১.
ফেরিটা এসে লিবার্টি আইল্যান্ডকে স্পর্শ করতেই কেমন একটা উত্তেজনা বোধ হয়। ছোট্ট একটা দ্বীপের বুকের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকৃতির এই মূর্তিটা সহস্র বছরের কত না ইতিহাস, আবেগ আর সংগ্রামকে ধারণ করে আছে। আর একটু পরেই আমরা এর শরীর ছুঁয়ে দেব।
নিউইয়র্কের আকাশটা কি আজ একটু বেশি ঝকঝকে হয়ে উঠেছে! হাডসন নদীর পানির বুকে রোদ্রের আলোর ছটা, আকাশের গাঢ় নীল রং যেন উপচে এসে হাডসনের জলরাশিকেও নীলাভ করেছে। দূরে ম্যানহাটনের আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত সারি সারি অট্টালিকা।
দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে আমরা লিবার্টি আইল্যান্ডে এসে পা রাখি। আমাদের ঠিক চোখের সামনে ছুঁয়ে দেওয়ার দূরত্বে সহস্র বছরের ইতিহাস হয়ে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত, গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য স্ট্যাচু অব লিবার্টি। আমরা নদী আর স্ট্যাচুটাকে দুই পাশে রেখে হাঁটতে থাকি, দাঁড়াতে থাকি, দেখতে থাকি।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখব? নাকি হাডসন নদীর বুকে ছোট্ট এই দ্বীপে দাঁড়িয়ে চারপাশের জলরাশি, আকাশ আর দূরের অট্টালিকার শহরের যে অপরূপ সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখব—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। ১৩ একরের মতো জায়গার ছোট্ট এই দ্বীপটা যেন রূপকথার কোনো কল্পরাজ্যের মতো মনে হতে থাকে।
২.
একেবারে সাদামাটা ভাষায় যদি ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টির’ বর্ণনা দিই, তা হলে বলতে হয়, ঢিলেঢালা জামা পরা এক নারীমূর্তি, যার মাথায় পরা আছে সুচালু সাত কাঁটার এক মুকুট। নারীটির বাঁ হাতে একটি ট্যাবলেট, যেখানে মুদ্রিত আছে একটি তারিখ—৪ জুলাই, ১৯৭৬। এটি হচ্ছে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। ডান হাত উঁচিয়ে ধারা আছে প্রজ্বলিত একটি মশালের মতো টর্চ। আর নারীমূর্তিটির পায়ে কাছে পড়ে আছে ছেঁড়া এক শিকল। এই যে কটি জিনিসের উল্লেখ করলাম—এর প্রতিটিরই আছে একেকটি ইতিহাস, আছে একটি অর্থ এবং বার্তা। নারীমূর্তির মাথায় যে সাতটি কাঁটা, সেটি হচ্ছে সাতটি মহাদেশ। লিবার্টি—স্বাধীনতার বার্তা যে সাতটি মহাদেশেই পৌঁছে গেছে, তারই বার্তা এই কাঁটার রশ্মি দিয়ে নির্দেশ করা হয়েছে। বাঁ হাতে থাকা ফলক বা ট্যাবলেট, যেখানে আমেরিকার স্বাধীনতার তারিখ খোদিত আছে—সেটি হচ্ছে আমেরিকার স্বাধীনতার ইতিহাস এবং ঘোষণার স্বীকৃতি। ডান হাতে ধরে রাখা জ্বলন্ত মশালটিকে ভাবা হয় স্বাধীনতার পথ দেখানোর প্রতীক। আর পায়ের কাছে পড়ে থাকা ছেঁড়া শিকলটি হচ্ছে দাসপ্রথার বিলুপ্তি এবং অত্যাচার থেকে মুক্তির প্রতীক। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং বন্ধুত্বের সর্বজনীন প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি।
এখানে এই মূর্তিটা বানাল কীভাবে? মানে বসাল কীভাবে? শুনেছি, অন্য জায়গা থেকে জাহাজে করে এনে এখানে বসানো হয়েছে—সেরীন মন্তব্য করে।
বারথোল্ডি যখন স্ট্যাচুটা তৈরিতে হাত দেন, তখনো কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন না, এর খরচের জোগান কোত্থেকে আসবে, মার্কিন সরকার এটি এখানে বসাতে দেবে কি না।
বারথোল্ডি যখন স্ট্যাচুটা বানানোয় হাত দেন, তখনো কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন না, এর খরচের জোগান কোত্থেকে আসবে, মার্কিন সরকার এটি এখানে বসাতে দেবে কি না। সেই যে ফরাসি ইতিহাসবিদ এদুয়ার দে লাবুল’র প্রত্যায়নপত্র আর তাঁর চেনাজান বন্ধুদের তালিকা নিয়ে তিনি নিউইয়র্কে এসে নেমেছিলেন। এর পর থেকে তো তাঁর সংগ্রামই চলেছে কেবল। আমেরিকার সুধীসমাজকে তাদের কাজের পক্ষে দাঁড় করানো, তহবিল সংগ্রহ, সরকারের অনুমোদন—কত কাজ তার।
নিউইয়র্কে শুরতেই তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। রাজনীতিক কিংবা সুশীল সমাজ—কেউই তেমন একটা আগ্রহ দেখাননি। তহবিল সংগ্রহ তো আরও দুরূহ হয়ে পরে। বারথোল্ডি তখন সফরে বেরিয়ে পরেন, আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে কথা বলতে থাকেন। তখন আবার নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়—নিউইয়র্কে এমন একটা স্ট্যাচু যদি তৈরিও হয়, তা হলে তাদের মানে, নিউইয়র্কের বাইরের জনপদের মানুষের কী লাভ তাতে! বারথোল্ডি হতাশ হননি। তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, আবার প্যারিসে ফিরে গেছেন; আমেরিকায়, ফ্রান্সে হন্যে হয়ে তহবিল সংগ্রহে ঘুরে বেড়িয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অবশ্য স্ট্যাচুর কাজও শুরু করে দেন। প্রথম কাজ তিনি যে আদলে স্ট্যাচুটা বানাতে চান, তার ছবি এঁকে ফেলা। এরপর সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
সেরীনের কথাই ঠিক। মূল মূর্তিটা তৈরি হয়েছে প্যারিসে। বারথোল্ডি তাঁর রূপকল্পটা তৈরি করেছেন। ফ্রান্সের গুস্টাভে আইফেল নামের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান স্ট্যাচুর অভ্যন্তরীণ কাঠামোটা তৈরি করে। এরপর সেটি আলাদা কাঠের কার্টনে ভরে ফরাসি নৌবাহিনীর জাহাজে করে আনা হয়েছে নিউইয়র্কে। আর স্ট্যাচু অব লিবার্টির পাদদেশের যে স্তম্ভটি সেটি তৈরি হয়েছে এই দ্বীপে। প্যারিস নির্মিত মূল স্ট্যাচুটিকে ৩১৫ খণ্ডে আলাদা করে ২১৪টি কাঠের কার্টনে ভরে নিয়ে আসা হয় নিউইয়র্কের এই দ্বীপে। এখানে এনে পুরোটা সংযোজন করা হয়। পরিকল্পনা থেকে সংযোজন পর্যন্ত—মানে পরিপূর্ণ এই স্ট্যাচুটি তৈরি করতে সময় লেগেছে পনেরো বছরের মতো।
বারথোল্ডি যখন ফ্রান্সে বসে মূল স্ট্যাচু বাাননো নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক একই সময়ে নিউইয়র্কের এই দ্বীপে তৈরি হয়েছে এর স্তম্ভটি। বলা চলে, প্রায় সমান্তরালভাবেই স্ট্যাচু আর পাদদেশের স্তম্ভ নির্মাণের কাজ এগিয়ে গেছে। ২৭ হাজার টন কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাদদেশের এই স্তম্ভটি—যার ওপর ১৫১ ফুট দীর্ঘ, ২২৫ টন ওজনের তামা আর লোহার তৈরি মূর্তিটিকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৩০৬ ফুটে। অনেকেই বলে থাকেন, তৈরির পর পর পুরো স্ট্যাচুটি ছিল তামার উজ্জ্বল রঙের। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই রং বদলে গিয়ে সবুজাভ রূপ ধারণ করেছে। নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে বলে কি এই রূপান্তর? হতে পারে!
স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যে নারী মূর্তিটির অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছে, এই নারীটি কে—এ নিয়েও নানা জল্পনা আছে। অনেকেই বলে থাকেন, এটি আসলে তাঁর মায়ের চেহারা।
৩.
দর্শনার্থীরা দ্বীপটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। পাশেই একটা মিউজিয়াম, যেখানে এই স্ট্যাচু নির্মাণের সুদীর্ঘ সংগ্রাম আর আবেগের ইতিহাস অত্যন্ত যত্ন করে সন্নিবেশিত আছে। পাদদেশের যে স্তম্ভটা, তার ভেতরে ঢুকে অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দর্শনার্থীদের কেবল যে পাদদেশের স্তম্ভটার ভেতরেই ঢুকতে দেওয়া হয় তা নয়, স্ট্যাচুর নারীমূর্তির মাথায় যে মুকুটটা আছে, সেখান পর্যন্ত দর্শনার্থীরা যেতে পারেন। তবে তার জন্য বাড়তি নিয়মাবলি অনুসরণ করতে হয়। একসময় অবশ্য একেবারে শীর্ষে নারীমূর্তিটির যে টর্চটা আছে, সে পর্যন্ত যাওয়া যেত। ১৯১৬ সালে বিস্ফোরণের ঘটনার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন অবশ্য নারীমূর্তির মাথার মুকুট পর্যন্ত দর্শকদের যেতে দেওয়া হয়।
মুকুট পর্যন্ত যেতে হলে অবশ্য বাড়তি কিছু ঝক্কি পোহানোর ব্যাপার আছে। প্রথমত. তার জন্য বাড়তি টিকিট কাটতে হয়, সেই টিকিট আবার দিনে দিনে পাওয়া যায় না। আগাম বুকিং দিয়ে রাখতে হয়। আর যাঁরা টিকেট পান, তাঁদের বাড়তি নিরাপত্তাতল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হয়।
এখানেই শেষ নয়, মুকুট পর্যন্ত যাওয়াটা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার। সেখানে যাওয়ার কোনো এলিভেটর নেই, হেঁটে হেঁটে সিঁড়ি ভেঙে যেতে হয়। পুরোটা হেঁটে মুকুট পর্যন্ত পৌঁছা মানে হচ্ছে ২৭ তলার সিঁড়ি ভাঁঙা। তার ওপর পথটার উল্লেখযোগ্য অংশ অত্যন্ত সংকীর্ণ। ভ্যাপসা গরমের ভেতর দিয়ে এতটা পথ হেঁটে হেটে যাওয়া সহজ কথা নয়। এর ওপর সেখানে কোনো ওয়াশরুম নেই। শারীরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী এবং সক্ষম না হলে এই চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রার শামিল না হওয়াই ভালো। বলাই বাহুল্য, আমরা এই ঝুঁকি নিতে যাইনি।
৪.
স্ট্যাচুটার নাম ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ হলে কেন? এই প্রশ্নটা যে কারও মনেই জাগা স্বাভাবিক। যেহেতু এই স্ট্যাচুটা বানানোই হয়েছে ফরাসি জনগণের বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে আমেরিকাকে উপহার দেওয়ার জন্য, এর অন্য কোনো নামও তো পারত। হতে পারত হয়তো। কিন্তু ফরাসি যে ইতিহাসবিদের মাথায় উপহারের চিন্তাটি এসেছিল, তাঁর মাথায় কেবল বন্ধুত্বই ছিল না, তাঁর চিন্তায় ছিল স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, উদারনৈতিক ব্যবস্থার মতো ধ্যানধারণা। সেই সময় আমেরিকা যেহেতু ‘লিবার্টি’র লড়াইয়ে মাত্র জিতল, ফ্রান্সেও একরকমের ‘লিবার্টি’র লড়াই চলছে—ফলে তারা ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ নামকেই বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাষায় অবশ্য এর প্রথম নাম করা হয়েছিলো, ‘La Libertéclairant le monde’, যার বাংলা অর্থ ‘বিশ্বকে আলোকিত করা স্বাধীনতা’। ‘লিবার্টি’ নামটি এসেছে রোমান স্বাধীনতার দেবী লিবারতাস (Libertas) থেকে। মূর্তিটিতেও সেই ‘লিবার্টি’র স্পিরিটকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বারথোল্ডি লিবার্টির ধারণাটিকে তাঁর নিজের মতো করে সাজাতে চেয়েছেন বলে বিভিন্ন নথিপত্রে উল্লেখ আছে।
স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে যে নারীমূর্তিটির অবয়ব ব্যবহার করা হয়েছে—এই নারীটি কে; এ নিয়েও নানা জল্পনা আছে। অনেকেই বলে থাকেন, এটি আসলে তাঁর মায়ের চেহারা। বারথোল্ডি মায়ের এতটাই ভক্ত ছিলেন যে মায়ের অমতে কোনো কাজ তিনি কখনো করেছেন, তার উদাহরণ নেই। কিন্তু এটি যে তাঁর মায়েরই চেহারা, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে গবেষণায় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও মত আছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
৫.
স্ট্যাচু অব লিবার্টির স্বপ্নদ্রষ্টা ফরাসি ইতিহাসবিদ এদুয়ার দে লাবুল আর রূপকার বারথোল্ডি—দুজনই ভেবেছিলেন যে আমেরিকার স্বাধীনতার শততম বার্ষিকীতে তাঁরা এই স্ট্যাচু উপহার হিসেবে দেবেন। ১৮৮৪ সালের ৪ জুলাই ফ্রান্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত লেভি মর্টনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি তুলে দেওয়া হয়। ফ্রেডরিক-অগাস্টে বারথোল্ডি নিজ হাতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেন এই স্ট্যাচু। সেখান থেকে আমেরিকায় এসে পৌঁছাতে বছর দুয়েক লেগে যায়। ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর নিউইয়র্কে উৎসর্গ করা হয়। সেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্ট্যাচু গ্রহণ করেন।
সেই থেকে আমেরিকা-ফ্রান্স বন্ধুত্বই কেবল নয়—সারা বিশ্বের গণতন্ত্র, স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।