে তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা হয়। অনেক অমুসলিম চীনা নাগরিক রমজানে মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেন। এ বছর চীনা নববর্ষের ছুটির সঙ্গে রমজান মিলে যাওয়ায় অনেক অমুসলিম পরিবার তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে তাদের বাড়িতে যায় এবং একসঙ্গে ইফতার করে। এই দৃশ্য চীনের ‘একতার মধ্যে বৈচিত্র্য’ (Unity in Diversity) নীতির জীবন্ত উদাহরণ।

তবে পবিত্র রমজান পালন করার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন বেশির ভাগ চীনা অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোজার সময় কোনো বিশেষ ছুটি বা সুবিধা দেওয়া হয় না। অনেক মুসলমানকে ক্লাস বা কর্মস্থলে নিয়মিত সময়সূচি অনুসরণ করতে হয়, যা রোজা রাখা অবস্থায় কিছুটা কঠিন হতে পারে।

আরও পড়ুন

চীনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রমজান পালনের অভিজ্ঞতা—

চীনের মুসলিম সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মধ্যে সাহ্‌রি ও ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কার্যক্রম। স্থানীয় মসজিদগুলো বিনা মূল্যে সাহ্‌রি ও ইফতার বিতরণ করে এবং বিদেশি মুসলমানদের জন্য এটি একটি মিলনমেলার মতো হয়ে ওঠে, বিশেষ করে শুক্রবারে জুমার দিনে। চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ইফতারির আইটেমও পাওয়া যায়।

চীনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের প্রধান অংশটি শিক্ষার্থী হলেও ব্যবসা ও চাকরিরত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু ধর্মীয় উৎসব পালনের ক্ষেত্রে চীনের পরিবেশ বাংলাদেশের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শীত ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি প্রচলিত থাকলেও রমজান বা ঈদের নামে কোনো ছুটি কিংবা অফিস সময় হ্রাসের সুযোগ নেই। বরং জুমার দিনও ক্লাস বা কাজ যথারীতি চলতে থাকে। আন্তর্জাতিক ডরমিটরিগুলোতে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে থাকেন। এর ফলে রাতের বেলায় রান্না বা সাহ্‌রির সময় শব্দ না করে সাবধানে চলাফেরা করা জরুরি, যাতে অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে।

ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রেও নিজস্ব উদ্যোগ নিতে হয়। বড় শহর বা প্রদেশে সরকার অনুমোদিত মসজিদ থাকলেও সব শহরে নেই। জুমার নামাজের জন্য অনেক সময় দূরে যেতে হয়। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবিহ প্রায়ই রুমে বা ছাদে আদায় করতে হয়। মসজিদ থেকে আজান বা সাহ্‌রির জন্য মাইকের আওয়াজ না আসায় সময়ের হিসাব রাখার দায়িত্বও পুরোপুরি ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত থাকে।

আরও পড়ুন

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রমজানে পরিবারের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালভাবে যুক্ত থাকেন। ভিডিও কলের মাধ্যমে ইফতারের সময় পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, কোরআন তিলাওয়াতের লাইভ স্ট্রিম দেখা বা অনলাইনে ইসলামিক লেকচার শোনা—সবই এখন সহজলভ্য। অনেকে ফোনের ইসলামিক অ্যাপ ব্যবহার করে নামাজের সময়, কিবলা দিক ও রমজানের ক্যালেন্ডার ম্যানেজ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি কমিউনিটি গ্রুপে ইফতারির ছবি শেয়ার করা, রেসিপি আদান-প্রদান করাও প্রচলিত।

পবিত্র রমজান পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হচ্ছিল ইসতিয়াক হোসেনের সঙ্গে। ২০২৩ সাল থেকে পিএইচডি করছেন চীনের হুয়াজং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, চীনে আসার আগে আমরা অনেকেই শুনেছি যে এখানে মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় জীবন পালন করা কঠিন। কিন্তু উহানে এসে আমার অভিজ্ঞতা একদম নতুন কিছু। এখানে আমরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই রোজা রাখি, সাহ্‌রি করি এবং ইফতার করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের মুসলিম শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে রমজানের সময়টাকে ভাগ করে নিই, আর সেখানেই তৈরি হয় এক ভিন্নধর্মী প্রবাসী সম্প্রদায়।

আরও পড়ুন

ইসতিয়াক হোসেন আরও বলেন, উহান শহরে কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে, যেখানে আমরা নিয়মিত নামাজ আদায় করি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উছাং মসজিদ, হ্যান কোউ মসজিদ, অপটিক্স ভ্যালি মসজিদ। রমজান মাসে এসব মসজিদে তারাবিহর নামাজে বিভিন্ন দেশের মুসল্লিদের একসঙ্গে নামাজ পড়তে দেখা যায়। ভাষা আলাদা হলেও সবার উদ্দেশ্য এক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। প্রবাসে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য ইসলামের বৈশ্বিক ঐক্যের অনুভূতি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করায়।

দীর্ঘদিন ধরে গুয়াংজুতে বসবাসরত আল-বারাকাহ রেস্তোরাঁর মালিক ব্যবসায়ী শেখ কোরবান আলী বলেন, চীনের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র গুয়াংজুর মতো জায়গায় রমজান আরও বেশি জনবহুল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশিরা ভারত, পাকিস্তান, আরব ও আফ্রিকার বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের খাবার ভাগাভাগি করেন, বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন। এই সাংস্কৃতিক বিনিময় চীনে রমজান কাটানোর সবচেয়ে উপভোগ্য দিকগুলোর মধ্যে একটি। গুয়াংজুতে বাংলাদেশি কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধভাবে সিয়াম পালন করে। কর্মব্যস্ত পরিবেশে, যেখানে রমজানের জন্য কোনো সরকারি ছুটি নেই, সেখানেও প্রবাসীরা তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে অবিচল—এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।

হুয়াজং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাঁদের ক্যাম্পাস এলাকায় ইফতারে
ছবি: লেখকের পাঠানো

শেখ কোরবান আলী আরও বলেন, সাহাবি আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর কবরের পাশের মসজিদের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মসজিদে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আরব, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা এক কাতারে নামাজ আদায় করেন। রমজানের তারাবিহে এই দৃশ্য ইসলামের সর্বজনীনতা ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জীবন্ত প্রতীক।

পরিশেষে বলব, চীনে রমজান মাস পালন শুধু একটি ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্য, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন। চীনে রমজান মাসের সময় মুসলিমরা তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং একই সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন। এটি চীনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং জাতিগত সম্প্রীতির একটি চমৎকার উদাহরণ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে চীনের ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে। রমজানের এই পবিত্র মাসটি চীনসহ সব মুসলিমদের জীবনে বয়ে আনুক আধ্যাত্মিক শান্তি এবং দেশটির জাতিগত সম্প্রীতিকে করুক আরও নিবিড়।

লেখক: মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশন (স্কুল অব ফরেন ল্যাংগুয়েজ) এ কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষক

ঈদের নামাজ পড়ে একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন চীনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা
ছবি: লেখকের পাঠানো

পরিশেষে বলব, চীনে রমজান মাস পালন শুধু একটি ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্য, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন। চীনে রমজান মাসের সময় মুসলিমরা তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং একই সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন। এটি চীনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং জাতিগত সম্প্রীতির একটি চমৎকার উদাহরণ, যা বিশ্বেরঅন্যান্য দেশে চীনের ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে। রমজানের এই পবিত্র মাসটি চীনসহ সব মুসলিমদের জীবনে বয়ে আনুক আধ্যাত্মিক শান্তি এবং দেশটির জাতিগত সম্প্রীতিকে করুক আরও নিবিড়।

লেখক: মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশন (স্কুল অব ফরেন ল্যাংগুয়েজ) এ কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষক

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]