বিহ্বল সময়: পর্ব-১০

মায়ের সঙ্গে লেখকেরা চার বোন। ২০২৪ সালে হাওয়াই দ্বীপেছবি: লেখকের পাঠানো

‘আম্মুর ইনসুলিন’; হলুদ স্টিকি নোটে লেখাটা সাঁটানো আছে এখনো ফ্রিজে। গতকাল ঠিক এই রকম সময়ে শাহিন আর আমি আম্মার ব্যাগ গোছানো নিয়ে হুড়পাড় করছি আর মাঝেমধ্যেই বন্ধুবান্ধব আম্মার সাথে দেখা করতে আসছেন। কাজের ফাঁকেই ফ্রিজে ‘আম্মার ইনসুলিন’ নোটটা লিখে রাখলাম যাতে ভোরে বের হওয়ার সময় নিতে ভুলে না যাই।

গতকাল ঠিক এই সাড়ে নয়টায় আম্মার পায়ে ভ্যাসলিন দিচ্ছিলাম। এক দিনের ব্যবধানে আমার এই টরন্টোর বাসায় এখন পিনপতন নীরবতা, কেউ নেই, কোনো শব্দ নেই, যেন বা চিরতরে গভীর নীরবতা নেমে এসেছে এই তিন বেডরুমের বাসায়। আম্মা চলে গেছে অন্য এক দেশে। অন্য এক বোনের বাসায়। এখানে আমি আর শাহিন বারবার আম্মার ছায়া খুঁজে ফিরছি। আমার এই এক হাত দূরেই বিছানায় আম্মা ছিলেন প্রায় একটা মাস।

জীবন খুব বিচিত্রভাবে মনের ভেতরে ‘বোধ’ তৈরি করে দেয়—আনন্দ, বেদনা, ভালোবাসা, দুঃখ, কষ্ট। গভীরতর কষ্ট বা হাহাকার মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সেই অবাক করা অনুভূতিশীল সেরা কবির কয়েকটা লাইন—‘আলো-অন্ধকারে যাই, মাথার ভেতরে স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, কোনো এক ‘বোধ’ কাজ করে। আমি তারে পারি না এড়াতে, আমি চলি, সেও চলে, আমি থামি, সেও থামে, আমি তারে পারি না এড়াতে’ (জীবনানন্দ দাশ-‘বোধ’ কবিতা)।

কত দিনের পরিকল্পনা, সেই কবে থেকে জানি, যেদিন আম্মা ঢাকা থেকে এসেছে, সেদিনই জানি, আম্মার ফ্লোরিডার টিকিট কাটা আছে সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে। আম্মা চলে যাবে বড়পার বাসায়। এবার আম্মা এক বছর থাকবেন আমেরিকায়। যেকোনো সময় চাইলেই যেতে পারি, কিন্তু তবু এই মুহূর্তের হাহাকারকে এড়াতে পারছি না কিছুতেই। আম্মার সেই নরম গাল, পিয়ারসন বিমানবন্দরে হুইলচেয়ারে বসা আম্মাকে ঠেলে নিচ্ছিল পাঞ্জাবি মেয়েটা, আমাকে আর শাহিনকে পেছনে ফেলে। তখন আমি আম্মার মাথায় হাত রাখি, আম্মার গালে গাল ঠেকাই, কী নরম গাল আম্মার! সেই ছোঁয়া এখনো লেগে আছে আমার ঠোঁটে। কী অদ্ভুদ বোধ বয়ে বেড়াই আমরা বুকের ভেতর, একেকটা পরশ হয়তো বা বদলে দেয় একটা জীবন, তা-ই না?

আরও পড়ুন

খুব ছোটবেলায় নানির ন্যাওটা// ছিলাম আমি। নানির তখন বেশ বয়স। রাতে আমি নানির কাছে ঘুমাতাম, নানি খুব নরম কাপড় পরতেন রাতে। নানির সারা গায়ে হাত দিতাম আমি।

আর প্রায় ৪০ বছর পরে আমার ছেলে নাইয়া আমার মায়ের ন্যাওটা ছিল, চার বছর বয়স পর্যন্ত নাইয়া আম্মার গায়ের সঙ্গে গা জড়িয়ে ঘুমাত। নানি আমাকে যশোরের ভাষায় বলতেন, ‘এ তো মহা জ্বালা হইলো দেখতিছি, তুই আমারে ঘুমাতি দিবি নে লুনা।’ আবার আমাকে ছাড়া নানি থাকতেও পারতেন না, প্রতি রাতে নানি আমাকে ডেকে নিতেন নিজের কাছে। এসব চক্রে যারা বড় হয়নি, যারা জন্মেই নিজেদের বেডরুম পেয়েছে, তারা কি আকুল হয়ে আমার মতো ফেলে আসা শিশুকালের জন্য কাঁদে কখনো?

সেই সব সময়ে মানে আমার জীবনের ৩৫/৩৬ পর্যন্ত আমরা আম্মাকে বাঘের চেয়ে বেশি ভয় পেতাম। আজও পাই। কিন্তু আজকের ভয় আর সেদিনের ভয়ের ভেতর ফারাক আছে। গতকাল দেখলাম, আম্মা কাকে যেন বলছে, ‘কী বলব আমি? এখন আর কাউকেই কিছু বলি না। কারণ, সবাই স্বাধীন, সবাই যার যার মতো চলবে।’

আরও পড়ুন

আসলে কি তা–ই, আম্মা?

আমরা চার বোন আজও প্রতিটা বিষয় নিয়ে আগে থেকে হোমওয়ার্ক করি। আব্বা বেঁচে থাকতে বলতাম, আব্বা–আম্মা কী ভাববেন? কী বলবেন? কীভাবে নেবেন? কতটা বলব, কতটা বলব না? কীভাবে বলব? কীভাবে বললে কষ্ট কম হবে আব্বা–আম্মার? যেন একটা ছায়া আছে আমাদের চার বোনের সাথে লাগাতার এবং সেটাই তো স্বাভাবিক।

অথচ এই আমাদের ছেলেমেয়েরা। এতটা স্বাধীন যে ওদের কোনো কথা বলার আগে আমরা হোমওয়ার্ক করি, তবু বেশির ভাগ সময় আমাদের চিন্তার অনেক অনেক বাইরে ওরা আচরণ করে। এখানে ভালো বা মন্দের বিষয় নয়। এখানে নিজেকে একধরনের নিঃস্ব বা একাকী ভাবার একটা প্রক্রিয়া যা আমাদের মাকে এখনো আমরা ভাবতে দিতে চাই না। কিছুতেই না।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আম্মা চলে যাওয়ার পর, সেই সকাল দশটায় এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় এসেছি কিন্তু এই বেডরুমে প্রতিটা কোনায় আম্মাকে দেখতে পাচ্ছি। এই বিছানায় আম্মা ছিলেন, এই চাদর, এই টেবিলের ওপর আম্মার রেখে যাওয়া ওষুধের খালি কৌটা, আম্মার ফেলে যাওয়া কাপড় এখনো সেভাবেই পড়ে আছে। বাথরুমে আম্মার ছোট ছোট সাদা তোয়ালে। সব যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

এ–ই আমাদের মা । মাত্র ২৩ বছর বয়সের ভেতর আমাদের চার বোনকে জন্ম দিয়ে ৭৩ বছর বয়স পর্যন্ত জীবন আর সংসারের ঘানি টেনেছেন আম্মু। কত বিচিত্র কষ্ট, দুঃখ, আনন্দ-বেদনার পথ বেছে নিতে হয় সন্তানকে বড় করতে হলে; এই সত্য দুনিয়ায় মা ছাড়া আর কেউ কোনো দিন জানতে পারবে না। শত চেষ্টায়ও না। আমাদের চার বোনকে বড় করতে গিয়ে আম্মা হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে সাহসী আর সবচেয়ে নির্মোহ মানুষ। তবু বয়সের সাথে সাথে সাহসের শক্তি কমতে থাকে। আম্মা ইদানীং ঢাকা থেকে বারবার বলতেন, ‘আমার ভয় লাগে রাতে একা থাকতে। মনে হয়, আমি বুঝি একা পড়ে থাকব; কেউ আমার পাশে থাকবে না।’

আরও পড়ুন

তাই শাহিন গিয়ে আম্মাকে নিয়ে এসেছে ঢাকা থেকে। এখানেও আমাদের জীবনের ভেতরে আম্মাকে নিয়ে আমরা ১০০ ভাগ চেষ্টা করি না কেন, আম্মার মন হয়তো পড়ে থাকে ঢাকায়, তার একান্ত নিজের সংসারে। কিন্তু আবার, ওই যে বয়স যা প্রত্যেক মানুষকে একদিন ধীরে ধীরে চোরাবালিতে টানতে থাকবে। টানতেই থাকবে।

আমাদের সবার জন্যই এই সব দিন অপেক্ষা করে আছে ভীষণভাবে। সুনার অর লেটার—আমরা সবাই এই চক্রে ধরা দেব। খুব নিশ্চিতভাবেই ধরা দেব। দেখা হবে, আম্মা; তোমাকে অনেক অনেক মনে পড়ছে।

চলবে...