১.
গোলাপ আগেই জানিয়ে রেখেছিল, স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখে আমরা এলিস আইল্যান্ডে যাব। টিকিটটাও সে রকমই। এক টিকিটে দুই আইল্যান্ড।
চট করে অনেক বছর আগে ঢাকার ইংরেজি সিনেমার বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে গেল। ঢাকার বেশ কিছু সিনেমা হলে তখন ইংরেজি সিনেমা দেখানো হতো। আর সেই সব সিনেমার বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হতো— ‘এক টিকিটে দুই ছবি’। ইত্তেফাকের পেছনের দিকে, কী যেন হলটার নাম, সেখানে গিয়ে অনেক দিন ‘এক টিকিটে দুই ছবির’ ইংলিশ মুভি দেখেছি। আজ আমরা ‘এক টিকিটে দুই আইল্যান্ড’ দেখব।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখার পর আরেকটি আইল্যান্ড দেখার খুব একটা আগ্রহ হচ্ছিল না। কিন্তু ব্যবস্থাটাই যেহেতু ‘একটা দেখলে আরেকটা দেখতেই হবে’ ধরনের, তখন আর দ্বিধা করার সুযোগ কোথায়! এলিস আইল্যান্ডগামী ফেরি ধরতে আবার বিশাল লাইনে নিজেদের দাঁড় করিয়ে দিই।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি থেকে খুব একটা দূরে নয় এলিস আইল্যান্ড। মাইলখানেকের মতো হতে পারে। ব্যাটারি পার্ক থেকে যে ফেরিতে আমরা এসেছি, সেটাই দুটি জায়গায় দর্শনার্থীদের আনা–নেওয়া করে। দুটি আইল্যান্ডের দেখভাল, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ—এই সবই একই ব্যবস্থাপনায়। ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি ন্যাশনাল মনুমেন্ট’ নামে ফেডারেল সরকারের কর্তৃত্বাধীন সংস্থার দায়িত্ব সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা আর ‘ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসেস’ নামের আরেকটি সংস্থা দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। ১৯৬৫ সালে এলিস আইল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্ট্যাচু অব লিবার্টির অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সেরীন ক্ষুধার আওয়াজ দেয়। স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে ঘুরতে ঘুরতে চোখ আর মনের খাবারে বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের কারোই পেটের ক্ষুধার কথা মনে হয়নি। অন্তত হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া যেত। এখন আর ফেরির লাইন ছেড়ে খাবারের দোকানের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোটা সমীচীন মনে হলো না, আগ্রহও হলো না।
– ফেরিতে স্ন্যাকস–জাতীয় কিছু পাওয়া যাবে?
– গোলাপ আমাদের আশ্বস্ত করে। আর ম্যানহাটানে ফিরে গিয়ে নিউইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা তো আছেই।
– গোলাপের কথায় পেটের ভেতর ক্ষুধা যেন আরও মোচড় দিয়ে ওঠে।
নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুডের অনেক নাম শুনে এসেছি আমরা। নিউইয়র্কে যাচ্ছি শুনেই ‘স্ট্রিট ফুড না খেলে মস্ত বড় মিস হয়ে যাবে’ বলে অনেকেই উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমাদেরও পরিকল্পনা আছে, একদিন জম্পেস নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুড খাওয়ার। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড, ফলে খাবারের চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হলো। আমরা বরং সুশৃঙ্খল দর্শনার্থীর মতো লাইন অনুসরণ করে ফেরির দিকে এগোতে থাকি।
নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুডের অনেক নাম শুনে এসেছি আমরা। নিউইয়র্কে যাচ্ছি শুনেই ‘স্ট্রিট ফুড না খেলে মস্ত বড় মিস হয়ে যাবে’ বলে অনেকেই উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমাদের পরিকল্পনাও আছে, একদিন ঘটা করে নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুড খাওয়ার।
২.
মিনিট ১০–১৫–এর মধ্যেই ফেরিটা এলিস আইল্যান্ডে পেঁছে যায়। ফেরিটা কাছাকাছি পৌঁছাতেই প্রথমে আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা বড়সড় দালানটা চোখে লাগে, রংটা অনেকটা লালচে ধরনের। আমেরিকার অভিবাসনের ইতিহাসের পরতে পরতে এই লাল দালানের উল্লেখ আছে। ততক্ষণে বড় সাইনবোর্ডের লেখাগুলো দৃষ্টিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিল্ডিংটার সামনে লাল ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা রঙে ‘এলিস আইল্যান্ড, ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইমিগ্রেশন’ লেখাগুলো যেন আমাকে আরও উজ্জীবিত করে তোলে।
- আমরা তাহলে মিউজিয়াম দেখতে যাচ্ছি!
- নিজের উচ্ছ্বাসটা নিজেই নিজের কাছে পৌঁছে দিই যেন।
ফেরি থেকে নেমেই হুড়মুড় করে সবাই লাল দালানটার দিকে ছুটতে থাকে। কেউ কেউ বাইরের খোলা জায়গায়টায় দাঁড়িয়ে নদী, দূরের স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর ম্যানহাটান শহরের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলো দেখতে থাকে। আর আমি ওই মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি, তাদের দেখতে থাকি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
সেরীন আর গোলাপ ততক্ষণে ভবনটার ভেতরে ঢুকে গেছে। আমি যতটা চোখ যায়, পুরো জায়গাটা দেখার চেষ্টা করি।
‘এলিস আইল্যান্ড’ নাম শুনে আরেকটা আইল্যান্ডে যাচ্ছি বলে মনে হলেও এটি আসলে একটি মিউজিয়াম। আমেরিকার অভিবাসন জাদুঘর। প্রায় ২৭ একর জায়গাজুড়ে ছোট্ট একটি দ্বীপ, এই দ্বীপকে আবার আমেরিকার অভিবাসনের ইতিহাসের ঐতিহাসিক অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ১৮৯২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল এই দ্বীপে। এখান থেকে তারা আমেরিকার ভেতরে যাওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। তারপর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। আবার মাস, বছরের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এই দ্বীপ থেকেই অনেককে ফিরে যেতে হয়েছে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে।
বলা হয়ে থাকে, বর্তমান আমেরিকায় বসবাসরত দুই–তৃতীয়াংশ মানুষের পূর্বপুরুষের আমেরিকায় প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল এই এলিস আইল্যান্ডে। অভিবাসনের ইতিহাসে এই আইল্যান্ড একদিকে যেমন ‘আইল্যান্ড অব হোপ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, আবার ‘আইল্যান্ড অব টিয়ারস’ হিসেবেও উল্লেখিত হয়েছে। সেগুলো সবই ইতিহাস এবং অতি অবশ্যই আমেরিকার ইতিহাস। সে ইতিহাসটা আমেরিকানরা অত্যন্ত যত্ন করেই ধরে রেখেছে এই ছোট্ট দ্বীপে। কোনো বিতর্ক, কোনো জটিলতায় ফেলেনি এই দ্বীপ কিংবা দ্বীপকে ঘিরে আবর্তিত ইতিহাসকে।
সেরীন আর গোলাপকে অনুসরণ করে আমিও লাল দালানের ভেতরে ঢুকে পড়ি। সামনে–পেছনে, ওপরে—চারদিকে আমার চোখ ঘুরতে থাকে। দেয়ালে বড় বড় ছবি, একেকটি ছবি যেন একেকটি ইতিহাস। পুরো বিল্ডিংটাকে, মানে মিউজিয়ামটাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন শত বছর আগের কোনো অভিবাসী নতুন করে তাঁর পুরোনো জীবনটাকে পরিভ্রমণ (রি-ভিজিট) করতে পারবেন এখানে। রি-ভিজিট অব দ্য পাস্ট যাকে বলে। ফেরি থেকে ও বাইরে থেকে দেখা এলিস আইল্যান্ডের লাল দালানটা কোটি অভিবাসীর স্বপ্ন ও সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে তাদের অতীতটাকেই একেবারে অপরিবর্তিতরূপে বর্তমান করে রেখেছে।
৩.
ফেডারেল সরকারের মালিকানায় থাকলেও একটা সময় এই দ্বীপ ছিল ম্যানহাটানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ওয়েলশ নাগরিক স্যামুয়েল এলিসের মালিকানাধীন। ১৭৭৪ সালে দ্বীপটি কিনেছিলেন তিনি। হাডসন নদীকে ঘিরে তাঁর বেশ কিছু সম্পত্তি ছিল। ম্যানহাটানের সুরম্য অট্টালিকায় বসে হাডসন নদী আর সেই নদীতে থাকা একটি দ্বীপের মালিকানাবোধ তিনি খুব উপভোগ করতেন বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্রে ধারণা পাওয়া যায়। তবে একটা সময় তিনি এই দ্বীপ বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আরও কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীর সঙ্গে এই দ্বীপ বিক্রির জন্য তিনি বিজ্ঞাপনও দেন। এই দ্বীপ কিনতে কেউ এগিয়ে আসেনি। তিনি তখন ঠিক করেন, তাঁর চার কন্যার ভবিষ্যৎ সন্তানদের কাউকে তিনি দ্বীপটি দিয়ে যাবেন। তবে শর্ত হচ্ছে, সেই সন্তানটি হতে হবে পুত্রসন্তান এবং তার নাম রাখতে হবে তাঁর নিজের নামে—স্যামুয়েল এলিস। তাঁর এক কন্যার একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হলেও একেবারে শৈশবেই তার মৃত্যু হয়। আর কারও পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি দ্বীপটি নিজের কাছেই রেখে দেন। নিজের নামে দ্বীপটির নাম করেন এলিস আইল্যান্ড। পরে অভিবাসনের জোয়ার শুরু হলে নিউইয়র্ক রাজ্য সরকার ১৮০৮ সালে দ্বীপটি কিনে নেয়। তবে তারা নামের কোনো পরিবর্তন করেনি। পরে নিউইয়র্ক রাজ্য সরকার এটি ফেডারেল সরকারকে দিয়ে দেয়। তখনো এর নাম থেকে যায় এলিস আইল্যান্ড।
সরকারের হাতে আসার পরও সাড়ে ২৭ একর আয়তনের এই দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির মধ্যে হাডসন নদীর মুখে এই দ্বীপের অবস্থান। ফলে দুই রাজ্যই এর মালিকানা দাবি করে বসে। দেখা দেয় আইনি জটিলতা। কিন্তু ফেডারেল সরকার সেটি বাড়তে দেয়নি। নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নেয় এর ব্যবস্থাপনা। সেখানে আবার দুই রাজ্যকেই সঙ্গে রাখা হয়। কোনো রাজ্য নয়, ফেডারেল সরকারের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে এই দ্বীপ। আমেরিকার আদিকালে অভিবাসনপ্রক্রিয়া আর আগন্তুকদের চিকিৎসার জন্য গড়ে ওঠা হাসপাতাল ভবনটিকেও রেখে দেওয়া হয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এই দ্বীপে।
৪.
দেয়ালে টানানো ছবি, ভাস্কর্য আর ফ্লোরে রাখা প্রায় ১৩৩ বছর আগের মানুষের ব্যবহার্য পোশাক, আসাবাবের সংরক্ষণের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন একটা অশরীরী অনুভূতি টের পাই। মনে হয়, আমরা নিজেরাও যেন শত বছর আগের কোনো সমাজে চলে গেছি।
চিকিৎসকের প্রাথমিক ছাড়পত্র নিয়ে জাহাজ থেকে ছাড়া পাওয়া মানুষগুলোকে এলিস আইল্যান্ডের এই লাল দালানের প্রবেশপথে জড়ো করা হতো। এখান থেকে তাঁদের পাঠানো হতো রেজিস্ট্রেশন রুমে। বিশালাকৃতির রেজিস্ট্রেশন রুমটা অনেকের জন্য ছিল বিশাল বিস্ময়।
এলিস আইল্যান্ডেই কি আমেরিকার অভিবাসনপ্রক্রিয়ার প্রথম শুরু? প্রশ্নটা মাথায় টোকা দেয়। না, আমেরিকার অভিবাসীদের প্রথম প্রসেসিং সেন্টার ছিল ব্যাটারি পার্কের ক্যাসল ক্লিনটন, যেটি আমি আগের এক কিস্তিতে উল্লেখ করেছি। যেখান থেকে ফেরিটা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, খরা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা—ইত্যাদি নানা কিছুর কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে মানুষ নিজেদের দেশ ছাড়তে শুরু করে। ভাগ্যের অন্বেষণে খুঁজতে থাকে নতুন কোনো স্থান। আর এই সুযোগটাই নেয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ‘চালাক’ কিছু মানুষ। রীতিমতো কোম্পানি খুলে, প্রচার প্রচারণা চালিয়ে মানুষ সংগ্রহ করে জাহাজে বোঝাই করে আমেরিকায় লোক পাঠাতে শুরু করে তারা। অনেকটা বর্তমানের বাংলাদেশের আদম ব্যবসায়ীদের মতো। বাংলাদেশে যেমন আদম ব্যবসায়ীরা নানা ফন্দিফিকির করে বিদেশে লোক পাঠান, অনেকটা সেই রকম। যেহেতু নদীপথেই অভিবাসীদের আমেরিকায় নিয়ে আসা হতো, ব্যাটারি পার্ক আর তৎসংলগ্ন এলাকাটাতেই ভিড় জমে নতুন অভিবাসীদের। ক্যাসল ক্লিনটনের প্রসেসিং সেন্টারটি বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রসেসিং করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। এই সময় আবার এটি বন্ধও হয়ে যায়। তখন সরকার মনোযোগ দেয় এলিস আইল্যান্ডে। সেখানে ইমিগ্রেশন প্রসেসিং শুরু করে। ১৮৯২ সালে এটিই হয়ে ওঠে আমেরিকার প্রধান অভিবাসনকেন্দ্র। মূলত সেই সময়টায় বড় বড় তিন জাহাজভর্তি অভিবাসী হাডসন নদীর উপকূলে অপেক্ষা করছিল আমেরিকায় প্রবেশের জন্য। তাদের প্রসেসিংয়ের জন্যও নতুন এবং বাড়তি জায়গার দরকার হয়ে পড়ে। ১৮৯২ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এলিস আইল্যান্ডে অভিবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয়।
আয়ারল্যান্ড থেকে আসা ১৫ বছর বয়সী অ্যানি মুর অভিবাসী হিসেবে এলিস আইল্যান্ডে প্রথম অভিবাসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর দুই ভাই। ম্যানহাটানে বাবা–মায়ের সঙ্গে দেখা করতে তিনি জাহাজে করে আমেরিকায় আসেন বলে তথ্যপত্রে উল্লেখ আছে। এলিস আইল্যান্ড দিয়ে আসা প্রথম অভিবাসী হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাস হয়ে আছে।
আমরা ধীর লয়ে এগোতে থাকি। ছবি, ছবিতে থাকা ফুটনোট, ইনফোগ্রাফ আমাদের গতিকে ধীর করে ফেলে। বিল্ডিংটিতে ঢোকার পর থেকে ধাপে ধাপে যেসব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নতুন আসা অভিবাসীদের যেতে হয়েছে—প্রতিটি রুম, ফ্লোর, সিঁড়ি ঠিক সেভাবেই সাজিয়ে রাখা আছে। দর্শনার্থীরা ভিড় করে সেই সব ঐতিহাসিক উপাদানগুলো দেখে আর আমেরিকার অভিবাসনের পেছনের ইতিহাসের মুখোমুখি হয়।
লাল দালানের প্রবেশমুখের হলওয়ের মতো জায়গাটা পেরুলেই রেজিস্ট্রেশন কক্ষ। ঠিক এই জায়গাটায়ই নতুন আসা অভিবাসীদের নিবন্ধন করা হতো। কিন্তু এই জায়গা পর্যন্ত আসাই ছিল অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজভর্তি অভিবাসীরা নিউইয়র্কের প্রবেশমুখে পৌঁছালেই সরাসরি জাহাজ থেকে নেমে শহরে ঢুকে যেতে পারত না। জাহাজে তাদের অপেক্ষায় থাকতে হতো চিকিৎসক এবং অভিবাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য। তাঁরা সেখানে গিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা করবেন। প্রাথমিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার মূল বিষয়টা হচ্ছে তাঁরা শারীরিকভাবে সুস্থ কি না। এখানে ছাড়পত্র পেলেই তাঁরা অভিবাসনপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার জন্য লাল দালানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সে সময়ে একই সঙ্গে অসংখ্য জাহাজ আর এত বেশি অভিবাসী আসছিলেন যে চিকিৎসকের আসার জন্য তাঁদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ জাহাজেই অপেক্ষা করতে হতো। চিকিৎসক এবং অভিবাসন কর্মকর্তারা তাঁদের পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে যাঁদের সুস্থ মনে করতেন, তাঁদের জামায় একটা ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দিতেন। আর যাঁদের সুস্থ বলে মনে হতো না, তাঁদের সেই জাহাজে করেই নিজের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হতো।
জাহাজে করে আসা এই অভিবাসীদের মধ্যেও আবার শ্রেণি বিভাগ ছিল। শিক্ষিত, বিত্তশালী যাঁরা জাহাজে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রী হিসেবে আসতেন, তাঁদের এ ধরনের কোনো পরীক্ষা–নিরীক্ষার প্রয়োজন হতো না। তাঁদের এমনকি এলিস আইল্যান্ডের লাল দালানের অভিবাসনপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েও যেতে হতো না। তাঁরা জাহাজ ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সোজা শহরে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু সাধারণ শ্রেণির অভিবাসীদেরই নানা রকমের পরীক্ষা–নিরীক্ষা আর অভিবাসনপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হতো। তার একেবারে প্রাথমিক পরীক্ষা হচ্ছে জাহাজে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের দল বেঁধে পাঠিয়ে দেওয়া হতো এলিস আইল্যান্ডে, তাঁদের ভাগ্যের পরবর্তী পরীক্ষার মুখোমুখি হতে।
৫.
একটা জিনিস খেয়াল করেছ, অপেক্ষমাণ লোকগুলোর এই ছবিটা দেখো। প্রত্যেকের জামায় একটা চিহ্ন দেওয়া আছে। সেরীনের আঙুল অনুসরণ করে ছবিগুলোর দিকে তাকাই। ঝাপসা হলেও ঠিক পড়া যায়—E. I । তার মানে কি এলিস আইল্যান্ড?
- সেরীনের তীক্ষ্ণ নজরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনেক কিছুই ধরা পরে। মিউজিয়াম, প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক কোনো কিছুর ব্যাপারে সেরীন অত্যন্ত চৌকস গাইড। চমৎকারভাবে বিষয়ের ইতিবৃত্ত তুলে আনতে পারে। কয়েক মাস আগে ক্যালগিরির রকি মাউন্টেন এলাকায় ভ্রমণের সময়ও সেখানকার ভৌগোলিক পরিবর্তনের ইতিবৃত্ত এত চমৎকারভাবে তুলে ধরছিল যে আমাদের মনে হয়েছে, আমরা নিজেরাই সেই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।
চিকিৎসকের প্রাথমিক ছাড়পত্র নিয়ে জাহাজ থেকে ছাড়া পাওয়া মানুষগুলোকে এলিস আইল্যান্ডের এই লাল দালানের প্রবেশপথে জড়ো করা হতো। এখান থেকে তাঁদের পাঠানো হতো রেজিস্ট্রেশন রুমে। বিশালাকৃতির রেজিস্ট্রেশন রুমটা অনেকের জন্য ছিল বিশাল বিস্ময়। এত বড় হলরুমে তাঁদের অনেকেই এর আগে কখনো যাননি। সেখানে তাঁদের নানা রকমের পরীক্ষা–নিরীক্ষা হতো। সেই রেজিস্ট্রেশন রুমটিতে যেতে হতো একটা দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়টা দূর থেকে চিকিৎসক এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের একটা দল তীক্ষ্ণভাবে প্রতিটি অভিবাসীকে খেয়াল করত। তাঁরা স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যেতে পারছেন কি না, আস্তে হাঁটছেন, নাকি জোরে হাঁটছেন, হাঁটতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন কি না, কেউ কাশি দিচ্ছেন কি না, কারও মধ্যে কোনো ধরনের অসংলগ্নতা দেখা যাচ্ছে কি না—সেগুলো লক্ষ করা হতো। এমনকি ছোট ছোট বাচ্চাদেরও আলাদা হেঁটে সিঁড়ি পার হতে হতো এবং তাদেরও এসব খেয়াল করা হতো।
সিঁড়ি পেরিয়ে যাওয়া লোকগুলোর কারও হাঁটায় কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে, কাউকে অসুস্থ মনে হলে আলগোছে তাঁর গায়ের জামায় চক দিয়ে একটি চিহ্ন বসিয়ে দেওয়া হতো। সেটিও আসলে একটা ট্যাগ। কারও হার্টের সমস্যা আছে মনে হলে তাঁর জামায় H, চোখের সমস্যা হলে E, পায়ের সমস্যা হলে Ft, কাউকে অলস মনে হলে L চিহ্ন দিয়ে দেওয়া হতো। সিঁড়ির ওপরের মাথায় নিবন্ধনকক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব চিহ্ন দেখে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন।
রেজিস্ট্রেশন রুমের আয়তনটা অনেক বড় হলেও অভিবাসীদের দাঁড়ানোর জন্য লোহার রেলিং দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। সেটিকে আবার অনেকে জেলখানা মনে করতেন। সেখানে কর্মকর্তারা প্রত্যেকের নাম ধরে ডাকতেন এবং সামনে যাওয়ার পর আবার তাঁদের নাম জিজ্ঞাসা করতেন। কর্মকর্তারা নিশ্চিত হতে চাইতেন, আমেরিকায় অভিবাসী হতে আসা এই লোকগুলোর প্রত্যেকেই কথা বুঝতে এবং বলতে পারেন। কানে শুনতে পাচ্ছেন কি না, চোখে ঠিকঠাক দেখেন কি না—এই দুটি বিষয় নিয়ে তাঁদের সতর্কতা ছিল মাত্রাতিরিক্ত।
রেজিস্ট্রেশন রুমে নাম নিবন্ধনের পর তাঁদের পাঠানো হতো নানা ধরনের পরীক্ষার জন্য। শারীরিক সুস্থতা, মানসিক সুস্থতাসহ অন্যান্য সংবেদনশীলতাবিষয়ক পরীক্ষা—এ রকম নানা ধরনের পরীক্ষা–নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হতো অভিবাসীদের। মেডিকেল চেকআপটা ছিল ভয়াবহ রকমের আতঙ্কের। আলাদা আলাদা রুমে নিয়ে মেডিকেল চেকআপের সময় প্রায় সবাইকে সম্পূর্ণরূপে কাপড় খুলে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হতো। চর্মরোগ আর মেয়েদের মাথার উকুন নিয়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বাড়তি সতর্কতা ছিল।১৯১৪ সাল পর্যন্ত এলিস আইল্যান্ডের সব চিকিৎসকই ছিলেন পুরুষ। ফলে তাঁদের সামনে কাপড় খোলা নিয়ে মেয়েদের চরম অস্বস্তি ছিল।
এভাবে একে একে নানা ধাপ পেরিয়ে অভিবাসীরা পৌঁছাতেন নিচতলায় ক্লেম রুমে। ক্লেম রুমে আসা মানেই তাঁর ভাগ্যের চাকা খুলে গেছে। এখানে এসে তিনি লাগেজটাগেজ যা সঙ্গে ছিল, সেগুলো নিয়ে আমেরিকার সমাজের একজন হয়ে যাওয়ার সুযোগ লাভ করলেন।
পুরো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে আমরা কখন প্রায় ১৩০ বছর আগে ডুবে গিয়েছিলাম, টের পাইনি। সংবিৎ ফিরে আসতেই আমাদের শহরে ফেরার তাগিদটা তীব্র হয়ে ওঠে। ফেরির দিকে পা চালাতে চালাতে আবার পেছন ফিরে লাল দালানটাকে দেখে নিই।
– প্রায় দেড় শ বছর আগেও আমেরিকানরা কী চুজি ছিল দেখো!
- সেরীন মন্তব্য করে। জাহাজভর্তি লোক আসছে, কিন্তু সবাইকে তারা গ্রহণ করবে না। আমেরিকার রাস্তা অকর্মণ্য লোকে না ভরে যাক, সেটা তারা প্রায় দেড় শ বছর আগেও নিশ্চিত করতে চেয়েছে, এখনো চাচ্ছে। সেরীনের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। শহরে যাওয়ার এটাই দিনের শেষ ফেরি কিনা! চলবে...