মক্কা–মদিনার ডায়েরি-৩
৭. ঐতিহাসিক কুবা মসজিদ থেকে বদর প্রান্তরে
এখানে আমাদের দিন কাটছে নিয়মের মসৃণ লয়ে। এরপর কী ঘটবে—বলে দেওয়া যায়, প্রতিটি ওয়াক্তের কার্যপ্রণালি মোটামুটি তার আগের মতোই। এমনকি আগামীকালের দিন–রাত্রি কীভাবে যাবে, তা–ও বলে দেওয়া যায় নিমেষেই। এর পরিবর্তন ঘটাতেই যেন আমাদের মোয়াল্লেম খালেদ সাহেব খবর পাঠালেন—পরদিন বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা জিয়ারায় নিয়ে যাবেন। সকাল সাতটার সময় সবাইকে প্রস্তুত হয়ে হোটেল লবিতে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করলেন। যথাসময় গ্রুপের সবাই উপস্থিত হলাম। মোয়াল্লেম ৪০ সিটের বিলাসবহুল বাস নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন। বাসের চাকা গড়াল গন্তব্যের দিকে।
কুবা মসজিদ এলাকায় প্রবেশ করছি, দূর থেকে মসজিদটি পদ্মের মতো প্রস্ফুটিত দেখা যাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার বাড়িতে পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর কুবা মসজিদে এসে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, সে একটি উমরাহ করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী অনুসরণ করলাম। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নির্মিত মসজিদ, স্বয়ং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ মসজিদ নির্মাণ করেন। সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের ফলে মসজিদটি বিশাল, আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে রূপ নিয়েছে। কয়েকটি সাদা গম্বুজ ও মোট চারটি সুউচ্চ মিনার মসজিদকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছ। মসজিদের চারপাশে বিশাল উন্মুক্ত চত্বর, যা খেজুরগাছের বাগান ও ফোয়ারা দ্বারা সজ্জিত। পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা নামাজ আদায়ের স্থান, অজুর জন্য আধুনিক সুবিধা ও গাড়ি পার্কিংয়ের সুন্দর ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া কুবা মসজিদ ঘিরে পার্ক, শপিং মল, হাঁটার পথসহ নানা আধুনিক স্থাপনা গড়ে এলাকাটি সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলা হয়েছে। কাফেলার সবাই ফিরে এলে আমরা রওনা হলাম কিবলাতাইন মসজিদের উদ্দেশে।
কিবলাতাইন মসজিদটি ইসলামের ইতিহাসে কিবলা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। মসজিদটি আধুনিক শৈলীতে নির্মিত হলেও ঐতিহ্যবাহী সৌদি জ্যামিতিক নকশা, হালকা পাথর আর মার্বেলে তৈরি। মসজিদটির ছাদে দুটি ভিন্ন দিকনির্দেশক গম্বুজ আছে, যা দুটি কিবলাকে প্রতীকীভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা নফল নামাজ আদায় করে সালমান ফারসির খেজুরবাগান দেখার জন্য রওনা হলাম।
আমাদের বাস এসে দাঁড়াল বিশাল এক খেজুরবাগানের সামনে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই বেশ বড় একটি খেজুর বিক্রয়কেন্দ্র, যেখানে বিভিন্ন ধরনের খেজুর বিক্রি হচ্ছে। আমাদের কাফেলার অনেকেই দামদর করল, কিন্তু কেউ কিনল না। জয়নাল সাহেব আমার কানের কাছে এসে বললেন, ‘দাম বেশি।’ আমরা একটু বাগান ঘুরতে চাইলাম, কিন্তু বেশি দূর যাওয়ার অনুমতি নেই। খেজুরগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা ইতিহাসের পাতায় ডুবে গেলাম।
মসজিদে নববির ছাদের ওপর কিছু সরিয়ে নেওয়া যায় এমন গম্বুজ রয়েছে। যখন আবহাওয়া শীতল থাকে এবং ছাদের ভেতরের অংশে বাতাস ও প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয়, তখন এই গম্বুজগুলো যন্ত্রের সাহায্যে ধীরে ধীরে পাশে স্লাইড করে। ফলে ছাদের ওই অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আকাশ দেখা যায়। আমার কাছে এ ধরনের আধুনিক স্থাপত্য ও যন্ত্রকৌশল অসাধারণ মনে হয়েছে।
হজরত সালমান ফারসি (রা.)-এর খেজুরবাগানটি ইসলামের ইতিহাসে এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী। সালমান ফারসি (রা.)-এর খেজুরবাগান থেকে বের হয়ে আমরা ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রান্তর দেখার জন্য রওনা হলাম। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসে আরামবোধ হলেও বাইরের আবহাওয়া অনেক গরম। সূর্য মাথার ওপর আগুন ঝরাচ্ছে। আসার সময় আম্মার হুইলচেয়ার আনা হয়নি। মোয়াল্লেম সাহেব বারণ করেছিলেন। ওনার ভাষ্য ছিল, আমরা গাড়ি নিয়ে সব জায়গায় যাব, তেমন হাঁটা লাগবে না। বাস্তবে হাঁটাপথ কম নয়। প্রতিটি স্থাপনায় বাস পার্কিং থেকে হেঁটে আসতে হয়, দূরত্ব নেহাত কম নয়। আমরা যাঁরা যুবক আর সুস্থ, তাঁদের জন্য চলে। কিন্তু আম্মার মতো অসুস্থ আর বয়স্কদের অনেক কষ্ট হচ্ছিল। নিজের নির্বুদ্ধিতায় বিরক্ত হচ্ছি। বদর প্রান্তরটা অনেক বড় এলাকা। এত বড় এলাকা আম্মা কীভাবে হাঁটবেন! একবার ঠিক হলো আম্মা গাড়িতেই থাকবেন, এখান থেকেই জিয়ারত করবেন। পরে কী ভেবে আম্মা বললেন, কষ্ট হলেও যতটুকু পারি হাঁটতে থাকি, বাবাও উৎসাহ দিলেন। আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম।
বদরের শহীদদের কবরস্থানে যাওয়ার পথটি ইট–বাঁধানো। এখানে অনেক কবুতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। রুনার হাতে ছাতা ছিল; হঠাৎ ছাতা খুলতে অনেক কবুতর একসঙ্গে উড়াল দিল। অনেক কবুতর একসঙ্গে উড়ছে আর তাঁদের ডানা ঝাপটানোর ফড়ফড় শব্দ চারিদিকে। কাফেলার অন্য সদস্যরা আগেই কবরস্থানের সামনে পৌঁছে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা পৌঁছাতেই মোয়াল্লেম সাহেব ফাতিহা পাঠ করে জিয়ারত করলেন। বদর যুদ্ধের ১৪ জন শহীদ সাহাবি (রা.)–এর কবরস্থান এটি। দেখলাম, কবরস্থানের পাশে একটি ছোট টিলার ওপর অনেক মানুষ উঠছে। জায়গাটিতে মানুষের ভিড় আছে দেখা গেল। এই টিলার নাম ‘আল-আরিশ টিলা’। এ টিলায় যুদ্ধে চলাকালীন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একটি তাঁবুতে অবস্থান করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন এবং যুদ্ধের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। নবীজি (সা.)-এর সেই অবস্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে টিলার কাছে একটি ছোট মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রতিটি ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বিশেষ মর্যাদার স্থানে রয়েছে। প্রতিটি মুসলিমের মনে গাঁথা আছে এই স্থান–কাল–পাত্রের ইতিহাস। এখানে মরু আবহাওয়া, দেশের দিনরাত্রির গায়ের চিরপরিচিত খাঁজগুলো হারিয়ে গেছে। দুই দিন কাটিয়েই মনে হচ্ছে, কত দিন বুঝি এইখানে আছি। কখন শোয়া, কখন খাওয়া, কখন বেড়ানো—কিছুরই ঠিক নেই। আর কাজ নামক জিনিশটাই একেবারে অনুপস্থিত। প্রতিমুহূর্তে চোখে ও মনে নতুন ও অনভ্যস্ত ছাপ পড়ছে। এখানে–ওখানে গেলাম, এটা–ওটা দেখলাম—এই করে করে একটা দিন সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একটা দিনের মধ্যে আমাদের মন নতুনভাবে নাড়া খায়। তবে ঘোরাঘুরি বা পর্যটনের উত্তেজনায় মনে যে ছাপ পড়ে, তা থেকে এই ছাপগুলোর প্রকৃতিই আলাদা।
৮. মসজিদে নববির ঐশ্বর্যময় শৈলী
মসজিদে নববির সৌন্দর্য আমাদের মনে নাড়া দিয়েছে। মসজিদে নববির স্থাপত্যনকশা ইতিহাস আর আধুনিকতার সংমিশ্রণের এক ঐশ্বর্যময় উপস্থাপন। অনেকগুলো নামাজের হল, বিশাল খোলা আঙিনা ও পার্কিং এলাকা নিয়ে গঠিত এই মসজিদে ১০ লাখের বেশি মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। আম্মার হাঁটুর সমস্যার কারণে হাঁটায় অসুবিধা হয়, তাই হোটেল থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে মসজিদের নিচে পার্কিং এলাকায় এসে নামি। পার্কিংয়ের বিষয়টা প্রথম দু–এক দিন বুঝতে পারিনি। গাড়িগুলো গেট থেকে একটু দূরে নামিয়ে দিয়ে যেত। অথচ মসজিদের নিচে টানেলের আদলে গড়ে তোলা সুপরিকল্পিত এই পার্কিং থেকে মসজিদের যেকোনো জায়গায় কম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব। পার্কিং থেকে লিফটে সোজা ওপরে মসজিদ চত্বরে ওঠা যায়। পার্কিংয়ের সঙ্গে নিচেই অজুর স্থান, টয়লেট ও গোসলের ব্যবস্থা করা আছে। মসজিদের সম্পূর্ণ কাঠামোটি ভূগর্ভস্থ টানেল ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় শীতল রাখা হয়।
কিবলাতাইন মসজিদটি ইসলামের ইতিহাসে কিবলা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। মসজিদটি আধুনিক শৈলীতে নির্মিত হলেও ঐতিহ্যবাহী সৌদি জ্যামিতিক নকশা, হালকা পাথর আর মার্বেলে তৈরি।
খোলা আঙিনা ও ছাদে স্থাপিত হাইড্রোলিক্যালি নিয়ন্ত্রিত বিশাল ছাতাগুলো আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়। দিনের বেলায় রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য এগুলো খোলা হয়। ফজরের নামাজের পর আমি মুগ্ধ হয়ে ছাতাগুলো খুলতে দেখেছি, আবার মাগরিবের সময় বন্ধ হতে দেখেছি। মসজিদে নববির ছাদের ওপর কিছু সরিয়ে নেওয়া যায় এমন গম্বুজ রয়েছে। যখন আবহাওয়া শীতল থাকে এবং ছাদের ভেতরের অংশে বাতাস ও প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয়, তখন এই গম্বুজগুলোকে যন্ত্রের সাহায্যে ধীরে ধীরে পাশে স্লাইড করা হয়। ফলে ছাদের ওই অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আকাশ দেখা যায়। আমার কাছে এ ধরনের আধুনিক স্থাপত্য ও যন্ত্রকৌশল অসাধারণ মনে হয়েছে।
মসজিদের সবচেয়ে আইকনিক অংশগুলোর মধ্যে একটি হলো মহানবী (সা.) এবং প্রথম দুই খলিফা আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)–এর রওজার ওপরে অবস্থিত সবুজ গম্বুজ। এটি প্রথমে কাঠ ও পরে সিসা দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং এর বর্তমান সবুজ রং উসমানি আমলে করা। অভ্যন্তরীণ সজ্জা উসমানি ক্যালিগ্রাফি এবং অলংকৃত টাইলস যুক্ত। উসমানি খিলাফত মসজিদের স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। বর্তমান নকশায় একাধিক উঁচু মিনার রয়েছে, যা মসজিদের বিশালতা প্রকাশ করে। উঁচু মিনারগুলো ঐতিহ্যবাহী উসমানি ও মামলুক স্থাপত্যের মিশ্রণ। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বয় সাধন করে সৌদি রাজবংশ মসজিদের বিশাল সম্প্রসারণ করেছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক নির্মিত আদি মসজিদটির সংস্কার যুগে যুগে বিভিন্ন খলিফা ও মুসলিম শাসকদের দ্বারা প্রসারিত ও অলংকৃত হয়েছে। বর্তমানে নারী আর পুরুষের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা, অজু করার জায়গার সুন্দর বন্দোবস্ত করা আছে। প্রতিটি নামাজের ঘরের ভেতর ও বাইরে ঠান্ডা আর সাধারণ পানি পানের সুন্দর বন্দোবস্ত করা আছে। একজন মুসল্লির সুন্দরভাবে ইবাদত করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার প্রায় সব সুবিধা করা আছে। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা আর সেবার মান বিবেচনায় তা বিশ্বমানের। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা আর পানি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত কর্মীর বেশির ভাগ বাংলাদেশি আর পাকিস্তানি। বাংলাদেশ থেকে সফরকারীদের জন্য এটা একটা বাড়তি সুবিধা, কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে তাঁদের সহযোগিতা নেওয়া যায়।
মসজিদে নববির আজান শ্রুতিমধুর, নামাজের কিরাত পাঠ অসাধারণ কোনো সুর। এখানের কোনায় কোনায় যেন শান্তির বীজ রোপণ করা আছে। কী অদ্ভুত মুগ্ধতা যেন ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রাখা আছে এই জায়গার জল, মাটি, আকাশ আর বাতাসে। এই অনুভূতি আমার কাছে নতুন, আমি এই পরিস্থিতির কাছে অপরিচিত এবং এই বৈচিত্র্যে আমি অনভ্যস্ত বলে এই পরিবেশ আমার কাছে কখনো অদ্ভুত, কখনো আশ্চর্যজনক। আমার মনের প্রতিক্রিয়া স্বভাবতই প্রবল ও ইন্দ্রিয়ের সচেতনতা অনেক গুণ সূক্ষ্ম। মসজিদে নববি নিজের সত্তায় আশ্চর্য ও অপরূপ।
৯. মদিনার মায়াময় বিকেল
আমাদের দিনপঞ্জিতে গোলকধাঁধা লেগেছে। ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, এশা—এই পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের সঙ্গেই প্রত্যহিক কাজকর্ম, আহার আর ঘোরাঘুরি জড়িয়ে গেছে। আসর, মাগরিব আর এশার নামাজের মধ্যে বিরতি কম, আহার–নিদ্রার ঝামেলাও নেই। তাই আসর নামাজ পড়ে আমরা আর হোটেলে ফিরি না। এ সময়ে আমি আর রুনা মদিনার অলিগলি ঘুরতে বের হই। কখনো আমরা ঘড়ি ধরে হাঁটি মসজিদে নববির বাইরে উত্তর দিকের কোনো রাস্তা ধরে, আবার কখনো মসজিদে নববির বাইরে দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে। আবার কোনো দিন পশ্চিম দিকে তো, আবার কোনো সময় উত্তর–পূর্ব দিক বারাবর। প্রতিবারই আমাদের সময় নির্দিষ্ট থাকে দুই ঘণ্টা। এই দুই ঘণ্টাকে দুই ভাগ করে আমরা সামনে এগোতে থাকি আর পিছিয়ে আসি। উল্লেখ্য, আসর ও মাগরিবের নামাজের সময়ের ব্যবধান দুই ঘণ্টার বেশি। এ সময়কে আমরা কাজে লাগাই আশেপাশের জায়গাটা ঘুরে দেখতে। আমাদের হোটেল মসজিদে নববির দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। দক্ষিণ দিকটা, বিশেষ করে বিলাল (রা.) মসজিদের এলাকা এখন ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্থাপনা নির্মাণের কাজ শেষ হলে এ জায়গার চেহারা পাল্টে যাবে। তারপরও এখন যেটুকু আছে, তা–ও বেশ সুন্দর ও পরিপাটি। শপিং মল আর হোটেলের বড় বড় দালান খেজুরের দোকান, উপহারসামগ্রী ও কাপড়চোপড়সহ নিত্যসামগ্রীর দোকান আর বহুতল মলে ভরপুর।
উত্তর দিকটার চেহারা একদম ফিটফাট আর কেতাদুরস্ত। উত্তরের গেট দিয়ে বের হলে আকাশ ঢেকে যাবে তারকা হোটেল আর বিপণিবিতানের আলোকঝলকানিতে। কী নেই এখানে—গিফট শপ, খাবারের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ, মার্কেট, ফুড কোর্ট। উত্তর পশ্চিম কোনে বিভিন্ন দেশের নামকরা খাবারের দোকান দিয়ে সাজানো মেলার আকারে গড়ে তোলা ‘গ্লোবাল ফুড ভিলেজ’ ফুড কোর্টটি বৈচিত্র্যপূর্ণ। স্থানীয় সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের সিগনেচার খাবার—মান্দি (সুগন্ধি চালের ওপর ধীরে ধীরে রান্না করা ভেড়া বা মুরগির অত্যন্ত নরম মাংস দেওয়া), কাবসা (মাংস ও মসলাদার চাল দিয়ে তৈরি), শাওয়ারমা (ম্যারিনেট করা মুরগি বা গরুর মাংসের পাতলা স্লাইসগুলো গরম রুটির মধ্যে সালাদ ও সস দিয়ে পরিবেশন করা, আমাদের দেশে শর্মা নামে পরিচিত), ফালাফেল (ভাজা ছোলা বা ডাল দিয়ে তৈরি ছোট বল, ব্রেড বা স্যান্ডউইচের সঙ্গে পরিবেশন করা)। এ ছাড়া আছে আন্তর্জাতিক ও অন্যান্য সিগনেচার খাবার, যেমন ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি বিরিয়ানি, কাবাব, আফগানি পোলাও ও মাংসের পদ; টার্কিশ সিগনেচার খাবার ডোনার, বখলাভা, টার্কিশ ডিলাইট, কুনাফা ইত্যাদি। আরও আছে রকমারি আইক্রিমের দোকান—মদিনা রোজ আইসক্রিম, আজওয়া আইসক্রিম। এই ফুড কোর্টের রোজ আইসক্রিমের বিক্রয়প্রক্রিয়া আমাদের খুব আকর্ষণ করে। রুনা আইসক্রিমের অর্ডার করতেই দোকানি ভদ্রমহিলা গোলাপের পাঁপড়ি এনে রুনার ওপর ছিটাতে থাকেন। এরপর গায়ে গোলাপের সুগন্ধিযুক্ত স্প্রে করে চমৎকার একটি আইসক্রিম হাতে তুলে দেন। আইসক্রিমটি স্বাদও ছিল খুব মজাদার।
আমি আর রুনা উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াই কলেজ পলাতকের মতো, কিন্তু পরের ক্লাসে ফিরতে হবে। আমাদের বেড়ানোও উদ্দেশ্যবিহীন—কোথাও পৌঁছানোর গরজ নেই। পথে পথে কেবলই নানা ছুতোয় দেরি করা। একেক দিন একেক পদের খাবার কিনি। এখানে একটু দাঁড়াই, ওখানে একটু দেখি। কবুতরগুলোকে খাবার দিই, ঝাঁকে ঝাঁকে ওদের উড়ে যাওয়া দেখি, কবুতরের সঙ্গে মানুষের সখ্য বোঝার চেষ্টা করি। না, ওরা পোষ মানে না, ওরা দায়িত্বহীন, ওরা মুক্ত, স্বাধীন। এ সময়ে আমরাও মুক্ত, আমরাও ওই পাখিদের মতো দায়িত্বহীন! কিসের সুগন্ধ নাকে লাগল! আরবের আতরের সুবাস গায়ে মাখি। স্মৃতির হাওয়ায় খুঁজে ফিরি এমন সৌরভ কোন সুগন্ধির? গতকাল যে সুগন্ধি ভালোবেসে কিনেছিলাম, এর সঙ্গে নতুনটার পার্থক্য কী! ভাবনার কত রঙিন সুতা ঢিলে হয়ে ঝুলে পড়ে, জড়িয়ে যায়; সেগুলোকে মেলানো যদি না যায় তো না-ই গেল। প্রতিটি আলাদা সুতা উজ্জ্বল হয়ে থাক স্মৃতির জাদুঘরে।
আমরা মাগরিবের নামাজ আদায় করতে ফিরে আসি। এর মধ্যে মদিনার বিরাট আকারের অপূর্ব ছাতাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাইরে নামাজে দাঁড়ালাম, মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ। আকাশ অন্ধকার হতে থাকে, আর মদিনার অপূর্ব বাতিগুলো অপরূপ আলো ছড়িয়ে মায়াময় করে তোলে জায়গাটা। খোলা জায়গায় বসলে আকাশের দিকে তাকানো আমার স্বভাব। চাঁদ অর্ধচন্দ্রের দশা পার করে প্রতিদিন পূর্ণিমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, আকাশ অর্ধেকের বেশি আলোকিত। এত আলোর বন্যায় তারাগুলো তেমন চোখে পড়ে না। এশার আজান হলো, আমি আর বাবা নামাজ শেষ করে আম্মা আর রুনাকে নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।
১০. কবরের প্রান্তর জান্নাতুল বাকি
মসজিদে নববির প্রতি ওয়াক্ত নামাজের শেষে জানাজার নামাজ অবধারিত। আল্লাহর কুদরত! তিনি প্রতি ওয়াক্তে জানাজার নামাজের মাধ্যমে যেন বান্দাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। আমি যে কদিন এখানে নামাজ পড়েছি, নামাজের শেষে জানাজার নামাজ পেয়েছি। বাবার কাছ থেকে জানলাম, তিনিও যে কয়বার হজে আর ওমরায় এসেছেন—একই অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। বাবা আরও যোগ করলেন, মক্কার কাবা শরিফেও এমন হয়।
ফজর নামাজ শেষ করে জান্নাতুল বাকিতে জিয়ারতে চলে আসি। ভোর আসছে ছোট্ট পা ফেলে, আকাশে দপ দপ করে একটা তারা জ্বলছে—ধ্রুব তারা! উত্তরে সে স্থির। জ্যোৎস্নার শেষ ছায়া মিলিয়ে গেছে; ভোর হলো। দিনের আলো ফুটছে, তামাটে মাটির রাস্তা দিয়ে অতি আস্তে আমরা চলেছি। পথের দুই ধারে অজস্র কবর। এমন আকাশের নিচে আর কখনো আমি দাঁড়াইনি, নিস্পন্দ শান্তিময় কবরের প্রান্তর জান্নাতুল বাকি। আমার বড় মামাকে কবরস্থ করা হয় জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে। আমাদের জীবনে এক জ্যোতির্ময় আতঙ্কের নাম মৃত্যু—কবরস্থানই এটা সবাইকে মনে করিয়ে দেয়।
মসজিদে নববির পূর্ব দিকে অবস্থিত জান্নাতুল বাকি ইসলামের প্রাচীনতম ও গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থান। মহানবী (সা.) হিজরতের পর এটিকে মুসলমানদের কবরস্থান হিসেবে নির্ধারণ করেন। এখানে তাঁর পরিবারের সদস্য, প্রায় ১০ হাজার সাহাবা (রা.) এবং খলিফা উসমান (রা.)–সহ বহু বুজুর্গ শায়িত আছেন। অতীতে এখানে গম্বুজ ও মাজার ছিল, তবে আঠারো শতকে আল সৌদ কর্তৃপক্ষ সেগুলো ধ্বংস করে খোলা প্রাঙ্গণ করে। বর্তমানে ফজর ও আসরের পর পুরুষদের জন্য জিয়ারতের সুযোগ থাকে। মহানবী (সা.) নিজেও নিয়মিত এখানে জিয়ারত করতেন।
হাজারো কবরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তাটি কখনো বাঁয়ে কখনো ডানো অসংখ্য শাখা–প্রশাখা মেলে এগিয়ে গেছে। এ যেন বিশাল কবরের সমুদ্র, দিগন্ত বিস্তৃত কবরের মাঠ! চোখ কোথাও বাধা পাই না। পথের দুই ধারে নেই কোনো গাছের সারি, নেই কোনো পাখির ডাক। আমরা হাজার হাজার মানুষ হেঁটে চলেছি লাখ লাখ কবরের মধ্য দিয়ে। আমাদের নাকে সকালের গন্ধ, পথে আলো–ছায়ার জাল বোনা, মুখে দরুদ আর কানে হাজার মানুষের হেঁটে যাওয়ার শব্দ। হাঁটতে হাঁটতে রোদ ফুটল, পুরোটা হেঁটে শেষ করতে পারব না। ডানে বাঁক নিলাম, বের হওয়ার পথ ওই দিকেই। বাঁক ফিরতেই বিশাল আকাশের পটভূমিতে দেখা দিল মসজিদে নববি, রসুলুল্লাহ (সা.)–এর রওজার ওপর সবুজ গম্বুজ, মিম্বরসহ পুরো মসজিদ—অপূর্ব হয়ে ফুটে আছে। চলবে...
লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা