মক্কা মদিনার ডায়েরি–১

মসজিদে নববিতে প্রবেশের একটি পথের ছবিছবি: লেখকের পাঠানো

১. সূচনা-ব্যর্থতা থেকে পূর্ণতা

আমার জীবনে ওমরাহ করার সুযোগ গত রমজান মাসে এসে হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সবকিছু বাঁধা, বাক্সে শুধু তালাচাবিটি পড়তে বাকি। এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপাত৷ কনফার্ম করা টিকিট বুঝিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত অপারগতা জানায় হজ এজেন্ট। সৌদি সরকার বাংলাদেশসহ কিছু দেশের জন্য ওমরাহ ভিসা বন্ধ রেখেছে, মূলত সেখানে প্রচুর লোকসমাগমের কারণে এরূপ করতে তারা বাধ্য হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। সুতরাং সেই রমজানে ওমরাহ করা হচ্ছে না জেনে রমজানের পর ভিসা পাওয়া যায় কি না, সে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হই, আগামী হজের আগে ওমরাহ ভিসা পাওয়া যাবে না। সেই রমজানে কাবায় প্রচুর মানুষের ভিড় হওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানতে পারি। তাই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সব ছেড়ে অপেক্ষায় রইলাম।

মিরাকল ঘটে গেল অক্টোবর (২০২৫) মাসে! হজ এজেন্টের সঙ্গে একদিন দেখা হয়ে যায় চলতি রাস্তায়। কথায় কথায় সব ঠিক করে ফেলি। এ ছাড়া বাবাও দু-এক দিন আগে বলছিল, ওমরাহর কথা। খুব দ্রুত ভিসা হয়ে যায়। আগের মাসে চিকুনগুনিয়া জ্বরে ভুগে আমি আর আমার স্ত্রী রুনার অবস্থা বেশ কাহিল। চিকুনগুনিয়ায় যারা ভোগেনি, তারা বুজবে না এর মর্মপীড়া। আমাদের হাত–পায়ের প্রতিটি অস্থি-সন্ধিতে তীব্র ব্যাথার যে ছাপ এই রোগ রেখে গেছে, তার সঙ্গে আমরা তখনো লড়ছিলাম। জ্বর ছেড়ে গেছে এক মাস আগে কিন্তু এখনো আমরা হাঁটতে–চলতে তীব্র ব্যথা আর আর্তনাদে জবুথবু হয়ে আছি। স্বাস্থ্যের কারণে বাদ দেওয়ার ইচ্ছা জাগলেও আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এবার যাবই। চিকিৎসকের পরামর্শে হরেক রকম ওষুধে বাক্স ভর্তি করে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হলো এবং ওষুধের গুণে হোক আর আল্লাহর কৃপায় হোক, ঠিকমতো যাত্রা শেষও হয়েছিল!

আরও পড়ুন
রাতের মসজিদুন নববি
ছবি: লেখকের পাঠানো

কোনো আশা, কোনো কল্পনা, যা হয়তো অনেক দিন ধরে মনে লালন করছেন! কিন্তু বাস্তবের কর্মপরিকল্পনায় তা কিছুতেই হয়ে উঠছে না, তা একদিন সত্যি সত্যি পূর্ণ হয়ে গেল। যা চেয়েছেন, যেমন করে চেয়েছেন, তেমনি করেই হলো। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্য করেন, বিশ্বাসটা তখন আরও দৃঢ় হয়। আমাদের পক্ষে এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কিছু নেই। মক্কা আর মদিনার কয়েকটি দিন আমাদের কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল।

ভাবলাম, মুহূর্তগুলো লিখে রাখি বা রাখার চেষ্টা করি! যা কিছু দেখছি, শুনছি, ভাবছি, অনুভব করছি, তা প্রকাশ করতে যাওয়া বা লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা চাই। এই দক্ষতা আর ক্ষমতাটা আমার যে সীমিত, তা আমি নিশ্চিত। বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করলেই ভ্রমণের গুণ অর্জিত হয় না, তেমনি লিখতে জানলেই লেখক হওয়া যায় না, এই সত্য সামনে রেখেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শুধু নিজের দৃষ্টিতে দেখা এই মহান স্থানগুলোর বর্ণনা সাদামাটাভাবে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা বলা যায়। মক্কা আর মদিনার পথে পথে প্রতিটি স্থাপনার বর্ণনা শুধু বর্তমানে স্থানটির অবস্থান, আকৃতি, সুবিধা আর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয় না, বরং বর্তমানকে টেনে নিয়ে হাজির করে ইতিহাসের ওই সুবর্ণ সময়ে, যখন ইসলাম নামের এক বিশ্বাসের জন্ম হচ্ছে। যা মানুষকে শিক্ষা দেবে একটি আদর্শ জীবনব্যবস্থার, যার বদৌলতে মানুষ পরিচিত হবে তার সৃষ্টিকর্তা আল্লহ ও তাঁর বিধানের সঙ্গে।

বিমানের বোর্ডিং হাতে অপেক্ষা করছি। মোয়াল্লেম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানালেন, টিকিটের কী এক জটিলতায় তিনি যেতে পারছেন না! বিষয়টা কাফেলার সবাইকে ছোটখাটো একটা ধাক্কা দিল।

২. গোলাপি হিজাবের কাফেলা ও বিমানে নানা অভিজ্ঞতা—

নির্দিষ্ট দিনে বিমানবন্দরে গিয়ে হাজির হলাম, আমার স্ত্রী আর মা–বাবা সঙ্গে আছেন। অদৃষ্টগুণে পূর্বপরিচিত সাইফুল ভাইকেও পেলাম, স্ত্রী আর মাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। কাফেলার কর্ণধাররা আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। নারীদের জন্য গোলাপি রঙের হিজাব দেওয়া হলো, রংটি এতই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে বহুদূর থেকে সহজে সনাক্ত করা যাবে। যার সুবিধা আমরা পরবর্তীতে ভালোভাবে পেয়েছিলাম। একজন মোয়াল্লেমকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো, যিনি আমাদের সঙ্গে মক্কা আর মদিনায় সার্বিক সহযোগিতা করবেন। মোয়াল্লেম সবার সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ করে বেশ কিছু উপদেশ আর পরামর্শ দিলেন। যার সারমর্ম হলো, সব সময় দলবদ্ধ থাকতে হবে, আমরা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় যাচ্ছি, ওখানে ঝগড়া–বিবাদ করা যাবে না। নারীদের বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই কাফেলার দেওয়া হিজাবটি পরতে হবে, না হলে ভিড়ে হরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয় বিশেষভাবে দেখানো হলো। অন্য নারীরা কে কতটুকু ভয় পেলেন, জানা নেই, তবে আমার আম্মা একদিনও হিজাব ছাড়া বের হননি। স্ত্রী রুনা হিজাবটি ইতিমধ্যে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছে। এই উদ্ভট রঙের হিজাব সে পরবেই না। যদিও হারিয়ে যাওয়ার ভয় ওর সবচেয়ে বেশি।

সবাই বিমানের বোর্ডিং কার্ড হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছি। মোয়াল্লেম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানালেন, টিকিটের কী এক জটিলতায় তিনি যেতে পারছেন না! আমি যেন সবাইকে দেখাশোনা করে মদিনা পর্যন্ত নিয়ে যাই। সেখানের বিমানবন্দরে মদিনার মোয়াল্লেম খালেদ সাহেব উপস্থিত থাকবেন। বিষয়টা কাফেলার সবাইকে ছোটখাটো একটা ধাক্কা দিল।

আরও পড়ুন

আমাদের যাত্রাসঙ্গী মামুন সাহেব বিরক্ত হলেন। কাফেলার কার্যকলাপ তিনি ভালো চোখে দেখলেন না। ভদ্রলোকের বয়স ৪০ হবে, আরব আমিরাতে চাকরি করেন, স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে এসেছেন। ছেলেটি অসুস্থ, হাঁটতে পারে না, বাচ্চা মানুষ, বয়স ১০ বা ১২ হবে। সরাটা বিমানবন্দর তিনি ছেলেকে কোলে নিয়ে হেঁটেছেন, টিকিটে হুইলচেয়ার বুকিং ছিল না। আমাদের আরেকজন যাত্রাসঙ্গী জয়নাল সাহেব, খুব অমায়িক মানুষ। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, বয়স ৬০–এর কাছাকাছি। আগেও গিয়েছেন ওমরাহ করার জন্য, মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিও করেছেন একসময়। আমাকে জানালেন, স্ট্রোক করার পর সবকিছু ভুলে যান। তবে ভদ্রলোক বেশ কর্মক্ষম এখনো এবং ভারী মিশুক। আমাদের কফেলায় হাসিনা নামের একজন বয়স্ক মহিলা আছেন, একা এসেছেন, সঙ্গে কেউ নেই। ওনার নিজের পরিবার নেই, ভাইয়ের ছেলেরা ফুফুকে ওমরাহ করার জন্য পাঠিয়েছেন। উনি একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। জয়নাল সাহেব ভাইয়ের মতো পুরোটা পথ ওনাকে সঙ্গে রাখলেন। আর আছে তিন বোনের একটি দল, তাঁদের ভাই ও আত্মীয়স্বজন সৌদি আরবে থাকেন। ওমরাহর উদ্দেশ্যে আর বেড়াতে যাচ্ছেন তাঁরা। আত্মীয় সাইফুল ভাই ও তাঁর পরিবারের কথা আগেই বলেছি। আমার বাবা আর মা এ কাফেলায় সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, আগেও হজ আর ওমরাহ করতে গেছেন। সবাই ওনাদের খুব সমীহ করছেন, ওনাদের পরামর্শ গ্রহণ করছেন। ১৫ দিনের প্যাকেজ ট্যুরে একসঙ্গেই থাকব সবাই।

রুমে জানালা আছে, জানালা খুলতে গিয়ে দেখলাম, দেয়ালটা অনেক পুরু। আমাদের দেশের তুলনায় দ্বিগুণ চওড়া। চওড়া দেয়ালগুলো দিনের প্রচণ্ড তাপকে শোষণ করে এবং সেই তাপ ঘরের ভেতর আসতে বিলম্ব ঘটায়। আবার রাতের বেলা তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। মোটা দেয়ালগুলো দিনের বেলায় যে তাপ শোষণ করেছিল, সেই তাপ তারা রাতের বেলা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর নির্গত করে উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। মরুর কড়া রোদের গরম আর শীতের তীব্র ঠান্ডা থেকে রুমের তাপমাত্রা ঠিক রাখতেই এ ব্যবস্থা।

ভ্রমণে স্থানের মাহাত্ম্যটা জরুরি, তবে পাশাপাশি মানুষের সান্নিধ্যও। দলের মানুষগুলো যদি ‘ইন্টারেস্টিং’ হয়, যদি মানুষগুলো একটু অন্য রকমের হয়। আমাদের ভ্রমণসঙ্গীরা একটু অন্য রকমই। হুমায়ূন আহমেদের নাটক থেকে একেকটি চমৎকার চরিত্র যেন এক হয়েছে! আমরা মোট ১৭ জনের দল বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইটে সৌদি আরবের মদিনায় যাব। এই কিছু সময়ের মধ্যে সবাই সবার আপন হয়ে গেছেন। কারও একটু সমস্যা হলে সবাই তাঁর সমাধানে ব্যস্ত হয়ে যান। সবাই অতি সজ্জন, আমরা ৫ জন পুরুষ, ১০ জন মহিলা আর ২টি শিশু। এই ছোট দলসহ ইমিগ্রেশন শেষ করে গেটে গিয়ে অপেক্ষা করছি বিমান ছাড়ার জন্য। কাফেলার মহিলারা সবাই গোলাপি রঙের হিজাব পরে আছেন, সহজেই চিহ্নিত করা যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে অন্যান্য কাফেলায় লাল, নীলসহ বিভিন্ন রং ও বর্ণের হিজাব দেখা গেল। প্রতিটা রং মার্কামারা।

বিমানে চড়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে আমাদের বদলি হয়ে যাওয়া এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার। আমার ভাবনায় জায়গা করে নেয় সেই সময়, যখন মক্কায় পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। দেশ–বিদেশ, পাহাড়–জঙ্গল আর লোকালয় পেরিয়ে মক্কা–মদিনায় পৌঁছাতে হতো। প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল প্রতি পদে। অমানুষিক ক্লেশ ছাড়া তা সম্ভব হতো না। বিমান এসে যাত্রা সুসাধ্য করেছে; কিন্তু সেই সঙ্গে তীর্থ মাহাত্ম্যও কি কমিয়ে দিয়েছে! আগের যুগে পায়ে হেঁটে, গরু–মহিষের গাড়ি আর জাহাজে করে যাঁরা হজ্জে যেতেন, তাঁরা বোম্বে, বর্তমানে মুম্বাইয়ে গিয়ে মিসর বা সিরিয়ার জাহাজ ধরতেন হাজ্জাজ তথা বর্তমান সৌদি আরবে পৌঁছানোর জন্য। অনেকে আবার যাত্রায় বিলম্বের কারণে বা অসুস্থতার কারণে সে জাহাজে চড়তে না পেরে হজে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হতেন। বিশেষ ক্লেশের পরে ব্যর্থ হলেও সমাজে তাঁদের সম্মান করে হাজি সাহেবই বলতেন। স্থানীয়ভাবে তাঁদের পরিচয় ছিল বোম্বাইয়া হাজি!

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বর্তমান গতিবিজ্ঞানের যুগে এই সমস্যা আর নেই। আজকে বিমান মিস করলে আগামীকাল বা পরশু ঠিকই টিকিট পেয়ে যাবেন। তবে কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে আমরা যা দেখার, যা অনুভব ও গ্রহণ করার সুযোগ পাই, তা কি পাওয়া যায় বিমানে রাতারাতি একেকটা আস্ত দেশ পার হয়ে? সেই তো সত্যিকারের পথচলা, যখন পথের দুই ধারে কত কিছু থেকে কত অভিজ্ঞতা মনে ভর করে। কত মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। একেক জায়গার খাবারের স্বাদ, একেক দেশের একেক রেওয়াজ, বিভিন্ন জাতির বিচিত্র আতিথেয়তা।

তবে ইবনে বতুতার মতো বেরিয়ে পড়লাম, যখন খুশি যেকোনো রাস্তা ধরে, এই যুগে এই অভিজ্ঞতা অসম্ভব। দেশে দেশে সীমানায় সীমানায় পাহারা বসানো আছে, তুমি ভিনদেশি! এই দেশে ঢুকতে হলে ভিসা চাই, কারণ জানা চাই, সঙ্গে ডলার চাই। আর আজকালকার মানুষের মানসিক দুঃখভোগের এত বিচিত্র উপায় আছে যে পায়ে হেঁটে দেশ ভ্রমণের মতো শারীরিক ক্লেশ সহ্য করা এ যুগের লোকের পক্ষে অসম্ভব। শরীরটাকে যথাসম্ভব শান্তিতে রেখে খোলা আকাশে বিমানযাত্রাই এখন চরম অ্যাডভেঞ্চার। বিমানবন্দরগুলোই এখন ঐতিহ্য আর কৃষ্টির বিনিময়ের মহাসম্মেলনকেন্দ্র। একেকটা বন্দরজুড়ে কত রকম মানুষের ভিড়, কত বিচিত্র রকমের তাঁদের বেশভূষা, কথাবার্তা।

আরও পড়ুন

সঠিক সময়ে গভীর রাতে আমাদের বিমান ছেড়ে যায়। জানালার বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। এই অন্ধকারে দেখা দেয় কুঞ্জ কুঞ্জ মেঘ, অনেক দূরে কোথাও মেঘে মেঘে বিদ্যুতের ঝিলিক, হাজার হাজার মাইল নিচে কোনো এক নাম না জানা শহরের আলো অনেক অস্পষ্ট-অসংগতভাবে চোখে পড়ে। অবশ্য এসব দৃশ্য জানালার পাশে আসন পেলে তবেই ভাগ্যে জোটে, না হয় সিটের সামনের স্ক্রিনে সিনেমা দেখে, গান শুনে বা ঘুমিয়ে সময় পার। বিমানবন্দরে মানুষের যে প্রাণচাঞ্চল্য, বিমানে তা দীর্ঘ স্থবির সময়।

বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণ ছিল ক্লেশহীন। বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভালোই। টিকিট বুকিংয়ের সময় আমাদের কাফেলা আমার বয়স্ক মায়ের জন্য হুইলচেয়ারের কথা উল্লেখ করতে ভুল করে, কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় বিমান কর্মকর্তা হুইলচেয়ার দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেন, এমনকি এই সহযোগিতা আমরা মদিনা এয়ারপোর্টেও পাই, শুধু এয়ার হোস্টেসকে অনুরোধ করে। ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হাসিমুখে যাত্রীদের সেবা দিয়ে গেছেন। এক যাত্রী লাইটের হোল্ডার দেখিয়ে বললেন, এসির বাতাস আসছে না, অ্যাটেনডেন্ট হাসিমুখেই জবাব দেন, ঠিক আছে স্যার, দেখছি। আমি ইতিমধ্যে জ্যাকেট পরে নিয়েছি এবং আমার আশপাশেই অনেকে কম্বল চেয়ে নিয়েছেন। এসি ভালোই ঠান্ডা দিচ্ছিল, ভদ্রলোকের কেন গরম লাগছিল, কে জানে? বিমানের বাথরুমে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে। ময়লা টিস্যু আর আবর্জনার স্তূপ জমা হয়েছে মেঝেতে, নোংরা অবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক যাত্রী জানেন না, বিমানের ল্যাবরেটরি বা টয়লেট কীভাবে ব্যবহার করতে হয়! বাংলাদেশ বিমানে আমি প্রায়ই ভ্রমণ করি, এর আগে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।

৩. আলোকিত শহরে প্রথম সকাল—

মদিনা বিমানবন্দরে ভোরে নামলাম। বিচিত্র সুন্দর পৃথিবী। স্থবিরতায় ভরা ছিল প্রায় সমস্ত পথ, এখনো লেগে রয়েছে তার আলসে আভাস। চারদিক অদ্ভুত চুপচাপ; বিমানবন্দরের আলো জ্বলা জানলাগুলো নিয়ে উড়োজাহাজগুলো ছবির মতো দাঁড়িয়ে। দূরে শোনা যাচ্ছে ইঞ্জিনের অসহিষ্ণু নিশ্বাস। তেমন ভিড় নেই। ইমিগ্রেশন শেষ করতে দেরি হলো না। মহিলা অভিবাসন কর্মকর্তা দ্রুত ভিসা আর পাসপোর্ট পরীক্ষা করে সিল দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন। ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ নিয়ে ওয়েটিং এলাকায় পৌঁছে দেখা হয় আমাদের কাফেলার মদিনার মোয়াল্লেম খালেদ সাহেবের সঙ্গে। খালেদ সাহেব সবাইকে গুছিয়ে নিয়ে রওনা হন এয়ারপোর্ট পার্কিংয়ে আমাদের অপেক্ষায় থাকা বিলাসবহুল বাসের দিকে।

বিলম্ব ছাড়া যানের চাকা গড়াল মদিনার মসজিদুন নববির পথে। মসজিদুন নববির দক্ষিণ দিকে মসজিদে বেলাল (রা.) এর পেছনেই আমাদের হোটেল। হোটেল থেকে পাঁচ মিনিটে জান্নাতুল বাকির পাশের ৩৬৫ গেট দিয়ে মদজিদুন নববিতে পৌঁছানো যায়। মসৃণ প্রশস্ত রাস্তা, দুই পাশে সুবিন্যস্ত খেঁজুরবাগান, ধূসর দিগন্তের শেষে পাথুরে পাহাড় আর সবকিছুর পটভূমিতে উষ্ণ নীল আকাশ। গাছগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে চলেছে, পাহাড় পাখা মেলে উড়ে চলেছে, দিগন্ত কতবার ঘুরে ঘুরে গেল পাখির ঝাঁকের মতো। সুরম্য অট্টালিকা চোখের ওপর দিয়ে ঝিলকিয়ে গেল। এই দৃশ্যপট ঘুরে–ফিরে চলতে চলতে আমরা পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্য হোটেল লুজিন গোল্ডেনে।

এই পথে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করতাম আমরা। দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড দেখা যায়
ছবি: লেখকের পাঠানো

মদিনার আদি নাম ইয়াসরিব, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নাম পরিবর্তন করে দেন। তিনি বলেছিলেন যে ‘ইয়াসরিব’ নামটি নেতিবাচকতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি এর পরিবর্তে শহরের নতুন নাম দেন ‘তাইয়্যিবাহ’ (যার অর্থ শুভ বা পবিত্র)। যা পরে পরিচিতি লাভ করে ‘মদিনাতুন নবী’ (নবীর শহর) বা ‘আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারা’ (আলোকিত শহর) নামে।

এখন মদিনার সময় সকাল ১০টা, রুমের জন্য আরও দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। সবাই দীর্ঘ যাত্রায় বেশ ক্লান্ত, সেই কবে বিমানে খাবার খেয়েছি, ক্ষুধায় পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। লবিতে অপেক্ষা করছি, এর মধ্যে নাশতা চলে এল। গরম পরোটা, সেদ্ধ ডিম, ডালভাজি আর পানি। নাশতা খেয়ে পেট ঠান্ডা হলো কিন্ত মস্তিষ্ক পিন পিন করছে এক কাপ চায়ের জন্য। ওটারও ব্যবস্থা হয়েছে। হোটেলের লবিতে বসে আছি, মোটামুটি মানের হোটেল। বেশির ভাগ খদ্দের ভারতীয়, পাকিস্তানি আর বাংলাদেশি। আমাদের মতো আরও একটি দল অপেক্ষায় আছে। আরেকটি দল হোটেল ছেড়ে যাচ্ছে, গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। হোটেলের আশপাশে হেঁটে দেখলাম। হোটেলের সামনের রাস্তাটা বেশ বড়। রাস্তা আর পার্কিং দুভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। হোটেল ও আশপাশের দালানগুলো মোটামুটি পুরোনো, ভবনগুলো পাঁচ–ছয়তলা। আশপাশে প্রচুর দোকানপাট আছে। পাকিস্তানি আর বাংলা হোটেল আছে অনেকগুলো।

মা–বাবা–স্ত্রীর সঙ্গে লেখক
ছবি: লেখকের পাঠানো

এর মধ্যে রুমের বন্দোবস্ত করা হয়ে গেছে। সকালে গরমের ভাবটা কম মনে হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মরুভূমি তার উষ্ণ অভ্যর্থনার জানান দিল। রুমে ঢুকে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসলের আয়োজন করছি, কিন্তু সে গুড়ে বালি। কল দিয়ে ঠান্ডা পানির বদলে গরম পানি বের হচ্ছে! পামি গরম হোক আর ঠান্ডা, গোসল সেরে যাত্রার ক্লান্তি প্রশমিত করে এসির ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর এলিয়ে বিশ্রামের আয়োজন সম্পন্ন করলাম। রুমে জানালা আছে, জানালা খুলতে গিয়ে দেখলাম, দেয়ালটা অনেক পুরু। আমাদের দেশের তুলনায় দ্বিগুণ চওড়া। চওড়া দেয়ালগুলো দিনের প্রচণ্ড তাপকে শোষণ করে এবং সেই তাপ ঘরের ভেতরে আসতে বিলম্ব ঘটায়। আবার রাতের বেলা তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। মোটা দেয়ালগুলো দিনের বেলায় যে তাপ শোষণ করেছিল, সেই তাপ রাতের বেলা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে নির্গত করে উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। মরুর কড়া রোদের গরম আর শীতের তীব্র ঠান্ডা থেকে রুমের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে এ ব্যবস্থা।

‎এর মধ্যে দুপুরের খাবার এল রুমে, বাসমতি চালের সাদা ভাত, আলুভর্তা, ডাল, সবজি আর মাছ। এই দূরদেশে এলেও বাঙালি খাবারের এই আয়োজন শরীর আর মনে স্বস্তি এনে দিল। মোয়াল্লেম খালেদ সাহেব এসে খোঁজখবর নিয়ে গেলেন, আসরের নামাজের সময় মসজিদে নববিতে যাওয়ার প্রোগ্রাম জানিয়ে গেলেন। চলবে...

লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা