মক্কা মদিনার ডায়েরি–২

মসজিদে নববির ভেতর গম্বুজের নকশার ছবি, এই গম্বুজগুলো সরে গিয়ে আকাশ উন্মুক্ত হয়ে যায়ছবি: লেখকের পাঠানো

৪. মদিনার দিনলিপি: মসজিদে নববিতে প্রথম নামাজ ও হুইলচেয়ার কাহিনি

কাফেলার সবাই মসজিদে নববিতে যাওয়ার জন্য বের হলাম। হোটেল থেকে মসজিদে নববি সামান্য পথ, কিন্তু আমার আম্মার আর্থ্রাইটিস সমস্যার কারণে হাঁটতে কষ্ট হয়, তাই আলাদা হয়ে ট্যাক্সিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাইরে বেশ গরম, মরুর লু হাওয়া চোখেমুখে ঝাপটা মারল। এখন অক্টোবর মাস, গরম কমে আসার কথা, আর কমে আসার উদাহরণ যদি এই হয়, তবে এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত গরমের তাণ্ডব চিন্তা করে ভয় হলো।

ট্যাক্সি ছাড়া সাধারণ গাড়িও ভাড়া যায়, এখানে মিটারে চলে না। রাস্তায় প্রাইভেট কার মসজিদে নববিতে পৌঁছে দিতে ২০ রিয়াল ভাড়া হাঁকল, দরদাম করে ১০ রিয়ালে রফা। আমরা রওনা হলাম রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর মসজিদের পথে। প্রশস্ত পথ, সুরম্য অট্টালিকা, রাস্তার বিলাসবহুল গাড়ির ভিড় সৌদি আরবের স্বাস্থ্যকর অর্থনীতির জানান দেয়। পাকিস্তানি চালক মসজিদে নববির ৩৬৫ নম্বর গেটের কিছু আগেই আমাদের নামিয়ে দিল, এর চেয়ে সামনে গেলে পার্কিং করা যায় না; পুলিশ ধরবে! বাকিটা পথ হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম। আসরের নামজের এখনো আধা ঘণ্টা দেরি, হাজারো মুসল্লি নারী–পুরুষ নির্বিশেষে দলে দলে মসজিদে প্রবেশ করছেন। তীব্র গরমের ঝাপটায় চোখমুখ জ্বালা করছে, বিশাল আকৃতির ছাতাগুলো ডানা মেলে রোদ থেকে ছায়া বিলোচ্ছে, বিশাল ফ্যান পানি মিশ্রিত বাতাস দিয়ে উষ্ণ আবহাওয়া শীতল করার চেষ্টায় ঘুরে চলেছে।

‎নারী–পুরুষ নামাজের বন্দোবস্ত আলাদা, প্রতিটি নামাজের ঘর নম্বর দিয়ে আলাদা করা আছে। নির্দিষ্ট নম্বরের ঘর হয় পুরুষ অথবা নারীদের জন্য নির্ধারিত। খুব সুন্দর ব্যবস্থা। খোলা অঙ্গনেও নারী ও পুরুষের আলাদা নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা আছে। পার্টিশন না থাকায় সবাই সবার নজরদারির মধ্যে থাকব। হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। প্রথম দিন ভেতরে প্রবেশ না করে বাইরের অঙ্গনে নামাজ আদায় করলাম। আমার আম্মার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, তাঁর জন্য হুইলচেয়ার প্রয়োজন। মসজিদে নববিতে ৩০১ আর ৩৩০ নম্বর গেটের পাশে পাসপোর্ট আর ভিসার রেকর্ড রেখে বিনা মূল্যে হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। আমি আর আমার স্ত্রী রুনা আসরের নামাজ শেষে ৩৩০ নম্বর গেটে গিয়ে একটি হুইলচেয়ার নিলাম। ওখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তা দুজন তরুণী, বোরকা পরা নিকাবে মুখ ঢাকা। ইংরেজি বোঝেন ও বলতে পারেন। মদিনা এয়ারপোর্টেও স্বেচ্ছাসেবী আর অভিবাসন কর্মকর্তা হিসেবে অনেক নারীকে দেখলাম। তাঁরা যে শুধুই নারীদের সাহায্য করছেন তা কিন্তু নয়। নারী–পুরুষ সব যাত্রীকে সমানভাবে সেবা প্রদান করছেন। সৌদি আরবে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ‎হুইলচেয়ার প্রদানকারী নারী কর্মকর্তা এন্ট্রি শেষ করে আমাকে একটি রিসিট দিলেন।

‎আমি প্রশ্ন করলাম এই হুইলচেয়ার আমাকে কখন ফেরত দিতে হবে?

‎তিনি উত্তর দিলেন যাওয়ার আগে এই কাউন্টারে রিসিটসহ নিয়ে আসতে।

‎আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম যদি আমি এটি হারিয়ে ফেলি তখন কি জরিমানা দিতে হবে?

‎তিনি উত্তর দিলেন, এটি আপনার কাছে আমানত হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, আপনি এটার যত্ন করবেন। আর যদি হারিয়ে ফেলেন তবে কোনো জরিমানা দিতে হবে না।

আরও পড়ুন

আমরা খুশিমনে হুইলচেয়ার নিয়ে রওনা হলাম। (এই আমানত আমি মদিনা থেকে মক্কায় যাওয়ার আগে ফেরত দিয়েছিলাম, কিন্তু আমার হোটেলের অনেককে হুইলচেয়ার মক্কায় নিয়ে যেতে দেখেছিলাম।) পরে মক্কায় যখন আবার হুইলচেয়ার জোগাড়ের জন্য মোতোয়াল্লিকে বলেছিলাম, তখন তিনি বললেন আপনারা হুইলচেয়ার কেন ফেরত দিতে গেলেন? এগুলো ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি থেকে দান! আশ্চর্য হলাম, ওয়াক্‌ফ বলে কি যথাস্থানে ফেরত দিতে হবে না? নাকি আমার বোঝার ভুল! আমার জানা মতে মক্কায়ও বিনা মূল্যে হুইলচেয়ার দেওয়া হয় এবং যথারীতি আমি ওইখানে তা সংগ্রহ করছিলাম।

বাবা আর আম্মাকে রেখে মসজিদ থেকে বের হলাম খাবার কিনতে। কিছুদূর হাঁটার পর বেশ কিছু শপিং মল। একটিতে ঢুকে ঘোরাঘুরি করছি, বাংলাদেশি ছেলে জোর করে দোকানে ঢুকাল। ওর অবস্থাটা এমন, কিনতে হবে না। বিভিন্ন রকম খেজুর খেয়ে দেখুন, খেজুর সম্পর্কে জানুন।

মসজিদুন নববিতে আজ প্রথম এলাম, প্রথম নামাজ আদায় করলাম এই সুখ আর আনন্দ কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়। আমি আর আমার স্ত্রী, আমাদের মন যেন হালকা হয়ে আকাশে ভাসছে। কী এক আনন্দ মনে সুখ বুলিয়ে চলেছে। মাগরিবের নামাজের এখনো দুই ঘণ্টা বাকি। গেটের বাইরে সুন্দর চত্বর, শয়ে শয়ে কবুতর হেঁটে কিংবা উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখতে ভীষণ সুন্দর আর পরিবেশটা খুবই মনোরম। মানুষ কবুতরগুলোর সঙ্গে খেলা করছে, ওদের খাবার দিচ্ছে। একটি বাচ্চা কবুতরগুলোর মাঝে দৌড়ে গেল, শত শত কবুতর উড়ে গেল। চারদিকে পাখা ঝাপটানির আওয়াজ। আশেপাশে অনেক শপিং মল, সারি সারি সোনার দোকান, খেজুরের দোকান, খাবার আর আতরের দোকান। আতরের দোকানের বিক্রয়কর্মী একটি নীল ছোট কাগজ দিয়ে গেল আমাদের, তাতে আতরের সুগন্ধ মাখা। সুগন্ধীটা মন পবিত্র করে দেওয়ার মতো। আরবের লোকেরা নাকি আতর সুগন্ধী খুব পছন্দ করে। না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে ওরা আতর কেনে! আমরাও আতর কিনব ঠিক করলাম, তবে এখন নয়। আসলে সুখী হতে হলে সব সময় মস্ত ঘটনার প্রয়োজন হয় না, জীবনের অতি সহজ অতি সাধারণ জিনিসগুলোর সংযোগই আমাদের প্রাণে সুখের উৎসব ডেকে আনে।

রিয়াজুল জান্নাহ-এর ভেতরের ছবি
ছবি: লেখকের পাঠানো

ছোট একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর পেলাম। বিস্কুট, কেক, ফলমূল, নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই আছে। আমরা কিছু ফলমূল আর ক্রোসেন্ট কিনলাম মা–বাবা আর আমাদের জন্য। আমরা উদ্দেশ্যহীন আরও কিছু সময় ঘুরে বেড়ালাম, তারপর ফিরে গেলাম। মা–বাবার সঙ্গে কাফেলার আরও কয়েকজন একসঙ্গে বসে আছেন। সবার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেলাম, সবার চোখেমুখে আনন্দ, স্বস্তি আর প্রশান্তির ছায়া মসজিদে নববিতে আসতে পেরে।

৫. মদিনার দিনলিপি—রওজা মোবারক জিয়ারতের অভিজ্ঞতা

মাগরিবের নামাজের সময় আমাদের কাফেলার জয়নাল সাহেবকে পেয়ে গেলাম, ঠিক আমার আগের কাতারে বসে কোরআন পড়ছিলেন। আমি আর বাবা একসঙ্গে বসে আছি। নামাজ শেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর রওজায় সালাম জানানোর নিয়ত করলাম। সালাম জানাতে ১ নম্বর দরজা ‘বাব আস সালাম বা শান্তির দরজা’ দিয়ে রওজায় প্রবেশ করা লাগে। আমরা বসে আছি মসজিদের ৩২ নম্বর কক্ষের বাইরের চত্বরে। এদিক থেকে ১ নম্বর দরজায় মসজিদের ভেতর পথে হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। উদ্দেশ্য মসজিদের ভেতরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাওয়া। মসজিদের ২২ নম্বর কক্ষ হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমরা উত্তর দিক দিয়ে প্রবেশ করেছি, যেতে হবে পশ্চিম দিকে। মসজিদের ভেতরের সৌন্দর্য অসাধারণ। প্রতিটি বস্তু-মার্বেল, টাইলস, ঝাড়বাতি, ক্যালিওগ্রাফি, নকশা, আলোকসজ্জা, কার্পেট, প্রতিটি স্তম্ভ পিলার, মেঝে থেকে ছাদ সবকিছুর সমন্বয় অপূর্বরূপে প্রস্ফুটিত। এত সুন্দর কারুকাজ আমি আর দেখিনি। মনে হলো কোনো রাজপ্রাসাদের ভেতর হাঁটছি। আসলেই তো রাজপ্রাসাদ! হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর মসজিদ এটি। ভেতরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা দিকভ্রান্ত হলাম। মসজিদের পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশি একজনকে জিজ্ঞেস করে আবার চলা শুরু করলাম। কয়েকবার দিক পরিবর্তন করতে হলো! ভেতরের কক্ষগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে সংযুক্ত। এক কক্ষ দিয়ে পশ্চিমে যেতে যেতে দেখলাম পরের কক্ষটিতে চলাচল বন্ধ আছে! পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার জন্য বা অন্য কারণেও এভাবে কক্ষ ঘের দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিবার জয়নাল সহেব দিক পরিদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন—আসুন আসুন ডানে গেলেই আমরা পেয়ে যাব! বাঁয়ে গিয়ে সোজা হাঁটলেই হবে বলে জয়নাল সাহেব এগিয়ে যান, শেষে পথ হারান। জয়নাল সাহেবের কাজকর্মে আমি খুব মজা পাচ্ছি! প্রসঙ্গে অপ্রসঙ্গে অসহায় হয়ে বলেন, স্ট্রোক করার পর সব ভুলে যাই! এভাবে পথ আরও গুলিয়ে যাই। ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত আমরা ৬ নম্বর দরজা হয়ে মসজিদ থেকে বাইরের চত্বরে বের হয়ে ১ নম্বর দরজায় ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম।

আরও পড়ুন

এক নম্বর দরজাটি সবচেয়ে বড় ও সজ্জিত। এটি মূল ও প্রাচীন অংশের উত্তর পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এর জন্য দীর্ঘ লাইন দিতে হলো। হাজার হাজার মানুষ প্রতি ওয়াক্তে এখানে লাইন দিচ্ছে। যখনই গিয়েছি, একমুহূর্তের জন্য আমি এই লাইন খালি দেখিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর রওজা মোবারক জিয়ারত ও সালাম জানিয়ে চল্লিশ নম্বর দরজা দিয়ে বের হয়ে এলাম।

‘আসসালাতু আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ,...’

‎ নারীরা এশার নামাজের পর বত্রিশ নম্বর গেট দিয়ে সালাম জানাতে আসতে পারেন, তবে তাঁরা রওজা মোবারকের সামনে আসার অনুমতি পান না। রওজা মোবারকের পেছনে ‘রিয়াজুল জান্নাহর’ বাইরে দিয়ে সালাম জানিয়ে তারা দুই নম্বর গেট দিয়ে বের হয়ে আসেন। আম্মা আর রুনা এশার নামাজের শেষে সেভাবেই জিয়ারত সম্পন্ন করে এলেন।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার শেষ করতে দশটা বেজে গেল। দীর্ঘ যাত্রায় আর দিনভর কাজকর্মে সবাই ক্লান্ত। দিবাগত রাত তিনটায় ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে উঠলেই তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হলাম। অন্ধকার আকাশ, চারপাশ সুনসান, কিন্তু অনেক মানুষ নীরবে একই রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে, আমিও সেই রাস্তায় শামিল হলাম। বিলাল (রা.) মসজিদ পার হতেই এই ভিড় যেন আরও বাড়তে থাকল, আর মসজিদুন নববির কাছে এসে তা রিতীমতো জনস্রোতে রূপ নিল। ভোর ৪টায় তাহাজ্জুদ নামাজের আজান হলো, মসজিদুন নববি তখন কানায় কানায় মুসল্লিতে পরিপূর্ণ। সবাই মশগুল নামাজে, কোরআন তেলাওয়াতে, ইবাদত বন্দেগিতে। চারদিকে তাকিয়ে মনে হলো কোনো চিরন্তন সকালবেলার একটি সুর এখানে ধরা পড়েছে। এখানে আটকে রয়েছে যে সুর, এ পৃথিবীতে তা আর নেই, নেই আমাদের জীবনে, নেই বাস্তবে আর স্বপ্নেও। পৃথিবী এগিয়ে চলে গেল, তার টান এখানে যেন লাগল না। এখানে রইল কোনো সুগন্ধী অতীত চিরকাল হয়ে। পুরো মদিনা যেন মুগ্ধ হয়ে রইল আমাদের সরকার রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর অলীক স্পর্শে।

আরও পড়ুন

৬. মদিনার দিনলিপি: আলোকিত শহরে জান্নাতের ছোঁয়া

ফজরের নামাজ শেষে হোটেলে পৌঁছে দেখি রুমের সামনে নাশতা রেখে দেওয়া আছে। ফ্রেশ হয়ে নাশতা খেয়ে একটু ঘুমানোর আয়োজন করলাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙা চোখে খবরের কাগজ খুলতে ভালো লাগে। ভালো লাগে ঠান্ডা পানিতে গোসল দিতে, চেনা ড্রেসিং টেবিলে চুল আঁচড়াতে, ভালো লাগে ঠিক সময়ে খাওয়া-শোয়া, ভালো লাগে চায়ের সঙ্গে ডুবিয়ে তেলের পরটা বা বিস্কুট খাওয়া। এই ভালো লাগাটা অনেক সময় ভ্রমণে বাদ দিতে হয়। এটা সৌভাগ্য যে খুব বেশি ছাড় আমাদের দিতে হয়নি। চায়ের কেটলি আছে, আছে চা–পাতা, চিনি, দুধ, বিস্কুট। সবকিছু সঙ্গে আনা। ঘুম ভাঙে কেটলিতে চা ফোটার আওয়াজ আর চায়ের সুভাসে। আম্মা আর রুনার জন্য বাড়তি পেরেশানি, বেড়াতে এসেও চা বানাও, কাপ ধৌত করো। আমার আর বাবার জন্য বাড়তি আনন্দ। বাবা তো পারলে কাফেলার সবাইকে ডেকে চা খাওয়ান। চেনা অভ্যাসের গণ্ডি পার হতে না চাওয়াটা আমাদের ধর্ম। জীবনে বৈচিত্র্যের রস জোগান দিতে চাইলে কিছু ছাড় দিতে হয়। কিছুটা ভালো না-লাগার জড়তার পরেও আমরা খুশি ছিলাম বর্তমান স্বাভাবিকতায়।

বেশ একটা কাণ্ড ভেতরে ভেতরে যেন ঘটে গেছে। দ্রুত হয়ে গেছে সময়ের লয়। আড়মোড়া ভাঙতে না-ভাঙতেই জোহরের নামাজের সময় চলে আসে। নামাজ শেষে খাওয়া–দাওয়া, এবার আসর নামাজের প্রস্তুতি। আজ আসরের নামাজের পর ৪টা ১০ মিনিটে রিয়াজুল জান্নায় যাওয়ার সময় নির্ধারণ করা আছে। নামাজ শেষে প্রায় আধ ঘণ্টা আগে সাঁইত্রিশ নম্বর গেটে চলে গেলাম আমি আর বাবা। বাবার কাছে মোবাইলে নুসুক অ্যাপ দিয়ে পবিত্র রিয়াজুল জান্নাহর পরিদর্শনের বিষয়টি একেবারে নতুন। বাবা এর আগেও কয়েকবার হজ ও ওমরাতে এসেছেন। যেকোনো বিষয় এলে বাবা পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে যান। মক্কা মদিনা নিয়ে তাঁর কত স্মৃতির কথা।

মদিনায় লেখক
ছবি: লেখকের পাঠানো

রিয়াজুল জান্নাহতে ইবাদত, জিকির ও নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এটি মসজিদে নববির একেবারে মূল ও প্রাচীন অংশে অবস্থিত। রিয়াজুল জান্নাহর ভেতরে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্তম্ভ বা খুঁটি রয়েছে, যেগুলোকে রহমতের স্তম্ভ বলা হয়। এগুলো নবীজির (সা.) যুগের বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি বহন করে। অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে রিয়াজুল জান্নাহতে প্রবেশ এবং নামাজ আদায়ের জন্য নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হয়। ‘নুসুক’ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ের নিবন্ধন ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। দর্শনার্থীর পাসপোর্ট নম্বর, ভিসা নম্বর, ই–মেইল আইডি দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। নারী ও পুরুষদের আলাদা সময়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। দীর্ঘ লাইন কয়েক ধাপে এগিয়ে চলেছে। দুই জায়গায় অ্যাপ স্ক্যান করে ৩৯ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করিয়ে বসতে দিল। এখানেও কয়েক ধাপ ভাগ করা আছে। আমাদের ডাক পড়ল। এ দরজায় গেছেন না–জানি কত মহাপুরুষ, কত রহস্যের রাস্তার আশ্চর্য প্রান্ত ওই দরজা—ওই রাস্তায় যাঁরা বেরিয়েছেন তাঁরাই ধন্য। এখানে ক্লান্তি নেই। আসতে আসতে শেষের দিকে অবসন্ন লাগছিল, কিন্তু যে মুহূর্তে রিয়াজুল জান্নায় ঢুকেছি, সেই মুহূর্তে গায়ে লেগেছে শান্তির হাওয়া, প্রশান্তির ঢেউ হয়ে উঠেছে আমাদের শরীর। আকাশে উড়তে উড়তে হঠাৎ পাখি দিক বদল করে, সেই তীক্ষ্ণ বাঁকা রেখায় আমি। এ কোথায় এলাম? এত আলো, এত ভিড়ের মধ্যে নিবিড় নিঃশব্দ, এত শান্তি, আর এমন স্বচ্ছ উজ্জ্বল নীরবতা—বিশ্বাস হয় না যেন। এখানে যেন সৃষ্টির কাজ এখনো শেষ হয়নি!

আরও পড়ুন

রিয়াজুল জান্নাহতে সময় বরাদ্দ থাকে কুড়ি মিনিট, এর মধ্যে নামাজ দোয়া পড়ে শেষ করতে হয়। এ সময়ের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবীরা দর্শনার্থীদের বের করে দেন। এরপর নবীজির রওজা মোবারকের সামনে গিয়ে ৪০ নম্বর গেট দিয়ে বের হতে হয়। রিয়াজুল জান্নাহতে ঢুকে আমি আর বাবা পেছনের সরিতে বসে নামাজ পড়ছিলাম। কখন যে কুড়ি মিনিট পার হলো টের পেলাম না। আমাদের সঙ্গে যে দলটি এসেছিল তাদের ইতিমধ্যে বের করে দেওয়া হয়েছে, আরও একটি নতুন দল এল, তারাও নামাজ পড়ে বিদায় নিল। আমি আর বাবা রয়ে গেলাম প্রায় এক ঘণ্টা। এরপর বের হয়ে প্রবেশ করলাম এক নম্বর গেট দিয়ে নবীজির রওজা মোবারকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিগণকে সালাম জানিয়ে জিয়ারত শেষে বের হলাম চল্লিশ নম্বর দরজা দিয়ে।

বাবা আর আম্মাকে একসঙ্গে রেখে আমি আর রুনা মসজিদ থেকে বের হলাম কিছু খাবার কিনতে। আজ বের হলাম ৩৬৫ নম্বর গেট দিয়ে, যে গেট দিয়ে আমরা আসা–যাওয়া করি। কিছুদূর হাঁটার পর বেশ কিছু শপিং মল। একটি শপিং মলে ঢুকে ঘোরাঘুরি করছি, অনেক খেজুরের দোকান এখানে। বাংলাদেশি একটি ছেলে জোর করে দোকানে ঢুকাল। ওর অবস্থাটা এমন, কিনতে হবে না। আপনারা বিভিন্ন রকম খেজুর খেয়ে দেখুন, খেজুর সম্পর্কে জানুন। চট্টগ্রামের ছেলে। কথায় কথায় চেনা–পরিচয় হয়ে গেল। আমরা বিভিন্ন রকম খেজুর খাওয়ার জন্য কিনলাম। কিছু খেয়ে দেখলাম, বেশ সুস্বাদু। দেশি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম—দোকানটি তার নাকি, কতদিন ধরে আছে মদিনায়, দেশে শেষ কখন গেছে। উত্তর এল—সে এখানে চাকরি করে, দুই বছর আগে দেশে গেছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, রিনিউ করতে অনেক টাকা লাগবে। জেগাড় হয়নি, তাই চেষ্টায় আছে। মল থেকে বের হয়ে একটি শর্মার দোকান পাওয়া গেল। আরবের শর্মা চেখে দেখতে হবে। তাও এক বাংলাদেশি দোকান চালাচ্ছেন, বাড়ি ফেনী। শর্মা নিয়ে মসজিদে রওনা হলাম। মা–বাবার কাছে পৌঁছতেই তাঁরা উল্টো নাশতা বের করে দিলেন। কারা যেন মুসল্লিদের নাশতা দিয়ে গেছে। মা আর বাবা আমাদের জন্য তুলে রেখেছেন। আমাদের কাফেলার হাসিনা খালা, তিন বোন, মামুন সাহেবের স্ত্রী, জয়নাল সাহেব সবাই একত্রে আছেন। সবাই ভাগ করে শর্মা খেলাম। শর্মার স্বাদে আমাদের দেশেরটাই জিতল। এশার নামাজের পর আম্মা আর রুনা রিয়াজুল জান্নাহতে গেল। চলবে...