মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে যখন মাগরিবের আজান ভেসে আসে, তখন বাহরাইনের আকাশে এক অন্য রকম প্রশান্তি নেমে আসার কথা। কিন্তু এ বছর সেই প্রশান্তির জায়গায় দানা বেঁধেছে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক। বাহরাইনে একজন প্রবাসী হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এবারের মতো থমথমে রমজান আমি আগে কখনো দেখিনি।
ঐতিহ্যের বাহরাইন
বাহরাইনের রমজান–সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। এখানকার স্থানীয় লোকজনের প্রধান ঐতিহ্য হলো ‘গাবগা’ (Ghabga)। এটি মূলত ইফতারের কয়েক ঘণ্টা পর গভীর রাতে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে আয়োজিত এক রাজকীয় ভোজ। বাহারি সব পদের মধ্যে থাকে ‘হরেস’ (Harees) গম ও মাংসের এক অনন্য মিশ্রণ, যা ছাড়া বাহরাইনিদের ইফতার অসম্পূর্ণ। এ ছাড়া মাছবুস আর মিষ্টি মুখ করতে লুগাইমাত তো আছেই। বাহরাইনিরা রমজানের রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে মার্কেটে ভিড় করেন, চারদিকে উৎসবের আমেজ থাকে।
কয়েক দিন ধরেই ইফতার বা সাহ্রির আগমুহূর্তে বা কাছাকাছি সময়ে ইরান থেকে ছোড়া মিসাইল বা ড্রোন নিক্ষেপের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে উঠছে। ভয়ার্ত সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যখন কানে আসে তখন ইফতারের খেজুর হাতে নিয়েও আমাদের বুক কেঁপে ওঠে।
প্রবাসীদের ইফতার
আমরা যারা প্রবাসী বাংলাদেশি, আমাদের ইফতারের স্বাদটা একটু ভিন্ন। ডিউটি না থাকলে আমরা নিজেদের বাসাতেই সাধ্যমতো ইফতারের আয়োজন করি। কিন্তু কর্মব্যস্ত অধিকাংশ প্রবাসীই ছোট ছোট বাংলাদেশি হোটেলগুলোয় ভিড় জমান। সেখানে পেঁয়াজু, ছোলা-বুট, জিলাপি আর ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির গন্ধে মনে হয় যেন দেশের কোনো গলিতে বসে আছি। অন্যান্য বছর বিভিন্ন সংগঠন বড় বড় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করলেও, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার কারণে এবার সেই জৌলুশ একদমই নেই। বড় জমায়েত এড়িয়ে সবাই এখন ঘরোয়া পরিবেশে বা কর্মস্থলেই ইফতার সারছেন।
সাইরেনের শব্দে আতঙ্কিত সাহ্রি ও ইফতার
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুদ্ধের দামামা আমাদের দোরগোড়ায়। গত কয়েক দিন ধরে প্রায় নিয়মিতই ইফতার বা সাহ্রির ঠিক আগমুহূর্তে বা কাছাকাছি সময়ে ইরান থেকে ছোড়া মিসাইল বা ড্রোন নিক্ষেপের আশঙ্কায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে উঠছে। ভয়ার্ত সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যখন কানে আসে, তখন ইফতারের খেজুর হাতে নিয়েও আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। এই আতঙ্ক এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী।
স্বাভাবিক সময়ে রমজানের রাতে বাহরাইনের রাস্তায় প্রচুর গাড়ি আর মানুষের আনাগোনা থাকলেও, এবার জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। চলাফেরা এখন অনেকটাই সীমিত।
রমজানের শেষ দশকে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি কিয়ামউল লাইল বা দীর্ঘ রাত্রিকালীন সালাতের জন্য। বাহরাইনের প্রায় সব মসজিদে এ আয়োজন থাকলেও নিরাপত্তার কারণে এবার অনেক মসজিদে এই নামাজ হচ্ছে না।
ইবাদতেও পড়েছে প্রভাব
রমজানের শেষ দশকে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি কিয়ামউল লাইল বা দীর্ঘ রাত্রিকালীন সালাতের জন্য। বাহরাইনের প্রায় সব মসজিদে এই আয়োজন থাকলেও নিরাপত্তার কারণে এবার অনেক মসজিদে এই নামাজ হচ্ছে না। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নামাজ পড়ানো হলেও উপস্থিতি সীমিত।
আমরা প্রবাসীরা সাধারণত সাহ্রিতে মাছ, মাংস আর সবজি দিয়ে তৃপ্তিসহকারে ভাত খেয়ে রোজা রাখি। কিন্তু এখন মানসিক উদ্বেগের কারণে অনেকে রাতে সাহ্রি খেয়েই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ছেন, যেন পরিস্থিতির অবনতি হলে সজাগ থাকা যায়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
একদিকে হৃদয়ে ধর্মীয় ঐতিহ্যের টান, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত প্রাণের ভয়। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে যখন সাইরেন বেজে ওঠে, তখন বিদেশের মাটিতে আমাদের বুকটা কেঁপে ওঠে। স্বজনদের থেকে দূরে এই অনিশ্চয়তা বড় বেদনার।
এখন আমাদের প্রতিটি মোনাজাতে একটাই প্রার্থনা, শান্তি ফিরে আসুক এই জনপদে। আবার যেন নির্ভয়ে মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে সেই চিরচেনা প্রশান্তির আজান। যুদ্ধের আতঙ্ক মুছে গিয়ে আবারও ফিরে আসুক আমাদের চেনা রমজান।