বিহ্বল সময়: পর্ব–৯

মে মাসে টরন্টো শহরে এখন দীর্ঘ বিকেল।

রাত সোয়া ৯টা অবধি দিনের ঝকঝকে রুপালি আলো আকাশে ছড়িয়ে থাকে। জীবনের সব প্রথম দেখাই নাকি প্রতিবারের দেখার সঙ্গে মিলে যায়। সেই যে ১৯৯৮ সালে নাইয়ার বাবার সঙ্গে প্রথম যখন লন্ডন হিথরো বিমানবন্দর থেকে আরও পাঁচ ঘণ্টা বাসে ভ্রমণ করে কার্ডিফে পৌঁছেছিলাম, সেদিনও আকাশ আলো করে রাত ১০টা বেজেছিল ঘড়ির কাঁটায়। মনে পড়লে আজও নিজেকে চিমটি কাটতে ইচ্ছা করে, এই আমিই কি সেই আমি? সেদিন কি জেনেছিলাম আরও ২৩ বছর পরে, মাত্র ১৮ বছরের কানাডার প্রতিটি সামারে সেই কার্ডিফের রাত ১০টার বিকেলের কথা ফিরে ফিরে মনে পড়বে?

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে অজানা বিষয় হলো মানুষের ‘মন’। এই মানবমনের কোনো প্রেডিকশন বা অনুমান তিনি জানেন না, জানা সম্ভব হয়নি এবং হয়তো আরও একটু বাড়িয়ে বলেছিলেন ‘নারীর মন’।

সামারের এই দীর্ঘ বিকেলে মন খুব উথালপাতাল করে। অনেক বছর হয়ে গেছে, নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য একমাত্র অফিসের কাজ করি। এর বাইরে ভালোবেসে রান্না আর ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকি। বাইরের হট্টগোল বা নানা ধরনের গ্যাদারিং থেকে দূরে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি অনেকটা। তাই সম্পূর্ণ একটা কাজবিহীন দিন যা করে, সেটা হচ্ছে নিজের অতীত, বেড়ে ওঠা, অনেক বছর ধরে প্রবাসে থাকলে দেশে ফেলে আসা মানুষেরা, প্রিয় বা অপ্রিয় মানুষেরা স্মৃতিতে ঘুরে ঘুরে আসতে থাকে। ঘোরলাগা এসব মুহূর্ত, ঘণ্টা ও দিন। একটি প্রশ্ন তাড়া করে ফেরে, কোন সূত্রে এই জীবন পেলাম আমি? কী চাই এই জীবনের কাছে? সুখ বা অসুখের আসল অনুভূতি কোনটা?

এমন সব সময়ে দুজন মানুষ আমাকে আলোড়িত করে রাখে। একজন সরদার ফজলুল করিম স্যার, অন্যজন আমার বাবা। সরদার স্যারের বিচিত্র জীবন আমাকে যত দিন যাচ্ছে, তত বেশি আলোড়িত করছে। এর প্রধান কারণ কী?

স্যারকে ১০ বছর খুব কাছ থেকে দেখেছি, সেটা কি একটা কারণ? নাকি সরদার স্যার বারবার বলেছিলেন, ‘লুনা জীবনে নির্মোহ হইতে শেখো। আশা যত কম করবা, তত ভালো থাকবা—এটাই কি কারণ? স্যারের সব কথা যত বেশি বয়স হচ্ছে, তত সত্য হচ্ছে। মানবজীবনে সত্যিকার একজন দার্শনিক তো এই কাজটাই করে যান, তাই না?

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

অন্যজন আমার বাবা। আব্বাকে নিয়ে কথা বলার তেমন কিছু নেই, কিছুই নেই। কারণ, আব্বা কোনো অনন্য ও অসাধারণ মানুষ ছিলেন না। ক্ষমতা, টাকা, প্রতিপত্তি, এমনকি খুব অসাধারণ পারসোনালিটি—কোনোটাই আমাদের বাবার ছিল না; বরং হয়তো আব্বার সামনেই একটু কায়দা করে বা রূপক অর্থে আব্বা যে একজন অনেকটাই ‘অযোগ্য মানুষ’, সেটাও বহুবার বলা হয়েছে। এর কারণ অনেকগুলো হতে পারে, কিন্তু প্রধান কারণ একটাই, হয়তোবা একটাই, তেমন কোনো অর্থসম্পদ আব্বা করে যেতে পারেননি।

এই তো মাত্র ২৫ বছর আগে আমাদের ধানমন্ডির অ্যাপার্টমেন্ট কেনার আগে আব্বার খুব আপত্তি ছিল। কারণ, এই অ্যাপার্টমেন্টের অ্যাবিলিটি আব্বার ছিল না। কিন্তু ওই যে আমাদের মা, সাধ্যের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে সাহস করতেন, তা–ই করলেন আম্মা। বড় মামা আর আম্মা মিলে সেই দূরের কোনো গলি–ঘুপচির অ্যাপার্টমেন্টের বায়না বাতিল করে ধানমন্ডির মতো প্রপার জায়গায় বাড়ির বুকিং দিলেন।

এই লেখায় আব্বার সঙ্গে একান্ত অনুভূতি বলার জন্য বসেছি। কোথাও কোনো জমি, অ্যাপার্টমেন্ট, চাকরি, আমাদের বিয়ে, উন্নতি–অবনতি, এসব নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইনি, কিন্তু পাঠক জানেন তো এগুলো মিলিয়েই মানুষের জীবন। এসব টুকরা টুকরা ছবি বা কর্ম মিলিয়েই আপনি মানুষকে জানতে ও চিনতে পারবেন।

আরও পড়ুন

অন্য একটা উদাহরণ দিই সরদার স্যারকে নিয়ে। স্যারের বড় ছেলে জ্যোতি একটু অন্য রকম (মানসিক ভারসাম্যহীন) সন্তান ছিল। স্যার বারবার বলতেন, এ ছেলের দায় স্যারের। কারণ, স্যার তাঁর জীবনে ১১ বার জেলে গেছেন। যখন জ্যোতিকে সময় দেওয়ার কথা, তখন স্যার দেশকে সময় দিয়েছেন। তাই জ্যোতির দায়িত্ব পালনে স্যার সঠিক সময়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। স্যার তাই বেঁচে থাকাকালীন জ্যোতিকে সব সমর্থন দেওয়ার শতভাগ চেষ্টা করেছেন।

আজকের এ সন্ধ্যায় আব্বাকে ভীষণ মনে পড়ে। খুব বেশি মনে পড়ে। অন্য বোনদের মতো আমার জীবনটা খুব স্বাভাবিকভাবে এগোয়নি। যাপিত জীবনের পথের বাধা আমাকে যতটা আঘাতের চিহ্ন দিয়েছে, সেটা অন্য বোনদের জন্য এতটা ভিজিবল নয়। তাই আব্বা চলে যাওয়ার আগে এক পরিচিত খালাকে বলেছিলেন, ‘লুনার জন্য চিন্তা হয়।’

আরও পড়ুন

কেন ভাবতেন আব্বা আমাকে নিয়ে?

আব্বা চলে যাওয়ার বছরে, মানে ২০২০ সালের জুনের ১০ তারিখের পর থেকে যেসব লেখা ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলাম, সেখান থেকেই পরিচয় হয়েছে বাকী বিল্লাহর সঙ্গে। যাকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছি মাত্র দেড় বছর আগে। মা–হারা সেই দুই সন্তান ফোনে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করে, ‘আন্টি আপনার শরীর কেমন, খাবার খাইছেন আন্টি?’ সময়ের আবর্তে এই অতি সামান্য দুটি প্রশ্ন করার মানুষ একদম শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে।

মনে পড়ে সেই ভোরের কথা। বাকী বিল্লাহকে কথা দেওয়ার আগমুহূর্তে আব্বাকে স্পষ্ট স্বপ্নে দেখলাম। সাদা পাঞ্জাবি পরে কথা বলছেন, আব্বুর সেই চিরপরিচিত হাসি মুখ। আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘লুনা তুমি যাও, বাকীকে আমি খুব ভালো চিনি, তোমার কিছু ভাবতে হবে না।’

ভোরের সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরেই বাকীকে ফাইনাল কথা দিয়েছিলাম। আব্বা, আমি কিন্তু সাধ্যের বাইরে যাইনি আব্বু। আমি তোমার মতো অতি সাধারণ একজন সৎ মানুষকে পাশে চেয়েছি অনেকটাই শেষ বয়সে এসে। তুমি কি আমাকে দেখতে পাও আব্বু? চলবে...

আরও পড়ুন