মালয়েশিয়ার মালাক্কায় এক রমজানের স্নিগ্ধ সন্ধ্যা

ছবি: লেখকের পাঠানো

পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট একটি দেশ—কিন্তু উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যে এক অনন্য বিস্ময়—মালয়েশিয়া।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই মুসলিমপ্রধান দেশটি আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আকাশছোঁয়া টুইন টাওয়ার, বিস্তৃত এক্সপ্রেসওয়ে, সুপরিকল্পিত নগরায়ণ, আর রাস্তার দুপাশে সারি সারি ফুলের গাছ—সব মিলিয়ে যেন রূপকথার সাজানো রাজ্য।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ দেশটিকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে প্রযুক্তি, শিক্ষা, অর্থনীতি ও নান্দনিকতা একসঙ্গে বিকশিত হয়েছে। শহরের ব্যস্ততার মাঝেও শৃঙ্খলা আছে, উন্নয়নের মাঝেও সবুজ আছে—এটাই মালয়েশিয়ার বিশেষত্ব।

আমি ভ্রমণপিপাসু মানুষ। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছি, নানা সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু মালয়েশিয়া আমাকে বারবার টানে। হয়তো মুসলিম দেশ বলে, হয়তো এর পরিচ্ছন্নতা আর আন্তরিকতা আমাকে আকর্ষণ করে। বছরে দু-চারবার সুযোগ পেলেই চলে যাই এই দেশটির রূপ-সৌন্দর্য দেখতে।

ইফতারের বড় বড় থালায় সাজানো থাকে খেজুর, ভাজা সামুদ্রিক মাছ, ভাত, কলা, বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস, কেক। পাশে সাদা পানির বোতল আর নানা স্বাদের কোমল পানীয়। ক্যানের মধ্যে পেয়ারা জুস, কলা মিল্ক, টমেটো জুস, আপেল জুস—যার যার পছন্দমতো নেওয়ার সুযোগ। তরমুজের ঠান্ডা জুসের স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।

মালয়েশিয়ার বিভিন্ন শহর ঘুরলেও আমার হৃদয়ের কাছাকাছি জায়গা দখল করে আছে মালাক্কা। ঐতিহাসিক এই শহরটি একসময় পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। তাই এখানে ইতিহাসের ছাপ স্পষ্ট। পুরোনো লাল ইটের ভবন, গির্জা, মসজিদ আর জাদুঘর—সবকিছু যেন অতীতের গল্প বলে।

শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা মালাক্কা নদী। নদীর দুপাশে শিল্পসমৃদ্ধ দেয়ালচিত্র, ছোট ছোট রঙিন নৌযান, ঝকঝকে ক্যাফে আর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা—দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। সন্ধ্যার আলো নদীর জলে পড়লে মনে হয় যেন শহরটা নতুন করে সেজে উঠেছে।

রমজান মাসে এই শহরের আবহ আরও বদলে যায়।

মালয় ভাষায় ইফতারকে বলা হয় বারবুকা পুয়াসা। ইফতারের আগমুহূর্তে পুরো পরিবেশে একধরনের পবিত্র নীরবতা নেমে আসে। রমজানের বাজারে নানা রকম খাবারের সমারোহ—নাসি লেমাক, সাতে, বিভিন্ন সামুদ্রিক পদ, রঙিন পানীয়—সবকিছুই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন

মালাক্কায় আমার প্রিয় থাকার জায়গা Heeren Street Hotel—একটি ঐতিহাসিক বুটিক হোটেল, জংকার ওয়াকের খুব কাছেই। আশপাশে অনেক বাংলাদেশি ভাই আছেন। কাছেই মালাক্কার সরকারি সেন্ট্রাল মসজিদ। তাই ইফতারের সময় হলে আমি সেখানেই চলে যাই।

মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দর, পরিষ্কার ও সুপরিচালিত। বিশাল প্রাঙ্গণে ইফতারের আয়োজন করা হয় অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে। মুসল্লিদের মাঝে বাংলাদেশি সংখ্যাই বেশি, এরপর পাকিস্তানি, ভারতীয় এবং কিছু আফ্রিকান ভাইদের দেখা মেলে। সবাই এক কাতারে বসে—কোনো জাতিগত ভেদাভেদ নেই, নেই ভাষার বিভাজন—শুধু একটাই পরিচয়, আমরা মুসলিম।

ইফতারের বড় বড় থালায় সাজানো থাকে—খেজুর, ভাজা সামুদ্রিক মাছ, ভাত, কলা, বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস, কেক। পাশে সাদা পানির বোতল আর নানা স্বাদের কোমল পানীয়। ক্যানের মধ্যে পেয়ারা জুস, কলা মিল্ক, টমেটো জুস, আপেল জুস—যার যার পছন্দমতো নেওয়ার সুযোগ। তরমুজের ঠান্ডা জুসের স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।

মালয় ভাষায় ইফতারকে বলা হয় বারবুকা পুয়াসা। ইফতারের আগমুহূর্তে পুরো পরিবেশে একধরনের পবিত্র নীরবতা নেমে আসে। রমজানের বাজারে নানা রকম খাবারের সমারোহ—নাসি লেমাক, সাতে, বিভিন্ন সামুদ্রিক পদ, রঙিন পানীয়—সবকিছুই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
আরও পড়ুন

ইফতারের আগে দেখেছি—স্থানীয় মালয় পুরুষ ও নারীরা নিজেদের বাড়ি থেকে হাতে তৈরি পিঠা, পায়েস, নানা খাবার নিয়ে মসজিদে আসছেন। কেউ হেঁটে, কেউ গাড়িতে। এ যেন দানের আনন্দ, অংশগ্রহণের আনন্দ।

একদিন নুডলস খেতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম—তার ভেতর সমুদ্রের শামুক-ঝিনুক। প্রথমে দ্বিধায় পড়েছিলাম। পরে ইমাম সাহেবের কাছে জানতে পারলাম—এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইমাম শাফি (রহ.)-এর মাজহাব অনুসরণ করেন। তাই সমুদ্রের প্রায় সব প্রাণীই তাদের কাছে হালাল। সংস্কৃতির এই ভিন্নতা আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

ইফতারের পরও অনেক খাবার বেঁচে যায়। বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি ভাইয়েরা যাঁর যাঁর প্রয়োজনমতো নিয়ে যান। অপচয়ের বদলে ভাগাভাগির এই সংস্কৃতি আমার খুব ভালো লাগে।

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এক থালায় বসে, বিভিন্ন দেশের মুসলিম ভাইদের সঙ্গে, একই সময়ে, একই দোয়া পড়ে ইফতার—এ যেন এক অদৃশ্য বন্ধন। ভাষা আলাদা, দেশ আলাদা—কিন্তু আজানের ধ্বনি এক, রোজা ভাঙার অনুভূতি এক, আল্লাহর কাছে হাত তোলার আকুতি এক।

মালয়েশিয়ায় ইফতার শুধু খাবারের আয়োজন নয়—এটি শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, ভ্রাতৃত্ব আর অংশীদারত্বের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে—পৃথিবী বড়, সংস্কৃতি ভিন্ন; কিন্তু হৃদয়ের ভাষা এক।

রমজান সেই ভাষাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

দেশ ভিন্ন হলেও, সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তে যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে—মনে হয় পুরো পৃথিবী যেন এক পরিবারের মতো।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন