বিহ্বল সময়: পর্ব-১১

ছবি: লেখকের পাঠানো

তাহলে কি সেই সময় চলে এল আমার মতো অনেকের জীবনেই, যখন নীরব হয়ে ভাবতে হবে—আচ্ছা, আর যদি অল্প কিছুদিনের ভেতরেই এমন অবস্থায় পড়ি, সেদিন কী হবে আমার জীবনের?

আমি কি পাব মাত্র একটা মমতাময়ী হাতের পরম স্পর্শ এই কপালে?

বা আমি যখন হাসপাতালের বিছানায় একা সহায়হীন হয়ে পড়ে থাকব, তখন মাত্র একজন মানুষ আমার ঘরেই নীরবে জেগে থাকবে আমার জন্য? বা খুব কড়া ডোজের ওষুধের পরে ঘুমাতে যাবার আগমুহূর্তে জানব—আমার ঔরসজাত সন্তান বা আমার স্বামী, যাঁর জন্য একদিন পৃথিবী বাজি রেখে সবাইকে ছেড়ে তাঁর হাত ধরেছিলাম, বা আমার কোনো আত্মীয়, যাঁকে অনেক জীবন অবধি জীবনের সেরা সঙ্গী বলে বিশ্বাস করে এসেছি বা একজন পরম বন্ধু, যাঁকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার জন্য শতকোটি হিসাবের এই জীবনকে তুচ্ছ করেছি বা করে যাচ্ছি।

এই যে ওপরে বর্ণিত সবগুলো বা সব ধরনের মানুষের ভেতর থেকে মাত্র একজন মানুষের একটা হাত কি পাব আমার কপালে, যেদিন আমার অন্ধকার ঘরে পেইড নার্স বা ডাক্তার ছাড়া আর কেউ থাকবে না? কিন্তু আমি চাইব মাত্র একজন স্বার্থহীন মানুষ? কেউ কি আছে এই এত বড় প্লানেটে?

আরও পড়ুন

কথা হচ্ছিল ডালাসের টেক্সাসে অবস্থিত পার্কল্যান্ড হাসপাতালের ৬০২ নম্বর ঘরে বসে, যেখানে মায়ের সঙ্গে আমার ৩ নম্বর দিন পার হচ্ছে। মাত্র ৩০ মিনিট আগে টরন্টো যাওয়ার তারিখ পিছিয়েছে বোন কনা, যার কারণে আম্মা দুনিয়ায় সেরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শুভ্রা নামে আরও একজন বাঙালি মেয়ে, যে আমাদের চার বোনের সঙ্গে নিজেকে বোন দাবি করে আসছে গত ১৫ বছর, ওকে বললাম—‘এই যে কার্ডিওলজির এত বড় ডাক্তার শাহ এল সকালে আম্মাকে দেখতে, সে কি ইন্ডিয়ান না শুভ্রা? নাম শুনে তো তা–ই মনে হয়।’

শুভ্রা হেসে বলে, ‘মেজপা ডাক্তার শাহ হচ্ছে এ বি সি ডি (আমেরিকান বর্ন কনফিউজড দেশি)।’

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

‘তাহলে আমরা কী সেতু?’ সেতু আবার উত্তর করে—‘মেজপা, আমরা তো  পিউর দেশি। একদম দেশি। আমরা তো কনফিউজড না। বোঝেন না আপনি? এই যে আমি, আপনি খালাম্মার জন্য জীবন বাজি লাগাইছি। আমরা ১০০ ভাগ বিশ্বাস করতেছি, যতই আমেরিকা/কানাডায় থাকি, ওই বাংলাদেশের সব মধ্যবিত্ত ভ্যালুজ হচ্ছে আমাদের জীবনের সেরা অর্জন। আপনে কি মনে করেন—নাইয়া আপনার এই ভ্যালুজ নিয়া বড় হইছে? আমার আপনার সন্তান খারাপ–ভালো সেই প্রশ্ন কিন্তু না, কিন্তু একটা কথা বলি, আপনে না বলছেন, নাইয়ারে খালাম্মা মানুষ করছে প্রথম চার বছর, বলেন তো বুকে হাত দিয়া, নাইয়া ফোনে কানাডা থেকে কয়বার খালাম্মার কথা জানতে চাইছে?’

আরও পড়ুন

পাঠক—‘ট্রিগার’ নামে একটা ইংরেজি শব্দের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত, শুভ্রার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এই লেখার ট্রিগার পয়েন্ট।

ও চলে গেছে আরও চার ঘণ্টা আগে—আম্মা এই সময়ের ভেতরে ফ্রেশ হয়েছেন, হাসপাতালের বেডে বসে জোহরের নামাজ সেরেছেন, হাসপাতাল থেকে দেওয়া দুপুরের বিস্বাদ খাবার খেয়েছেন। এবং এই মুহূর্তে আমার থেকে মাত্র ৫ হাত দূরে বেডে শুয়ে আছেন আম্মা, একটা নীরব নিঃশব্দ, একাকী দুপুর আমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমিও এর ভেতরে দুপুরের গোসল সেরে ছয়তলা থেকে নিচের ক্যাফেতে গিয়ে আরাম করে খাবার খেলাম, যাবার আগে প্যালেস্টাইন কড়া মুসলিম ডিউটি নার্স টববগে ৩৩ বছরের তরুণ ছেলে হুসেনকে বললাম, ‘দেখো, আমার মা ঘুমাচ্ছে, মাত্র একটা ঘণ্টা যেন আম্মা ঘুমাতে পারে, এই যে তোমরা প্রতি ৪০ মিনিট পরপর গিয়ে তাঁকে চেকআপ করো, কীভাবে একটা মানুষ ঘুমাবে বলতে পারো?’ এই বলে লম্বা সালাম দিলাম, হুসেন খুব বিনীতভাবে জানাল—‘তুমি তোমার সময় নাও, আমি দেখব তোমার মাকে।’

বিশাল ক্যাফের ঝকঝকে এরিয়া, চারদিকজুড়ে নজরকাড়া সোভা, বিশাল হাসপাতাল, আমেরিকার বিত্তবৈভবের কথা তো নতুন করে দুনিয়াকে জানান দেবার কিছু নেই। নর্থ আমেরিকা মানে আমেরিকা/কানাডায় যেদিকেই তাকাই মনে হয়—কত কত বিত্ত থাকলে একটা দেশ তার নাগরিকদের জন্য এতখানি সুবিধা আর সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে? কেমন করে এতটা ফ্যাসিলিটি এসব দেশের নাগরিকদের দরজায় এসে দাঁড়ায়?

আরও পড়ুন

অন্যদিকে এই মন বারবার বলে চলে—কোন অন্ধ চিপা গলির দেশে জন্ম আমার? কত শিকড়ে গ্রথিত আছে আমার নাড়ি?

মাত্র চার বছরের ছেলেকে নিয়ে ২০ বছর আগে যে দেশ ছেড়েছিলাম, একমাত্র ছেলে এবং নিজের জীবনের সবটুকু নিরাপত্তা, স্বাবলম্বী হওয়ার সবচেয়ে সেরা রাস্তা বের করার জন্য যে ঝুঁকি নিয়েছিলাম, সেই ছেলে কি আদৌ আমার ভ্যালুজ ধারণ করবে বা করা উচিত? কেন আশা করব নাইয়া আমার বা ওর নানির কষ্ট/দুঃখের কথা ভেবে উতলা হবে? কানাডিয়ান কালচারের পাশাপাশি আর কোনো বোধ বা ভ্যালুজ কি দিতে পেরেছি নাইয়াকে আমি?

পাঠককে একটা কথা এই ফাঁকে জানিয়ে রাখতে চাই। বিশেষ করে কানাডায়—আঠারো বছরের নিচের প্রতিটি সন্তান পরিষ্কার জানে যে ওদের বড় করার জন্য সরকার ওদের বাবা–মায়ের হাতে মাসকাবারি ডলার তুলে দেয়—গত ১৮ বছর দোভাষীর কাজ করে এই সত্য আমি শিওর করে জানি যে কানাডার নাগরিকদের জন্য সব সুযোগ–সুবিধা বাবা–মায়ের চেয়ে সন্তান অনেক বেশি নিশ্চিত করে জানে। সে কারণেই হয়তো অনেক ছোটবেলায় নাইয়া বলেছিল ‘আম্মু, তুমি জানো না কানাডায় কেউ না খেয়ে মারা যাবে না।’

তাহলে এই আমি লুনাই কি বছরের পর বছর নাইয়াকে বলিনি—‘বাবু, তোমার জীবন তুমি দেখো, আমি কিছুই চাই না তোমার কাছে, আমাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না, তুমি আমার বারডেন হবে না, তুমি ১০০ ভাগ নিজের পায়ে দাঁড়াবে—কেবল এটুকুই চাই তোমার কাছে।’

তাহলে আজকে কেন সব চিন্তা এলোমেলো হচ্ছে? তাহলে কি সময় এগিয়ে আসছে? বুঝতে পারছি একটা মমতাময়ী হাত জীবনের জন্য বড় বেশি প্রয়োজন, তাই কি এমন এলোমেলো চিন্তা জেঁকে ধরেছে আমার মতো সমসাময়িক অনেককেই?

ছবি: লেখকের পাঠানো

চিন্তা আর বাস্তবতার ফারাক বরাবরই আকাশ–পাতাল। খুব গভীর হয়ে ভেবেছি গত কয়েক দিন—এমন কিছু কি করেছি আমি যে আমার ভাগ্য ‘আমার মায়ের’ মতো হবে?
শতকোটিবার প্রশ্নের পরও একমাত্র উত্তর এসেছে—না, না এবং না।

জীবন যে বড় বেশি শূন্য আর একাকী, এটা মানার আগেই চলে যেতে চাই; কিন্তু অতটুকু সৌভাগ্য করেও অনেকেই আসে না এই দুনিয়ায়, আমিও আসিনি নিশ্চয়। আম্মা জেগে উঠেছেন, দেখি কিছু লাগবে কি না। চলবে...