নির্বাচনী কড়চা-৩

ফাইল ছবি

অনেক দ্বিধা আর ভয় নিয়ে আজ মোহাম্মদপুরে এসেছি। বাইকে করে এসে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে নেমেছি। তারপর মোহাম্মদপুরের দিকে হাঁটা দিই। সত্যি কথা বলতে কি, এদিকে এলেই কেন যেন গা ছমছম করে। এখানে চুরি-ছিনতাই নৈমিত্তিক ব্যাপার। তা ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলার সবচেয়ে বেশি অবনতি হওয়া এলাকার মধ্যে মোহাম্মদপুর অন্যতম। আমি সাবধানে সামনে আগাই। একটা সেনাবাহিনীর টহলগাড়ি সামনে দিয়ে ছুটে যায়—কিছুটা আশ্বস্ত হই, কিন্তু ভয় কাটে না। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিই, না—আমাকে ফলো করার কেউ নেই।

আমি একটা রিকশা নিয়ে বালুর মাঠের সামনে আসি। ফুটপাতে মানুষের ভিড়, চারপাশ পোস্টার–ব্যানারে ভরা। হঠাৎ কানে মিছিলের শব্দ আসে। হ্যাঁ, একটা ছোট্ট মিছিল এদিকে আসছে। সামনের সারিতে কয়েকজন নেতা গোছের, কিন্তু পেছনেরগুলো কিশোর। ওদের স্লোগানের সঙ্গে হাসাহাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে—এরা চেঁচামেচি করে মজা পাচ্ছে। পোলাপান অনেক দুষ্টু!

আমি হাঁটতে হাঁটতে পপুলার হাসপাতালের দিকে যাই। আমার এক জুনিয়র এই হাসপাতালে চাকরি করে। ভেতরে ঢুকেই থমকে যেতে হয়। আউটডোরে উপচে পড়া ভিড়—শত শত মানুষ, সবার চোখেমুখে একই রকম উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ। এখানে কেউ ভোটের কথা ভাবছে না, ভাবছে শুধু বাঁচার কথা।

রিকশা থেকে নেমে রেসিডেনশিয়াল স্কুলের দিকে হনহনিয়ে হাঁটতে থাকি। হঠাৎ রাস্তায় চার-পাঁচজন নারীর সঙ্গে একটা লোকের কথা-কাটাকাটি নজরে আসে। মনে হয়, মওকা মিলে গেছে। আমি খানিকটা দূরে এক ভ্রাম্যমাণ চা-বিক্রেতাকে থামিয়ে এক কাপ চা দিতে বলি। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঝগড়াটা শুনি। ব্যাপারটা অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ—তথাপি নির্বাচনের সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি। তারপর আসল কাহিনি বুঝতে পারি। মিছিলের কিংবা ভোট চাওয়ার জন্য জনা পাঁচেক নারীকে নিয়ে এসেছিল এই লোক—সম্ভবত মাথাপিছু দুই শ টাকা। কিন্তু আরেকজন লোক তাদের নিয়ে যায় মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে। এই ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়েই ঝামেলা চলছে। নিজের অজান্তেই আফসোস আসে—আহারে, মিছিলেও ভেজাল! দুই নম্বরি!

আমি কোনদিকে যাব, কার সঙ্গে কথা বলব—বুঝে উঠতে পারি না। হঠাৎ ফ্লাস্ক হাতে এক চা-বিক্রেতার দিকে চোখ যায়। সে অনেকটা দূরে চলে গেছে; প্রায় দৌড়ে তাকে ধরে ফেলি। বয়স পঞ্চাশের বেশি—কম হবে না। হাতে বিস্কুটের প্যাকেট, সঙ্গে পান আর ধূমপানের সামগ্রী। তাকে রাস্তার পাশে থামাই দু-একটা কথা বলার জন্য। প্রথমে সে রাজি হয় না—ইউটিউবার মনে করে। তারপর একটু কথা বলার চেষ্টা করি। খিটখিটে মেজাজের বিক্রেতা বলে, ‘এই আসনে কে জিতবে, কেউ কইবার পারবে না। তবে ভোটের দিন অনেক গন্ডগোল হইবার পারে।’

চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঝগড়াটা শুনি। ব্যাপারটা নিম্নমানের কাজ—তথাপি নির্বাচনের সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি। তারপর আসল কাহিনি বুঝতে পারি। মিছিলের কিংবা ভোট চাওয়ার জন্য জনা পাঁচেক নারীকে নিয়ে এসেছিল এই লোক—সম্ভবত মাথাপিছু দুই শ টাকা। কিন্তু আরেকজন লোক তাদের নিয়ে যায় মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে। এই ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়েই ঝামেলা চলছে। নিজের অজান্তেই আফসোস আসে—আহারে, মিছিলেও ভেজাল! দুই নম্বরি!

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটা অটোরিকশা নিয়ে ধানমন্ডির দিকে রওনা দিই। অন্যসব জায়গার মতো এখানকার অলিগলিতেও নির্বাচনী আমেজ। প্রার্থীদের বড় বড় পোস্টারের ওপর দিয়ে উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি দেখতে উৎকট লাগে। সন্ধ্যার পরেও লেকের পাড়ে বিভিন্ন বয়সের অনেক মানুষ। বাহারি প্রচার প্রচারণা দেখতে দেখতে আবাহনীর মাঠের সামনে চলে এসেছি। রিকশা থেকে নেমেই মাঠের চারদিকে তাকাই। লোহার রেলিংয়ে ঝুলছে ব্যানার-পোস্টার। একটু সামনে যেতেই দেখি, কয়েকজন যুবক একটা রিকশার সঙ্গে কিছু একটা বেঁধে দিচ্ছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারি—একটা দলের প্রতীক রিকশার সঙ্গে বেঁধে দিচ্ছে!

আমি হাঁটতে হাঁটতে পপুলার হাসপাতালের দিকে যাই। আমার এক জুনিয়র এই হাসপাতালে চাকরি করে। ভেতরে ঢুকেই থমকে যেতে হয়। আউটডোরে উপচে পড়া ভিড়—শত শত মানুষ, সবার চোখেমুখে একই রকম উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার ছাপ। এখানে কেউ ভোটের কথা ভাবছে না, ভাবছে শুধু বাঁচার কথা।

আরও পড়ুন

শারীরিক অসুস্থতা একটি পরিবারের গোটা কাঠামোকে নড়বড়ে করে দেয়। যখন নিজের জীবনে এমন এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন রাষ্ট্র, সরকার কিংবা রাজনীতি—সবকিছুই মূল্যহীন হয়ে যায়। তখন মানুষ শুধু মানুষই থাকে, নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকে না। এই হাসপাতালে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যেখানে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত, সেখানে কোনো উৎসবই পূর্ণতা পায় না। চারপাশে নির্বাচনের ব্যানার, পোস্টার আর স্লোগানের ভিড়—তার মাঝেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। নির্বাচনকে ছাপিয়ে সেই নির্মম বাস্তবতা আমাকে ধীরে ধীরে উদাস করে দেয়।

আরও পড়ুন
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]