পাখির দুটি ডানা আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার মতো সাদা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই গোলাপ জানতে চাইল—মামা, এখানে স্ট্রিট ফুড খাবেন? নাকি জ্যাকসন হাইটসে গিয়ে বাংলাদেশি খাবার খাবেন?
জ্যাকসন হাইটস!—নামটা শুনেই সেরীন চিৎকার করে ওঠে।
‘আমেরিকায় বাংলাদেশ’ কিংবা ‘নিউইয়র্কের ঢাকা’—এই জ্যাকসন হাইটসের কত গল্পই–না শুনেছি। একসময় জ্যাকসন হাইটস ঘুরতে যাব—সেই প্ল্যানও আমাদের আছে।
স্ট্রিট ফুডে হালাল খাবারও পাবেন, অনেক বাংলাদেশিরই দোকান আছে এখানে। কাজেই টেনশন করার কিছু নেই। আর জ্যাকসন হাইটসে তো এক ট্রেনেই চলে যাওয়া যাব।—গোলাপ, আমাদের ভাগনে গোলাম মোস্তফা গোলাপ নানা অপশনগুলো তুলে ধরে।
—জ্যাকসন হাইটসে যাব—সেরীন যেন খানিকটা বাড়তি স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়েই জবাব দেয়।
এলিস আইল্যান্ডে আমেরিকার অভিবাসন ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে কি সেরীনের ক্ষুধার তীব্রতা কমে গেল!—ভাবতে ভাবতে আমি সামনের সাদা ভবনের দিকে তাকাই।
স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যাওয়ার সময় (আগের কিস্তিতে) আপনাদের এই সাদা দালানের কথা বলেছিলাম, বলেছিলাম—ফেরার সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার অকোলাস’ নামে নিউইয়র্কের অন্যতম আইকনিক এই ভবনটির কথা লিখব। আমরা এখন সেই ভবনটির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আর এর পাশেই ঐতিহাসিক ৯/১১ মেমোরিয়াল। ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এক বোমা হামলায় নিহত তিন হাজারের বেশি মানুষের স্মৃতি, বর্বর ধ্বংসযজ্ঞ আর সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর উপাখ্যান নিয়ে গড়ে উঠা এই স্মৃতিস্তম্ভ। একটা ঐতিহাসিক স্থানের এতটা কাছে এসে একটু উঁকি না দিয়ে চলে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এর পরে আবার সময় পাওয়া গেলে না হয় বিস্তারিত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা যাবে।
‘গ্রাউন্ড জিরো’ কেন বললাম! নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি। ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ বোমা হামলার পর পর ‘গ্রাউন্ড জিরো’ শব্দটা খুব বেশি উচ্চারিত হতো।
—এখন তো মিউজিয়ামে ঢুকতে পারবেন না, তা ছাড়া আগাম টিকিট কেনা না থাকলে টিকিটও পাওয়া যায় না। ওয়াক-ইন টিকিট বিক্রিই হয় না। তবে মেমোরিয়াল পুল পর্যন্ত যাওয়া যাবে।
—সমস্যা নেই। আশপাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে পৃথিবীকে পাল্টে দেওয়া একটি ঘটনা আর শূন্য থেকে আবার মাথা উঁচু করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর এই স্মৃতিস্তম্ভ, লনের গাছ আর এখানকার বাতাস গায়ে মেখেই না হয় ফিরে যাব। মনে মনে ভাবি।
সারা দিনের ঘোরাঘুরির ক্লান্তি, ক্ষুধা, জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি খাবারের হাতছানি—উপেক্ষা করে আমরা গ্রাউন্ড জিরোর দিকে হাঁটতে থাকি।
২.
‘গ্রাউন্ড জিরো’ কেন বললাম! নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি। ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ বোমা হামলার পর পর ‘গ্রাউন্ড জিরো’ শব্দটা খুব বেশি উচ্চারিত হতো। ম্যানহাটানের যেই জায়গাটায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, টুইন টাওয়ারের অবস্থান ছিল, —সেই জায়গাটাকে ‘গ্রাউন্ড জিরো’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ৯/১১–এ সব কিছুকেই শূন্য করে দিয়েছে, কিংবা সেই সময়টায় বাস্তবিক অর্থেই পুরো ১৪.৬ একর বিস্তৃত জায়গাটা শূন্য হয়ে গিয়েছিল।
৯/১১ মিউজিয়ামে বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সর্বশেষ মিউজিয়ামে ঢোকা যায় বিকেল সাড়ে ৫টায়।
এখন অবশ্য সেই জায়গাটা আর ‘জিরো’ নয়। সেখানে গড়ে উঠেছে ৯/১১ স্মৃতিস্তম্ভ। যেই জায়গাটায় টুইন টাওয়ার ছিল ঠিক তার পাদদেশে তৈরি হয়েছে দুটি প্রতিফলক পুল। ‘রিফ্লেক্টিং অ্যাবসেন্স’ ডিজাইনে তৈরি বিশাল পুলে রয়েছে জলপ্রপাত। পুল দুটির চারপাশে ব্রোঞ্জ প্যানেলে ৯/১১-এর প্রায় ৩০০০ শহীদ আর ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের নাম খোদাই করে রাখা হয়েছে। অন্তত ৬ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেদিন নিহত হয়েছিলেন বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছিল। এই নামগুলোর মধ্যে তো তাঁদের নামও আছে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে এলেও স্মৃতিস্তম্ভের সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। চারপাশে হেঁটে হেঁটে পুলের গায়ে খোদাই করে থাকা নামগুলো পড়ার চেষ্টা করছে। কেউবা ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে। আর কেউ কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নামগুলোর সামনে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
কোনো কোনো নামের ওপর সাদা গোলাপ ফুল গুঁজে দেওয়া আছে। ‘সব নামের ওপর গোলাপ ফুল নেই কেন’?—চট করে প্রশ্নটা মাথায় আসে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যেদিন যার জন্মদিন থাকে, সেদিন তার নামের ওপর সাদা গোলাপ গুঁজে দেওয়া হয়, আর সাদা গোলাপ দেখে দর্শনার্থীরাও তাঁদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে পারেন।
নামগুলোর দিকে চোখ ঘুরাতে ঘুরাতে মনে পড়ে যায় এই স্মৃতিস্তম্ভের আর্কিক্টে/ডিজাইনার মাইকেল আরাদের একটি কথা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, when you come to the memorial, you come up to the edge of one of these voids, and you see this enormous empty space Infront of you. It’s the space that can’t be filled, and will not be filled. It is there where you encounter the names of the dead.
আহা! তিন হাজারের বেশি মানুষের নামের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ক্ষণিকের জন্যে হলেও দাঁড়িয়ে যায়, শ্রদ্ধায় স্মরণ করে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের অঙ্গীকার করে।
৯/১১ মিউজিয়ামটা বানানো হয়েছে ভেতরে, আন্ডারগ্রাউন্ডে। বলতে গেলে সেদিনের বোমা হামলা, হামলা পরবর্তী প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহই যেন ধরে রাখা হয়েছে এই মিউজিয়ামে। বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই মিউজিয়াম খোলা থাকে। সর্বশেষ মিউজিয়ামে ঢোকা যায় বিকেল সাড়ে ৫টায়। দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে এয়ারপোর্ট সদৃশ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তবে টিকিট কাটতে হয় অনলাইনে, আগাম। এবং নির্দিষ্ট টাইম শ্লট বুকিং দিয়েই টিকিট কাটতে হয়। মিউজিয়ামে গিয়ে তাৎক্ষণিক টিকিট কাটার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যেহেতু আগাম টিকিট কিনে আসিনি আর শেষ গ্রুপ প্রবেশের সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে, ফলে এই যাত্রা আমাদের মিউজিয়াম দেখার ইচ্ছাটা অপূর্ণই রাখতে হলো।
অনেক মানুষ যখন পুলে ৯/১১ এ হারিয়ে যাওয়া মানুষের নামের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মানুষগুলোর কথা ভাবছেন, তখন আরো অনেক মানুষ স্মৃতিস্তম্ভটার চারপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। জায়গাটায় অনেকগুলো গাছ সারি সারি লাগানো আছে। দেখে চেনা যায়—সাদা ওকগাছ এগুলো। এই গাছগুলো পুরো পরিবেশটায় নির্মল একটা প্রাকৃতিক আবহ তৈরি করে দিয়েছে যেন। এই গাছগুলোর মধ্যে একটি গাছের গোড়ার দিকে গোল চিহ্নিত করে করে আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই গাছটার কাছে মানুষের ভিড়ও যেন একটু বেশি। এই গাছটির আলাদা একটা নাম আছে - ‘সারভাইভাল ট্রি’। - ‘সারভাইভাল ট্রি’- মানে বেঁচে যাওয়া গাছ।
২০১১ সালের বোমা হামলার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রায় এক মাস পর এই গাছটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। বিধ্বস্ত, ভেঙে, পুড়ে যা তা অবস্থা। কিন্তু গাছটায় প্রাণ আছে টের পেয়ে তার বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর নতুন ডালপালা গজাতে শুরু করে। এক সময়ে সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠলে ২০১০ সালে গাছটিকে ৯/১১ মেমোরিয়াল প্লাজায় ফিরিয়ে আনা হয়। ‘ক্যালোরি পিয়ার’ গাছটি এখন আশা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়ামের অংশ হয়ে আছে।
৩.
সেই টুইন টাওয়ার তো নেই, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারও কি নেই? ২০০১ সালে বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া আদি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের প্রধান দুটি ভবন ছিল টুইন টাওয়ার। সেই কমপ্লেক্সে আরও সাতটি বিল্ডিং ছিল। সেগুলো অবশ্য তেমন আলোচনায় আসেনি। টুইন টাওয়ার হিসেবে দুটি টাওয়ার ছিল কমপ্লেক্সের অংশ মাত্র। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং টুইন টাওয়ার পরস্পরের পরিপূরক নাম হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়। সবকিছু ছাড়িয়ে এক সময় টুইন টাওয়ার নামটাই সবার মনে গেঁথে যায়।
৯/১১–এর ধ্বংসযজ্ঞের পর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় নতুন ভাবে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সে’ নির্মাণ করা হয়। সেখানে ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ হয়ে ওঠে নিউইয়র্ক শহরের প্রধান ও সবচেয়ে উঁচু ভবন। ১০৪ তলা ভবনের ১৭৭৬ ফুট উচ্চতাকে অনেকে প্রতীকী হিসেবেও দেখে থাকেন। আমেরিকার স্বাধীনতার বছরের সঙ্গে মিলিয়ে এর উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে।
ঘুরে ফিরে আমরা আবার সেই সাদা ভবনটার কাছাকাছি এসে পৌঁছে যাই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার সাবওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে আমরা জ্যাকসন হাইটস যাব। পাখির ডানার মতো বিল্ডিংকে পেছনে ফেলে আমরা সেদিকে হাঁটতে থাকি। বাই দ্য ওয়ে, এই বিল্ডিংটা হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের প্রধান পরিবহন কেন্দ্র এবং শপিং মল। একটি শিশুর হাত থেকে ছাড়া পাওয়া ঘুঘু দুই ডানা ছড়িয়ে দিয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে—এমন একটি অবয়বে বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করা হয়েছে। ৯/১১–এর মর্মস্পর্শী হত্যাকাণ্ডের পর পুনর্জন্ম এবং দৃঢ়তা নিয়ে নতুন জীবনে হেঁটে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি এই ডিজাইনে।