রমজান মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র একটি মাস। এই মাসে মুসলমানরা সুবেহ সাদিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত রোজা রাখেন, বেশি বেশি ইবাদত করেন এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। তবে জাপান একটি অমুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানে রমজান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। কর্মক্ষেত্র, স্কুল বা সামাজিক পরিবেশে অনেক সময় মুসলমানদের রোজা রাখার বিষয়টি সহকর্মী বা পরিচিত ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা করতে হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে রোজা পালন কখনো কখনো চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো হালাল খাবারের প্রাপ্যতা। অতীতে জাপানে হালাল খাবার সংগ্রহ করা বেশ কঠিন ছিল, বিশেষ করে ছোট শহরগুলোতে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হয়েছে। টোকিও, ওসাকা, নাগোয়া, কোবে প্রভৃতি বড় শহরে এখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হালাল রেস্তোরাঁ, গ্রোসারি দোকান এবং ইসলামিক মার্কেট গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক হালাল খাদ্যপণ্যের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ফ্রোজেন হালাল মাছ, মাংস ও অন্যান্য পণ্য অনলাইনে সহজেই অর্ডার করা যায়। এমনকি বাংলাদেশের মসলা, সবজি, মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। সাধারণত প্রায় ১০ হাজার জাপানি ইয়েন বা তার কাছাকাছি মূল্যের অর্ডারে অনেক প্রতিষ্ঠান বাসায় ডেলিভারির সুবিধাও দিয়ে থাকে।
রমজান মাসে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা অনেকটা দেশের মতো করেই ইফতারের আয়োজন করেন। মুড়ি, ছোলা, বেসন, খেজুর ইত্যাদি কিনে বাসায় ইফতারি প্রস্তুত করা হয়। কর্মদিবসে মাগরিবের সময় সবাই একসঙ্গে ইফতার করা সব সময় সম্ভব হয় না, তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে অনেকেই বাসায় বা মসজিদে একত্রে ইফতার করেন। মসজিদে ইফতারটা একই সঙ্গে আনন্দের এবং ইবাদতের জন্য অত্যন্ত সুন্দর মাধ্যম।
রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তারাবিহর নামাজ। বড় শহরগুলোর মসজিদে প্রতিদিন তারাবিহর জামাত অনুষ্ঠিত হয় এবং মুসল্লিদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য থাকে।
বাংলাদেশিদের ইফতারের সাধারণ আইটেমগুলোর মধ্যে থাকে বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলা, বুট, মুড়ি, খেজুর, আপেল, কমলা ইত্যাদি। জাপানে আপেল, কমলা, কলা ও খেজুরের মতো ফল প্রায় সারা বছরই সহজলভ্য। অনেক মসজিদে ইফতারের জন্য বিরিয়ানি একটি সহজ ও জনপ্রিয় সমাধান হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান, ইন্দোনেশীয় বা মালয়েশিয়ান মুসলমানদের কাছেও বিরিয়ানি একটি পরিচিত খাবার হওয়ায় অনেক মসজিদের ইফতার আয়োজনে এটি দেখা যায়। জাপানের বিভিন্ন মসজিদে পবিত্র রমজানে প্রতিদিন ইফতারের আয়োজন করা হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা একত্র হন। এটি ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও আন্তসাংস্কৃতিক বন্ধনের এক সুন্দর উদাহরণ। রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তারাবিহর নামাজ। বড় শহরগুলোর মসজিদে প্রতিদিন তারাবিহর জামাত অনুষ্ঠিত হয় এবং মুসল্লিদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য থাকে।
জাপানে মুসলমানদের একটি বড় অংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত মুসলমানদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, তুরস্ক, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও জাপানে বসবাস করে। বর্তমানে জাপানে আনুমানিক ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজারের মতো মুসলমান বসবাস করে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছেন অথবা মুসলিম পরিবারে বিবাহসূত্রে যুক্ত হয়েছেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
জাপানে বর্তমানে ১৬০টির বেশি মসজিদ রয়েছে এবং এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। টোকিও, ওসাকা, নাগোয়া এবং অন্যান্য বড় শহরে বড় বড় মসজিদ রয়েছে, যেখানে শতাধিক মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। ঈদ বা জুমার নামাজের সময় অনেক মসজিদ পূর্ণ হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয়।
জাপানের কোবে শহরে অবস্থিত কোবে মুসলিম মসজিদ, যা ১৯৩৫ সালে নির্মিত, দেশটির সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ।
টোকিওর টোকিও ক্যাসি মসজিদ, ওসাকার ইবারাকি মসজিদসহ আরও অনেক মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ২০০ থেকে ১ হাজার ২০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় মসজিদের সংখ্যা এখনো কম। রমজান মাসে মসজিদগুলোতে আগত মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় এবং ইফতারসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন সাধারণত কমিউনিটির সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হয়।
আমার নিজের শহর ওসাকাতেও কয়েকটি মসজিদ রয়েছে। পাশের শহর কিয়োটোতে অবস্থিত কিয়াটো সেন্ট্রাল মসজিদ তুলনামূলকভাবে বড় একটি মসজিদ। এ ছাড়া ওসাকায় ওসাকা ইসলামিক সেন্টার রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ইসলামিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং মুসলিম কমিউনিটির ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া হয়।
রমজানকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশিরাই নন, বরং বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা এখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মিলিত হন। প্রবাসে থেকেও তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইসলামিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চার একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
জাপানি সমাজে ইসলাম এখনো তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত একটি ধর্ম। ভাষাগত বাধা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে অনেক জাপানি ইসলামের রীতিনীতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং মুসলিম পর্যটনের কারণে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি মুসলমানদের জন্য রমজান পালন কখনো কখনো চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি আসলে একধরনের আত্মিক ও সামাজিক বন্ধনের সময় হয়ে ওঠে। এ মাসে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, দাওয়াত, ইফতার আয়োজন এবং একে অপরের খোঁজখবর নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
বিদেশে বসবাসের কারণে এই কমিউনিটির অনুভূতি আরও গভীর হয়ে ওঠে। রমজান শেষে মুসলমানরা ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করেন। জাপানে ঈদের দিন সরকারি ছুটি না থাকলেও মুসলমানরা চেষ্টা করেন একত্রে ঈদের নামাজ আদায় করতে এবং আনন্দ ভাগাভাগি করতে।
অনেকেই নতুন পোশাক পরেন, বিশেষ খাবার রান্না করেন এবং বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানান। প্রবাসে থেকেও পবিত্র রমজান ও ঈদের এই উৎসব মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে এক অনন্য আনন্দ ও ঐক্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে।