নির্বাচনী কড়চা–৪
আজ আমি এসেছি সিরাজগঞ্জে, সরেজমিনে আমার নিজের নির্বাচনী এলাকার অবস্থা দেখতে। সত্যি বলতে কী, এখানে নির্বাচনের ডামাডোল ঢাকার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়, কোনো কোনো জায়গায় ঢের বেশি! মানুষ কাজ ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্বাচন বিশ্লেষণ করছেন। বাজার, অফিস ও চায়ের দোকানের পাশাপাশি কোনো কোনো বাড়ির দেউড়িতে নির্বাচনের আলোচনা হচ্ছে এবং সেগুলোয় নারী ভোটারদের সরব উপস্থিতি নজরকাড়া।
আমি গ্রামের ভেতর থেকে শহরের দিকে যাচ্ছি। এখানে রিকশা একেবারেই অনুপস্থিত। মফস্সলের কাঁচা–পাকা রাস্তায় চলাচলের প্রধান বাহন ব্যাটারিচালিত ভ্যান। এসব বাহন চার থেকে আটজন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করতে পারে। নারী–পুরুষ সবাই মিলে শেয়ারিং করে বসে নিজ নিজ গন্তব্যে যায়। অনেক মানুষ একসঙ্গে চলাচলের কারণে ভ্যানগুলো যেন একেকটা ভ্রাম্যমাণ নির্বাচনী আলোচনা সভা। আমি ২০ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব বিভিন্ন ভ্যানে বসে মানুষের কথা শুনেছি। যাত্রী ওঠানামা করে, কিন্তু আলোচনার বিষয় পরিবর্তন হয় না। তাঁদের কথা অনুযায়ী, নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবং কে ক্ষমতায় আসবে, তা ভোটের আগে বলা যাবে না। অনেকে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথাও অকপটে বলেছেন।
বোরকা পরে ভ্যানে উঠেছেন এক নারী যাত্রী। হাতে সবজিভর্তি ব্যাগ। কথা শুনে মনে হলো, কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাজা সবজি নিয়ে যাচ্ছেন। আমি কোনো রকম ভণিতা ছাড়া সরাসরি বলি, ‘আপা, ভোট দেবেন কাকে?’ আমার কথা শুনে তাঁর মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলাম না। হয়তো এ ধরনের প্রশ্ন শুনতে শুনতে তিনি অভ্যস্ত। ‘দিনে কয়েকবার করে ভোট চাইতে আসে, তবে কাউকে বলিনি, ভোট কাকে দেব,’ তাঁর সাবলীল উত্তর।
পাশে বসা আরেক লোক বলেন, ‘এবার নতুন সরকার দেখতে চাই!’ তারপর তিনি তাঁর যুক্তিগুলো পণ্ডিতের মতো গড়গড় করে বলতে থাকেন।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
কড্ডার মোড়ে এসে ভ্যান থেকে নেমে কিছু সময় দাঁড়িয়ে লোকজনের ব্যস্ততা দেখি। এখানে রেলস্টেশন আছে, বাংলাদেশের সব জায়গায় যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। লোকজনের কমতি নেই। পোস্টার–ব্যানারে ভরপুর চারপাশ। কাগজের পোস্টার চোখে পড়ে না, সব কাপড়ের পোস্টার ঝুলছে। একপাশে আর্মির দুটি টহল গাড়ি দেখা যায়। দুই সৈনিক একটি দোকান থেকে সবজি কিনছেন।
আমার পরিচিত এক দোকানমালিকের সঙ্গে দেখা করি। নাম ইয়াসিন, অনেক দিন পরে দেখা। কুশল বিনিময় শেষে তিনি চা অর্ডার করেন। আমি গল্প করার সুযোগ হাতছাড়া করিনি। প্রথমে আর্মির গাড়ি ও রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে চাই।
ইয়াসিন বলেন, ‘রাস্তাঘাটের অবস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো।’ নির্বাচন নিয়ে কিছু বলার আগেই তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘ভাই, ঢাকার কী অবস্থা? কার ফিল্ড ভালো?’ আমি আমতা–আমতা করে বলি, ‘ফিল্ড কার কেমন, সেটা তো বলতে পারব না, তবে মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রচুর। মানুষ মনে করছে, সত্যি সত্যিই তাদের ভোট মহামূল্যবান।’
আমি এলাকার নির্বাচনের খবর জানতে চাইলে ইয়াসিন সিরাজগঞ্জের সব কটি আসন নিয়ে সবিস্তার বলেন। ‘বেলকুচি ও উল্লাপাড়া আসন নিয়ে শঙ্কা আছে, বড় ধরনের ক্যাচাল হতে পারে। তবে আমাদের সদর আসন নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা নেই। ভাই, এখন ঘরে–বাইরে ও পথে–প্রান্তরে সবাই নির্বাচনের হালচাল নিয়ে ব্যস্ত। নির্বাচন ছাড়া কথা বলার আর কোনো টপিক নেই। তবে নির্বাচনের ডামাডোল চললেও আমার ব্যবসার অবস্থা খারাপ—বেচাকেনা নেই বললেই চলে।’ আমি চা শেষ করে ইয়াসিনকে ধন্যবাদ দিয়ে সদরের দিকে রওনা দিই।
শেয়ারিং করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে কড্ডা থেকে সদরের দিকে। আমি অটোরিকশার একটা আসনে বসতেই আরও চার যাত্রী অবশিষ্ট চারটি আসন দখল করেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি শাঁই শাঁই করে চলতে থাকে। আর আমি দেখি নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, অফিস ও বিচ্ছিন্ন গুচ্ছ গুচ্ছ মিছিল।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি শহর পর্যন্ত যেতে পারে না, পথেই নামতে হয়। কিছুক্ষণ হেঁটে সামনে দেখি, অনেক লম্বা একটা মিছিল। মিছিলের সবাই বোরকা–নেকাব পরিহিত নারী! বোরকা পরা নারীদের এত বড় মিছিল আগে কখনো দেখিনি।
আমি হাঁটতে হাঁটতে জামান কমপ্লেক্সের সামনে যাই বন্ধুবর রফিকের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা এক ক্যাম্পাসের। বিশ্ববিদ্যালয়–জীবন থেকেই দেশ, সরকার, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে আমরা তুমুল বিতর্ক করতাম। আজ এসেছি নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে।
আমরা রাস্তার পাশে একটা খোলা চায়ের দোকানে বসে কুশল বিনিময়ের পর নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে শুরু করি। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় রফিক পরিমিতভাবে কথা বলে। কারণ, আসন্ন নির্বাচনে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি নির্বাচনের পরিবেশ ও ভোটার উপস্থিতি কেমন হবে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই সে বলে, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো থাকলে ভোটারের উপস্থিতি সরকারের ধারণার চেয়ে বেশি হবে।’ তার মতে, এ মুহূর্তে এই এলাকার জনসাধারণের একমাত্র কৌতূহল হচ্ছে নির্বাচন।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক গল্প করি নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকার ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে। তারপর রওনা দিই পার্শ্ববর্তী উপজেলার দিকে। সেখানে নারীদের বিশাল ঝাড়ুমিছিল হচ্ছে, সেটা দেখব।
সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে একটা কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। সব ভোটকেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ফলাফল ঘোষণার সময় প্রচুর ক্যামেরা তাক করা থাকবে, ভিডিও–অডিও রেকর্ড থাকবে। এ রকম অকাট্য প্রমাণ থাকলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং অসম্ভব! তবু কেন কিছু মানুষ মনে করছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে? আমি মাথা চুলকাই আর ভাবি—এ রকম সময়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কীভাবে সম্ভব! কোনোভাবেই উত্তর মেলাতে পারি না।
*লেখক: রূপক, মিরপুর, ঢাকা।