নির্বাচনী কড়চা-২
আমার আজকের গন্তব্য কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁওয়ের দিকে। মেট্রোতে চড়ে কাজীপাড়ায় নেমে যাই। তারপর হাঁটতে শুরু করি। আমার উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের হাওয়া সাধারণ মানুষের মনে ঠিক কীভাবে দোলা দিচ্ছে, তা কাছ থেকে দেখা।
কাজীপাড়ায় কথা হয় ফুটপাতের এক ফলের দোকানদারের সঙ্গে। নেড়েচেড়ে ফল দেখি আর কথা বাড়ানোর চেষ্টা করি। এতে কাজ হয়। লোকটার জানাশোনা বেশ গভীর, চিন্তাধারা বাস্তবমুখী। সে অনেকটা মজার ছলেই যা বলল, তার সারমর্ম হলো—কাজ না করে যদি মিছিল-মিটিংই জীবিকার মাধ্যম হয়, তাহলে সেখানে দুর্নীতির প্রকোপ কোনোভাবেই কমবে না। কাজ না করে যদি স্লোগান দিয়ে, মিছিল-মিটিং করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বা তালগাছ হয়, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কাজ না করে যদি সংসার চলে, তাহলে হয় তার বাবার তালুক আছে, নয়তো সে দুই নম্বরি করে। তার কথা খণ্ডন করার মতো যথেষ্ট যুক্তি আমার মাথায় আসে না। আমাদের কথোপকথনে আরও দুজন যোগ দেয়। আমি এক কেজি আপেল কিনে ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে শেওড়াপাড়ার দিকে হাঁটা শুরু করি।
পড়ন্ত বিকেলে মানুষের ঘরে ফেরার তাড়া বেশ নজর কাড়ে। বাস, মেট্রোরেল বা অন্য কোনো বাহন থেকে নেমে প্রয়োজনীয় কিছু কিনেই মানুষ বাসার দিকে ছুটছে। এসবের মধ্যেও নির্বাচনী আমেজ ভালোভাবে চোখে পড়ে। রিকশায় মাইক লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী গান গেয়ে প্রচার চলছে। সেই গানের পরতে পরতে রয়েছে প্রার্থী ও দলের প্রশংসা। ফুটপাতের দোকানদারেরা প্রার্থী ও প্রতীক নিয়ে একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করছে, তর্কাতর্কি করছে। মনে হয়, নির্বাচন এই শহরের দৈনন্দিন জীবনে একধরনের বিনোদনের রসদও জুগিয়েছে। শেওড়াপাড়ার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট নির্বাচনী অফিসঘর। শামিয়ানা টানানো এসব ঘরের ভেতরে কয়েকটি চেয়ার, প্রার্থীর পোস্টার, আর দু-তিনজন লোক বসে বসে আপনমনে ধোঁয়া ছাড়ছে। একটি শিঙাড়া–পুরির দোকানের চারপাশে অল্প বয়সী ছেলেদের জটলা। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করি। যারা এখানে দাঁড়িয়ে শিঙাড়া-পুরি খাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই ভোটার নয়। হয়তো কোনো স্থানীয় নেতার সৌজন্যে খাওয়াদাওয়া—এতেই আপাত খুশি।
জ্যামে বসে থেকে আরেকটি অবাক করা বিষয় লক্ষ করি। কয়েকজন লোক দোকান থেকে দোকানে ঘুরে ঘুরে ভোট চাইছে আর দুজন লোক ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে মুঠোফোনে তাদের ভিডিও করছে। এদের উদ্দেশ্য কী, বুঝতে পারি না। হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের জন্য কনটেন্ট বানাচ্ছে, অথবা ভবিষ্যতের কোনো রাজনৈতিক প্রমাণ—তা স্পষ্ট নয়।
ছোট ছোট, গিজগিজ করা এসব অস্থায়ী নির্বাচনী অফিস আমার নজর কাড়ে। আগেও এসব অফিস তৈরি হতো, তবে এবার সংখ্যাটা বেশি। এসব অফিসের মাধ্যমে নিজ নিজ রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষ থেকে কিছু বরাদ্দ আসে, নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা এখানে একত্র হয়। তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনী মিছিলের উৎপত্তিও এসব অফিস থেকেই। পাশাপাশি এগুলো নির্বাচনকালীন একটি ক্ষুদ্র অর্থনীতিও তৈরি করে—কিছু তরুণ এখানে জড়িয়ে পড়ে হাতখরচের আশায়।
আমি একটি রিকশা নিয়ে আগারগাঁওয়ের দিকে রওনা দিই। চিপা গলি ভেদ করে ধীরে ধীরে রিকশা এগোতে থাকে। নির্বাচন নিয়ে কথা বলতেই রিকশাওয়ালা তার অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করে বলতে থাকে বিগত নির্বাচনের কথা। আমি শুনি আর ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করি। রাস্তার ওপর টানানো রয়েছে প্রার্থীদের প্রতীকসংবলিত পোস্টার। সিনথেটিক পলিমারের ওপর একসঙ্গে কয়েকটি পোস্টার সাঁটানো। দেয়ালে দেয়ালে আধা ছেঁড়া রঙিন পোস্টারের ওপর অল্প কিছু সাদাকালো পোস্টার। আশ্চর্যের বিষয়, কাগজের পোস্টারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। রিকশাওয়ালা মামার নির্বাচনী বয়ান বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। কথার টানে বুঝতে পারি, সে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ। নির্বাচন ও নতুন সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা অনেক। মনে হয় সে একজন আশাবাদী মানুষ।
আগারগাঁও! সরকারি অফিসপল্লির প্রশস্ত রাস্তায় নেমে পড়ি। এখানকার ফুটপাতগুলোতে সন্ধ্যায় বেশ আড্ডা জমে। অফিস শেষে সমমনা সহকর্মী, ব্যাচেলর কিংবা বন্ধুবান্ধব মিলে এখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে দেয়। কাজের চাপ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বাসায় ফেরে। বাইরের লোকজনও এখানে আসে। মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেটদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আমারও এখানে আসা হয়।
জ্যামে বসে থেকে আরেকটি অবাক করা বিষয় লক্ষ করি। কয়েকজন লোক দোকান থেকে দোকানে ঘুরে ঘুরে ভোট চাইছে আর দুজন লোক ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে মুঠোফোনে তাদের ভিডিও করছে। এদের উদ্দেশ্য কী, বুঝতে পারি না। হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের জন্য কনটেন্ট বানাচ্ছে, অথবা ভবিষ্যতের কোনো রাজনৈতিক প্রমাণ—তা স্পষ্ট নয়।
অবশেষে আগারগাঁও! সরকারি অফিসপল্লির প্রশস্ত রাস্তায় এসে রিকশা থেকে নেমে পড়ি। এখানকার ফুটপাতগুলোতে সন্ধ্যায় বেশ আড্ডা জমে। অফিস শেষে সমমনা সহকর্মী, ব্যাচেলর কিংবা বন্ধুবান্ধব মিলে এখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে দেয়। কাজের চাপ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বাসায় ফেরে। বাইরের লোকজনও এখানে আসে। মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেটদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আমারও এখানে আসা হয়।
আজ এসেছি একা—এখনকার আড্ডাবাজির টপিক জানার জন্য। কোথাও মাটির কাপে চা, কোথাও ফুচকা—সব মিলিয়ে জমে উঠেছে সন্ধ্যার আড্ডা। একদিকে বিক্রেতাদের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, অন্যদিকে ক্রেতাদের তাড়াহুড়া। কিছুদিন আগেও সবাই কথার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দিত। এখন কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়ে। মোবাইল স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে শুরু হয়েছে কথার লড়াই! কেউ কেউ নির্বাচনী ট্রল দেখে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে। নতুন পে–স্কেল আর কে সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে তুমুল তর্ক চলছে। নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না—এ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। সবাই যে নির্বাচন নিয়েই কথা বলছে, তা নয়; তবে অধিকাংশ মানুষের আলোচনার বিষয় একটাই—নির্বাচন। খাবার পরিবেশন করা ছেলেগুলোও নিজেদের মধ্যে ভোট নিয়ে কথা বলছে, নিজেদের এলাকার প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রল করছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো—মানুষের মুখে ভয়ের ছাপ নেই। কেউ কথা বলার আগে চারপাশ তাকিয়ে দেখছে না, ফিসফিস করে কথা বলছে না।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি ঝালমুড়ি খেতে খেতে হাঁটছি আর এসব দেখছি। মাঘের শেষ প্রহরের হালকা শীত ঝালমুড়ির স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেট্রোরেলের ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে শুক্লপক্ষের চাঁদ। শীতের সঙ্গে বইছে হালকা বাতাস। হঠাৎ তিন-চারজন ছেলের তর্ক কানে আসে। একজন বলার চেষ্টা করছে—সব দোষ ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনের। সে প্যারোডি করে বলছে, ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন দেখলেই নেতারা বেহুঁশ হয়ে যায়, তাদের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। তাদের যুক্তি আমার মনেও ধরে। আসলেই তো—যে যত বেশি ক্যামেরার সামনে আসে, সে তত বেশি বেফাঁস কথা বলে। উদাহরণ হিসেবে বিগত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কথাই বলা যায়। তাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনের সামনে এসেছেন আর সবচেয়ে বেশি বেফাঁস কথাও বলেছেন। এসব ভাবতে ভাবতে হাসি পায়।
ঘড়িতে রাত সাড়ে নয়টা ছুঁই ছুঁই। আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে হাঁটি। শহর তখনো কথা বলছে—নির্বাচন নিয়ে, প্রত্যাশা নিয়ে আর বদলের আশায়।