চীন দেশে বাউল বেশে: শেনঝেন পর্ব
সাংহাই, ইউ ঘুরতে ঘুরতে নিজেদের ইবনে বর্তুতার ভাতিজা ভেবে যা খুশি, যেমন খুশি করে দিন পার করছি। ইউতে এসে কেনাকাটার মোহ লেগেছিল আমাদের সবার। একেকজনের কেনাকাটা যেন অন্যকে ছাড়িয়ে যায়, সেইভাবে কেনা হচ্ছে। তবে কোনোটাই তেমন দামি জিনিস নয়। ছোটদের স্কুলব্যাগ, জুতা, খেলার সামগ্রী। সুফিয়ান ভাই তিনজোড়া জুতা দু শ ইউয়ান দিয়ে সস্তায় কিনে আনন্দিত। আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না, দিন শেষে রিপন ভাই চার জোড়া জুতা অন্য দোকানে দেড় শ ইউয়ান দিয়ে কিনে নিয়েছে! আবার চার জোড়া কেনা হলো রিপন ভাইয়ের দামে। দিনভর প্রয়োজনীয়–অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হলো। এভাবে ওজনের ঝুলি কখন বিশ কেজি পেরিয়ে গেছে, সেদিকে খেয়াল নেই কারও।
ইউ বিমানবন্দরের লাগেজ ওজনে দিতেই সবার ঘোর কাটল। আমাদের ব্যাগেজ লিমিট প্রতিজন ২০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে। অনেক জিনিস বড় লাগেজ থেকে সরিয়ে হাতে নিলাম, বুকিংয়ে সবার ব্যাগের ওজন যোগ করে গড় করার পরও ১০ কেজি বেশি। এই বাড়তি ওজনের টাকা গুনতে হবে। রিপন ভাই চায়না সাউদার্ন কর্তৃপক্ষের ওপর খেপে গেলেন, ‘আটজন মানুষ তোদের দেশে বেড়াতে এসেছে সবার মিলে ১০ কেজি না হয় বেশি হলো, তাই বলে বাড়তি পয়সা দিতে হবে!’ রাগ, অনুনয় কিছুই কাজে এল না, বাড়তি ওজনের পয়সা দিতে হলো।
শেনঝেন এলেই স্মৃতির বাক্স আমরা খুলে বসি। সুখের স্মৃতি, দুঃখের স্মৃতি, সফলতার আর প্রবঞ্চনার কহিনিগুলো মনে ফিরে আসে। পছন্দের মেনু সাবাড় করতে করতে আমরা স্মৃতিগুলো উজ্জীবিত করছিলাম।
উড়োজাহাজ শেনঝেন স্পর্শ করল, তখন রাত ১২টা। রাত এখানে কোনো ব্যাপার নয়। মেট্রোরেল যদিও বন্ধ হয়ে গেছে, বিমানবন্দরে বাস সার্ভিস চালু আছে। সবাই টিকিট কেটে চেপে বসলাম, গন্তব্য হুচেং-বে। এখান থেকে আমাদের কাজকর্মের সুবিধা পাওয়া যায়। শেনঝেন শহরটি হংকংয়ের একদম পাশে। কম্পিউটার আর ইলেকট্রনিকস পণ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে অনেক কলকারখানা গড়ে উঠেছে। শহরটি একদম শুরু থেকে যেন আমাদের বয়সের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। প্রথমবার যখন শেনঝেন আসি, তখনো শহরটি পাহাড় আর নির্মল প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। নতুন নতুন বহুতল ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে, কোনোটার লৌহ কঙ্কাল দেখা যাচ্ছে, কোনোটার কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। আমরা তখন হংকং হয়ে চীনের শেনঝেন শহরে প্রবেশ করতাম। হংকং অন-অ্যারাইভেল ভিসা দিত। হংকং থেকে জলপথে, রেলপথে আর মেট্রোরেলে চীনের শেনঝেনে প্রবেশ করা যেত। এখন হংকং ভিসা বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধই বলা যায়। দালানের জঞ্জালে ঢাকা হংকং থেকে শেনঝেন এলে মনে হতো শ্বাস নিতে পারছি। বাংলাদেশের তুলনায় নিঃসন্দেহে হংকং অনেক উন্নত, তখনো ছিল আজও আছে। তাই হংকং গেলে ওখানেও ঘুরে বেড়াতাম। মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর আমি হংকংয়ে প্রথম দেখি। পৃথিবীর বিখ্যাত সব মানুষের মোমের মূর্তি বানিয়ে কি সুন্দর করে রাখা আছে। প্রিয় তারকাদের মূর্তিগুলোর সঙ্গে কত রকম ছবি যে ডিজিটাল ক্যামরায় তোলা হলো। ছবিগুলোও সব এখন আর নেই; কিন্তু মনের পর্দায় আঁকা আছে স্মৃতি হয়ে সবকিছু।
তুসোর জাদুঘর দেখার জন্য ট্রামে চড়ে পাহাড়ের চূড়ায় চড়তে হয়েছিল, জায়গার নাম ‘ভিক্টোরিয়া পিক’। ওপর থেকে পুরো হংকং দেখা যায়। দ্বিতীয়বার যখন হংকং ভ্রমণ করি, যাত্রাসঙ্গী ছিল স্কুলের বন্ধু আমার মিতা কামরুল। সেবার আমরা পুরো হংকং, আইল্যান্ড আর কাউলুন শহর হেঁটে বেড়িয়েছি। ছোট শহর, তেমন কষ্ট হয়নি। আমরা হংকংয়ের অলিগলি, রাস্তাঘাট হেঁটে হেঁটে দেখেছি। সময়টা ছিল দারুণ, বয়সও ছিল কম। তবে আমরা হতাশ হয়েছিলাম হংকংয়ের সমুদ্রসৈকত দেখে! এত ছোট সৈকত, আমাদের সমুদ্রসৈকতের কাছে কিছুই না। যেকোনোভাবে দেশকে এগিয়ে রাখতে পারলে মন খুশি হয়।
প্রায় ২০ বছর আগের কথা, ওই সময় চীন দেশের কথা শুনলে চীনাদের বিশেষ কায়দায় বানানো কাঠের ঘরবাড়ি, কুংফু কারাতে, সাপ, ব্যাঙ—এগুলো মাথার মধ্যে চণ্ডী পাকাত। হংকং, শেনঝেন, সাংহাই, চিনদাও—ওই সব শহর ঘুরে দেখার পর সেই সব মান্ধাতার আমলের ধারণা চিরতরে দূর হয়ে যায়। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, পৃথিবীর ইতিহাস চীনারা অন্যভাবে লেখা শুরু করেছে। আধুনিক চীন ওই বিবর্তনের বর্তমান রূপ, যা আরও বহুদূর যাবে। তখনো চীনারা ইংরেজি বোঝে না। ইংরেজি বলতে পারে বা লিখতে পারে গুটি কয়েকজন।
আমাদের বিমানবন্দরে বাসটা দাঁড়াচ্ছে না বিশেষ। বেশ ভিড়, অনেক লোক দাঁড়িয়েও আছে। শহরের কাছে আসতেই বাস স্টপেজে লোকজন নামতে লাগল। রাস্তায় গাড়ির ভিড় নেই, আমাদের দেশে হলে নিজের সুবিধামতো রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে লোকজন নামত! এখানে লোকজন নিয়ম মেনে বাসস্টপেজেই নামছে। গাড়িগুলো সিগন্যাল মেনে চলেছে। চীনারা আইনকে শ্রদ্ধা করে। বাল্যবন্ধু কামরুলসহ যে বছর শেনঝেন আসি, সেই সময় আমার সাপ্লাইয়ার ফ্লান্টা রাতে ডিনার শেষে হোটেলে নামিয়ে দেওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। গাড়ি আট লেন প্রশস্ত রাস্তায় চলছিল, এই রাস্তাগুলোর স্পিড লিমিট ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এই রাস্তাগুলোয় লোক পারাপারের জন্য আন্ডারপাস করা থাকে। হঠাৎ এক লোক ওর গাড়ির সামনে এসে পড়ে, ওই সময় তার গাড়ি গতিসীমার সর্বোচ্চ চলছিল। ধাক্কাটা বেশ জোরে ছিল। ফ্লান্টার গাড়ির সামনের গ্লাস ফেটে যায়, লোকটি প্রায় ১০ মিটার উড়ে গিয়ে পেছনে পড়ে। ফ্লান্টা ওর গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করে রাস্তার যে লাইনে চলছিল ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে। আমরাও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বসে রইলাম গাড়িতে। কোনো লোকজন জটলা করল না, অন্য গাড়িগুলো পাশ কাটিয়ে গেল। পাঁচ মিনিট পর রোডের ডিভাইডারে এক লোককে ওয়াকিটকি নিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলাম। আরও ১০ মিনিট পর অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি এল। পুলিশ গাড়ি থানায় নিয়ে গেল। ফ্লান্টা ট্যাক্সিতে আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফ্রেশ হতে গেল। পরদিন ওর অফিসে গিয়ে জানলাম, সকালে ফ্লান্টা থানায় গেলে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গাড়ি তাকে দিয়ে দেয়। গাড়ি গ্যারেজে রিপেয়ার করতে দেওয়া হয়েছে, ইনস্যুরেন্স করা আছে। লোকটি হাসপাতালে আছে, বেঁচে আছে ও শঙ্কামুক্ত। সে মাতাল হয়ে রাস্তার মধ্যে চলে আসে। আসলে পুরো ব্যাপারটায় ফ্লান্টার কোনো দোষ ছিল না। আমরাও ভারমুক্ত হলাম। ২০ বছর আগের চীনের সভ্যতার গল্প এটা।
আরেকবার তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটল ডলার ভাঙানোর সময়। রিপন আর জুয়েল ভাই ডলার ভাঙাতে গেলে দোকানি চোখের পলকে হাতের কারসাজিতে ১০ হাজার আর এমবি গায়েব করে দেয়! পুলিশে অভিযোগের উপায় ছিল না। কারণ, যাদের থেকে টাকা ভাঙানো হয়, তারা সরকার অনুমোদিত নয়।
শহরের মধ্য দিয়ে চলছে আমাদের বাস। ভিড় কম, দাঁড়ানো যাত্রী আর নেই। বড় বড় দালান মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে জানান দিচ্ছে আমরা গন্তব্যের কাছাকাছি চলে এসেছি। কাঙ্ক্ষিত স্টপেজে বাস থামতেই বাক্স–পেটরা নিয়ে নেমে গেলাম। হোটেল আগেই বুক করা অনলাইনে। জুয়েল আর রিপন ভাই বাস থেকে নেমে এত জোরে হাঁটা ধরল, হোটেলের পথে যেন আমরা কেউ আর সঙ্গে নেই! ওরা দুজন কার আগে কে পৌঁছাবে তার প্রতিযোগিতা চলল। ব্যবসায়ী বন্ধু হলে যা হয় আরকি, একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে। ‘সুজন’ কথাটি আমাদের মন থেকে হারিয়ে যায়! শেনঝেনের এ রাস্তা আর গলিগুলো আমাদের নখদর্পনে। বাস থেকে নেমে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম। হোটেলে পৌঁছে রুম বুঝে নিয়ে একটু গোলমালের মধ্যে পড়ে গেলাম। ৩০০ স্কয়ার ফিট ডবল বেডরুম বুক করা হয়েছিল। রুমের সাইজ আর বেড দুটি ঠিক আছে; কিন্তু বেড দুটি দুটো ডাবল বেড হবে ধরে আটজনের জন্য দুটি রুম বুক করেছিলাম। এখন দেখছি বেডগুলো ডাবল না। বালিশ, লেপ–তোশকও দুজনের জন্য দেওয়া। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে অতিরিক্ত বালিশ আর লেপ–তোশক জোগাড় করতে হলো। এরপর বের হলাম খেতে। পাশেই মুসলিম রেস্তোরাঁ আছে। শেনঝেন এলেই স্মৃতির বাক্স আমরা খুলে বসি। সুখের স্মৃতি, দুঃখের স্মৃতি, সফলতার আর প্রবঞ্চনার কহিনিগুলো মনে ফিরে আসে। পছন্দের মেনু সাবাড় করতে করতে আমরা স্মৃতিগুলো উজ্জীবিত করছিলাম।
দুই বছর আগে এই মুসলিম রেস্তোরাঁয় খাবার শেষ করে হোটেলে ফিরে দেখি আমিন ভাইয়ের পকেটে মানিব্যাগ নেই! মানিব্যাগে প্রায় এক হাজার ডলার আর ক্রেডিট কার্ড ছিল। ক্রেডিট কার্ডেও অনেক ডলার এনডোস করা। সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করা হলো, রেস্তোরাঁ, হোটেলের রুমে, হোটেলের পাশের পার্কে। খুঁজে না পেয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হলো। সারা রাত আমি, আমিন আর রিপন ভাই থানায়। পুলিশ সকালে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের গতিবিধি রেকর্ড করা সিসিটিভি ফুটেজ দেখাল, কোনো কূলকিনারা ওরা পায়নি। আমরাও কিছু দেখলাম না, ভোজবাজির মতো মানিব্যাগটি গায়েব হয়ে গেল। অথচ আমরা নিশ্চিত, মানিব্যাগ আমিনের সঙ্গেই ছিল। ওখান থেকে টাকা দিয়ে সে কোমল পানীয় কিনে বিল মিটিয়েছিল, এক বয়স্ক ভিখিরিকে টাকা দিল। হোটেলে ঢুকে দেখে পকেটে মানিব্যাগ নেই। চীনের সিসিটিভি ক্যামরার নিরাপত্তাবলয় ব্যর্থ! আমাদের সন্দেহ হলো ওই বয়স্ক ভিখিরিকে, যে টাকা দেওয়ার পর আমিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। ঠিক ওই জায়গায় সিসিটিভি ফুটেজও অস্পস্ট ছিল।
আরও তিন বছর আগে মোশাররফ ভাইয়ের সঙ্গে ওই রকম ঘটনা ঘটেছিল। শপিং করে হোটেলে ফেরার সময় ট্যাক্সিতে মোশাররফ ভাই মুঠোফোনটি ফেলে আসে। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে তারা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি বের করার জন্য। সিসিটিভি ফুটেজে সব দেখা যাচ্ছিল শুধু গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি স্পস্ট দেখা যাচ্ছিল না। ফোনটি আর পাওয়া গেল না। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী, আমরা জানি মুঠোফোন নম্বর ট্র্যাক করেও চাইলে চেষ্টা করা যায়। বিভাষীয় চীনাদের বোঝানো কঠিন। আরেকবার তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটল ডলার ভাঙানোর সময়। রিপন আর জুয়েল ভাই ডলার ভাঙাতে গেলে দোকানি চোখের পলকে হাতের কারসাজিতে ১০ হাজার আর এমবি গায়েব করে দেয়! পুলিশে অভিযোগের উপায় ছিল না। কারণ, যাদের থেকে টাকা ভাঙানো হয়, তারা সরকার অনুমোদিত নয়। এ ছাড়া তাদের থেকে টাকা গুনে বুঝে নেওয়া হয়েছে! হোটেলে এসে দেখা যায় ১০ হাজারের একটা বান্ডিল গায়েব। এর পর থেকে আমরা ব্যাংক ছাড়া ডলার ভাঙাই না। বর্গাকার পৃথিবীর চীনে অনেক কিছু হতে পারে।
গল্পে গল্পে অনেক রাত হলো। রুমে ফিরে বিছানায় পড়ে ঘুমিয়েছি নাকি ঘুমিয়ে বিছানায় পড়ছি জানা নেই। পরদিন ঘুম ভাঙল ঝকঝকে রোদের আলোয়। সাংহাই বা ইউয়ের মতো শীত নেই, যা আছে তা অগ্রহায়ণের শীত স্পর্শমাত্র। সোজা জুয়েল ভাইদের রুমে গেলাম। জুবায়ের সেদ্ধ ডিম আর নুডলস প্রস্তুত করে রেখেছে, রিপন ভাই চা বসিয়ে অপেক্ষায় কখন চায়ে বলক আসবে। দ্রুত সবাই নাশতা শেষ করলাম, সবার অনেক কাজ। এখানে আমাদের ব্যবসায়ী বন্ধু অনেক। একেকজন একেক পণ্যের ব্যাপারী। সকালবেলা আমরা যার যার মতো বের হই, ফু হুয়া রোড ধরেই সবাই হেঁটে যায় কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে নিজের প্রয়োজনীয় পণ্যের সওদাগরের কাছে। চীনা সওদাগরেরা বেশির ভাগ নারী। দোকানে, কারখানায় পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কোনো জড়তা নেই, কোনে ভণিতা নেই। ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর পেশাদারি আচার–আচরণ তাঁদের। সারা দিন ব্যবসার কাজ করি, কাজের ফাঁকে একত্র হয়ে লাঞ্চ সারি। তেমন আহামরি কিছুই না চীনা হালাল চিহ্নিত নুডলসের প্যাকেট। প্যাকেটে দেয়া মসলা মিশিয়ে গরম পানি দিলেই খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। সন্ধ্যা ছয়টা বাজতেই অফিসগুলো বন্ধ হতে থাকে। আজকের জন্য কাজ শেষ করে সবাই একত্র হই কাছেই এক রেস্তোরাঁয়। তাও মুসলিম রেস্তোরাঁ, পাশেই অবশ্য ম্যাকডোনালস আছে। আমাদের পছন্দ মুসলিম রেস্তোরাঁর খাবার। স্যুপ আর বার্গার খেতে খেতে আলোচনা চলল, কার কী কাজ করতে হবে।
চীনের মার্কেটে এলেই আমার মনে প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে! আমাদের দেশে পুরোনো মুঠোফোন বা কম্পিউটার ই-গার্বেজ বলে আমদানিনিষিদ্ধ। কিন্তু চীনে এগুলো দিব্যি বেচাকেনা হচ্ছে। আসলে মেরামত করে যদি মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়, তা কী করে বর্জ্য হয়?
ব্যবসায়িক কাজের বাইরের কাজ এগুলো, কারও হয়তো দেশ থেকে বয়ে আনা মুঠোফোনের ডিসপ্লে বদলাতে হবে, কারও মুঠোফোনের ব্যাটারি, কারোবা একটি পুরোনো মুঠোফোন কিনতে হবে, আর কারও প্রয়োজন নতুন মুঠোফোন। সব কাজের জায়গা আমাদের আশপাশেই। এই রেস্তোরাঁটার পাশেই আছে পুরোনো মুঠোফোন ও এর যন্ত্রাংশের এক বিশাল মার্কেট। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পুরোনো মুঠোফোন এখানে সুলভে কেনা যায়। এ ছাড়া মেরামত করা যায় সব ধরনের মুঠোফোন। এই মার্কেটে এলেই আমার মনে এক প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে! আমাদের দেশে পুরোনো মুঠোফোন বা কম্পিউটার ই-গার্বেজ বলে আমদানিনিষিদ্ধ করা আছে; কিন্তু এই চীন দেশে এগুলো দিব্যি বেচাকেনা হচ্ছে। আসলে মেরামত করে যদি মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়, তা কী করে বর্জ্য হয়? বরং আমাদের মতে নিম্ন অর্থনীতির দেশে কম মূল্যে কেনা এসব পণ্য বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে। অবশ্যই এগুলো নিয়ে সিদ্ধান্তের জন্য দেশে সরকার প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন সবাই আছে! আমাদের মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় রইল না।
শেনঝেন সেগা মার্কেট এলাকায় আমাদের সব কাজকর্ম। প্রায় দুই তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা মল আর অফিস ভবনগুলোয় আমাদের কাজের প্রয়োজনে আনাগোনা। এখানে মলগুলোয় ঢুকলে চীনা ব্যবসায়ীরা অনেকে আমাদের চেনে, আমরাও তাদের চিনি। কেউ কেউ অনেক বছর আগে থেকে পরিচিত, আবার নতুন নতুন অনেকের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। হয়ে ওঠে ব্যবসার পরিকল্পনা। এখানে পরিচয়ের মাত্রাটা কেমন তার একটা উদাহরণ দিতে পারি। সেগ মার্কেটের নিচতলা থেকে দশ তলা পর্যন্ত যে ফ্লোরগুলো আছে, ওখানে আমাদের ওয়াইফাইয়ের জন্য মুঠোফোন ডেটা ব্যবহার করতে হয় না। কয়েক বছর ধরে যখনই এখানে এসেছি, কোনো না কোনো দোকানের সঙ্গে ব্যবসা হয়েছে, তাদের দোকানের ওয়াইফাই ধার করেছি। সেই ওয়াইফাই মোবাইলে রয়ে গেছে, দোকানের পাশে গেলেই মোবাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ওয়াইফাইয়ে সংযুক্ত হয়ে যায়! এ তালিকায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ রিপন ভাইয়ের মুঠোফোন, এরপর জুয়েল ভাই এবং ক্রমান্বয়ে আমাদের তালিকা! এখানে পরিচিত ব্যবসায়ীরা দেখা হলেই লাঞ্চ বা ডিনারের দাওয়াত দেয়; কিন্তু রিপন ভাইয়ের অবস্থান এই বিষয়ে একেবারেই না। তার বদ্ধমূল ধারণা এই লাঞ্চ বা ডিনারের টাকা চীনারা মালের দামের সঙ্গে নিয়ে নেয়! মালের দাম বাড়িয়ে দেয়। একবেলা খানা খাইয়ে তিনবেলার খাবারের দাম পণ্যের অর্ডারের সঙ্গে নিয়ে ফেলবে। রিপন ভাইয়ের ধারণা বা চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করা কঠিন। আমাদের ধারণা তিনি পাঠান, ভুলে বাংলাদেশে জন্মেছে। আমরা বাকিরা চীনাদের দাওয়াতে সাধারণত না করি না, পণ্যের দাম যা–ই হোক, তা পরে বিবেচনা করা হবে। চীনাদের বৈচিত্র্যময় খাবারের স্বাদ আগে উপভোগ করা যাক। তবে হালাল খাবারের বিষয়টি তাদের জানিয়ে দিতে হয়, না হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা।
মুঠোফোন সারার কাজ শেষ, সবার টুকিটাকি যা কেনার কেনা হয়েছে। মনজু ভাই এখন ডং বেং যেতে চায়। জামাকাপড়, জুতাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বিশাল বাজার এই ডং বেং এলাকা। সাংহাই আর ইউ বেড়াতে গিয়ে জিনিস, জামাকাপড় অনেক কেনা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানের লাগেজ কোটায় ২৫ কেজি ওজন, ২০ কেজি এরই মধ্যে অতিক্রম করে গেছে, যার জন্য চায়না সাউদার্ন এয়ারওয়েজ বাড়তি পয়সা নিল! এখন বিমানের কোটায় আরও ১৫ কেজি অবশিষ্ট থাকে, এগুলো পূরণ করতে হবে। এমনিতেই তো আর পূরণ হবে না, গাঁটের পয়সা খরচ করে জিনিস কিনতে হবে। আমাদের বিদেশভ্রমণ মধ্য বিত্তের চরকিবাজি, সব দেখতে হবে, সব জায়গায় ঘুরতে হবে। টাকা খরচ করা যাবে না। দেখার জন্যই না হয় গেলাম! বাজারে নতুন কী এসেছে, সস্তায় যদি ভালো কিছু পাওয়া যায়! ডং বেং যাওয়ার জন্য মেট্রোরেলের যে স্টেশনে নামতে হয়, তার নাম লাজু। সবার মেট্রোরেলের কার্ড করা আছে, মাটির নিচে ঢুকে গেলাম মেট্রোরেলে চড়ার জন্য। কার্ড পাঞ্চ করে লাইন দুইয়ে দাঁড়াতেই বাতাসে শিস দিয়ে ট্রেন হাজির। দুই স্টেশন পরেই লাজু, মেট্রোরেলভর্তি মানুষ, সবাই ছুটে চলছে যার যার গন্তব্যে। আমরা পৌঁছে গেলাম, মাটি ফুঁড়ে উঠলেই ডং বেং। হাজারো মানুষের মেলা চারদিকে। ছোট ছোট জটলায় টিকটক ভিডিও বা সোশ্যাল মিডিয়া লাইভ স্ট্রিমিং চলছে। ক্যামরা, লাইট, স্পিকার বেশ জমজমাট অবস্থা। এ রকম ছোট ছোট অনেক দল পেরিয়ে এসেছি, একেকজন একেক ধরনের সংগীত পরিবেশন করছে চীনা ভাষায়। গানের ভাষা বোঝা গেল না। কেউ গাইছে বেশ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে, কেউ গাইছে নেচে-কুঁদে! মানুষ নিজের চিত্তের শান্তির জন্য কত প্রক্রিয়া যে উদ্ভাবন করেছে, তার মধ্যে সংগীত অন্যতম। মনজু ভাইয়ের গায়ক মন চঞ্চল হয়ে ওঠে চারদিকের সুরের মূর্ছনায়। মনজু ভাই খুব আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, ‘গান একটা গাইব?’ একমুহূর্ত চুপ করে থেকে আমি বলি, ‘আমিও সেই কথাটাই ভাবছিলাম।’ অন্যদের সম্মিলিত অসহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত নিবৃত্ত হলাম!
টাকাপয়সা তেমন একটা বাঁচানো গেল না, প্রথম কেনাকাটা রিপন ভাই শুরু করল। জুয়েল ভাই রিপন ভাইকে টেক্কা দিয়ে একই জিনিস দুই টাকা কম দামে কিনল, মনজু ভাই রিপন ভাই আর জুয়েল ভাই দুজনের মতো দুইটা কিনে নিল। সুফিয়ান ভাই সবাইকে টেক্কা দিয়ে আরও কিছু সংযোজন করে প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলল। আমরা বাকিরা সুবিধাবাদীর মতো তুলনামূলক সর্বনিম্ন মূল্যটা সাদরে গ্রহণ করে বাজারে বিক্রির উচ্চগতি অব্যাহত রাখলাম। ১১টা মেট্রোরেলের শেষ সময়। কেনাকাটায় খরচ যা গেছে যাক, ট্যাক্সির জন্য বাড়তি ভাড়া গোনা যাবে না। মেট্রোরেল ধরতে মাটির তলায় ঢুকলাম। আমাদের হোটেলের একদম পাশে মেট্রোস্টেশন। সেখানে নেমে আমি রিপন আর মনজু ভাই ওয়ালমার্টে গেলাম বাজার করতে আর অন্যরা হোটেলে ফিরে গেল।
ওয়ালমার্টে অফার দেখলেই রিপন ভাইয়ের চেহারা চকচক করে ওঠে, চোখ ভেতর থেকে খানিকটা বের হয়ে আসে। রিপন ভাই ডগমগ হয়ে বলল, ‘বিশটা ডিম সতের ইউয়ান আর ত্রিশটা ডিম উনিশ ইউয়ান! দেখলে, কি অবস্থা?’ খুশিতে তার দাঁত সব বের হয়ে আসছিল। এরপর আবিষ্কার করল যে পুডিং সাধারণত পাঁচ টাকায় কেনা হয়, এখন তা মাত্র দুই টাকা। মুরগির রান আর হাঁস কেনা হলো। রাতের খাবার রান্না করা হবে আজ, ওয়ালমার্টে এই শেষ সময়ে অনেক কিছু হ্রাসকৃতমূল্যে বিক্রি হয়। হাঁস, মুরগি, সবজি, ডিম আর পুডিং কিনে রুমে ফিরে এসেই রান্না শুরু হলো। এখানে রান্নার আয়োজন মানে মিনি পিকনিক। সারা দিনের খাটাখাটুনির শারীরিক ক্লেশ নিমেষেই বিলীন হয়ে যায় এই সময়। আমাদের আড্ডা চলতে থাকে, চলতে থাকে কথার ফুলঝুরি। এর মধ্যে ঝগড়া চলে, চলে তর্কের যুদ্ধ। ঝগড়া–তর্ক যত প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক হোক, তা টিকে থাকে শুধু কয়েকটি মুহূর্ত। বিতৃষ্ণার ভার বেশি দূর বহন করা মানে সুন্দর মুহূর্ত নষ্ট করা। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নিটোল-মধুর মুহূর্তগুলো আমরা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি এখানে, যাতে প্রতিটি মুহূর্ত যেন হয়ে ওঠে জীবনের দুর্লভ সম্পদ।
রাত ভোর হয় চিরপরিচিত সূর্যোদয়ে, তবু চির নতুন প্রতিটি দিন। নাশতা শেষ করে আমরা বের হই যার যার কাজে, একে অন্যের কাজ শেয়ার করে নিই। আমি হয়তো যাব একটি পণ্যের অর্ডার করতে আমিন আর মোশারফ ভাই বলে দিল তাদের জন্যও ওই পণ্য অর্ডার করে দিতে। আমি দায়িত্ব নিয়ে অর্ডার করলাম আমিন আর মোশারফ ভাই উই চ্যাট বা আলী পে ব্যবহার করে মূল্য পরিশোধ করে দিল। আমিও নিজের প্রয়োজন এমন পণ্যে অর্ডার করার জন্য রিপন বা জুয়েল ভাইয়ের সাহায্য নিলাম। এতে কাজ সংক্ষিপ্ত হয়, সময় বেঁচে যায়। তবে কোনো জিনিসই নিরপেক্ষ শুভ নয়, ব্যবসার গোপনীয় কিছু ব্যক্তিগত বিষয়ও থাকে। আমাদের মধ্যেই কেউ হয়তো চলে গেছে অন্য কোনো বিক্রেতা বা সরবরাহকারীর কাছে, যার ঠিকানা সে অন্যদের জানাতে চায় না! আমরা দেখলাম আমাদের মধ্যে কেউ নির্দিষ্ট পণ্যের কিছু স্যাম্পল নিয়ে এল, কিন্তু কাউকে জানাল না কোথা থেকে কিনেছে! ব্যবসা বলে কথা, এভরি থিং ইজ ফেয়ার ইন ট্রেড অ্যান্ড ওয়ার!
সুফিয়ান ভাই আর মনজু ভাইয়ের গায়ে লেগে আছে পর্যটকের হাওয়া। মনজু ভাই সেগ মার্কেটে গান রেকর্ড ও লাইভ করার ইনস্ট্রুমেন্টস পেয়ে ওখানে বসে বসে সারা দিন গান করল! সুফিয়ান ভাই মুঠোফোনে তা রেকর্ড করে উই চ্যাট গ্রুপে পাঠাচ্ছে। বেশ আমোদে তারা সময় পার করছে। মনে হচ্ছে মনজু আর সুফিয়ান ভাই, তারা শেনঝেন এসেছে গান গাইতে! আমি আর জুয়েল ভাই এক সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে কাজ শেষ করে অন্য একজন সাপ্লায়ারের কাছে গিয়ে রিপন ভাইকে পেয়ে যাই। রিপন ভাই দুঃসংবাদ শোনাল। হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের রান্নার ইলেকট্রিক চুলা নিয়ে গেছে! রুম সার্ভিস রুম গোছাতে রিপন ভাইদের রুমে গেলে রান্নার জিনিস দেখে ম্যানেজারকে জানালে তারা চুলা নিয়ে যায়। উই চ্যাটে রিপন ভাইকে ম্যানেজার জানায় রুমে রান্না করা যাবে না। হোটেল ছাড়ার সময় তারা চুলা দিয়ে দেবে।
আমরা আগামীকাল সন্ধ্যায় শেনঝেন ছেড়ে চলে যাব, রাতে গুয়াঞ্জু থেকে দেশে ফেরার ফ্লাইট। সেই হিসাবে আগামীকাল ১২টায় আমাদের রুম ছাড়ার সময়। ওয়ালমার্ট থেকে কেনা চিকেনগুলো রাতে রান্না হওয়ার কথা, এখন কী হবে, সে ভাবনা মাথায় নিয়ে হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে রিপন ভাই চ্যাটে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রায় তিন–চার বছর ধরে শেনঝেন এলে এই হোটেল বা তার আশপাশের হোটেলে উঠি। সব হোটেলে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করি, কখনো সমস্যা হয়নি। যদিও হোটেল রুমে রান্নার অনুমোদন নেই; কিন্তু সব হোটেল কর্তৃপক্ষ তা জানত। আমরা বা আমাদের গ্রুপের কেউ না কেউ বছরের বেশ কয়েকবার শেনঝেন আসি। রান্নার সরঞ্জামগুলো হোটেলের স্টোররুমে জমা থাকে, যাতে পরে কেউ এলে ব্যবহার করতে পারে। তিন–চার বছর আগে যে হোটেলে থাকতাম, সেখানে সরাসরি ওদের কিচেনে রান্না করতাম। ওই হোটেল ভবনটি ভেঙে ফেললে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে আমরা অন্য হোটেলগুলোয় উঠি।
কাজের ভারে আরেক সন্ধ্যা আসে আমাদের হয়ে। হালকা খাওয়াদাওয়া শেষে এবার ঘোরাঘুরি। সুফিয়ান ভাই অ্যাপল সেভেনটিন প্রো ম্যাক্স কিনেছে। আমরাও সবাই কোনো কোনো মুঠোফোন সেট কিনলাম নিজের বা প্রিয়জনের জন্য। মনজু আর সুফিয়ান ভাই আবার ডং বেং যেতে চায়। জামাকাপড় কিনবে, আরও কত কী! আমাদেরও বিশেষ কোনো কাজ নেই, পৌঁছে গেলাম ডং বেং। আবারও সেই টিকটক, গানবাজনা জমজমাট একটা পরিবেশ। প্রয়োজন নেই তবু কেনা হলো আরও কিছু জামা; যুক্তি, এই দামে এই জিনিস দেশে পাওয়া যায় না! আমরা মধ্যবিত্ত আধুনিক বাঙালি, দুই টাকা বাঁচাতে বিশ টাকা খরচ করি! শপিং করলে নাকি দিমাক খুশ হয়ে যায়, দামের বাহারে আমার দিমাক ততটা খুশি না হলেও কেনা হলো কিছু কিছু। এবার ফেরার পালা। ডিনার মুসলিম রেস্তোরাঁয় হলো, তারপর হোটেল ঘরে গপ-শপ, মালপত্র গোছানো। কাল ছাড়তে হবে এই শহর। শেনঝেন থেকে গুয়াঞ্জু বিমানবন্দর প্রায় তিন শ কিলোমিটার দূরে। আমরা কীভাবে গুয়াঞ্জু বিমানবন্দরে যাব? আগামীকাল ১২টায় আমাদের হোটেল ছেড়ে দিতে হবে। বাকি সময়ের জন্য একটি রুম রাখা যায় কি না, এসব বিষয়ে আলাপ চলছিল। আমাদের বেশির ভাগের প্রস্তাব অন্য হোটেলে একটি রুম নেওয়া হোক। ওখানে রান্না করা যাবে, আর কাজের ফাঁকে কারও বিশ্রামের প্রয়োজন হলে রুম ব্যবহার করা যাবে। গুয়াঞ্জু যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করা হোক, আটজনের জন্য চারটি গাড়ি লাগবে যেহেতু বাক্স–পেটরা বেশি! রিপন ভাই বেঁকে বসল। তার মতামত, মেট্রোরেল ব্যবহার করে রেলস্টেশন যাবে, তারপর ট্রেনে চেপে গুয়াঞ্জু পৌঁছে আবার মেট্রোরেল ব্যবহার করে বিমানবন্দর!
চীন ছাড়ার আগে রিপন ভাইয়ের মস্তিষ্ক হযবরল হয়ে যায়, আরাম প্রিয় বাঙালি থেকে তিনি হয়ে যায় হাঙ্গামাপ্রিয় পাঠান। তার মতামতের বিশেষ গুরুত্ব দিলাম না। পরদিন সকালে আমি আর জুয়েল ভাই পাশেই অন্য হোটেলে একটি রুম ঠিক করে ফেললাম। এই হোটেলটিও আমাদের পূর্বপরিচিত। হোটেলের নাম সেফা হোটেল। আমরা নাম দিয়েছি ‘বুড়োবুড়ির হোটেল’। বৃদ্ধ স্বামী আর স্ত্রী মিলে হোটেলটা চালায়, তাই এই নাম। লাগেজপত্তর ট্যুরিজম ট্রেন্ড (আগের) হোটেলে জমা রেখে রান্নার জিনিসপত্তর উদ্ধার করে নতুন হোটেলে নিয়ে আসা হলো। জুয়েল ভাই পরিচিত এক গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে চারটি গাড়ি ঠিক করে ফেলল। গাড়িগুলো রাত আটটায় হোটেলের সামনে আসবে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যেতে। বিষয়টি সহজ মনে হলেও গাড়ি ভাড়া করা সহজ কোনো কাজ নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা ভাষাগত সমস্যা। কোথা থেকে ভাড়া করা যাবে তা–ই অজানা, আবার গাড়ি যদি সময়মতো না আসে, তখন? যা হওয়ার হবে। আমাদের পায়ের নিচে শর্ষে, পা ফেললেই গড়াবে।
পরদিন সকালে এল আলসতার পাখায় ভর করে। আজ তেমন কোনো কাজ নেই, তবু বের হলাম শেষবারের মতো মার্কেট এলাকা চক্কর দিতে। মনজু আর সুফিয়ান ভাই গত রাতে পরিকল্পনা করেছিল উইনডো অব দ্য ওয়ার্ল্ড দেখতে যাবে। সকালে এ বিষয়ে তাদের কোনো উৎসাহ দেখা গেল না। দুজনে বেরিয়েছে চকলেট কিনতে। আমরা যার যার কাজ গুছিয়ে হোটেলে হাজির হলাম ছটার মধ্যে। মনজু আর সুফিয়ান বিকেল থেকে রুমে ছিল, রান্নার কাজ মনজু ভাই করে রেখেছে। গরম ভাত, মুরগির রান আর সালাদ দিয়ে চমৎকার ডিনার শেষ করে আমরা প্রস্তুত হলাম গুয়াঞ্জু বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য। মনের মধ্যে সবার একটু চাপা উত্তেজনা, গাড়িগুলো ঠিক সময়ে ঠিকমতো আসবে তো? রিপন ভাই গাড়ি ভাড়া করার বিপক্ষে তার মূল কারণ, ড্রাইভাররা অনেক সময় বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে। সময়মতো আসে না, অনেক সময় লাগেজসংখ্যা নিয়ে জটিলতা তৈরি করে। কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সবার আছে, তবে ভালো অভিজ্ঞতা আর সুবিধার সংখ্যা অনেক বেশি।
অন্ধকার নেমে এসেছে রাস্তায়, সড়কবাতিগুলো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। অপেক্ষার সময় এখনো পাড় হয়ে যায়নি, ৮টার ১৫ মিনিট আগেই জুয়েল ভাইয়ের মুঠোফোনে মেসেজ এল। গাড়িগুলো সব এসে গেছে, দাঁড়িয়ে আছে হোটেলের পার্কিংয়ে। আমরা বাক্স–পেটরা নিয়ে হাজির হলাম পার্কিংয়ে, দুজন দুজন ভাগ হয়ে চেপে বসলাম চারটি গাড়িতে। কোনো ঝামেলা নেই, কোনো জটিলতা হলো না। সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম, সময়মতো চেপে বসলাম উড়োজাহাজে। উড়োজাহাজও উড়ল সময়মতো। আঙুলের ফাঁক গলে জল গড়ানোর মতো কতগুলো দিন গড়িয়ে গেল, মধুর হয়ে রইল আরও কিছু স্মৃতি। এবার আমরা ঘরে ফিরছি। আসলেই কথাটা সত্য, ফিরে আসার নির্দিষ্ট ঘর আছে বলেই ভ্রমণ এত সুখকর।
লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]