স্পেনের বার্সেলোনা ভ্রমণ: ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে পিকাসোর শিল্পভুবনে

১৬ নভেম্বর ২০২৫, রোববার। দিনটি শুরু হয়েছিল ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির সান্নিধ্যে, আর শেষ হয়েছিল বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর শিল্পভুবনে। প্রকৃতি ও শিল্প—এই দুই অনন্য সৌন্দর্যের মিলনে দিনটি আমাদের ইউরোপ ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

সকালে বার্সেলোনার ক্যারেল ডি ভিলারোয়েল এলাকায় আমাদের অস্থায়ী আবাসে প্রাতরাশ সেরে সকাল ১০টায় আমরা বেরিয়ে পড়ি। অনিত আমাদের নিয়ে রওনা দিল ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত আধুনিক ও নান্দনিক পোর্ট অলিম্পিক এলাকার উদ্দেশে। ছোট্ট নাতনি রূপকথা আগের দিনের ভ্রমণের ক্লান্তিতে সে বিশ্রামে ছিল, ওর মা আনিকা সেদিন সকালে আমাদের সঙ্গে বের হয়নি।

তবে ভ্রমণের শুরুতেই ঘটল ছোট্ট একটি মজার ঘটনা। আমরা ভুল করে অন্য রুটের একটি বাসে উঠে পড়লাম। ফলে নির্ধারিত পথের পরিবর্তে বাসটি শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিল। মনে হলো এ–ও যেন ভ্রমণেরই একটি অপ্রত্যাশিত আনন্দ। বাসের জানালা দিয়ে বার্সেলোনার পরিচ্ছন্ন রাজপথ, আধুনিক স্থাপত্য, সারিবদ্ধ বৃক্ষ আর ব্যস্ত নাগরিক জীবনের বিচিত্র দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে গেল, টেরই পাইনি। প্রায় এক ঘণ্টা পর, দুপুর ১২টার দিকে আমরা পৌঁছালাম ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট অলিম্পিক এলাকায়। নীল সমুদ্র, সোনালি বালুকাবেলা, সারি সারি ইয়ট ও পালতোলা নৌকা, আর সাগরের শীতল বাতাস, প্রথম দর্শনেই মনে হলো, বার্সেলোনা যেন প্রকৃতি ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মিলনস্থল।

আরও পড়ুন

ভূমধ্যসাগরের তীরে পোর্ট অলিম্পিক বার্সেলোনার বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর ও বিনোদন এলাকা। এটি ১৯৯২ সালের অলিম্পিক গেমসের নৌযান প্রতিযোগিতার জন্য নির্মিত হয়েছিল। এ অঞ্চলটি আধুনিক বার্সেলোনার প্রতীক। একদিকে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি, অন্যদিকে সারি সারি ইয়ট, পালতোলা নৌকা, জলক্রীড়া, রেস্তোরাঁ, সেলবোট ও আধুনিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্য। পোর্ট ভেলের ভেতরে অবস্থিত মেরিনা পোর্ট ইউরোপের অন্যতম বিলাসবহুল সুপার ইয়ট মেরিনা। এখানে ১৫০টির বেশি ইয়টের জন্য নোঙরের ব্যবস্থা রয়েছে এবং ১৯০ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সুপার ইয়টও এখানে ভিড়তে পারে।

দুপুরের রোদ তখন নীল সমুদ্রের জলে রুপালি ঝিলিক ছড়াচ্ছিল। দূরে অসংখ্য নৌকার মাস্তুল আকাশের দিকে উঠে গেছে। পালতোলা সাদা ইয়টগুলো শান্ত জলের ওপর ভাসছিল, যেন কোনো শিল্পীর যত্নে আঁকা ক্যানভাস। শীতল হাওয়ায় সৈকতের তীর ঘেঁষে আমরা অসংখ্য পর্যটকের সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক হাঁটলাম। আমাদের দুজনের ক্লান্তি দেখে অনিত সমুদ্রতীরের একটি রেস্তোরাঁর সামনে থামল। অবসন্নতা দূর করতে বসে বসে কফি খাচ্ছিলাম আর অনন্ত নীল ভূমধ্যসাগরের অপরূপ সৌন্দর্য দেখছিলাম। সাগরের ঢেউগুলো একের পর এক এসে তীরে আছড়ে পড়ছিল, আর সেই শব্দের মধ্যে ছিল একধরনের প্রশান্তি। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বার্সেলোনা শুধু একটি আধুনিক শহর নয়, এটি সমুদ্র ও মানুষের সহাবস্থানের এক সুন্দর উদাহরণ।

ভূমধ্যসাগর দর্শন শেষে ১৫-২০ মিনিট হেঁটে আমরা তিনজন প্রবেশ করলাম শতাব্দীপ্রাচীন গথিক পরিবেশে। পাথরের সরু গলি, মধ্যযুগীয় প্রাসাদ, নীরব উঠান পেরিয়ে চলে এসেছিলাম বিশ্ববিখ্যাত পাবলো পিকাসোর মিউজিয়ামে।

পাবলো পিকাসো মিউজিয়াম—

ভূমধ্যসাগর দর্শন শেষে ১৫-২০ মিনিট হেঁটে আমরা তিনজন প্রবেশ করলাম শতাব্দীপ্রাচীন গথিক পরিবেশে। পাথরের সরু গলি, মধ্যযুগীয় প্রাসাদ, নীরব উঠান পেরিয়ে চলে এসেছিলাম বিশ্ব বিখ্যাত পাবলো পিকাসোর মিউজিয়ামে। কয়েক ঘণ্টা আগেও আমরা ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলাম; আর এখন দাঁড়িয়ে আছি আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসের এক মহাতারকা পাবলো পিকাসোর সৃষ্টির সামনে। যেন একই দিনে প্রকৃতি ও শিল্পের দুই অনন্য জগতের মিলন।

মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বারে জনপ্রতি ১২ ইউরো মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে ভেতরে প্রবেশ করলাম। প্রথমেই গ্যালারিতে পিকাসোর শৈশব ও কৈশোরের চিত্রকর্ম দেখে বিস্মিত হলাম। এত অল্প বয়সে এমন নিখুঁত রেখা, বাস্তবধর্মী অঙ্কন ও রঙের ব্যবহার—প্রতিটি ছবির মধ্যেই যেন ভবিষ্যতের সেই বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পীর অসাধারণ প্রতিভার স্পষ্ট ইঙ্গিত লুকিয়ে ছিল।

আরও পড়ুন

ধীরে ধীরে একতলা থেকে দোতলার গ্যালারিগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। শিল্পকর্মের নীল পর্বের গভীর বিষণ্নতা, গোলাপি পর্বের কোমল উষ্ণতা ও কিউবিজমের যুগান্তকারী শিল্পভাষা, যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেলাম। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই পিকাসোর জীবনও ছিল সদা পরিবর্তনশীল। তিনি কখনো নিজেকে এক ধারায় আবদ্ধ রাখেননি, বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন।

মিউজিয়ামের নীরব পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হলো, দুপুরে দেখেছি প্রকৃতির শিল্প, আর বিকেলে দেখছি মানুষের শিল্প। একদিকে ভূমধ্যসাগরের অসীম নীল, অন্যদিকে পিকাসোর ক্যানভাসে ধরা মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও সৃষ্টিশীলতার অনন্ত জগৎ—দুটিই যেন সৌন্দর্যের দুই ভিন্ন, অথচ সমান মহিমান্বিত রূপ।

ফিরে আসার সময় শেষবারের মতো পেছন ফিরে তাকালাম। মনে হলো, আজ শুধু একটি শহর দেখিনি; ইতিহাস, শিল্প, সমুদ্র আর মানুষের জীবনকে একসূত্রে গাথা এক অনন্য বার্সেলোনাকে অনুভব করেছি।

মিউজিয়ামটির বিশেষত্ব—

বিশ্বজুড়ে পিকাসোকে নিয়ে একাধিক জাদুঘর থাকলেও বার্সেলোনার এ মিউজিয়ামটির গুরুত্ব আলাদা। কারণ, এখানে তাঁর খ্যাতির শীর্ষ সময়ের কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর গঠনকাল, অর্থাৎ একজন কিশোর কীভাবে ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত হলেন, তাঁর ধারাবাহিক ইতিহাস।

পাবলো পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৬ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম যেন ছিল এক শিল্পযাত্রার সূচনা। তাঁর বাবা ছিলেন একজন চিত্রশিক্ষক, যিনি খুব অল্প বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন ছেলের অসাধারণ প্রতিভা। ছোটবেলাতেই পিকাসো এমন নিখুঁত ছবি আঁকতেন, যা কেবল অনুশীলনের ফল নয়, এটি ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ।

কৈশোরে পিকাসো জন্মস্থান মালাগা ছেড়ে বার্সেলোনায় চলে আসেন। এ শহরই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এখানে তিনি শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন, তিনি শিখেছিলেন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে। বার্সেলোনার ক্যাফে, শিল্পমহল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি যা কিছু শিখেছি, সবই শিখেছি বার্সেলোনায়।’

জীবনের একপর্যায়ে পিকাসোর জীবনে নেমে আসে গভীর বেদনা। তাঁর খুব কাছের প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক অস্থিরতা তাঁর শিল্পে ছায়া ফেলে। শুরু হয় তাঁর ব্লু পিরিয়ড (Blue period)—একসময় যখন তাঁর ক্যানভাসে নীল ও ধূসর রং প্রাধান্য পায়।

মিউজিয়ামের সেই অংশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি কেবল ছবি দেখছি না, আমি একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা অনুভব করছি। প্রতিটি মুখ, প্রতিটি দৃষ্টি যেন এক অজানা কষ্টের গল্প বলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অন্ধকার কেটে যায়। জীবনে ফিরে আসে আলো, সম্পর্ক, উষ্ণতা। তাঁর শিল্পেও দেখা যায় পরিবর্তন। তাঁর রোজ পিরিয়ড (Rose period)—ছবিতে রং উষ্ণ হয়ে ওঠে গোলাপি ও কোমল আভা। কিন্তু পিকাসো এখানেই থেমে থাকেননি। ১৯০৭ সালে তিনি এমন এক কাজ করেন, যা আধুনিক শিল্পের ইতিহাসকে বদলে দেয়। তিনি বাস্তবতাকে ভেঙে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। ফরাসি শিল্পী জর্জেস ব্রাকের সঙ্গে মিলে তিনি সৃষ্টি করেন কিউবিজম (Cubism)।

আরও পড়ুন

পিকাসোর শিল্প কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, ছিল প্রতিবাদেরও ভাষা। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় আঁকা তাঁর কালজয়ী গুয়ের্নিকা (Guernica) আজও যুদ্ধবিরোধী শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। মিউজিয়ামের প্রতিটি কক্ষে ঘুরে ঘুরে তাঁর সৃষ্টির বৈচিত্র্য দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে পড়ি। অনিতের পূর্ব অভিজ্ঞতায় গুরুত্বপূর্ণ চিত্রগুলোর ইতিহাস বর্ণনায় আমাদের দর্শনের আনন্দ আরও বেড়ে যায়।

মিউজিয়ামে প্রদর্শিত পিকাসোর কাজগুলো মূলত সবই আসল শিল্পকর্ম। এগুলো কোনো পোস্টার বা কপি নয়। অর্থাৎ যে চিত্রকর্ম, স্কেচ বা সিরামিক সেগুলো পিকাসোর নিজের হাতে তৈরি। তবে সবগুলো একসঙ্গে প্রদর্শিত হয় না। স্থান সংকুলান, সংরক্ষণ ও বিশেষ প্রদর্শনীর কারণে নির্দিষ্ট সময়ে সংগ্রহের এক একটি অংশ প্রদর্শিত হয়।

মিউজিয়ামের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো লা মেলিনাস (Las Meninas) সিরিজ। ১৯৫৭ সালে পিকাসো স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী দিয়েগো ভেলাকুয়েজের বিখ্যাত চিত্রকর্ম লা মেলিনাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। এই সিরিজে মোট ৫৮টি পৃথক চিত্রকর্ম রয়েছে এবং পুরো সিরিজটি একসঙ্গে সংরক্ষিত আছে বার্সেলোনার এই মিউজিয়ামে। এটিই বিশ্বের একমাত্র স্থান যেখানে সম্পূর্ণ সিরিজটি একসঙ্গে দেখা যায়। এই ৫৮টি কাজের মধ্যে রয়েছে—মূল চিত্রের ৪৫টি পুনর্ব্যাখ্যা, কবুতরবিষয়ক ৯টি চিত্র, ৩টি প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং তাঁর স্ত্রী জ্যাকলিনের একটি প্রতিকৃতি।

মিউজিয়ামের ইতিহাসে ১৯৭০ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেই বছর পিকাসো পরিবার তাঁর চিত্রকর্মগুলো দান করেন, তার মধ্যে ছিল ২৩৬টি চিত্রকর্ম, ১ হাজার ১৪৯টি অঙ্কন, ১৭টি স্কেচবুক, শৈশবের নোটবুক, ২টি খোদাইচিত্র এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা ৪০টি অন্যান্য চিত্রের কাজ। এই দানের ফলে মিউজিয়ামের সংগ্রহ অসাধারণভাবে সমৃদ্ধ হয়।

পিকাসোর শিল্প শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় গুয়ের্নিকা শহরে বোমা হামলার প্রতিবাদে তিনি আঁকেন তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম গুয়ের্নিকা, যা বর্তমানে সংরক্ষিত আছে সোফিয়ার মিউজিয়ামে।

পর্যটন তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে মিউজিয়ামের সংগ্রহে পিকাসোর প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈলচিত্র, অঙ্কন, স্কেচ, নোটবুক, প্রিন্ট খোদাই চিত্র ও সিরামিক শিল্পকর্ম। পিকাসোর চিত্র প্রমাণ করে শিল্প কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি প্রতিবাদের ভাষা, ইতিহাসের দলিল। আমরা বিভিন্ন কক্ষের দেয়ালের বিভিন্ন সাইজের তাঁর সৃষ্টি দেখে বিভোর হয়ে পড়েছিলাম, অনিতের পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলোর ইতিহাস বর্ণনা করে আমাদের জ্ঞানার্জনকে সহায়তা করেছিল। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে গেটের পাশে পর্যটন কেন্দ্রের শোরুমে প্রবেশ করি। হাজারো মুদ্রিত ছবি থেকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পিকাসোর আঁকা শ্রেষ্ঠ ছবি থেকে চারটি ছবি কিনেছিলাম। দেশে ফেরত আসার পরে সেই ছবিগুলো এখন আমার ঘরের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

লা রাম্বলা: রাতের আলোয় জীবন্ত বার্সেলোনা

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা দিলাম বার্সেলোনার প্রাণকেন্দ্র লা রাম্বলার দিকে। সেখানে আমার মেয়ে আনিকা ছোট্ট রূপকথাকে স্ট্রলারে নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাই পিকাসোর মিউজিয়ামের নীরব শিল্পভুবন থেকে বেরিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম বার্সেলোনার প্রাণকেন্দ্র লা রাম্বলার পথে।

লা রাম্বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। মানুষের ভিড়, রাস্তার শিল্পী, সংগীত, আলো—সব মিলিয়ে এক চলমান উৎসব। চলার পথে আমাদের খুদে পর্যটক রূপকথা স্ট্রলারে শুয়ে শুয়ে এদিক ওদিক অবাক দৃষ্টিতে অত্যন্ত শান্তভাবে রাস্তার আলো দেখছিল। অচেনা মানুষের ভিড়, রাস্তার সুর আর রঙিন পরিবেশ—সবকিছু যেন তার ছোট্ট দুটি চোখে এক নতুন রূপকথার গল্প হয়ে ধরা দিচ্ছিল। কখনো সে নীরবে জ্বলজ্বলে আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকছিল, কখনো কৌতূহলী চোখে পথচারীদের দেখছিল। মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট শিশুটিও নিজের অজান্তেই বার্সেলোনার স্মৃতির পাতায় একটি কোমল অধ্যায় লিখে রাখছে।

দিনের তুলনায় রাতের লা রাম্বলা যেন আরও গভীর, আরও নাটকীয়। জীবন্ত শিল্পমঞ্চে রাতের রাম্বলা যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রাস্তার শিল্পীরা তখন তাদের সেরাটা দেয়, কেউ গিটার বাজাচ্ছে, কেউ গান গাইছে, কারও অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করছে। রাস্তার পাশে ছোট ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোতে বসে মানুষ বিয়ার হাতে গল্প করছে, খাবার উপভোগ করছে।

রাত যখন আরও গভীর হচ্ছে, লা রাম্বলার আলো, পথশিল্পীদের সুর, মানুষের হাসি আর ক্যাফেগুলোর প্রাণচাঞ্চল্য যেন বার্সেলোনাকে এক জীবন্ত শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। মনে হচ্ছিল, এই শহর কখনো ঘুমায় না, সে শুধু সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলায়।

ফিরে আসার সময় শেষবারের মতো পেছন ফিরে তাকালাম। মনে হলো, আজ শুধু একটি শহর দেখিনি; ইতিহাস, শিল্প, সমুদ্র আর মানুষের জীবনকে একসূত্রে গাথা এক অনন্য বার্সেলোনাকে অনুভব করেছি। গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে চলল, আর পেছনে ফেলে আসা আলোকোজ্জ্বল লা রাম্বলা নীরবে আমার ভ্রমণস্মৃতির একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রইল।

(বি. দ্র.: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও সংগৃহীত তথ্য নিয়ে লেখা)

*লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ, বনানী, ঢাকা