নির্বাচনী কড়চা-১

চা–দোকানে নির্বাচনী আড্ডাপ্রথম আলো ফাইল ছবি

দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো বাংলাদেশ। মিছিল-মিটিংয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে কথার লড়াই। কোথাও কোথাও কথার সঙ্গে হাতাহাতি, চুলোচুলি, লাঠালাঠিও চলছে সমানতালে। আনাচকানাচ গড়ে উঠেছে খুপরির মতো ছোট ছোট নির্বাচনী অফিস। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতা–কর্মীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। প্রার্থীরা প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার পাশাপাশি দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কাজের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন, সবার কাছ থেকে দোয়া চাচ্ছেন। গ্রাম কিংবা শহরের অলিগলিতে গুচ্ছ গুচ্ছ মিছিল আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে পরিবেশ। দেশজুড়ে চলছে নির্বাচনের মহাউৎসব।

মিরপুরের পল্লবীতে আমার বাসা। এটি ঢাকা-১৬ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। এখানকার নির্বাচনী উৎসব সরেজমিন দেখতে সন্ধ্যার পর রিকশা নিয়ে ঘুরতে বের হই। মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১০ নম্বর, স্টেডিয়ামের আশপাশের ফুটপাত, ফুসকার দোকান, ভ্যান মার্কেট—এই সবই আমার গন্তব্য। কৌতূহলী মন জানতে চায়, মানুষ আসলে কী চাচ্ছে, কেমন চাচ্ছে, কাকে চাচ্ছে। আবার যেহেতু আমি সাংবাদিক নই, তারপরও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সহজেই সাবলীলভাবে গল্প জুড়ে দিতে পারি।

রিকশা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সর্বজনীন বাহন। সে জন্য রিকশাওয়ালাদের কাছে দেশের হালচিত্র থাকে। যেহেতু তাঁরা বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাই যেকোনো জাতীয় বিষয়ে তাঁদের মতামত আমার কাছে বেশ বাস্তবসম্মত মনে হয়। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়, এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডির লড়াই হবে। অনেকেই আবার মিছিলে গিয়ে বাড়তি কিছু আয়ের ধান্দাও করেন।

চায়ের দোকান তো এখন রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ। একে জনসাধারণের রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয় বললেও কম বলা হবে না। গ্রুপে গ্রুপে চা খেতে খেতে উগরে দিচ্ছে রাজনীতির অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। আমি চা খাওয়ার অসিলায় দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি। আপামর জনসাধারণের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারি-মানুষ চায় ভোটের মাধ্যমেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হোক। ভোটাররা যেন কোনো রকম জোরজবরদস্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ভোট দিতে পারেন।

নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে ভোট গ্রহণের কাজে নিয়োজিত প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মুখ বন্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। ফরিদপুর জিলা স্কুল, ৩০ জানুয়ারি
ছবি: আলীমুজ্জামান

মিরপুর ১০–এ হকারদের হাঁকডাক গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। তাঁরাও আমার কৌতূহলের অংশ। দু-একটা জিনিস কিনে তাঁদের সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করি, কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারি না। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করেন, নির্বাচন হবে না। তাঁদের কথার সারমর্ম হলো, নতুন সরকার যেন তাঁদের উচ্ছেদ না করে, সরকারি দলের লোকজন যেন চাঁদা আদায়ের হার বাড়িয়ে না দেয়। এভাবেই তাঁরা পরম্পরায় রাস্তা দখল করে ব্যবসা করতে চান।

স্টেডিয়ামের সামনে লাভ রোডে তরুণ-তরুণীদের পদচারণে সব সময়ই মুখর থাকে। সন্ধ্যার দিকে উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়। আমার ধারণা, রোমান্টিক প্রেমের আলাপে নির্বাচনের উপস্থিতি আছে। এমন রসিক জায়গায় এসে না পারি ওদের দিকে সরাসরি তাকাতে, আবার না পারি কিছু জিজ্ঞেস করতে। তবু রাস্তার পাশে খাবার কেনার অসিলায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি-নির্বাচন নিয়ে ওদের ভাবনা কী, নির্বাচনের জোয়ার ওদের কতটা স্পর্শ করেছে, তা বোঝার চেষ্টা করি। আমার ধারণা, একেবারে অমূলক নয়। কপোত-কপোতির প্রেমের মাঝেও ঢুকে পড়েছে নির্বাচনের বেপরোয়া উৎসব। খাবার হাতে পাওয়ার আগপর্যন্ত ওদের কথা শুনে আন্দাজ করি, ওরা এখনো দ্বিধান্বিত, তবে ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

দুয়ারীপাড়া বাজার। রাস্তার পাশে ভ্যানের ওপর থরে থরে সাজানো শীতের টাটকা সবজি। পাকা টমেটো বেছে ব্যাগে তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করি, ‘মামা, ভোট দেবেন না?’ আমার কথা শেষ হতে না হতেই ত্বরিত উত্তর আসে, ‘দিতে তো হইবই! দ্যাশ থাইকা বাস পাঠাইয়া দিবো। বাসের ভাড়া দেওন লাগবো না। আমরা সগলে মিল্লা দেশে যাইয়া ভোট দিমু।’

তার মুখে একপশলা হাসি।  

আমি আবার প্রশ্ন করি, ‘মামা, নির্বাচনের পরে মাগনা ফেরার কোনো ব্যবস্থা আছে?’ আমার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। আমি আর কথা বাড়াই না। টমেটোর দাম দিয়ে রিকশায় চড়ি বাসায় ফেরার জন্য। রিকশাওয়ালার সঙ্গে যথারীতি নির্বাচনের আলাপ জুড়ে দিই। জর্দা দেওয়া পান চিবোতে চিবোতে সে বলে, ‘এবারের নির্বাচনে খেলা হবে, মামা-খেলা হবে!’

  • লেখক: রূপক, মিরপুর, ঢাকা।