১২ দিনে দেখা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, দুর্যোগেও জীবনের হাতছানি-৫

ছবি: লেখকের পাঠানো

১৪.

পরবর্তী পাঁচ দিন কাটল অসম্ভব পরিশ্রমে!

মহিপাল মোড়ে তিনতলা মাদ্রাসার পুরোটা ক্যাম্প, ২য় তলায় মেডিকেল সেন্টার। প্রাথমিকভাবে পাখি আর তমা ছিল এর মূল দায়িত্বে, ওর দুজনেই বেসরকারি মার্ক্সস মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তবে তাদের ঢাকা ফেরত আসতে হয় দুই দিন পরই। যদিও ওরা চলে গেলে পরদিনই ওই মেডিকেল থেকে ব্যাকআপ টিম আসার কথা ছিল, তবে তারা সময়মতো আসতে না পারায় এর দায়িত্ব এসে পড়ে আমার আর ইমনের কাঁধে।

আমরা ভাগাভাগি করে কাজ করতাম। অধিকাংশ সময়ে ইমন ড্রেসিংয়ের কাজগুলো করলে, আমি মেডিসিনের দিকটা দেখতাম। এ ক্ষেত্রে রোগীর ডিটেইলস লিখে চিকিৎসকদের হোয়াটসঅ্যাপ করলে সে অনুযায়ী তারা ওষুধ দিত, প্রয়োজনে ভিডিও করেও পাঠাতাম। এরপর আবার এআই দিয়ে ক্রস চেক করতাম ওষুধ আর সিমটম ঠিক আছে কি না! এ পদ্ধতিতে পাঁচ দিনে অন্তত আড়াই শ থেকে তিন শ মানুষের চিকিৎসা করেছি আমরা।

আরও পড়ুন
আমার পাশে বসা ইমন! জানালার পাশে ওর সিট। জানি না সড়কের দিকে তাকিয়ে কী এত দেখে ছেলেটা। তবে এবার এমন এক জিনিস ও দেখল, ওর মুখ থেকে যার বর্ণনা শুনে মুহূর্তে উড়ে গেল আমার শরীরের সব ক্লান্তি!

যা দেখলাম, বন্যার পানির ভেতর হেঁটে আসতে গিয়ে কারও হাত -পা কেটে গেছে, কারও তীব্র শ্বাসকষ্ট, দুশ্চিন্তাজনিত কারণে হার্ট প্যালপিটিশনের সমস্যা ও প্যানিক অ্যাটাক, পচা পানি থেকে স্কিন ইনফেকশন ইত্যাদি ছিল সাধারণ সমস্যা। তবে এ সবের ভেতরে কিছু কেস ছিল অস্বাভাবিক। যেমন অপারেশনের ২য় দিনে ২৫ বছর বয়সের এক যুবতীকে উদ্ধার করে আনে আমাদের ফিল্ড রেসকিউ টিম। ওকে নাকি রাস্তায় পাশে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। আনার সময়েও অজ্ঞান অবস্থাতেই ছিল। তবে ক্যাম্পে আনার পর রগের ভেতর স্যালাইন পুশ করলে, কয়েক ঘণ্টা পর জ্ঞান আসে তার। ওর সঙ্গে কথোপকথন থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি। তাদের গ্রামে দিন দুয়েক আগে রাতের বেলায় বন্যার পানি হটাৎ করে বাড়তে শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে ঘরের চালায় উঠলে পরিবারসমেত সেখানেই আটকা পড়ে যায় সে। পরবর্তী সময়ে একটি উদ্ধারকারী নৌকা ওদের সেখান থেকে তুলে হাইওয়ের পাশে একটি শুকনা স্থানে নিয়ে আসে। সেখানে আরেকটি দল নিজেদের উদ্ধারকারী পরিচয় দিয়ে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায়। কিছু খাবারদাবার খেতে দেয় ওদের। সেই খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ওর ঝিমুনি ভাব হয়! কিছুক্ষণের ভেতরেই দৃষ্টিসীমানার সবকিছু হারিয়ে যায় গভীর অন্ধকারে।

মাঝখানে কী হয়েছে ও জানে না, তবে যখন জ্ঞান আসে, তখনো অন্ধকারেই নিজেকে আবিষ্কার করে রাস্তায় পাশে। আশপাশে পরিবারের সদস্য কিংবা অন্য কোনো মানুষ কেউই নেই। মুঠোফোন, ব্যাগ, টাকাপয়সা যা ছিল সব হাওয়া। এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আবারও জ্ঞান হারায় সে। এরপর নিজেকে আবিষ্কার করে আমাদের মেডিকেল সেন্টারের বিছানায়।

প্রথম দুই দিন অধিকাংশ সময়ে ক্যাম্পের বিছানায় অর্ধচেতন অবস্থাতেই পড়ে ছিল সে। মাঝেমধ্যে ঘুমের ভেতর গোংরানি মতো আওয়াজ করত আর মুখ থেকে ঝরত সাদা ফ্যানার মতো। তবে মাঝেমধ্যে জ্ঞান আসলে কাঁদত আর কদাচিৎ কথা বলত।

মেয়েটা তিন দিন পর হটাৎ করে কই যেন চলে যায়। যাওয়ার আগে আমাদের কাউকে কিছু বলেও যায় না। আমাকে অবশ্য বলেও তেমন লাভ নেই, এ অঞ্চলের মানুষের উপভাষা আমি বলতে গেলে প্রায় কিছুই বুঝি না, হাত–পা নাড়িয়ে যা বলে তার কনটেক্সট থেকে যতটুকু যা বুঝি আরকি। কথা বোঝার জন্য আরেকজন ট্রান্সলেটর লাগে আমার। তবে মানুষের অভিব্যক্তি এমন অনেক কিছুই বলে দেয় যা সে মুখে বলে না অথবা বলা যায় না। ওর অভিব্যক্তি থেকেও তেমন কয়েকটা কথা আমি বুঝতে পেরেছি, আরও ক্ষীণস্বরে বললে অনুমান করতে পেরেছি, যা ও মুখে বলেনি।

ছবি: লেখক

১৫.

প্রায় পাঁচ দিন পর ১৩ জনের মেডিকেল টিম আসে ক্যাম্পে। তত দিনে অবশ্য ফেনির অবস্থা তুলনামূলক ভালো, তবে এদিকের পানি নোয়াখালীর দিকে বয়ে যাওয়ায় অবস্থার অবনতি হচ্ছে সেখানে। তাই নতুন এই টিম পরদিনই নোয়াখালীর দিকে রওনা দিলে ক্যাম্প ক্লোজ করার সিদ্ধান্ত নেই আমরা বাকিরা। গত আট দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্যাম্পের অবশিষ্ট সদস্যদের অসাড় অবস্থা তখন। সবাই যে যার মতো করে ঢাকা ফিরে যাচ্ছে।

অমরা অর্থাৎ আমি, সেই সিয়াম ভাই আর টিনেজার ইমন—আমরা তিনজনও তেমনটাই ভাবছিলাম। তবে আমাদের ভাগ্যরেখায় এই যাত্রাকালের শেষ গন্তব্য তখনো লেখা হয়নি বোধ হয়।

আরও পড়ুন

রওনা দেব তার কয়েক ঘণ্টা আগে আকিবের মুখ থেকে শুনতে পারি ওর বাবা–মা আমাদের সালাম জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ আন্তরিকতায় চুবানো একটি ফরমানও জারি করেন। বলতে গেলে, এই কদিন তো বেলার শেষ শুরু তথা সময়ের পরিসীমায় হিসাব জ্ঞানটাও ছিল না আমাদের। তাই গ্রামের নির্মল পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর খায়েশ আর ভূরিভোজের এই জোড়ালো দাওয়াত উপেক্ষা করা গেল না আর।

আচ্ছা বলা হয়নি বোধ হয় আকিব, আবদুল্লাহ আর আমি যেদিন স্পিডবোট খুঁজতে চেয়ারম্যান ঘাট গিয়েছিলাম, সেদিন রাতে বন্যার পানি উঠে গেলে, ছোট দুই ভাইবোনকে নিয়ে ওর মা বাড়ির পাশের সেই নির্মানাধীন ভবনেই আশ্রয় নিয়েছিল।

পরদিন, অর্থাৎ যেদিন সকালে আকিবকে ফোনে পাচ্ছিলাম না, ও একা একাই প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ, কখনো পানির ভেতর হেঁটে, কখনো সাঁতরে পারি দিয়ে বাড়ি পৌঁছায়। মা আর ছোট ভাইবোনকে সুস্থ দেখে সেদিনই আবার ফিরে আসে ক্যাম্পে।

স্বাভাবিক অবস্থায় এমন কাজ প্রায় অসম্ভব বলেই হয়তো বিবেচিত হবে। তবে পরিবারকে একনজর দেখার জন্য, মানুষ কত কীই–না করে। সম্ভব অসম্ভবের সব মানদণ্ড তখন হাতির পারার মতো দুমড়েমুচড়ে ফেলতে পারে। সেখানে ৪০ কিলোমিটার দুর্গম পথ আর এমনকি।

১৬.

আকিবের বাড়ি থেকে আমাদের যাত্রাপথ মোড় নেয় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দিকে। অপরূপা সেই রূপসী ঝরনার স্বচ্ছ পানিতে পাওয়া না–পাওয়ার সব হিসাব ধুয়ে যায় আমার। কেবল রয়ে যায়, গিরিপথের ভেতর দিয়ে ট্রেকিংয়ের সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ময়ূরাক্ষী নদি পাড়ি দেওয়ার পর দূরে যে পাহাড়, তার ভেতর থেকে কি একটা পাখি যেন বুনো সুরে ডাকছিল। সেই সুর ব্যাখ্যা করার মতো কোনো শব্দ জানা নেই আমার। লিলুয়া বাতাসের মতো শীতল, আবার আষাঢ় মাসের মেঘের মতো গাড় সেই সুর, আমার আজও কানে বাঝে।

শেষ গন্তব্যের পথে!

শো শো বাতাসের শব্দ, ইঞ্জিন, চাকা আর মহাসড়কের গুনগুন আওয়াজে আমার দুই চোখেও ঘুম আসে যায়। লাইট হাউসের ঘূর্ণমান আলো যেভাবে আশা–যাওয়া করে অন্ধকার সাগড়পাড়ে! সাতসাগর পাড়ি দেওয়া ভীষণই ক্লান্ত এক নাবিক আমি, তবু কে যেন গভীর সাগর থেকে ডাকছে আমাকে। এই ডাক উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই। তাই তো সহযাত্রী নিয়ে সাগরের দিকে যাচ্ছি!

আমার পাশে বসা ইমন! জানালার পাশে ওর সিট। জানি না সড়কের দিকে তাকিয়ে কী এত দেখে ছেলেটা। তবে এবার এমন এক জিনিস ও দেখল, ওর মুখ থেকে যার বর্ণনা শুনে মুহূর্তে উড়ে গেল আমার শরীরের সব ক্লান্তি!

প্রথমে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল, এসব কী বলছে ও, যা বলছে, তা আদৌ ঠিক তো, নাকি কেবলই ক্লান্ত মস্তিষ্কের ভ্রম। এর আগে মহাসড়কে আমি সড়ক দুর্ঘটনা দেখেছি বড়জোর। হাইওয়ে নিয়ে ডাকাতির গল্প, ভূতের গল্প শুনেছি অনেক। তবে ও যা বলছে, এমনটা কোনো দিন শুনিইনি। কয়েক মুহূর্ত কাটল এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম ওর চোখের দিকে। এদিকে প্রতি সেকেন্ডে ঘড়ির কাটা টিক টিক করে ঘুরছে আর অঘটনের ঘটনাস্থলকে পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, যদি ঘটনা সত্যি হয় আরকি। তবে এমন পরিস্থিতিতে রক্তে এড্রেনালিন রাশ শুরু হতে খুব বেশি সময় নিল না। উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললাম: বাস থামাও! বাস থামাও।

আরও পড়ুন
লেখক

১৭.

চালক জোরে ব্রেক কষে বাস থামাতেই, সামনের দরজা দিয়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে নামলাম আমরা চারজন, সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার। এরপর পেছন দিকে প্রায় কিলোমিটার খানেক দৌড়ে আসার পর দেখলাম ঘটনা সত্য!

রাস্তার পাশেই গাছের সঙ্গে ফাসিতে ঝুলছে ২০-২২ বছরের এক যুবক! পরনে কেবল নীল রঙের নতুন একটা লুঙ্গি, শরিরের উপরিভাগ খালি। শ্যাম বর্ণের সুঠাম দেহ, দেখা বোঝা যায় কর্মঠ শরীর। যদিও মুখে ক্লিন শেভ, তবে স্বাভাবিক লাবণ্য উবে গিয়ে পাংশু নীলাভ বর্ণ ধারণ করেছে তার মুখ আর দেহ। বোঝা যায় একেবারে তাজা লাশ নয় এটি। কয়েক ঘণ্টা হয়েছে অন্তত।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আত্মহত্যা বলে মনে হলেও, হত্যাকাণ্ড হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাটি থেকে এক ফিটের মতো উচ্চতায় লাশের দুই পা ঝুলছে, তবে আশে পাশে টুল-মোড়া বা চেয়ার জাতীয় কিছু নজরে পড়ল না।

এক হতে পারে—প্রথমে গাছে উঠে, গলায় ফাঁস বেঁধে ঝুলে পড়েছে। দ্বিতীয় সম্ভাবনা—ছেলেটাকে অন্য কোনো জায়গায় হত্যা করা হয়েছে আরও আগে। এরপর, সুযোগ বুঝে এখানে এনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে লাশ।

তা যা–ই হোক, ত্রিপল নাইনে কল করে ঘটনা বিস্তারিত বললাম। তারা চট্টগ্রামের লোহাগড়া থানার সঙ্গে যুক্ত করে দিল। পুলিশকে আবারও সব বিস্তারিত বললে তারা আশ্বাস দিল দ্রুতই ব্যবস্থা নেবে। তাই আর কালক্ষেপণ না করে কক্সবাজারের উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হলো পুনরায়। এমন আকস্মিক ঘটনায় হকচকিয়ে গিয়েছিলাম আমরা সবাই।

তাই বাস চলতে শুরু করলে নির্বাক দর্শক হয়েই বাকি পথ অতিক্রম করলাম আমরা চারজন। বেশ খানিকক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম কেবল সামনের দিকে।

আলো-অন্ধকারের আশা যাওয়ায় যেন এক অতিমানবী রূপ ধারণ করেছে এই দীর্ঘ মহাসড়ক। কে জানে আর কী কী আপেক্ষা করছে সামনে!

হাত–পা আমার তখনো কাঁপছে আর মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে কয়েকটা প্রশ্ন- কেউ নতুন লুঙ্গি পরে, ক্লিন শেভ করে একেবারে মেইন রোডের পাশে এসেই কেন আত্মহত্যা করবে! আর যদি আত্মহত্যা না হয়, তাহলে একেবারে মহাসড়কের পাশে এভাবে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়ার সময় কেউ কি দেখল না!

তা ছাড়া গাছের সঙ্গে ঝুলতে থাকা এই মরদেহ নিশ্চয়ই আমরা দেখার আগেও এখানকার স্থানীয়রা দেখেছে—তাহলে খবর দিল না কেন পুলিশে? চলবে...

আরও পড়ুন