পরপর দুবার ঘটনাটি ঘটল। প্রথমবার সেরীন টার্নস্টাইলে কার্ড পাঞ্চ করে আমাকে বলল—তুমি যাও। আমি খানিকটা ধীরলয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি, গেট আর খুলছে না। খানিকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করলাম। কিন্তু কাজ হলো না। ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, গেট কেন খুলল না।
—তোমার বোধহয় আরও একটু তাড়াতাড়ি যেতে হতো, সেরীন মতামত দেয়।
—এত তাড়াতাড়ি পার হতে হয়! আশ্চর্য!
টরন্টোর সাবওয়ে তো এই রকম নয়! সেখানে পেস্ট্রো কার্ড পাঞ্চ করে গেট পেরোতে কখনো এত তাড়াহুড়া করেছি বলে মনে পড়ল না। আমি তো প্রায়শই ডাউন টাউনে যেতে সাবওয়েতেই চড়ি। আর নিউইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশন প্রথমবারেই আমার পয়সা খেয়ে দিল!
আজ আমরা নিজেরাই বেরিয়েছি, কোনো গাইড ছাড়া। ভাগিনা গোলাম মোস্তফা গোলাপ আমাদের সঙ্গ দিতে ছুটি নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বারণ করেছি। বলেছি, নিজেরা একাকী শহর ঘুরে না দেখলে অভিজ্ঞতা হবে কীভাবে। অনেক পীড়াপীড়িতে গোলাপ আমাদের একা ছেড়ে দিতে সম্মত হয়।
আমাদের প্ল্যান মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট দেখা। নিউইয়র্কে এসে টাইম স্কয়ারে না গেলে নাকি আমেরিকা ভ্রমণ, ভ্রমণ হিসেবেই গণ্য হয় না। সবাই অবশ্য বলছিল, টাইম স্কয়ারে যেতে হয় রাতের বেলা, রাতের টাইম স্কয়ারে নাকি অন্য রকম কিছু একটা আছে। কিন্তু রাতের টাইম স্কয়ার দেখতে চাইলে এ যাত্রা আর দেখাই হয়ে উঠবে না আমাদের, তা ছাড়া আমাদের আগ্রহ হচ্ছে নিউইয়র্কের কোনো একটা মিউজিয়াম দেখা। থিয়েটার দেখার পরিকল্পনাও ছিল। দেবু জানিয়েছিল, যেকোনো ভালো থিয়েটার শো দেখতে হলে অনেক আগে থেকে টিকিট কাটতে হয়। ফলে সেটা পরিকল্পনা থেকে বাদ দিয়েছি। নতুন কোনো দেশে গেলে, সে দেশের পাবলিক লাইব্রেরি, মিউজিয়াম আর থিয়েটার না দেখলে দেশটার সংস্কৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। থিয়েটার যেহেতু দেখা হলো না, ভালোভাবে মিউজিয়ামই দেখতে হবে।
নিউইয়র্ক সিটিতে বিভিন্ন ধরনের শিল্প, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক ১০০টিরও বেশি উল্লেখযোগ্য এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত মিউজিয়াম আছে। তবে ছোট গ্যালারি, ঐতিহাসিক বাড়ি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রহের মতো স্থানগুলো মিলিয়ে এই সংখ্যা ৭০০টিরও বেশি হতে পারে। তার মধ্যে অনেকগুলো মিউজিয়াম আছে বিনা পয়সায় ঘুরেফিরে দেখা যায়। আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট। সেটা দেখে টাইম স্কয়ারে হেঁটে বেড়ানো যাবে। সন্ধ্যায় আবার সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা আনোয়ার শাহাদাতের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা আছে। কাজেই সন্ধ্যার আগেই টাইম স্কয়ার ছেড়ে দিতে হবে।
বাসা থেকে বেরোনোর সময় নঈম নিজাম ভাই একটা ‘অমনি কার্ড’ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটাতে টাকা ভরা আছে। আরও লাগলে তোমরা ভরে নিয়ো। সাবওয়ের ভাড়া পরিশোধে লাগবে।
টরন্টোয় আমরা প্রেস্টো কার্ড ব্যবহার করি। এখন অবশ্য ক্রেডিট কিংবা ব্যাংকের ডেবিট কার্ড দিয়েও ভাড়া পরিশোধ করা যায়। নগদে পরিশোধ করারও সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে ভাড়ার ঠিক পরিমাণ সঙ্গে থাকতে হবে। ভাংতি বা বাড়তি ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রেস্টো কার্ড ব্যবহার সুবিধাজনক। ইচ্ছেমতো ডলার লোড করে নেওয়া যায়। তারপর আসা-যাওয়া স্টেশনে কেবল পাঞ্চ করা। প্রেস্টো কার্ডধারীরা টরন্টোর সাবওয়েতে ভাড়ায় খানিকটা রেয়াতও পায়।
টরন্টোয় আমরা প্রেস্টো কার্ড ব্যবহার করি। এখন অবশ্য ক্রেডিট কিংবা ব্যাংকের ডেবিট কার্ড দিয়েও ভাড়া পরিশোধ করা যায়। নগদে পরিশোধ করারও সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে ভাড়ার ঠিক পরিমাণ সঙ্গে থাকতে হবে। ভাংতি বা বাড়তি ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই।
টরন্টোর ‘প্রেস্টো কার্ডে’র মতোই নিউইয়র্ক সাবওয়েতে ব্যবহৃত হয় এই ‘ওমনি কার্ড’। সাবওয়ে স্টেশন, নির্দিষ্ট খুচরা দোকান বা ওমনি ভেন্ডিং মেশিন থেকে ৫ ডলারে কার্ডটি কেনা যায়। চার্জ বা রিচার্জও করা যায়, এসব স্থানেই। পাঁচ ডলার দিয়ে কার্ডটি কিনে পরিমাণমতো ডলার লোড করে নিতে হয়। যতক্ষণ ডলার ব্যালেন্স আছে, ততক্ষণ সাবওয়ে ভ্রমণে আর কোনো চিন্তা নেই। ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে আবার রিচার্জ করে নেওয়া যায়। সপ্তাহে (৭ দিনে) ১২টি পেইড রাইড হয়ে গেলে সেই সপ্তাহের বাদবাকি সব রাইড ফ্রি। নিউইয়র্ক যাঁরা সারা দিন ঘুরে বেড়াতে চান, তাঁদের জন্য সাবওয়ে এবং ওমনি কার্ড অবশ্যই সুবিধাজনক। শহরের এক প্রান্ত থেকে সাবওয়ে ধরে যেখানে খুশি নামবেন আবার উঠবেন, ১২ রাইডের পর সারা সপ্তাহের পুরো সময় বিনা পয়সায় ঘুরে বেড়ানো।
নিউইয়র্কে আসার আগে প্রস্তুতি পর্বে ‘অমনি কার্ড’কেনার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু নিউইয়র্কে পা দেওয়ার পর থেকেই গোলাপ যেভাবে গাইড হয়ে গেল, কার্ড কেনার আর প্রয়োজনই হলো না।
সেরীন আবার টার্নস্টাইলে কার্ড পাঞ্চ করে বলল, ফাস্টার যাও। বেশ খানিকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করে এবারও যেতে পারলাম না। তার মানে এবারও ভাড়াটা গচ্চা গেল। দুজনের ভাড়ার টাকা খালি খালি গচ্চা দিয়ে ফেললাম! কিন্তু সমস্যা কী? ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, তাড়াহুড়ায় আমি যে গেটে ভাড়া পরিশোধ করেছি, সেটির বদলে অন্য গেট ধরে ধাক্কাধাক্কি করেছি। সেরীনের চাহনি দেখে বুঝতে পারি, অনেক কষ্টে সে রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। বেড়াতে এসে নিউইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে হাজব্যান্ডের সঙ্গে রাগারাগি করাটাকে সম্ভবত শোভন মনে করল না ভেবে চুপ হয়ে আছে।
—নিশ্চয় স্টাফ কাউকে পাওয়া যাবে। বলে দেখি হারানো পয়সাটার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না।
—নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতোই কথাগুলো বলতে থাকি। আশপাশে তাকিয়ে কোথাও সাবওয়ের কোনো স্টাফ বা লোকজন দেখা যাচ্ছে না। আমরা কি মূল প্রবেশের বদলে অন্য প্রবেশপথ দিয়ে স্টেশনে ঢুকেছি! সাবওয়ে স্টেশনগুলোয় নানা দিকে প্রবেশপথ থাকে।
ততক্ষণে সেরীন তরুণ এক যাত্রীর স্মরণাপন্ন হয়ে গেছে। ছেলেটি কার্ডটা হাতে নিয়ে বলল-আমি পাঞ্চ করছি, তোমরা যাও।
এবার আমি অনায়াসেই ভেতরে চলে এলাম। ছেলেটি দ্বিতীয়বার পাঞ্চ করল। দুজনেই আমরা স্টেশনের ভেতরে। কিন্তু আমাদের যে চারজনের পয়সা চলে গেল?
দুই দুটি টিকিটের পয়সা ফাও ফাও (চুপি চুপি বলি, আমার বোকামির জন্য) হাওয়া হয়ে যাওয়ায় একটু খারাপও লাগছিল। টরন্টোর সাবওয়েতে নির্ঘাত এইভাবে টাকা হাওয়া হতো না। সেখানে প্রেস্ট্রো কার্ড একবার পাঞ্চ করার পর পরবর্তী দুই ঘণ্টা পর্যন্ত যতবারই পাঞ্চ করা হোক না কেন, পয়সা কাটবে না। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে কেউ কোনো একটা স্টেশনে নেমে বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আবার অন্য কোনো স্টেশনে বা সেই স্টেশন থেকেই ট্রেনে কিংবা টিটিসি বাসে চড়লে নতুন করে ভাড়া দিতে হয় না। প্রেস্টো কার্ড পাঞ্চ করতে হয়, কিন্তু কার্ড ভাড়া চার্জ করে না। তবে টরন্টোয় একটা কার্ড একজনই ব্যবহার করতে পারে। ফলে প্রথমবার পাঞ্চ করার পরপরই আবার পাঞ্চ করলে সেটি আর কাজ করবে না। কিন্তু নিউইয়র্কের অমনি কার্ডে একই সময়ে যত খুশি পাঞ্চ করা যায়। বিপত্তি সেখানেই। আবার সুবিধা দুজনের আলাদা কার্ডের দরকার হচ্ছে না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আগের দিন সঙ্গে গোলাপ ছিল। সাবওয়েতে করে সোজা শেষ প্রান্তে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার স্টেশনে নেমেছি। কিন্তু আজকের স্টেশনটা ভিন্ন। নঈম নিজাম ভাই স্টেশনে নামিয়ে দিতে এসেছিলেন। ব্যাংকে তাঁর কাজ আছে। ফলে তিনি জ্যামাইকার টিডি ব্যাংকের কাছের স্টেশনটায়ই নামিয়ে দিলেন। সেই স্টেশনে পয়সা গচ্চা দিয়ে আমরা ট্রেনের অপেক্ষায় আছি।
টরন্টোর সাবওয়ের চেয়ে কী নিউইয়র্কের সাবওয়ে অনেক বড়? মনে মনে ভাবি। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন দ্রুত পরিবহনব্যবস্থা এই নিউইয়র্ক সাবওয়ে। যাত্রা শুরু করেছিল ১৯০৪-এর ২৭ অক্টোবর। এখন বিশ্বের সপ্তম দ্রুত ট্রানজিট সিস্টেম। আমেরিকার প্রাচীনতম ভূগর্ভস্থ রেললাইনগুলোরও একটি এই সাবওয়ে। তবে লন্ডন ও প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে চালু হয়েছে নিউইয়র্কের আগেই। শহরজুড়ে ৪৭২টি স্টেশন নিয়ে ৬৬৫ মাইলের এই সাবওয়ে নেটওয়ার্ক মাটির নিচ আর ওপর দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রীকে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। অধিকাংশ লাইনই গেছে মাটির নিচ দিয়ে। কোথাও কোথাও ২০০ ফুট গভীর দিয়ে চলে গেছে ট্রেন লাইন, আর সেই গভীর দিয়ে প্রতিদিন মানুষ চলাচল করে।
প্ল্যাটফর্মটায় মানুষের ভিড়। নানা বর্ণের, নানা রকমের মানুষ এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর কোন প্রান্তে স্বজনদের রেখে এই মানুষগুলো নিউইয়র্কের ব্যস্ততম শহরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে!
স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাওয়ার পথে গোলাপ জানিয়েছিল নিউইয়র্কের ট্রেনগুলো আপটাউন আর ডাউন ডাউনের মধ্যে চলাচল করে। কিন্তু ট্রেনগুলো চিনতে হয় নম্বর এবং অক্ষর দিয়ে। যেমন ই টেন, ট্রেন সেভেন এই রকম। ‘নম্বর আর অক্ষর দিয়ে?-কথাটা শুনেই বেশ মজা পেয়েছিলাম। খানিকটা বিস্মিতও হয়েছি। টরন্টোর সাবওয়ে চেনা যায় কোন লাইনে চলছে, তা দিয়ে। এমনিতে ট্রেনগুলো নর্থ সাউথ আর ইস্ট-ওয়েস্টে চলাচল করে। কিন্তু কোনো ট্রেনের জন্য নম্বর বা অক্ষর বা অন্য কোনো প্রতীক বরাদ্দ নেই। প্রধান সাবওয়ে চারটি লাইনে বিভক্ত; ইয়ং-ইউনির্ভাসিটি লাইন, ব্লোর- ডেনফোর্থ লাইন, শেফার্ড লাইন এবং ফিঞ্চ ওয়েস্ট লাইন। ইয়ং- ইউনির্ভাসিটি লাইন, ব্লোর- ডেনফোর্থ লাইন মূল ডাউন টাউনকে সংযুক্ত করেছে বলে সব সময় এই ট্রেনগুলোয় ভিড় লেগেই থাকে।
আর নিউইয়র্কের সাবওয়ে আপ টাউন/ নর্থ বা ডাউন টাউন/ সাউথ—এই দুইভাগে বিভক্ত। ম্যানহাটন, কুইন্স, ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কসকে সংযুক্ত করে সাধারণত ‘আপটাউন’ট্রেনগুলো ম্যানহাটনের উত্তরের দিকে এবং ‘ডাউনটাউন’ট্রেনগুলো দক্ষিণের দিকে যায়। ট্রেনের গায়ে বা প্ল্যাটফর্মে Uptown/Bronx/Queens (আপটাউন) অথবা Downtown/Brooklyn (ডাউনটাউন) লেখা দেখে যাত্রীরা বুঝে নেয় তাঁর ট্রেন কোনটি।
কিন্তু ‘ই’ট্রেন, ‘সেভেন’ট্রেন- এই রকম নম্বর আর অক্ষর দিয়ে ট্রেনের নাম কেন? সেই কাহিনিটাও চমৎকার। একেবারে গোড়ার দিকে বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি বিভিন্ন এলাকায় লাইন তৈরি করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। অনেক পরে এসে এগুলোকে একত্র করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আনা হয়। এই সময়ে ট্রেনগুলোর পরিচিতি নির্ধারণের দরকার হয়ে পড়ে। তখন নম্বর এবং অক্ষর দিয়ে তাদের পরিচিতি নির্ধারণ করা হয়। যেমন IRT বা ইন্টার বোরো র্যাপিড ট্রানজিটে রুটের জন্য নম্বর (যেমন- ১, ২, ৩) এবং ব্রুকলিন- ম্যানহাটন ট্রানজিট করপোরেশনের এবং স্বতন্ত্র রুটের জন্য অক্ষর (যেমন- A, F, N) ব্যবহার করা হয়। পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতেই এই মিশ্র পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে।
প্রথম যে ট্রেনটা এসে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়, সেটাতেই ওঠে পড়ি। এটি কি আপ না ডাউন, নম্বর না অক্ষর, এতকিছু দেখার বিষয়টা ভুলেই গিয়েছিলাম। ট্রেন চলতে শুরু করলে মনে হলো-কোথায় যাচ্ছি?
কামরাটায় বেশ ভিড়। স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাওয়ার সময় এতটা ভিড় দেখিনি। সেদিন বরং বসার সিটও পেয়েছিলাম। আমরা দাঁড়িয়ে আছি সিট না পেয়ে। ঠিক আমাদের সামনে বসা দুজন, দেখে মনে হলো বাংলাদেশি। একটা মেয়ে ছোট্ট একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে কম্পার্টমেন্টে কিছু একটা বিক্রি করছে।
—নিউইয়র্কের সাবওয়েতে হকারও এলাউ করা হয়!
—প্রশ্নটা মনে আসতেই বাংলাদেশের ট্রেনভ্রমণের কথা মনে পড়ে যায়। গাদাগাদি করা ট্রেনের ভেতর আর স্টেশনের বাইরের প্ল্যাটফর্মে নানা রকমের সুর তুলে হকারদের পণ্য বিক্রির সেই স্মৃতিগুলো হঠাৎ যেন টন করে বেজে ওঠে।
—ছবি তোলো
—সেরীন তাগাদা দেয়। আমারও ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমে হুটহাট করে কারও ছবি তুলে ফেলা যায় না। প্রাইভেসি বোধটা প্রবল এখানে। বিনা অনুমতিতে কারও ছবি তুলে বিপদে পড়তে চাই না। তাই নিজেকে নিবৃত্ত করলাম।
সামনের সিটে বসা দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। আগ বাড়িয়ে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, আমাদের সঙ্গে চলুন, জ্যাকসন হাইটসে নেমে গিয়ে সেখান থেকে একই প্ল্যাটফর্ম থেকে আরেকটা ট্রেন ধরবেন। জ্যাকসন হাইটসে তিনি প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
—‘এক্ষুনি পরের ট্রেনটা চলে আসবে। সেটায় ওঠে পড়বেন। একেবারে শেষ স্টেশন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।’
—বলেই দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন তাঁরা। সম্ভবত কাজের সময় হয়ে গেছে। এইবার আর ট্রেনের নাম পড়তে ভুল হলো না। ‘ই ট্রেন’ই তো!
ট্রেন চলতে শুরু হলতেই মনে হলো আচ্ছা, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার স্টেশনটাকে মাথায় নিয়ে ঘুরছি কেন! স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যেতে সেখানে নেমেছিলাম। কিন্তু আজ তো আমরা মিউজিয়ামে যাব। সেলফোনে ডিরেকশন দিতেই ৫ম অ্যাভিনিউ/৫৩ দেখাচ্ছে। আমরা কি এখানেই নামব?
মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, সংক্ষেপে যেটাকে ‘মোমা’ বলে ডাকা হয়, আসলে ৫ম/৬ষ্ঠ অ্যাভিনিউর মাঝামাঝি। আমরা যে জায়গায়টায় নেমেছি, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ২ মিনিটের পথ। এবার অনেকটা ভারমুক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করি। ম্যানহাটনের মিডটাউনের বিশাল বিশাল অট্টালিকাগুলোকে পাশে রেখে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বর্তমান বিশ্বের আধুনিক চিত্রকলার অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়ামটায় পৌঁছে যাই। চলবে...