জ্যাকসন হাইটস: আমেরিকায় বাংলাদেশ কিংবা নিউইয়র্কের ঢাকা!

জ্যাকসন হাইটসে লেখকছবি: লেখকের পাঠানো

‘ও মাই গড!’ -সেরীন আর আমি একই সঙ্গে চিৎকার করে উঠি।

- এ তো দেখি তেজগাঁও রেলস্টেশন!

- কথাটা মুখ থেকে বের করতে না করতেই সেরীন সেটা টেনে নেয়।

- ‘বিশ্বাস করো, আমারও একদম তা–ই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, গলি আর দোকানপাটের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কারওয়ান বাজারে গিয়ে উঠব।’

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে যে ট্রেনটা ধরেছিলাম, সেটি সোজা নিয়ে এসেছে এখানে। আমরা নেমেছি জ্যাকসন হাইটস-রুজভেল্ট অ্যাভেনিউ নামের স্টেশনটায়। স্টেশন থেকে বেরুলেই ‘আমেরিকায় বাংলাদেশ’ কিংবা’ নিউইয়র্কের ঢাকা’। আমরা সেই ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের স্পর্শ পেতে ছুটে এসেছি এই জ্যাকসন হাইটসে।

ট্রেন থেকে নেমে সিঁড়ির মতো একটা জায়গা পেরিয়ে আমরা বাইরে আসব। কিন্তু সিঁড়িটার কাছে আসতেই সেরীন আর আমি যুগপৎ চমকে উঠি। সিঁড়িটার ওপরই পাশ ঘেষে নানা রকম পণ্য সাজিয়ে বসে আছে কয়েকটি দোকান। আর একটু এগোলেই তো প্ল্যাটফর্মেই পৌঁছে যেত দোকানের বিস্তৃতি। একেবারে বাংলাদেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের মতো। এরা কি বাংলাদেশি! প্রশ্নটা মাথায় আসতেই ফিরে দোকানগুলোর দিকে তাকাই।

এতটা জায়গা পর্যন্ত দোকান বসানোর অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ!

- কে যেন বলেছিল, আমেরিকায় কত কিছুই নাকি হয়! এটাও সম্ভবত সেই রকম কিছুই হবে। এদিক থেকে টরন্টোর সাবওয়ে স্টেশনগুলো ব্যতিক্রম। এভাবে স্টেশনের ভেতরে ফ্লোরে পণ্য সাজিয়ে বিক্রির দৃশ্য সেখানে কোথাও দেখা যাবে না। প্রতিটি স্টেশনেই কনভেনিয়েন্স স্টোর আছে, সেই স্টোরে নানা পণ্যের সঙ্গে ফাস্ট ফুডও বিক্রি হয়, কিন্তু সেগুলো রীতিমতো ছোটখাটো স্টোররুম।

স্টেশন থেকে বাইরে এসে দাঁড়াতেই মানুষের ভিড়, হইচই, কী যে এক প্রাণবন্ত অবস্থা! এটাকে কি কারওয়ান বাজার বলব? নাকি এলিফ্যান্ট রোড? নাকি নিউমার্কেট, গাউছিয়া! আমি আর সেরীন নিজেদের মধ্যে মজা করি। একপাশে দাঁড়িয়ে লম্বা করে শ্বাস নেই। বাংলাদেশের হাওয়া ভেবে কি জ্যাকসন হাইটসের বাতাস বুকের ভেতরে টেনে নিচ্ছি!

আরও পড়ুন

-কোথায় খাবেন?

-গোলাম মোস্তফা গোলাপ তাড়া দেয়। আমাদের ক্ষুধা পেয়েছিল সেই স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে। মাঝখানে ৯/ ১১ মেমোরিয়াল আমাদের ক্ষুধাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল যেন। জ্যাকসন হাইটসে এসে সেটা আবার প্রবলভাবে জেগে ওঠে। বাংলাদেশি খাবার খাব বলেই তো জ্যাকসন হাইটসে চলে এলাম।

আমরা আসলে দাঁড়িয়েছিলাম একটা রেস্তোরাঁর সামনেই। সাইনবোর্ডে সেটার নাম পড়ি—‘ইত্যাদি’। আমাদের ‘ইত্যাদি’ নামের রেস্তোরাঁটার ভেতরে ঢুকে জ্যাকসন হাইটসের বাংলা খাবারে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হবে। প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই সময়েও রেস্তোরাঁয় বেশ ভিড় আছে। সাজিয়ে রাখা নানা রকম বাংলাদেশি খাবারগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে—আর দেরি নয়। উদর পূর্তির পর আমরা পুরো এলাকাটা ভালো করে ঘুরে দেখব বলে মনস্থির করলাম।

আরও পড়ুন

২.

‘জ্যাকসন হাইটস’ নিউইয়র্কের বাংলাপাড়া হলো কীভাবে?

-এ নিয়ে কোথাও কোনো গবেষণা হয়েছে কি না, খোঁজ করতে হবে। আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসনের শুরু, সেটাও তো অনেক বছর আগে। তবে যতটুকু জেনেছি, ১৯৭০–এর দিকে যখন বাংলাদেশিদের আমেরিকায় পাড়ি জমানো বাড়তে থাকে, তখন থেকেই এই জ্যাকসন হাইটস এবং এর আশপাশে বাংলাদেশিরা বসতি গড়তে থাকেন। এখন তো এটি ছোটখাটো বাংলাদেশেই পরিণত হয়েছে।

তথ্য–উপাত্ত বলে, অভিবাসীদের এলাকা হিসেবে কিংবা বহুসংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে, তেমন অভিপ্রায় নিয়ে সম্ভবত জ্যাকসন হাইটসের গোড়াপত্তন হয়নি। বিত্তশালী, অভিজাত মানুষদের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েই ১৯০৯ সালে দিকে ৩৬৫ একর জায়গা নিয়ে জ্যাকসন হাইটসের উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছিল। এডওয়ার্ড এম ম্যাকডোগাল নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির মালিকানাধীন কুইন্সবোরো কর্পোরেশন ছিল এই কাজের দায়িত্বে। ব্রুকলিন হাইটসের মতোই অভিজাত এলাকা হবে এটি, পরিকল্পনাটা তেমনি ছিল। সে কারণে এলাকার নামকরণে ‘জ্যাকসন’ এর সঙ্গে হাইটস যোগ করা হয়। অবশ্য অনেকে বলে থাকেন, পার্শ্ববর্তী এলাকার তুলনায় এই জায়গাটা খানিকটা উঁচু বলে ‘হাইটস’ যোগ করা হয়েছে।

নিউইয়র্কের বাংলাদেশ স্ট্রিট
ছবি: লেখকের পাঠানো

নিউইয়র্ক শহরের ক্রমবর্ধমান আবাসনসংকটের কারণে জ্যাকসন হাইটসকে আর বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত রাখা যায়নি। কুইন্সবোরো ব্রিজ এবং ফ্লাশিং লাইন রেললাইন চালুর পর ম্যানহাটানের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়। তখন নানা কিসিমের মানুষ এখানে বসতি গড়তে শুরু করেন। কালের পরিক্রমায় এটি হয়ে ওঠে বহু সংস্কৃতি আর বহুজাতির মিলনস্থল।

জ্যাকসন হাইটসের ‘হাইটস’ শব্দটা না হয় জায়গাটা উঁচু বলে কিংবা ‘উঁচু তলার মানুষের’ আবাসিক এলাকা গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে জায়গাটার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে বলে যোগ করা হয়েছে, কিন্তু ‘জ্যাকসন’ এল কোত্থেকে?

জন সি জ্যাকসন নামের একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর নাম থেকে এসেছে জ্যাকসন, তার সঙ্গে হাইটস যুক্ত হয়ে জ্যাকসন হাইটস। চীন থেকে পণ্য আমদানি করে বিক্রি করে প্রচুর অর্থের মালিক এই জন সি জ্যাকসন ওই এলাকায় একটি টোল রাস্তা করে দেন। তাঁর নামের সঙ্গে উচ্চতাসূচক হাইটস যুক্ত করে এই এলাকার নাম করা হয় জ্যাকসন হাইটস। ৩৭ অ্যাভেনিউ আর ৭৩ স্ট্রিট বিবেচিত হয় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশপাড়া হিসেবে।

আরও পড়ুন

৩.

‘ইত্যাদি’ থেকে তৃপ্তি নিয়ে পেটপুড়ে খেয়ে এবার বাইরে এসে হাঁটতে শুরু করি। দুই পাশে বাংলা সাইনবোর্ড, বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপন থেকে রুমমেট আবশ্যকের বিজ্ঞাপন কী নেই! বাংলা সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি দোকানে দোকানে সাজানো বাংলাদেশি পণ্য। দোকানের সামনে ফুটপাতজুড়েও পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ঠিক এলিফ্যান্ট রোড ধরে হাঁটতে শুরু করলে যেমনটি দেখা যায়। অক্টোবরের শেষ দিকের ঠান্ডা খানিকটা নেমে এলেও রাস্তায় গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডাটাও চোখে পড়ল।

-আচ্ছা! ওটা কি পানের দোকান না? টরন্টোর বাঙালিপাড়া ডোনফোর্থেও পান বিক্রি হয়। কিন্তু এভাবে পানের নানা মসলা সাজিয়ে কোনো দোকানে পান বিক্রি হয় বলে চোখে পড়েনি।

নিউইয়র্কে বাঙালির পান খাওয়া নিয়ে নানা রকম গল্প প্রচলিত আছে। একবার নাকি কেউ একজন খয়ের দিয়ে পান খেয়ে রাস্তায় পানের পিক ফেলেছিলেন, পুলিশ দেখে তাঁকে তুলে নিয়ে সোজা হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। পুলিশ ভেবেছে লোকটা রক্তবমি করছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: dp@prothomalo. com

জ্যাকসন হাইটসে এত বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। মূলত ১৯৮০-এর দশক থেকে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটতে থাকে। নব্বইয়ের দশকে আরও প্রসার লাভ করে। জ্যাকসন হাইটসকে এখন উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ বাংলাদেশি বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। তবে শুরুটা হয়েছিল সত্তর-আশির দিকে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রয়োজন মেটাতে ছোট ছোট দোকান ও ব্যবসার শুরুর মধ্য দিয়ে।

কানাডা থেকে নিউইয়র্কে এসে ঢাকার অনুভূতি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা নামফলকে চোখ আটকে যায়। ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’! আশ্চর্য! সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। নিউইয়র্কের একটি রাস্তার নাম ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ হয়েছে, এ খবর পত্রিকায় পড়েছিলাম। আজ সেই রাস্তায় বাংলাদেশের নামাঙ্কিত ফলকটার নিচে এসে দাঁড়ালাম। কী যে একটা অনাবিল প্রশান্তি মনকে ভিজিয়ে দিতে লাগল।

নামফলকটার নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ নামের নিচে স্ট্রিটটার আদি নাম ‘৭৩ স্ট্রিট’ও লেখা আছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস ও এলমহার্স্ট সিটি কাউন্সিল মেম্বার এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত শেখর কৃষ্ণান বাংলাদেশি–অধ্যূষিত ৭৩ স্ট্রিটের নাম ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ করার প্রস্তাব দিয়ে সিটিতে বিল ওঠান। বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়ে যায। ফলে ৩৭ অ্যাভিনিউ থেকে ব্রডওয়ে পর্যন্ত ৭৩ স্ট্রিটের নাম সরকারিভাবেই ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ হয়ে যায়।

গোলাপ জানায়, এখন অবশ্য নিউইয়র্কের নানা জায়গায় বাঙালিরা ছড়িয়ে গেছেন। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ‘বাঙালিপাড়া’ গড়ে উঠেছে। ঠিক কাছাকাছি জ্যামাইকা এখন বাঙালিদের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জ্যামাইকার হিলসাইডে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি মালিকানাধীন গ্রোসারি, রেস্তোরাঁসহ নানা রকমের দোকানপাট আছে সেখানে। জ্যাকসন হাইটসের মতোই জ্যামাইকা এখন হয়ে উঠছে বাংলাদেশিদের নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

জ্যামাইকার বাঙালিপাড়াটা আমরা যেখানে উঠেছি, তার কাছে। গোলাপের বাসাও সেখানে। তাহলে জ্যামাইকার বাঙালিপাড়াটাও ঘুরে যাই।

-সেরীনের প্রস্তাবে আমরা সম্মত হয়ে যাই। চলবে...

আরও পড়ুন