বিহ্বল সময়: পর্ব-১২
খুব ভোরে নিজের একটা পুরোনো লেখা ভেসে উঠেছিল ফেসবুক ওয়ালে। নিজের লেখার হেডলাইন নিজেই আবার বলছি, ‘কী করিব এই জীবন লইয়া’।
আসলেই খুব অদ্ভুত ঠেকে সময়–সময়—মনে হয় কী করি? কী করি? ডালাসের পার্কল্যান্ড হাসপাতালে আজ শেষ রজনী। আগামীকাল এতক্ষণে নিজেদের বাসায়, নিজেদের সংসারে, সেজ বোন কনার সেই প্রিয় কোপেলের বাসায়। তাই আজকের শেষ রাতটা নিজের স্মৃতির পাতায় তুলে রাখতে চাই, একান্ত নিজের মতো করে একদিন এসব লেখা নিজেই পড়ব বলে সংগ্রহের ইচ্ছা হয় খুব।
বেশ কিছু টুকরা টুকরা নোট লিখব এই লেখায়—একটা কথার সঙ্গে হয়তো আরেকটা কথার ধারাবাহিকতা থাকবে না। তবু এসব কথাই আজকের স্মৃতির হীরকখণ্ড।
গতকাল আবার এসেছিল আমাদের সেই পাঁচ নম্বর বোন শুভ্রা—এই লেখার একজন–দুজন পাঠক হয়তো শুভ্রাকে সামনাসামনি চিনে থাকবেন এবং তাঁরা সহজেই জানবেন শুভ্রা কী ধাতু দিয়ে বানানো। শুভ্রা হচ্ছে এক মানুষের ভেতরে হাজার মানুষ।
শুভ্রা সঙ্গে করে আম্মার জন্য নিয়ে এসেছিল আলু দিয়ে পাতলা করে রান্না করা মুরগির মাংস, লাউয়ের তরকারি, দুই রকমের ডাল, ঝাল চিকেন ও পোলাও। হসপিটালের বিস্বাদ লবণবিহীন তরকারির কাছে এসব যেন বিয়েবাড়ির সেরা খাবার। গল্পে গল্পে শুভ্রা জানাল, পার্কল্যান্ডের এ হাসপাতালেই নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি গুলি খেয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ হাসপাতালেই সেবা নিতে নিতে তিনি মারা যান। কী অবাক যোগাযোগ—এখানেই মায়ের সঙ্গে আমার কাটল পাঁচ রাত, ছয় দিন।
লবিতে লবিতে ঘুরতে ঘুরতে বারবার ভেবেছি, ‘কোন ফ্লোরে, কোন রুমে ছিলেন জন এফ কেনেডি।’ হাসপাতালের এই কয় দিনে পরিচয় হলো কত কত মানুষের সঙ্গে। এরা রয়ে যাবে করোটির স্মৃতিতে। কঙ্গো থেকে আসা বিজু, যে দুই দিন আম্মাকে গোসল করিয়ে দিল। নাইজেরিয়া থেকে আসা রোয়েঙ্কা, যে পরপর দুই দিন ওভার নাইট শিফটে ছিল। ক্লিনার মেয়ে, যে এসেছে সোমালিয়া থেকে। মুসলিম সোমালিয়ান মেয়ে রাকুল আম্মার নামাজ পড়া দেখে সীমাহীন খুশি। প্রতি বেলায় আম্মার সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও একটা মিল বা খাবার সার্ভ করেছে। এ ছাড়া প্রতি শিফটে নানা বর্ণের, নানা জাতের মানুষ। এই দুপুরবেলা নিচের ক্যাফেতে যখন খাবারের মেনু দেখতে গেলাম, দেখি সালোয়ার–কামিজ পরা মধ্যবয়সী এক নারী এগিয়ে এসে উর্দুতে জানতে চাইছে ‘এখানে হালাল খাবার দেওয়া হয় কি না’। নারীকে ধরে–বেঁধে আম্মার কাছে নিয়ে এলাম। ইসলামাবাদের মেহরিনের স্বামী এ হাসপাতালে ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন। মেহরিন মুহূর্তেই আম্মার সঙ্গে কথা জমিয়ে ফেলে। কথায় বলে ‘পাখি ঝাঁকে মেশে’। আম্মার আর মেহরিনের কথা জমতে সময় লাগে না। কারণ, মেহরিনের দুই মেয়ে। এই মেয়েরাই এখন মেহরিনের সহায় হয়েছে। মেহরিনও ফিরে যায় তার মেয়ে জন্মের ইতিহাসের কাছে।
আমি সোহেলকে বললাম, ‘হায় রে সোহেল, তোগো রে দেশ দুধ–কলা দিয়ে দামি সাবজেক্টে পড়াইছে যে তোরা দেশের উন্নতির জন্য কাজ করবি আর তোরা কাজ করিস আমেরিকার উন্নতির জন্য।’ সোহেল বলে, ‘মেজপা, এসব কথা রাখেন, দেশ রে যে পরিমাণে দিতেছি, পাঠাইতেছি, আমেরিকায় না আসলে সেইটা দেশ বুঝতে পারত হাড়ে হাড়ে। দেশে থাকলে কিছুই দিতাম না, নিজে খাইতে পারতাম কি না, তা–ও সন্দেহ, এখন ২০ গুণ দিতেছি।’
যখন পাকিস্তানের বদ্ধ এবং রক্ষণশীল সমাজে ছেলে জন্ম দিতে না পারার অপরাধে মেহরিনকে পোহাতে হয়েছিল সমাজের ব্যাপক গঞ্জনা আর অপমান। আজকে মেহরিনের সেই দুই মেয়ে আমেরিকায় ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা–মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে ১০টা ছেলের সমান হয়ে। এমন গল্পের আবহাওয়াকে কী করে উসকে দিয়ে মুহূর্তে আগুন ধরিয়ে দিতে হয়, তা আম্মার চেয়ে ভালো খুব কম মা–ই জানে। কারণ, আম্মাকে পাড়ি দিতে হয়েছে চার মেয়ে জন্মের ইতিহাস, মেহরিনের ডাবল।
আজকে আম্মার যে মেয়ে সবচেয়ে বেশি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছে, একদিন এই কনাকেই কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াতে গিয়ে আম্মা তার হাতের শেষ সম্বল হিসেবে পাঁচটা সোনার চুড়ি গোপনে বেচে দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকার নায়েমের বাসায় কনা যখন বলল, ‘আব্বা, আমার একটা কম্পিউটার কিনতে হবে’—তখন আব্বা মাত্র দুই বছর চাকরি থেকে রিয়াটার করবেন। যেন আকাশ ভেঙে পড়ল আব্বা–আম্মার মাথায়, কিন্তু ব্যাংক লোন নিয়ে সেই যন্ত্রও কেনা হলো বাসায়।
খুব স্পষ্ট মনে পড়ে ১৯৯৪–৯৫ সালে জেনেছিলাম—আমার মতো একটা মেয়েকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করাতে বাংলাদেশ সরকারকে মাত্র ২৭–২৮ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, সেই ১৯৯০ সালেও জাহাঙ্গীরনগরে আমার মাসিক ফি ছিল ২২ টাকা। সেখানে সেই সময়ে একটা মেয়েকে ডাক্তারি পড়াতে সরকারের খরচ হয় ৩০ লাখ টাকা। এখনো ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার প্রায় ১২ বছর পরে আমার বস আফসান চৌধুরী একদিন ব্র্যাকের ১০ তালায় দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে বললেন, ‘লুনা, তুমি কি জানো বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একটা ছেলে বা মেয়ে ইংরেজি তো দূরের কথা, বাংলায় একটা নির্ভুল চিঠি লিখতে পারে না?’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এ কথার সত্যতা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না, কেউ না। আমি অন্য একটা ছেলে বা মেয়ের উদাহরণ দিতে চাই না। কিন্তু এটা আমার জন্য শতভাগ সত্য। তাহলে সেই ২৭ হাজার টাকার বিদ্যা নিয়ে আমি কী করে নর্থ আমেরিকায় কনার কাছাকাছি যোগ্য হয়ে উঠব? আমি কী করে মেহরিনের দুই মেয়ের মতো বাবা–মায়ের দায়িত্ব নেব?
আমি নিজে যে কারও বোঝা হয়ে বেঁচে নেই—এ প্রাপ্তিই সেরা মনে হয় সময়–সময়। তাই কনার পেছনে বাবা–মায়ের করে রাখা কোনো ইনভেস্টমেন্টই বৃথা যায়নি। বরং সুদে–আসলে তা কয়েক গুণ বেড়েছে, বাকি জীবন তো কনা সেই ‘সোনার রাজহাঁস’ হয়েই বেঁচে থাকবে আমাদের পরিবারে এবং সেটাই আমাদের অহংকার।
ওহ, অন্য একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছে ভীষণ।
১৭ অক্টোবর কনার বাসায় এসে যখন পৌঁছাই তখন ওর ক্লাসমেট বন্ধু সোহেল অপেক্ষা করছিল আমার সঙ্গে দেখা করবে বলে। কনার মতো সোহেলও প্রথমে অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস এবং পরে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছে। ডালাসে সোহেলের মাত্র পাঁচটা বাড়ি। আমি ওকে দেখেই একটু ঝাঁজালো স্বরে বললাম, ‘হায় রে সোহেল, তোগো রে দেশ দুধ-কলা দিয়ে দামি সাবজেক্টে পড়াইছে যে তোরা দেশের উন্নতির জন্য কাজ করবি আর তোরা কাজ করিস আমেরিকার উন্নতির জন্য।’
সোহেল কথা শেষ করতে দেয় না। শূন্য থেকে কথা তুলে নিয়ে বলে, ‘মেজপা, এসব আজাইরা কথা রাখেন, দেশ রে যে পরিমাণে দিতেছি, পাঠাইতেছি, আমেরিকায় না আসলে সেইটা দেশ বুঝতে পারত হাড়ে হাড়ে। দেশে থাকলে কিছুই দিতাম না, নিজে খাইতে পারতাম কি না, তা-ও সন্দেহ, এখন ২০ গুণ দিতেছি। ভালো লাগতাছে না আপনার, তাই না?’ জোঁকের মুখে লবণ পড়লে যা হয়, আমারও মুখের দশা তা–ই হলো। এ কথার বাইরে উত্তর দেব, সেটা কি জানা আছে আমার? বোন আমেরিকায় না থাকলে কি এই বিলাসী লেখা আসত আমার?
আজ আর নয়। আম্মা ভালো হয়ে ফিরে যাচ্ছেন এবং যাওয়ার আগে পার্কল্যান্ড হাসপাতালের সঙ্গে বাকি জীবনের জন্য ফলোআপ চিকিৎসার সাইন করে যাচ্ছেন, এই পাওয়াকেই বা কী করে মূল্যায়ন করি!
আগামী শুক্রবার ফিরতে হবে নিজের শহর টরন্টোতে। ভালোবাসায় এবং স্মৃতিতে বেঁচে থাকুক পার্কল্যান্ড হাসপাতাল।