উদ্বাস্তুর ইতিকথা-শেষ পর্ব

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

এই গল্পের লেখক কয়েক দিন হলো কক্সবাজার এসেছেন। মাস ছয়েক তিনি বেশ ব্যস্ত ছিলেন। শহরের ব্যস্ত জীবন আর কোলাহল থেকে তিনি একপ্রকার পালিয়ে এসেছেন বিশ্বের এই অন্যতম দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকতে, যেখানে নীল সমুদ্রের ঊর্মিমালা তটরেখার ওপর কখনো গর্জন করে, আবার কখনো নিঃশব্দে আছড়ে পড়ে। শুধু কি তা-ই?

দেখা মেলে দিগন্তকে সোনালি আভায় রাঙিয়ে যাওয়া সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তেরও।

এক পড়ন্ত বিকেলে লেখক তটরেখা বরাবর পায়চারি শেষে শান্ত-স্নিগ্ধ বিশাল সমুদ্রের সামনে একটি সৈকত-চেয়ারে বসে পড়লেন। তাঁর চোখের সামনে ধীরে ধীরে সূর্য অস্ত যেতে থাকে। আর নরম বালুর ওপর রাখা তাঁর পদযুগলকে ধীরলয়ে বয়ে আসা ঢেউগুলো যেন আলিঙ্গন করে ফিরছিল। লেখক ভাবছিলেন, যদি চিত্রী হতেন, হয়তো রংতুলিতে আঁকার চেষ্টা করতেন সমুদ্রসৈকতের পড়ন্ত বিকেল আর সন্ধ্যা নামার সন্ধিক্ষণকে!

আরও পড়ুন

সমুদ্রের ঢেউগুলো যখন লেখকের পায়ে আছড়ে পড়ছে, তখন কেন জানি লেখকের মানসপটে ভেসে উঠল অনেক দিন আগের এক স্মৃতি। তিনি তখন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। গিয়েছিলেন স্কুল পালিয়ে একটু বড় ক্লাসের কিছু ছেলের সঙ্গে সিনেমা হলে দুপুরের শো দেখতে। বসেছিলেন একেবারে সামনের বেঞ্চে। একটা দৃশ্য ছিল, সমুদ্রের বিশাল ঢেউ তীরে এসে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ছিল আর লেখক ভয়ে বেঞ্চের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, যেন ঢেউ তাঁকে কোনোভাবেই ভাসিয়ে নিয়ে যেতে না পারে! সেই বয়সে সিনেমা শেষে পর্দায় ভেসে ওঠা ‘সমাপ্ত’ দেখার পরও লেখক উদ্‌গ্রীব হয়ে সিটে বসে থাকতেন, তারপর কী ঘটবে তা দেখার জন্য!

কিছুক্ষণ হলো সূর্যটা একেবারেই ডুবে গেছে। আলো-আঁধারির এক অপরূপ খেলা চলছে। লেখকের মনে হলো, কে যেন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটির দিকে দৃষ্টি রাখতেই সে বলে ওঠে—

‘আচ্ছা, আপনি কেমন লোক বলতি পারেন? আপনি আমারে মারি ফেললেন?’
সত্যি বলতে কি, লেখক লোকটির অবয়ব দেখে বোঝার চেষ্টা করলেন, কে এই লোক? কিন্তু আলো-আঁধারিতে সেটা অনুধাবন করা তাঁর সাধ্যের অতীত। লেখক কিছু বলছে না দেখে লোকটি আবারও বলল—

আরও পড়ুন

‘বুঝতি পারতিছি, আপনি আমারে চিনতি পারতিছেন না।’
উত্তরে অপ্রস্তুত হয়ে লেখক বললেন—
‘না মানে, একটু অন্ধকার তো, তাই বুঝতে পারছি না।’

বেশ খানিকটা সময় ধরে তাঁদের মাঝে নিস্তব্ধতার একটা ঢেউ বয়ে গেল। হঠাৎই খসখসে গলায় লোকটি বলল—

‘আমি হলাম গিয়ে আপনার গল্পের রহমত মিয়া। এবারে মনে কয় চিনতি পারিছেন।’
‘ওহ হ্যাঁ, এবারে আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। ...তা আপনি তো ট্রাকের ধাক্কায় চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তারপর বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থেকে মারা গিয়েছিলেন।’

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মাথা দুই দিকে দুলিয়ে লোকটি মৃদুস্বরে বলল—
‘এই তো দেকচি আপনার মনে পড়িচে! তা এবারে আপনি তালি কন আমারে ক্যান মারি ফেলিলেন? আমি মরি গিলি আমার পরিবার আর বাচ্চাকাচ্চা গুলান কত যে দুক্ককষ্টের সাগরের মদ্দি গিয়ে পড়িছিল?’

উত্তরে লেখকও মৃদুস্বরে বললেন—
‘দেখেন রহমত মিয়া, আমাদের দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় যে মানুষ জীবন দেয়, তা তো সত্যি।’

আরও পড়ুন

‘আপনি ঠিকই কইছেন।’
লেখক কেন জানি নিজের চিন্তার মাঝে ডুবে গেলেন। তিনি ভাবলেন, রহমত মিয়া তো বেশ কিছুদিন রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় রিকশা চালিয়েছে। সে  হয়তো বলতে পারবে, রিকশা আর ট্রাক সংঘর্ষ কীভাবে এড়ানো যেতে পারে। আর তাই তিনি রহমত মিয়ার উদ্দেশে বললেন—

‘তা রহমত মিয়া, আপনি কি বলবেন, আমরা কীভাবে আপনার মতো দুর্ঘটনার শিকার যেন অন্যরা না হয়, তার জন্য কী করতে পারি?’

অন্ধকারে বোঝা না গেলেও এটা পরিষ্কার যে রহমত মিয়া লেখকের কথায় বেশ মজাই পেয়েছে। তাই খানিকটা হালকা স্বরে বলল—

‘কী যে কন না? আমরা হলাম গিয়ে টিপসই মারা শিক্কিত মানুষ! আমরা আর কী কতাম? ...তয় আমার মনে কয় কী, একই রাস্তায় ট্রাক আর বাসের লগে রিকশা চলতি দিয়া ঠিক না। দেহেন, দুডো রিকশা অ্যাকসিডেন্ট করলিও কি সহজে মানুষ মরতি পারে?’

রহমত মিয়ার মতামত শোনার পর লেখকের মনে হলো, তাই তো, ধারণাটা বেশ। কথাটা যখন তিনি রহমত মিয়াকে বলতে যাবেন, তখন সেখানে শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই তিনি দেখতে পেলেন না।

আরও পড়ুন

বেশ খানিকটা ক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর লেখকের মনে হলো, তিনি দেখতে পাচ্ছেন মাঝবয়সী এক নারীর অবয়ব আর তার সঙ্গে তিন থেকে চার বছর বয়সী একটা শিশু। লেখক খানিকটা সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললেন—

‘কে...কে ওখানে?’ বলেই দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ ঘষে দেখার চেষ্টা করলেন, আসলেই কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে কি না? এরই মধ্যেই লেখকে উদ্দেশে নারীটি বলল—

‘এই যে হুনেন, আমি কলাম মিনা বেগম, রহমত মিয়ার পরিবার। আর এই সেই নেদা ছাওয়ালডা, জিডা নিমুনিয়ায় মরিল।’

নারীটির কথা বলা শুনতেই লেখকের মনে হলো, মিনা বেগম তার নিজের আর তাদের শিশুসন্তানের মৃত্যুর দায় এখনই তাঁর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। তাই দেরি না করে তিনি দ্রুততার সঙ্গে বললেন—

‘দেখেন, আমাদের দেশে শৈত্যপ্রবাহ প্রতি শীতকালেই দেখা যায়। সেবারের শৈত্যপ্রবাহটা একটু কড়া আর দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। আর আপনি যদি আরও দু-এক দিন আগে বাচ্চাটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন, সে হয়তো আজও বেঁচে থাকত।’

সত্যি বলতে কি, লেখক কখনোই ভেবে পান না, শিশুর মৃত্যুর শোক কীভাবে মা-বাবারা সহ্য করে থাকেন!

আরও পড়ুন

কিছুক্ষণ নীরবতার পর মিনা বেগম আর্দ্রকণ্ঠে বলে উঠল—
‘বাচ্চাডার কথা নাহয় বাদ দিলাম। কিন্তুক আপনি আমারে আগুনে জ্বালায়ে মারি ফেললেন ক্যান?’

‘দেখেন মিনা বেগম, আমি আপনার গায়ে আগুন কখন দিলাম? আপনার গৃহকর্ত্রীর সাবধানতার কারণে তাঁর শরীরে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর চিৎকারে আপনি ছুটে গিয়েছিলেন আর তাঁকে বাঁচাতে আপনার গায়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল, তাই না?’

‘আপনি যে কী কন? একজন সাহায্য চাবি আর আমি দাঁড়াই দাঁড়াই দেখপো, তা কী করে হয়?’

‘তাহলে তো আপনার গায়ে আগুন লাগার দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার, তাই না?’
‘মানুষ হয়ে মানুষের বিপদে কিছু করব না, ইডা কী করে সম্ভব?’ বিড়বিড় করে মিনা বেগম একপ্রকার নিজের মনেই বলে গেল। আর লেখক কোনো উত্তর না করে চোখ বন্ধ করলেন।

বেশ কিছুক্ষণ হলো লেখক মিনা বেগমের কোনো কথা শুনতে পাচ্ছেন না। কিন্তু হঠাৎই খুব কাছ থেকে তিনি শুনতে পেলেন কোনো এক যুবা পুরুষের গাঢ় আর ভরাট কণ্ঠস্বর—
‘আচ্ছা, আপনি আমারে কেন নিখোঁজ করে দেলেন?’
লেখকের মনে হলো তিনি একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। তিনি যুবকের উদ্দেশে বললেন—

‘কে ভাই আপনি?...আপনাকে আমি নিখোঁজ করারই-বা কে?’
‘বুঝতি পারিচি। আপনি আমারে চিনতি পারেননি। আমি কলাম রহমত মিয়া আর মিনা বেগমের বড় ছাওয়াল টুটুল।’

‘হ্যাঁ, এবারে আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। তা আপনি কোথায় হারিয়ে গেলেন? আপনার বোন রিতা আর বন্ধু রফিক তো আপনাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। আর আপনি কিনা সমুদ্রসৈকতে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন? আপনার তো দেখছি দায়িত্বজ্ঞানের খুবই অভাব?’ লেখক একটানা কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন।

খানিকটা সময় চুপ থেকে টুটুল বলল—
‘দেখেন, আমাগের দ্যাশে রাজনীতি করাডা কী কষ্টের, আপনি মনে কয় তা জানেন না। আমাগের নেতা কইছে লম্বা সময়ের জন্নি গা ঢাকা দিতি হবি, নাইলে জীবন বাঁচপি কি না কিডা জানে।...বুনডার কথা কইছিলাম নেতারে। হে কইছে, আগে তোর জীবন বাঁচা, পরে বুনের কথা ভাবিস।’

টুটুলের কথার পিঠে লেখক কী বলবেন, তা ভেবে পেলেন না। তাঁর ভাবনায় এল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এই উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে সমাজ কি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে না, যাতে তারা নব-উদ্যমে জীবন শুরু করতে পারে। শেষ...