প্রবাসীদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ও দুঃখের দিন হলো উৎসবের দিনগুলো। কারণ, এ সময়টাতে প্রবাসের আনন্দের পাশাপাশি দেশের কথা, দেশে ফেলে আসা প্রিয়জনের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আর বারবার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে দেশের সব স্মৃতি। প্রবাসে রোজা আসে একেবারেই আড়ম্বরহীনভাবে। এখানে চাঁদ দেখার কোনো উৎসব নেই। অস্ট্রেলিয়াতে রোজা শুরু হয় অনেকভাবে। কেউ বৈজ্ঞানিক দিনপঞ্জি অনুসরণ করে রোজা রাখেন। আবার কেউ সৌদি আরবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রোজা রাখেন। আবার কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রোজা রাখেন। বিভিন্ন খুদে বার্তা দলের মাধ্যমে সবাই সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, কে কবে থেকে রোজা রাখছেন। এভাবেই রোজা শুরু হয়ে যায়।
রোজা শুরু হলে এখানে সাহ্রি খাওয়ার জন্য পাড়ার মসজিদের মাইকে ডাকার উৎসব নেই। নেই পাড়ায় পাড়ায় দল বেঁধে ডেকে বেড়ানোর দল। সবাই পারিবারিকভাবে উঠে সাহ্রি খেয়ে নেন। বড়দের সঙ্গে ছোটরাও অনেক সময় রোজা রাখে। আর ইফতার করা হয় সাধারণত বিভিন্ন মুসলিম অ্যাপের মাধ্যমে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন প্রিন্ট করা সাহ্রি–ইফতারের সময়সূচি সরবরাহ করে। ইফতারের পর রাতে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন মসজিদে চলে খতম তারাবিহর নামাজ পড়া। সেখানেও বড়দের সঙ্গে ছোটরা যোগ দেয়।
প্রবাসের ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা রুটিন জীবনে রোজা একটু বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। সঙ্গে যোগ করে কিছু আনন্দের মাত্রাও। ছোটদের মধ্যে কথা চলে কে কয়টা রোজা রাখতে পারল, সেটা নিয়ে। বড়দের মধ্যে চলে দলগতভাবে ইফতার আয়োজনের ব্যস্ততা।
দেশের মতো প্রবাসেও সাহ্রি ও ইফতার করার বিভিন্ন আয়োজন চলে। অন্যান্য মুসলিম দোকানগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশি দোকানগুলোতেও সুস্বাদু ও রকমারি ইফতার কিনতে পাওয়া যায়। তবে অনেককেই কাজের চাপে বাধ্য হয়ে রাস্তায়, বাসে বা ট্রেনে ইফতার করতে হয়। কারণ, এখানে দেশের মতো রোজা এলে অফিসের সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন করা হয় না। সাহ্রি ও ইফতার উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় ‘রমাদান নাইটস’ বলে মেলা বসে। সেখানে হরেক রকমের খাবার পাওয়া যায়।
রোজার প্রায় পুরো মাসজুড়েই চলে ঈদবাজার ও ঈদমেলা। সেখানে চলে ঈদের পোশাকের বিকিকিনি। মানুষ বিভিন্ন দোকান ঘুরে পছন্দের ঈদের পোশাক কেনেন। পাশাপাশি চলে মেহেদি নাইট।
সিডনির লাকেম্বার রমাদান নাইটস এখন পুরো অস্ট্রেলিয়াব্যাপী বিখ্যাত। এমনকি এর পরিচয় অস্ট্রেলিয়া ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে। সেখানে সপ্তাহের কিছু নির্দিষ্ট দিনে হেলডন স্ট্রিটের একটা অংশ আলাদা করে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখানে ইফতারের আগে থেকে শুরু করে বাজার চলে ভোররাত পর্যন্ত। রাস্তার দুই পাশে বসে খাবার ও পানীয়র দোকান। আর পুরো রাস্তাজুড়ে মানুষের ভিড় লেগে থাকে। মাঝেমধ্যে এমন ভিড় হয় যে পা ফেলাই মুশকিল হয়ে যায়। বিভিন্ন খাবারের দোকান থেকে দোকানিরা হাঁকতে থাকেন সেখানে কী কী পাওয়া যাচ্ছে আর সেই সব খাবারের বিশেষত্ব। এভাবে পুরো পরিবেশটা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এ ছাড়া লিভারপুলেও বসে রমাদান নাইটস। এখন বিভিন্ন সিটি কাউন্সিলের উদ্যোগেও স্থানীয়ভাবে বসে রমাদান নাইটস বাজার।
প্রবাসীরা পারিবারিকভাবে ইফতার করার পাশাপাশি এসব বাজারেও যান ইফতার করতে। এ ছাড়া দলগতভাবে চলে ইফতারের আয়োজন। এটা অনেকটা ঈদপূর্ববর্তী পুনর্মিলনীর মতো হয়। দুপুর বা বিকেল থেকেই সবাই জড়ো হতে থাকে কোনো রেস্তোরাঁ বা ভাড়া করা কমিউনিটি সেন্টারে। এরপর বিকেল গড়ালেই শুরু হয় ইফতারের তৎপরতা। ইফতারের পাশাপাশি থাকে রাতের খাবারের আয়োজন। মাঝে চলে বিভিন্ন ধরনের মতবিনিময়। বাচ্চারা এই আয়োজনগুলো সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে। কারণ, তারা সবার সঙ্গে মিলেমিশে ইচ্ছেমতো খেলাধুলা করতে পারে। এ ছাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে ইফতার আদানপ্রদান বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
রোজার প্রায় পুরো মাসজুড়েই চলে ঈদবাজার ও ঈদমেলা। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকমের ঈদপণ্যের মেলা বসে। সেখানে চলে ঈদের পোশাকের বিকিকিনি। মানুষ বিভিন্ন দোকান ঘুরে পছন্দের ঈদের পোশাক কেনেন। পাশাপাশি চলে মেহেদি নাইট। তবে এটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় চাঁদরাতে। সেখানে সবাই লাইন ধরে হাতে মেহেদির কারুকাজ করিয়ে নেন। এখানে বড়দের চেয়ে ছোটদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়।
প্রবাসের ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা রুটিন জীবনে রোজা একটু বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। সঙ্গে যোগ করে কিছু আনন্দের মাত্রাও। ছোটদের মধ্যে কথা চলে কে কয়টা রোজা রাখতে পারল, সেটা নিয়ে। বড়দের মধ্যে চলে দলগতভাবে ইফতার আয়োজনের ব্যস্ততা। চলে জামাতে তারাবিহর নামাজ পড়া। পাশাপাশি পড়ে যায় ঈদের কেনাকাটার ধুম। রোজার সব আনন্দ পূর্ণতা পায় ঈদের দিন এলে।