১.
গাড়িটা যে অনেকক্ষণ ধরে বৃত্তের মতো কোনো একটা কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, সেটা টের পাইনি। আমার নজর ছিল বাইরের দিকে। চারদিকে গাছপালায় যেন আগুন। কিংবা বলা যায়, নানা রঙে সাজিয়ে রাখা কোনো বাগান।
অক্টোবরের এই সময়টা উত্তর আমেরিকায়, বিশেষ করে কানাডা-আমেরিকার ফল সিজন। প্রথমে গাছের পাতাগুলো নানা রঙে বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে ঝরে পড়ে। আমরা সেটাকে কাব্য করে বলি পাতা ঝরার কাল—ফল সিজন। উইন্টার শুরুর আগে আগে প্রকৃতি যেন মানুষকে খানিকটা চাঙা করে দিয়ে যায় এই সিজনে। অনেক দূরের কোনো পার্কে, দূরে কোথাও কটেজে থেকে অথবা লং ড্রাইভে ‘ফল কালার’ দেখা কানাডা-আমেরিকার অনেক মানুষেরই অন্যতম প্রিয় একটা শখ। জ্যামাইকা থেকে বেরোনোর পর পুরো পথটাই তো গাছের পাতার রং দেখতে দেখতে, সেলফোনে কলিম শরাফীর কণ্ঠে ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে’ শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে আছি। কখন থেকে যে গাড়িটা ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে, টেরই পাইনি।
‘আমরা কি কোনো পাহাড়ে উঠছি’—সেরিনের কথায় সংবিৎ ফেরে।
‘দেখো দেখো আমরা ঠিক একটা পাহাড়ে উঠছি। এভাবে ঘোরানো পথ তো পাহাড়ে যাওয়ার জন্যই থাকে’—সেরিনের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস।
আসলেই তো! জানালা দিয়ে খানিকটা দূরে তাকাতেই চোখে পড়ে একটা ভ্যালি। দুই পাহাড়ের মাঝখানের সমতল অংশগুলো। গাছের রঙে বিভোর থাকায় এতক্ষণ ভালোভাবে ঠাহর হয়নি। তার মানে আমরা বেশ খানিকটা ওপরে চলে এসেছি।
‘দেবু কি তাহলে পাহাড়ে থাকে?’ প্রশ্নটা আমার মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে।
আমরা যাচ্ছি দেবুর বাসায়। দেবু হচ্ছে দেবাশীষ রায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়ার আগে ঢাকায় একাত্তর টেলিভিশনে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমি কাজ করেছি একুশে টেলিভিশনে। ২০০৮ সালের দিকে কানাডায় আর থাকব না ভেবে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলাম। সে সময় কিছুদিন একুশে টেলিভিশনের ইকোনমিক এডিটর হিসেবে কাজ করেছি। প্রয়াত সাংবাদিক এবং সাংবাদিক নেতা শাহ আলমগীর তখন একুশে টেলিভিশনের দায়িত্বে। দুপুর বেলার অলস সময়টায় বিজনেস নিয়ে তাঁরা একটা প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনা করেছেন। সরাসরি শেয়ারবাজারের লেনদেন দেখানো থেকে ব্যবসা–বাণিজ্যের নানা বিষয় নিয়ে এক্সক্লুসিভ রিপোর্টিং, আলোচনাসহ নানা কিছু থাকবে এতে। তখন পর্যন্ত ঢাকার কোনো টেলিভিশনে বিজনেস নিয়ে আলাদা কোনো প্রোগ্রাম চালু হয়নি। প্রথম আলোয় আমরা লাভলু ভাইয়ের (সানাউল্লাহ লাভলু) নেতৃত্বে এক্সক্লুসিভ একটা বিজনেস টিম গড়ে তুলেছিলাম। তারপর অবশ্য অন্যান্য পত্রিকাও সেটি করেছে।
একুশে টেলিভিশন তাদের সেই বিজনসে টিমটার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কাউকে খুঁজছিল। আমি তখন ঢাকায়। শাকিল আহমেদ যোগাযোগ করলেন প্রস্তাব নিয়ে। নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষায় আমিও রাজি হয়ে যাই। প্রিন্ট পত্রিকার সাংবাদিকতার পর টেলিভিশন সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা। দেবাশীষ তখন একুশে টেলিভিশনে। সেই থেকে দেবুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। অনেক বছর আগে দেবু যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েছেন। স্ত্রী সুরাইয়াকে (লাভলী) নিয়ে নিউইয়র্কে বসবাস করেছেন অনেক দিন। তারপর নিউইয়র্কের বাইরে বাড়ি কিনে চলে এসেছেন। দুই ছেলে নিয়ে তাঁদের সংসার। দেবু নিউইয়র্কের বাইরে ছিমছাম একটা গ্রামের মতো এলাকায় থাকেন, সেটা জানতাম। কিন্তু পাহাড়ে যে থাকেন, সেটা আমাদের জানা ছিল না।
আমাদের আমেরিকা ভ্রমণের আলোচনাটা শুরুই হয়েছিল দেবুর সঙ্গেই। কোথায় যাব, কী করব, নিউইয়র্ক থেকে কানেটিকাট কীভাবে যাব—এগুলো নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কথা হচ্ছিল। ঠিকঠাক ছিল নিউইয়র্কে আমরা দেবুর বাড়িতেই থাকব। কিন্তু সময় ঘনিয়ে আসতেই ভাগনে গোলাম মোস্তফা গোলাপের ঘোষণা—ভাগনে থাকতে মামা তো অন্য কোথাও থাকতে পারে না। আপনি ভাগিনার বাসায় থাকবেন—কথা ফাইনাল। সব পরিকল্পনা উল্টে দেন ফরিদা আপা। ফরিদা আপা মানে ফরিদা ইয়াসমিন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। ফরিদা আপা ফোন করে নির্দেশ দিলেন—‘সেরীনকে নিয়ে সোজা আমার বাসায় উঠবে। অন্য কোথাও যাবে না।’ এর আগে নিজাম ভাইও (নঈম নিজাম, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক) একই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। সাংবাদিকতার বাইরে ফরিদা আপা আমার এলাকার বড় বোন। দুজনের সঙ্গেই দীর্ঘদিনের সম্পর্কটা এমন যে ফরিদা আপা বা নঈম ভাইয়ের কোনো কথা ফেলা কঠিন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁরা দুজনই নিউইয়র্কে একটা বাসা ভাড়া করে আছেন। থাকেন দুজনেই। শেষ পর্যন্ত আমরা এসে ফরিদা আপা–নঈম ভাইয়ের বাসায় উঠি। দুই সাংবাদিকের বাসায় আমরা দুই সাংবাদিক, চার সাংবাদিকের আড্ডার লোভটা অত সহজে সামলানো যায়!
আমরাও তার গাড়িতে উঠে বসি। যতটা সম্ভব এলাকাটা দেখা যায়, সেটাই আমাদের লাভ। তা ছাড়া এখানকার একটা স্কুলও দেখা হয়ে গেল। কানেটিকাটে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয় ইয়েল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস আমরা ঘুরে এসেছি, এখন একটা এলিমেন্টারি স্কুল ঘুরে গেলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। একেবারে প্রাথমিক স্কুল থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল।
২.
গোলাপ আগেই জানিয়ে রেখেছিল, আমাদের নিয়ে বেরোবে বলে সে ছুটি নিয়েছে। সকালেই ফোন করে রেডি হতে তাগাদা দিল।
‘তাহলে দেবুর বাসায় যাই। গোলাপকে বলো, যেতে পারবে কি না।’ সেরীনের কথা শুনে খানিকটা চিন্তায় পড়ে যাই। দেবুর ঠিকানাটা গুগল করেছিলাম, নিউইয়র্কের যেই জায়গাটায় আমরা আছি, সেখান থেকে ৭০–৮০ মাইল দূরে। দেড়–দুই ঘণ্টার ড্রাইভ। এত দূরে গোলাপকে নিয়ে যেতে বলাটা ঠিক হবে কি না। গোলাপকে ইচ্ছাটা জানাতেই বলল, ‘ঠিকানাটা আমাকে টেক্সট করে দেন আর আপনারা রেডি হন।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই গোলাপ এসে হাজির।
জ্যামাইকার ভিড় ঠেলে হাইওয়েতে উঠে খানিকটা যাওয়ার পরই যেন অন্য এক নিউইয়র্ক। দেবুর বাসায় না গেলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সৌন্দর্য আমাদের দেখাই হতো না।
আমেরিকার হাইওয়েগুলো যথেষ্ট প্রশস্ত, দুই পাশে খোলা মাঠ, অক্টোবরের ফল সিজনে গাছপালার পাতায় পাতায় বাহারি রং। কিছুদূর পরপর টোল রাস্তা আর ব্রিজ। কোথাও থেমে টোল পরিশোধ করতে হচ্ছে না। কতটা পথ একজন পাড়ি দিল, স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হয়ে যাবে, সেই সমেত ভাউচার চলে যাবে বাড়িতে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই অর্থ পরিশোধ করে দিতে হবে।
‘এত ব্রিজ নিউইয়র্কে!’ প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঢুকেই আবার মনে হয়, শহর জনপদের অলিগলির ভেতর দিয়েই কি হাডসন কিংবা অন্যান্য নদী বয়ে গেছে! নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত না করেই আমেরিকা তার এক জনপদের সঙ্গে আরেক জনপদকে সংযুক্ত করেছে, কোথাও বড় সেতু বানিয়ে, কোথাও টানেল বানিয়ে, কোথাও ছোটখাটো ব্রিজ বানিয়ে। আর যেখানে কোনোটাই সম্ভব হয়নি, সেখানে ফেরি চালু করে। আমাদের পথে অনেকগুলো ছোট ব্রিজ পড়ল, প্রতিটি যেন একেকটি দৃষ্টিনন্দন কোনো স্থাপনা।
‘কোন দিকে যাব? আর তো কোনো পথ দেখছি না।’ গাড়ি থামিয়ে গোলাপ জানতে চায়।
একটা চৌরাস্তার মতো স্থানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তাটা সোজা সামনে চলে গেছে। জিপিএস আমাদের ডান দিকে যেতে বলছে; কিন্তু সেটি ঠিক রাস্তা মনে হলো না। রাস্তা না মানে, এতক্ষণ যে রকম পাকা রাস্তায় আমরা এসেছি, সে রকম কিছু না। গ্রামের মেঠোপথ যেমন, সে রকম একটা রাস্তা ডান দিকে ভেতরের দিকে চলে গেছে। অপরিচিত একটা স্থানে এ ধরনের রাস্তা দিয়ে এগোনো ঠিক হবে কি না, আবার কোথাও আটকে যাই কি না—এসব দ্বিধায় আমরা কী করব ভাবতে লাগলাম।
‘ভুল ঠিকানায় চলে এলাম না তো!’ সেরীন সংশয় নিয়ে জানতে চায়। ঠিক তখনই রাস্তায় নেম বোর্ডটা চোখে পড়ে—হিগিসন ট্রেইল। তার মানে আমরা ঠিক জায়গায়ই এসেছি। এখন এই মেঠোপথ ধরেই বত্রিশ নম্বর বাড়িটা খুঁজে বের করতে হবে। খানিক দ্বিধা, খানিক ভয় নিয়ে ডান দিকের মেঠোপথ ধরেই আমরা এগোতে থাকি। সামান্য এগোতেই দেবুর বাড়িটা আমরা পেয়ে যাই। গাছপালার আড়াল থেকে উঁকি মেরে থাকা ছিমছাম একটা বাড়ি।
দেবুর বাড়িটা একটা পাহাড়ের খাঁজে। মূল সড়কটা ছেড়ে যে মেঠোপথটা ধরে আমরা এসেছি, সেটা আসলে পাহাড়ের খাঁজে থাকা একটা ট্রেইল। বিভিন্ন খাঁজে এ রকম আরও অনেকগুলো ট্রেইল আছে। একেকটা ট্রেইলে ছোট ছোট বসতি গড়ে উঠেছে। দেবুদের বাড়িটা ট্রেইলটার একেবারে প্রবেশমুখে। আরও ৮–১০টা বাড়ি আছে এই সারিতে। শেষ মাথাটায় পৌঁছালে বিস্তীর্ণ বন। কেবল গাছ আর গাছ ছাড়া কিছুই দেখা যায় না যেন।
তখন পর্যন্ত ঢাকার কোনো টেলিভিশনে বিজনেস নিয়ে আলাদা কোনো প্রোগ্রাম চালু হয়নি। প্রথম আলোয় আমরা লাভলু ভাইয়ের (সানাউল্লাহ লাভলু) নেতৃত্বে এক্সক্লুসিভ একটা বিজনেস টিম গড়ে তুলেছিলাম। তারপর অবশ্য অন্যান্য পত্রিকাও সেটি করেছে।
দেবুর বাড়িটা যে পাহাড়ে, তার নাম শুনামুন মাউন্টেন (Schunemunk Mountain)। অরেঞ্জ কাউন্টির সবচেয়ে উঁচু পাহাড় এই শুনামুন। প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতার পাহাড়টি এই অঞ্চলের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান। দূরদূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা এই পাহাড়ে ছুটে আসে, ট্রেইল ধরে হাইকিং করে, পাখি দেখে। উঁচু পাহাড় থেকে হাডসন নদী আর অরণ্যের প্যানোরোমিক ভিউ দেখার এমন অপূর্ব সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না। তবে দেবুদের বাড়িটা পাহাড়ের একদম উঁচুতে নয়, মাঝামাঝি কিংবা মাঝের খানিকটা নিচের দিকে।
ঘরে ঢুকেই লিভিং রুমে থাকা ফায়ার প্লেসটার সামনে হাত ছড়িয়ে দিয়ে বসে যায় সেরীন। আমিও তাতে যোগ দিই। দেবুর স্ত্রী সুরাইয়া কয়েকটি কাঠের টুকরা আগুনে ছুড়ে দেয়। ফায়ার প্লেসের আগুনটা যেন আবার ফুঁস করে জ্বলে ওঠে। ছোটবেলায় গ্রামে শীতের সকালে বাড়ির উঠানে কিংবা রাস্তার পাশে খড়ের আগুনে শরীরের উষ্ণতা খোঁজার দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল যেন।
‘এই আগুনে কয়েকটা বেগুন দিয়ে দিলে তো ভর্তা বানানোর উপযোগী হয়ে যেত!’ কথাটা শেষ হতে না হতেই সুরাইয়া বেগুন ছুড়ে দেয় ফায়ার প্লেসের আগুনে।
‘আপনাদের জন্য বেগুন ভর্তা বানাব।’ সুরাইয়ার উত্তর।
৩.
দেবুদের বাড়িটা নিউইয়র্ক শহর থেকে এক–দেড় ঘণ্টার দূরত্বে অরেঞ্জ কাউন্টিতে। কাউন্টি হচ্ছে ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিট। বাংলাদেশে যেমন উপজেলা, পৌরসভা, গ্রাম আছে, অনেকটা সে রকম। নিউইয়র্ক শহরের পাঁচটি বোরোর কথা আগেই উল্লেখ করেছিলাম। এর বাইরে আছে ৬২টি কাউন্টি। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ব্রিটিশ প্রদেশ ও রাজপরিবারের নামে এই কাউন্টিগুলোর নামকরণ হয়েছে। ১৬৮৯ সালে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের রাজা তৃতীয় অরেঞ্জের নামে হয়েছে এই অরেঞ্জ কাউন্টির নাম। অরেঞ্জ নিউইয়র্ক রাজ্যের প্রাচীনতম কাউন্টিগুলোর মধ্যে একটি এবং হাডসন ও ডেলাওয়্যার দুটি নদীর মাঝখানে অবস্থিত একমাত্র কাউন্টি।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে অরেঞ্জ কাউন্টি নামে আটটি কাউন্টি আছে। তবে সবচেয়ে পুরোনো এবং প্রথম অরেঞ্জ কাউন্টি হচ্ছে নিউইয়র্কে, যেখানে আমরা এসে উপস্থিত হয়েছি। সেই অরেঞ্জ কাউন্টির ‘টাউন অব মনরো’র মনরো নামের গ্রাম এটি। জার্মান ও ডাচ সেটেলাররা প্রথম এখানে এসে বসতি গড়েছিল। শুনামুন পাহাড়ের কোলে আলগোছে বসিয়ে দেওয়া ছবির মতো ছোট্ট এই জনপদের নাম রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নাম অনুসারে।
গাছের ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালানো দেবুর ফায়ার প্লেসের উষ্ণতা নিতে নিতে আমাদের গল্প চলে। সুরাইয়া ব্যস্ত রান্নাবান্নায়। নিজের পোষা মুরগির মাংস আর ডিম ভাজি, নিজের বাগানের বেগুন ফায়ার প্লেসে পুড়িয়ে ভর্তার সঙ্গে খিচুড়ি। এমন একটা পাহাড়ি পরিবেশের জন্য এর চেয়ে জুতসই খাবার আর কী হতে পারে! আমার কাছে তো পুরো ব্যাপারটাই একটা পিকনিক পিকনিক লাগছিল।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
হঠাৎ দেবু ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনার টাইম হয়ে গেছে। দেবু যাবে তাদের পিকআপ করতে।
‘স্কুল কি অনেকটা দূরে?’ সেরীন জানতে চায়।
‘না। একদমই কাছাকাছি।’
আমরাও তার গাড়িতে উঠে বসি। যতটা সম্ভব এলাকাটা দেখা যায়, সেটাই আমাদের লাভ। তা ছাড়া এখানকার একটা স্কুলও দেখা হয়ে গেল। কানেটিকাটে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয় ইয়েল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস আমরা ঘুরে এসেছি, এখন একটা এলিমেন্টারি স্কুল ঘুরে গেলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। একেবারে প্রাথমিক স্কুল থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল।
স্কুলের কাছে এসেই খানিকটা চমকে উঠি। স্কুলটার ঠিক প্রবেশপথেই একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়ানো। পার্কিং লটে না গিয়ে দেবু পেছনের দিকে যেতে থাকল। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো গাড়ির একেবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আমাদের গাড়িটা দাঁড়ানোর পর আরও কয়েকটি গাড়ি এসে পেছনে দাঁড়িয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে জায়গাটা দেখার চেষ্টা করি। স্কুলটাকে সার্কেল করে অনেকগুলো গাড়ি সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। সবাই স্কুল থেকে বাচ্চাদের পিকআপ করতে এসেছেন।
বর্ণমালা-কথামালা যখন প্রাইমারিতে পড়ে তখন তাদের স্কুলে দিয়ে আসা, স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হতো। স্কুল ছুটির বেশ আগ থেকেই অভিভাবকেরা স্কুলের সামনে জটলা পাকিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন। বাচ্চাদের অপেক্ষায় থাকা সময়টায় অভিভাবকেরা নিজেদের মধ্যে নানা রকম খোশগল্পে মেতে উঠতেন। ক্লাস শেষ হলে ক্লাসের দরজা থেকে কিংবা নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে অভিভাবকের হাতে বাচ্চাদের তুলে দেন শ্রণিশিক্ষক। কে নিয়মিত স্কুল থেকে বাচ্চাদের তুলবেন, সেটি স্কুলকে আগে থেকে জানিয়ে রাখতে হয়। কোনো কারণে ভিন্ন কেউ গেলে সেটিও আগে থেকে স্কুলকে ফোন করে জানাতে হয়। কিন্তু এখানে কেউ গাড়ি থেকেই নামছেন না। বরং প্রত্যেকেই গাড়িতে বসে আছেন, গাড়ি নিয়ে লাইন করে আছেন। বলা যায় গাড়ির লাইন।
ক্লাস শেষ হতেই একটা একটা গাড়ি সামনে এগোচ্ছে। পার্কিং লটের পাশ ঘেঁষে গাড়িগুলো বিল্ডিংটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে দুজন শিক্ষক দাাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্যেক অভিভাবক গাড়ি নিয়ে শিক্ষকদের পয়েন্টে গিয়ে সন্তানের নাম এবং ক্লাস বলছেন, শিক্ষক তাঁর হাতে রাখা রেজিস্ট্রারের নাম চেক করে মাইকে ঘোষণা দিচ্ছেন—ভেতর থেকে আরেকজন বাচ্চাকে গাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে অনেকটা সময় লাগছে; কিন্তু তাতে কী। নিয়ম তো নিয়মই।
‘কিন্তু এত কঠিন নিয়ম কেন এখানে?’
দেবু জানাল—নিরাপত্তার কারণে এই ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে স্কুলে শুটিং হয় বলে এখানকার কর্তৃপক্ষ এই ব্যবস্থা করেছেন। অনেক স্কুলের সামনে এমনিতেও পুলিশের গাড়ি থাকে। বিশেষ করে স্কুল টাইমে। তাতে ওই সব রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় চালকেরা গতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন, সতর্ক থাকেন—স্কুলে পুলিশ আছে বলে।
৪.
এবার আমাদের শুনামুন পাহাড় দেখার পালা। পুরো পাহাড় দেখার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। সন্ধ্যার আগেই আমরা নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করব। আমরা বরং এ ট্রেইল ধরেই হেঁটে দেখব। ট্রেইলটা ধরে শেষ মাথা পর্যন্ত যাব।
হাঁটতে হাঁটতে দেবুর কাছে এই পাহাড়ের, ট্রেইলটার গল্প শুনি। দেবু কেন নিউইয়র্ক শহর ছেড়ে এমন একটা পাহাড়ে এসে বসতি গড়ল—সেসব গল্প শুনি। এই ট্রেইলে অল্প কয়েকটি পরিবারই বাস করে। সেই অর্থে জায়গাটা বেশ নির্জন। শেষ মাথা পর্যন্ত ডাক বিভাগের গাড়িও যায় না। ট্রেইলটার শুরু দিকেই ডাকবাক্স আছে, ডাক বিভাগের লোক এসে সেখানে চিঠিপত্র রেখে যান। প্রাপকেরা নিজ নিজ বক্স থেকে সেগুলো সংগ্রহ করে নেন।
‘গুলির শব্দ হলো মনে হয়!’ গল্প করতে করতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা শব্দে সবাই চমকে উঠি। দেবু হাসে। মনে হলো এসবের সঙ্গে সে পরিচিত। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পেছনের বাড়িটার ব্যাকইয়ার্ডে বেশ কয়েকজন চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আড্ডা দিতে দিতেই কেউ একজন হয়তো নিজের বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ে দিয়েছে। আমরা সাত–আটজন লোক রাস্তায় হল্লা করে হেঁটে যাচ্ছি, তা নিয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
ট্রেইলটার শেষ মাথাটায় এসে আমরা আনন্দ, বিস্ময় আর প্রকাশ করতে না পারা নানা রকম অনুভূতি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। সামনে আর কোনো পথ নেই। আছে বিশাল গভীর অরণ্য। উঁচু উঁচু গাছগুলোর রঙিন পাতা। আর নিচে গভীর খাদ। একেবারে শেষ প্রান্তে পাহাড়ের খাদ ঘেঁষে একটা বাড়ি।
‘এই বাড়িতে মানুষ থাকে! কীভাবে থাকে!’
আমাদের হইহল্লা শুনে বাড়ির পুরুষ লোকটা বেরিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ পর মহিলাটিও। অনেকটাই প্রৌঢ়ত্বে উপনীত এই দম্পতির বসবাস এ বাড়িটায়। তাঁরা তাঁদের ফ্রন্টইয়ার্ডের, ব্যাকইয়ার্ডের গেটটা খুলে দেন। ব্যাকইয়ার্ড বলতে গভীর অরণ্য আর শুনামুন পাহাড়ের গভীর খাদ। এ রকম নির্জনতায় কেবল দুটো মানুষ থাকেন কীভাবে! তাঁরা এসে কথা বললেন। বোতলজাত পানি এগিয়ে দিলেন। আমরা কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, ট্রেইলের খাদে দাঁড়িয়ে পাহাড় আর অরণ্যের নিবিড় সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক ভাবনার খানিকটা মাথায় ঢুকিয়ে আবার ফিরতি পথ ধরলাম।
দেবুর বাড়িতেও যে আমাদের জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছে, সেটা এতক্ষণ টের পাইনি। বাড়িটার ঠিক পেছনেই বেশ খানিকটা খালি জায়গা।
‘ব্যাকইয়ার্ডে কি বাগান করেছ দেবু?’ সেরীনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে কিঞ্চিৎ রহস্য করে দেবু। ‘আসেন, দেখে নেন’, বলেই হাঁটতে থাকে সে।
কানাডায় যাঁদের বাড়ি আছে, তাঁদের প্রায় সবাই ব্যাকইয়ার্ডে নানা রকম গাছপালা লাগান। সামনে ফুলের বাগান আর পেছনে শাকসবজি, লাউ–কুমড়া, মরিচ—কী থাকে না সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়ির মালিকেরাও ব্যাকইয়ার্ডে শাকসবজির গাছ লাগান। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তাঁরাও খোঁজ করেন বাগান আছে কি না। বাড়ির মালিকও নিজের বাগান, গাছপালার গল্প করতে খুবই আনন্দ পান। অনেক সময় এসব বাগান-গাছপালা নিয়ে গল্প করতে করতেই অনেক সময় কেটে যায়।
দেবুর ব্যাকইয়ার্ডে আসলে আমাদের জন্য বিস্ময়ই অপেক্ষা করছিল। বেগুন, টমেটো, মরিচসহ নানা রকম গাছ তো আছেই; এর বাইরে সেখানে আছে হাঁস–মুরগির খামার। পাখিও আছে অনেকগুলো। দেবু তাহলে পাখিও পোষে! রীতিমতো একটা খামার যেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এসে খামারি বনে গেছে একদা সাংবাদিক দেবাশীষ রায়। বলা বাহুল্য, এগুলো তাঁর শখ। দেবু চাকরি করে নিউইয়র্কের ডাক বিভাগে। আর এগুলো তার অবসর কাটানোর উপলক্ষ। দেবুর আওয়াজ পেয়ে হাঁস-মুরগিগুলো যেন ছোটাছুটি করে কাছে আসতে শুরু করল। তারা টের পেল কীভাবে যে তাদের লর্ড এসেছে!
সেরীন দুহাতে তার বাগান থেকে টমেটো, কাঁচা মরিচ, বেগুন তুলতে থাকে। সেরীন নিজেও জানে—এগুলো দেবুর বাড়িতেই রেখে আসতে হবে। তবু বাগান থেকে ফসল তোলার আলাদা একটা আনন্দ আছে না! সেটা সে মিস করতে চাইল না।
৫.
এবার আমাদের ফেরার পালা। অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু দেবুর বাড়ির এই প্রাকৃতিক পরিবেশ, দেবু-সুরাইয়ার অকৃত্রিম আন্তরিকতা, ভালোবাসা কেমন যেন আঁকড়ে ধরে রাখল। সন্ধ্যার আলো–আঁধারিতে মেঠোপথটা ধরেই গাড়ির এস্কেলেটরে পা রাখে গোলাপ। আবার সেই বৃত্তের মতো ঘুরতে ঘুরতে গাড়িটা নিচের দিকে নামতে থাকবে। একসময় পৌঁছে যাবে সমতলে। তার শুনামুন পাহাড়টাকে পেছনে রেখে ছুটতে থাকবে শহর নিউইয়র্কের দিকে।
আমি আর সেরীন একই সঙ্গে পেছন ফিরে তাকাই। দেবু, সুরাইয়া, তাদের দুই বাচ্চা তখনো বাইরে দাঁড়িয়ে। বুকের ভেতর কোথায় যেন কিছু একটা চিন করে ওঠে। আমরা অরেঞ্জ কাউন্টির আকাশজোড়া শূন্যতায় দৃষ্টি মেলে চুপ করে থাকি। চলবে...