নির্বাচনী কড়চা-৫
আমি আজ এসেছি কিষান–কিষানির কাছে। এটি সিরাজগঞ্জ–২ সংসদীয় আসনের আওতাধীন এলাকা। এখন বোরো ধান লাগানোর সময়, কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচন নিয়ে তাঁদের মধ্যে কিছু উদ্দীপনা আছে, কিন্তু প্রত্যাশা একেবারেই নেই। বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বজ্রপাতের মধ্যেই তাঁদের লড়াই চলে। ভোটের আগে তাঁরা অনেক মূল্যবান, কিন্তু ভোট চলে গেলে একেবারে মূল্যহীন—ঠিক অচল পয়সার মতো!
চিন্তার ডানা মেলে কল্পনায় হারিয়ে যাই—যেখানে দেখি কৃষকেরা সহজে সার–বীজ পাচ্ছেন, আধুনিক প্রযুক্তি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করছেন, কিষান–কিষানি সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন, তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সহজে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ড্রাইভারের ডাকে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসি।
কথা হয় পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। রোদে পোড়া পেটা শরীরে কাদা লেগে আছে, মাথায় গামছা বাঁধা। তিনি বলেন, এবার ধান লাগানোর কামলা নেই; যাঁরা এসব কাজে অভিজ্ঞ, তাঁরা সবাই নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত। অগত্যা নিজেরাই কাজে লেগে পড়েছেন। তাঁর স্ত্রী ধানের চারা তুলছেন আর তিনি খেতে সেই চারা লাগাচ্ছেন। জাহাঙ্গীর আফসোস নিয়ে বলেন, ‘আমরা ফসলের ন্যায্য দাম পাই না। ফসলের দাম বাড়লে আমরা লাভবান হতে পারি না, কিন্তু দাম কমলে শতভাগ ক্ষতি আমাদের। সরকার যে–ই গঠন করুক, আমাদের ক্ষতির আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি!’ আমি তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি। মনটা বিষিয়ে ওঠে—এআইয়ের যুগেও এখনো সনাতন পদ্ধতিতে অমানবিক পরিশ্রম করে এ দেশের কৃষকেরা শস্য উৎপাদন করেন।
সামনের সবজিখেতে দুজন নারী কাজ করছেন। খেতভর্তি আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি। একজন আমাকে ফুলকপি দেখিয়ে বলেন, ‘দেখেন, একেকটা ফুলকপি দুই কেজির বেশি।’ আমি দেখি ডাঁশা ডাঁশা ফুলকপি পাতার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। অন্য একজন কয়েকটি ক্ষীরা হাতে ধরিয়ে দেন। আমি লোভ সামলাতে পারি না, খোসাসহ মুখে চালান করতে থাকি। কী স্বাদ! এ দেশের মাটিতে সত্যিই সোনা ফলে।
আমি তাঁদের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করি—ভোট দেবেন কাকে? একজন বলেন, ‘আপনি বলেন, কাকে ভোট দেব?’ এমন পাল্টা প্রশ্নে আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই। মাঠে কাজ করেও এঁরা তাসনিম জারাকে চেনেন! দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, তৃণমূলের কায়িক শ্রমী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নির্বাচনের ইশতেহারে তেমন কিছু নেই।
একজন বলেন, সার আর বীজ কম দামে পাইলে ভালো হতো। আরেকজনের উত্তর চিন্তার খোরাক বাড়িয়ে দেয়। বলেন, ধানের মৌসুমে ঠাডা পড়ে গরু মরে, মানুষ মরে। নতুন সরকার যদি ঠাডা পড়া কমাতে পারত, তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তা কমত। নতুন সরকার ইচ্ছা করলেই এসব নিরাপত্তাজনিত সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান করতে পারে।
আমি তাঁদের ধন্যবাদ দিয়ে সামনে এগোতে থাকি। মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করি। কিছু দূরে কয়েকজন পাকা শর্ষে তুলছে, পাশে গমখেত। আমি চিকন আইল দিয়ে হেঁটে তাঁদের কাছে যাই। সালাম দিয়ে এক চাচাকে বলি, ‘শর্ষের ফলন কেমন হয়েছে, চাচা?’ তিনি সালামের জবাব দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ এইবার ভালোই দিছে।’
আমি টুকটাক কথা বলে নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলি। তাঁদের উত্তর প্রায় একই রকম। নির্বাচন সম্পর্কে অবহিত, কিন্তু প্রত্যাশা নেই বললেই চলে। নতুন সরকারের কাছে কোনো দাবি আছে কি? একজন বলেন, ‘সার আর বীজ কম দামে পাইলে আমাদের ভালো হতো।’ আরেকজনের উত্তর আমার চিন্তার খোরাক বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, ‘ধানের মৌসুমে ঠাডা পড়ে গরু মরে, মানুষ মরে। নতুন সরকার যদি ঠাডা পড়া কমাতে পারত, তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তা অনেকটা লাঘব হতো। তাঁর দাবি অত্যন্ত যুক্তিসংগত এবং সময়োপযোগী। নতুন সরকার ইচ্ছা করলেই এসব নিরাপত্তাজনিত সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান করতে পারে।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
আমি আর কিছু না জিজ্ঞেস করে মেইন রাস্তার দিকে হাঁটা দিই। এঁদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, কেউ কেউ হয়তো কিছু নগদ পাওনার আশায় যে কাউকে ভোট দেবেন, আবার কেউ নিজের পছন্দের দলের প্রতীক ছাড়া কিছু শুনতেই রাজি নন।
আমি অটোভ্যানে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিই। সন্ধ্যার ট্রেনে ঢাকায় ফিরতে হবে। অটো চলতে থাকে। অন্য দুজন যাত্রী নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। আমি চিন্তার ডানা মেলে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাই—যেখানে দেখি কৃষকেরা সহজে সার–বীজ পাচ্ছেন, আধুনিক প্রযুক্তি স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করছেন, কিষান–কিষানি সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন, তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সহজে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ড্রাইভারের ডাকে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসি। ভাড়া দিতে দিতে একটি সত্য কথা মনে পড়ে—গত দেড় বছরে কৃষক ছাড়া এ দেশের প্রায় সব শ্রেণি–পেশার মানুষ যমুনা বা শাহবাগে তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেছেন। কৃষকেরা যেন আধুনিক মানুষের চেয়ে ভিন্ন এক বাস্তবতার নাগরিক।
*লেখক: রূপক
মিরপুর, ঢাকা।