নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড আর ডা. আসমা আহমদের গল্প

নিউইয়র্কের রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজছবি: লেখকের পাঠানো

‘আমি যা-ব’ বলে হঠাৎই সেরীন লাফ দিয়ে ওঠে।

সকাল সকাল সেরীন জানিয়ে রেখেছিল, ‘আজ কোথাও যাব না, ঘরেই থাকব।’ আসলে আগের দিনটা একেবারে অতিরিক্ত গেছে, সকাল–সন্ধ্যা টানা ঘোরাঘুরি। জ্যাকসন হাইটস থেকে আমরা আবার জ্যামাইকার বাংলা পাড়ায় নেমে গিয়েছিলাম। সেখানকার বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকানগুলোয় হাঁটতে হাঁটতে সেরীন বেশ কিছু কাঁচা শাকসবজিও কিনে ফেলে।

ভাগিনা গোলাম মোস্তফা গোলাপ জানিয়ে রেখেছিল যে আজ তার নিজের জরুরি কিছু কাজ আছে, সে বেরোতে পারবে না। ফলে আমাদের একাই ঘুরে বেড়াতে হবে। আমরাও ঠিক করেছিলাম, নিজেরাই নিউইয়র্ক শহরে ঘুরে বেড়াব। কিন্তু সকালবেলা সেরীনের ঘোষণা, আজ সে বেরই হবে না।

দিপু এর আগেও একবার ফোন করেছিল, ‘আপনারা রেডি হয়ে থাকেন, আমি উঠিয়ে নিচ্ছি, কোথাও বসে একসঙ্গে খাব।’ আমি জানিয়েছিলাম, সেরীন আজ কোথাও যাচ্ছে না। আমি রেডি হচ্ছি।

কিন্তু দিপু যখন ফোন করে বলল যে দুই মিনিটের দূরত্বে আছে, তখন সেরীন গা–ঝাড়া দিয়ে উঠে একেবারে রেডি। দিপুর কথা শুনেই তার সব ধরনের আলস্য যেন হঠাৎ কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

দিপু, মানে মাহমুদ হাসান দিপু, সেও নিউইয়র্কে পর্যটক, বেড়াতে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, থাকে ক্যালগেরিতে। তার সঙ্গে আমাদের কানেটিকাটে দেখা হওয়ার কথা। আমরা যখন পোর্ট অথরিটি বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ফেসবুকে তার পোস্টটা চোখে পড়ে। ক্যালগেরি থেকে ফ্লাইট ধরছে দিপু, নিউইয়র্ক হয়ে কানেটিকাটে যাবে। কিন্তু দুজনেরই ব্যস্ততায় কানেটিকাটে আর দেখা হয়ে ওঠেনি। এখন নিউইয়র্কে আমাদের দেখা হচ্ছে।

নিউইয়র্কে দিপুর অনেক আত্মীয়স্বজন। তার মাও থাকেন এখানেই। ছেলে ক্যালগেরিতে থাকে, মা কেন নিউইয়র্কে? সেও এক চমৎকার গল্প। আসলে নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের প্রায় সবার জীবনই একেকটা চমৎকার গল্প।

কানেটিকাটে প্রথম রাতে স্বপন ভাইদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড আশফাক তালুকদার তাঁদের পরিবারের গল্প শুনিয়েছিলেন। নিউইয়র্কে তাঁদের এত আত্মীয়স্বজন যে কোনো উপলক্ষে সবাই একত্র হতে হলে কমিউনিটি সেন্টার বা হল ভাড়া করতে হয়। এখন তাঁরা ‘ফ্যামিলি গেট টুগেদার’ লিখে একটা ব্যানার টানিয়ে দেন। একটা আনুষ্ঠানিকতার ভাব চলে আসে। কানেটিকাট থেকে নিউইয়র্কে আসার পথে জেহাদও একই রকম গল্প শুনেয়েছিল, তাদের আত্মীয়স্বজন একত্র হলে ৬০-৭০ জন হয়ে যায়। কোনো বাড়িতে আর জায়গা হয় না। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি পরিবারের এই চিত্র অনেকটাই স্বাভাবিক এখন।

আমেরিকার ইমিগ্রেশনের এটা একটা চমৎকার দিক। একুশ বছর বা তার বেশি বয়সের যেকোনো আমেরিকান নাগরিক তাঁর মা–বাবা, ভাইবোনকে আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্পনসর করতে পারেন। যদিও প্রক্রিয়াকরণ দীর্ঘ সময়ের, কিন্তু সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করে রাখলে একটা সময় তাঁরা গ্রিনকার্ড পেয়ে যাবেন। আমেরিকায় এসে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর অনেক বাংলাদেশিই তাঁদের স্বজনদের স্পনসর করে নিয়ে আসেন। আবার একজন আসার পর তিনি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের পথঘাট বাতলে দিয়েছেন, তাঁরাও একসময় আমেরিকায় এসে থিতু হয়েছেন।

দিপুদেরও একই অবস্থা। দিপু নিজে কানাডিয়ান নাগরিক। তার মামা-খালাদের মিলিয়ে আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। খালাম্মা (দিপুর মা) এখানে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি হেঁটে হেঁটে (মানে বেড়িয়ে বেড়িয়ে) দিব্যি সময় কাটিয়ে দেন। ফলে তিনি নিউইয়র্ক ছেড়ে আর কোথাও যেতে চান না।

দিপুদেরও একই অবস্থা। দিপু নিজে কানাডিয়ান নাগরিক। তার মামা-খালাদের মিলিয়ে আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। খালাম্মা (দিপুর মা) এখানে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি হেঁটে হেঁটে (মানে বেড়িয়ে বেড়িয়ে) দিব্যি সময় কাটিয়ে দেন। ফলে তিনি নিউইয়র্ক ছেড়ে আর কোথাও যেতে চান না।

২.

জ্যামাইকার ‘সাগর চাইনিজ’–এ বসেছি আমরা। বাংলাদেশি মালিকানাধীন চাইনিজ রেস্তোরাঁ। ঢাকার এবং কানাডা-আমেরিকার বাংলাভাষী টেলিভিশনে, পত্রিকায় এই রেস্তোরাঁর বিজ্ঞাপন দেখেছি বলে নামটা পরিচিত ছিল। সেই ২০০৮ সাল থেকে ব্যবসা করে যাচ্ছে রেস্তোরাঁটি। এখন অবশ্য আরও কয়েকটি শাখা হয়েছে। নিউইয়র্কে দিপুর একটা বিশেষ পছন্দ কিংবা শখ হচ্ছে এই শহরে এলেই সাগর চাইনিজে একবেলা খাওয়া। এবার তাঁর শখ পূরণের সঙ্গী হিসেবে আছি আমি, সেরীন আর তাঁর মামাতো ভাই সুজন। খাবারের চেয়ে আমাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করা।

আমি আর সেরীন অনেকটা নির্ভার আছি আজ। কোনো কিছু নিয়েই তেমন তাড়া নেই। ঘুরতে গিয়ে একটা দিন কিংবা কিছুটা সময় একেবারে অলস কাটিয়ে দিতে পারাটাও কম নয়। অবশ্য আমাদের পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা। তিনি নিউইয়র্কে থাকেন অনেক বছর। দেখাসাক্ষাৎ নেই সে–ও ৩০ বছরের কম নয়। টেলিফোনে বিভিন্ন সময় কথা হয়েছে। নিউইয়র্কে আসার পর থেকেই দেখা হওয়ার চেষ্টা চলছে আমাদের। তিনি জানিয়েছেন, কোনো একটি রেস্তোরাঁয় বসে একসঙ্গে খাবেন এবং গল্প করবেন। তিনি এসে আমাদের নিয়ে যাবেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে বারবার প্ল্যান করেও ব্যাটে–বলে কিছুতেই মিলছিল না। আজও বিকেল–সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার একটা কথাবার্তা আছে। দিপুর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের পর্বটা সারলেই তাঁকে নক করব, এমন একটা পরিকল্পনা আছে আমাদের।

‘আমার ফোন সারা রাত খোলা থাকে। ভোরে বাসায় যাই, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার অফিসে যাই,’ তিনি বলছিলেন।

‘থাকো কোথায় তুমি? মানে নিউইয়র্কে বাসা কোথায়?’

‘জ্যামাইকায় থাকি। আবার লং আইল্যান্ডে থাকি। সেখানেও আমার বাড়ি আছে। তিন দিন লং আইল্যান্ডে থাকি, বাকি দিনগুলো জ্যামাইকায়।’

আরও পড়ুন
ডা. আসমা আহমেদ
ছবি: লেখকের পাঠানো

নিউইয়র্কে আসার পর থেকেই লং আইল্যান্ড নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। বিভিন্ন আলোচনায়ই লং আইল্যান্ডের প্রসঙ্গ এসেছে। ‘লং আইল্যান্ডে বাড়ি আছে বা লং আইল্যান্ডে থাকি’ কথাটা বলার মধ্যে খানিকটা অহংকার প্রকাশ পেয়েছে অনেকেরই। ওই যে ঢাকায় একসময় ‘ধানমন্ডিতে থাকি’, আরও অনেক পরে ‘গুলশান- বারিধারায় থাকি’ বলার মধ্যে একটা অভিজাত্য প্রকাশ পেত, অনেকটা সে রকম। লং আইল্যান্ডে যে বাড়ি আছে, এই তথ্য আলাপ শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যেই বেশ কয়েকজন জানিয়ে দিয়েছেন। আমাদের পরিচিত এই ভদ্রলোকও ঘুরিয়েফিরিয়ে তাঁর লং আইল্যান্ডে বাড়ির কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

আমাদের পরিচিত এই ভদ্রলোকের জীবনটাই যেন গল্প, যেকোনো গল্পকে হার মানিয়ে দেওয়ার মতো গল্প। বছরের পর বছর ধরে আমেরিকায় আছেন আনডকুমেন্টেড। স্ত্রী মারা গেছেন অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। কাগজ পেতে বিয়ে করেছিলেন, সেই সংসারও টেকেনি। কিছুদিন আগে বিয়ে করে ডকুমেন্টেড হয়েছেন। টেলিফোনের আলাপচারিতায় তিনি জানিয়েছিলেন, নিউইয়র্ক শহরে তিনি ট্যাক্সি চালান। আজ বললেন, কাল ১০টায় তিনি অফিসে যাবেন।

‘কিছু মনে করবেন না। আপনি কি মি. সাগর?’ রেস্তোরাঁর অন্য টেবিল থেকে উঠে এসে একজন কথা বলতে চাইলেন।

—জি। আপনি?

—আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি আপনার ইউটিউব দেখি। নিয়মিত দেখি। আপনাকে এখানে দেখে তাই কথা বলতে এলাম। আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলি?

টরন্টোয় এই ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। ইউটিউবারদের সঙ্গেও মানুষজন সেলফি তুলতে চায়, এটা আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, অবশ্যই ভালো লাগার অভিজ্ঞতা।

নানা বিষয় নিয়ে আমাদের গল্প চলতে থাকে। খালাম্মার প্রসঙ্গ আসতেই সেরীন জানতে চায়, ‘আপনার মা এখানে? তাঁকে দেখতে যাব।’

সাগর চাইনিজ থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে চড়ি। সুজন গাড়ি টান দেয়।

কত দূর এখান থেকে? সেরীন প্রশ্ন করে।

—বেশি দূর না। লং আইল্যান্ড।

এই প্রথম দিপুর মুখে লং আইল্যান্ডের নাম উচ্চারিত হলো। লং আইল্যান্ড নিয়ে তার মধ্যে কোনো বাড়তি আতিশয্য চোখে পড়ল না।

আমাদের পরিচিত সেই ভদ্রলোককে বার্তা পাঠাই, ‘আমরা লং আইল্যান্ডের দিকে যাচ্ছি। তোমার সঙ্গে সেখানেও দেখা হতে পারে। তোমার ঠিকানা দাও।’

দিপু, মানে মাহমুদ হাসান দিপু, সেও নিউইয়র্কে পর্যটক, বেড়াতে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট, থাকে ক্যালগেরিতে। তার সঙ্গে আমাদের কানেটিকাটে দেখা হওয়ার কথা।

৩.

লং আইল্যান্ড আসলে নিউইয়র্কের অভিজাত ও ধনীদের এলাকা। আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম দ্বীপগুলোর একটি। আটলান্টিক মহাসাগর ও লং আইল্যান্ড সাউন্ড দ্বারা বেষ্টিত এই দ্বীপ নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ১১৮ মাইল (১৯০ কিমি) পূর্ব দিকে প্রসারিত। দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সুরম্য অট্টালিকা, যেগুলো ‘গোল্ড কোস্ট’ হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ-পূর্বের‘হ্যাম্পটনস’ বিলাসবহুল অবকাশযাপনের স্থান। ইস্ট রিভার নামে নদীটি লং আইল্যান্ডকে মূল নিউইয়র্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আর দ্বীপটি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে আটলান্টিকের দিকে।

আমরা যাচ্ছি লং আইল্যান্ডের হাইড পার্ক এলাকায়। খালাম্মা আছেন তাঁর ভাইয়ের বাসায়। ভাই হচ্ছেন ড. আশরাফ আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। লেখক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ, ড. আশরাফ, খালাম্মা (দিপুর মা) আপন ভাই–বোন। দিপুর মামির সঙ্গে দেখা হওয়াটা হবে আমাদের জন্য বিরল এক অভিজ্ঞতা।এর আগে দিপুর কাছে তাঁর গল্প শুনেছি। তিনি কেবল গল্প নন, একটা ইতিহাস আসলে।

লং আইল্যান্ড তো একটা দ্বীপ। তা–ই না? তো এই দ্বীপের সঙ্গে শহরের যোগাযোগটা হয় কীভাবে?

—আমরা বিশাল একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে যাব। সেটাও একটা অভিজ্ঞতা। দিপুর উত্তর।

ব্রিজ, টানেল নানাভাবেই মূল শহরের সঙ্গে লং আইল্যান্ডকে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। আবার নাসাও, সাফোক কাউন্টির যোগাযোগের জন্য রয়েছে রেললাইন।

জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস এলাকার চেয়ে লং আইল্যান্ডকে ভিন্ন রকম মনে হলো। জ্যামাইকায় যেমন ঘনবসতি এবং ভিড়, ঠেলাঠেলি, এই এলাকা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় প্রতিটি বাড়িই বেশ বড় বড়, বাড়ির পাশে অনেকটা জায়গা নিয়ে ফ্রন্ট ইয়ার্ড, রাস্তাগুলোও তুলনামূলক ফাঁকা।

লং আইল্যান্ডেও চোখে পড়ার মতো বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে সফল ব্যবসায়ী যেমন আছেন, তেমনি আছেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারাও। বাংলাদেশি কমিউনিটির বেশ কয়েকটি সংগঠনও আছে এই লং আইল্যান্ডে। তারা নিয়মিত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক উৎসবের আয়োজনও করে থাকে।

আরও পড়ুন

গল্পে গল্পে কখন যে সময় কেটে যায় সুজনের চমৎকার ড্রাইভিংয়ে! তার গাড়িটা এসে বেশ বড়সড় একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে থামে। বাড়িটার সামনে আর পাশে বেশ খোলা জায়গা। চমৎকার ছিমছাম একটা বাড়ি। আশপাশের বাড়িগুলোও অনেকটা একই রকম। লং আইল্যান্ড নিয়ে এত আলোচনার কারণ বুঝতে অসুবিধা হলো না।

বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই দিপুর মা এমনভাবে আগলে ধরলেন যেন অনেক দিন পর নিজের বাড়িতে সন্তান এসেছে। ‘তোমাকে তো চিনি,’ আমার দিকে তাকিয়ে খালাম্মার কথায় সেরীন আর আমি দুজনই চমকে উঠি। তিনি হেসে বললেন, ‘ফেসবুকে, ভিডিওতে দেখি তো।’

বড় একটা ডাইনিং টেবিলে গোল হয়ে বসে গল্পে মজে যাই আমরা। খালাম্মা আড্ডার মধ্যমণি, দিপুর আরেক বোনকে আমরা আসার সময়ই পথ থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম, কাজ থেকে ফেরার পথে দুলাভাইকে নিয়ে আসবেন দিপুর আরেক বোন। মামি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

এই মামিই হচ্ছেন সেই মামি যাঁকে ইতিহাস হিসেবে দেখি। দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মতো, কেবল অভিবাসীই নয়, সবার প্রেরণা পাওয়ার মতো ইতিহাস। আমেরিকায় তিনি প্র্যাকটিসিং ডাক্তার। এনইসি হেলথ প্লাস হসপিটালসের সহকারী পরিচালক এবং অ্যাটেন্ডিং ফিজিশিয়ান। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে মার্কিন স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ডা. আসমা আহমেদ যে একই সঙ্গে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও রোগীসেবায় পারদর্শিতা দেখিয়ে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন, সেটি হাসপাতালের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যই বলে দিচ্ছে। এই বয়সেও অসাধারণ সুন্দরী, ঋজু ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মামির বাসায় এসেছি, তিনি তো আপ্যায়ন করবেনই। কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতাল থেকে এসেছেন, এখন আবার যাবেন ছেলের বাসায় নাতির ডিউটি করতে। কোনো কিছু নিয়েই তাঁর কোনো ক্লান্তি নেই। এই যে নাতির সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি ছুটে যাচ্ছেন, যেটি তাঁকে হরহামেশাই করতে হয়, সেটি যে তাঁকে প্রবল আনন্দ দিচ্ছে, তাঁর অভিব্যক্তিতে তার প্রকাশ ঘটছে। এটা এখন তাঁর একরকমের রুটিনই।

ডা. আসমা আহমেদের বিয়ে হয়েছিল যখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়েন। মাধ্যমিকের নির্বাচনী পরীক্ষার আগে আগে। সেবার তিনি কুমিল্লা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় জায়গা নিয়েই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। উচ্চমাধ্যমিকের মাত্র ১৯ দিন আগে সন্তান জন্ম দেন। সেবারও তিনি সম্মিলিত মেধাতালিকায় ছিলেন। ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। মেডিক্যালের পড়াশোনাটাও তাঁর নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। স্বামী ড. আশরাফ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির উঁচু পদে চাকরি নিয়ে সিলেটে চলে যান। তিনিও চলে যান সিলেট মেডিক্যাল কলেজে। স্বামী যখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ফিরে আসেন, আসমাও ফিরে যান চট্টগ্রাম মেডিক্যালে। ছোটাছুটি করে তিনি পড়াশোনা শেষ করেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে।

ডা. আসমা যখন বাংলাদেশে পুরোদস্তুর চিকিৎসাসেবায় ব্যস্ত, সে সময় আত্মীয়দের কেউ কেউ উৎসাহ দেন আমেরিকায় থিতু হওয়ার। স্পনসরশিপে চলে আসাটাও তেমন কঠিন কিছু নয়। স্বামী ড. আশরাফ পরামর্শ দিলেন, কারও স্পনসরশিপে নয়, বরং নিজের মতো করে যাওয়া যায় কি না, সেটা দেখার। এবার শুরু হয় আসমার ভিন্ন লড়াই। ঠিক করলেন, চিকিৎসক হিসেবেই তিনি আমেরিকায় যাবেন।

আরও পড়ুন
লং আইল্যান্ডে খালাম্মার সঙ্গে সেরীন
ছবি: লেখকের পাঠানো

কিন্তু বাংলাদেশি পড়াশোনা নিয়ে পশ্চিমের কোনো দেশে এসে সরাসরি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত হওয়া যায় না। ডা. আসমা সিদ্ধান্ত নিলেন, ফরেন মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েট এক্সাম কোর্স শেষ করবেন। সেটি আবার করতে হয় সিঙ্গাপুরে। সেটিও করলেন আসমা। ১৯৯৪ সালে তিনি পাড়ি জমান আমেরিকায়। ড. আশরাফ তখন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হুট করে ছেড়ে দিয়ে তিনিও আমেরিকায় স্ত্রীর সঙ্গী হতে পারেননি। ফলে সন্তানদের নিয়ে আসমার একা লড়াই। পরে অবশ্য ড. আশরাফও চলে এসেছেন, আমেরিকায় থিতু হয়েছেন পরিবারের সবাইকে নিয়েই।

ডা. আসমার অবশ্য প্রথম কয়েকটা বছর গেছে তুমুল লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই। তিন বছরের মাথায় যোগ দেন হাসপাতালে। ২০১৩ সালে তিনি ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের দায়িত্বে উন্নীত হন। এখনো তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দশম শ্রেণিতে বিয়ে হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি এক মেয়ে সংসার, সন্তানদের পরিচর্যাসহ সবকিছু সামলে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে এখন আমেরিকার একটি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং সহকারী পরিচালক।

আমাদের আড্ডায় রেখে আসমা মামি বিদায় নিতে চাইলেন। তাঁকে নাতির কাছে যেতে হবে। এটা তাঁর নিয়মিত কাজ। এক ছেলে, এক মেয়ে আমেরিকায় প্র্যাকটিসিং ডাক্তার, তাঁদের স্ত্রী–স্বামীরাও ডাক্তার। আরেক ছেলেও স্বাস্থ্য খাতেই পেশা বেছে নিয়েছেন। ড. আসমা এখন হাসপাতালে রোগী দেখেন, বাসায় এসে সংসার সামলান আবার একই এলাকায় থাকা ছেলে-মেয়ের ছোট বাচ্চাদের দেখভাল করেন। এখন তিনি যাচ্ছেন তাঁর নাতির সঙ্গে সময় কাটাতে।

আমাদের ফেরার সময় হয়। অল্পক্ষণের আড্ডায় খালাম্মা আমাদের কী যে এক মায়ায় বেঁধে ফেললেন! সেরীন ফিসফিস করে বলে, ‘খালাম্মার পাশে বসে থাকতে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আরও কিছুক্ষণ, অনেকক্ষণ খালাম্মার পাশে বসে থাকি।’

আমি মুঠোফোনে মেসেজ দেখতে থাকি। পরিচিত সেই ভদ্রলোক আর কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। তিনি তো জানিয়েছিলেন, আজ তিনি তাঁর লং আইল্যান্ডের বাড়িতে আছেন। আমরাও লং আইল্যান্ডে আসছি, জানার পর থেকেই তাঁর মেসেজ বন্ধ হয়ে গেল কেন?

নিউইয়র্কের পরতে পরতে কত গল্প যে আছে, আমরা তার কতটুকু খবর রাখি!

চলবে..

আরও পড়ুন