অস্ট্রিয়া ভ্রমণ: লেক কনস্ট্যান্সের তীরে ব্রেগেঞ্জ বন্দরে একদিন
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সুইজারল্যান্ডের রাইনে ফলসের গর্জনমুখর সৌন্দর্য হৃদয়ে ধারণ করার কয়েক দিন পর, আমাদের আরেকটি বিস্ময়ের দ্বার খুলে দিল—লেক কনস্ট্যান্স, জার্মান ভাষায় বোডেনজি। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও মনোরম এই হ্রদটি জার্মানি, সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া—এই তিনটি দেশের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ৫৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল হ্রদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৩ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ১৪ কিলোমিটার। আল্পস পর্বতমালা থেকে নেমে আসা রাইন নদী এই হ্রদে প্রবেশ করে আবার এর পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে অল্প দূরেই সৃষ্টি করেছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত রাইনে ফলস। অর্থাৎ লেক কনস্ট্যান্স এবং রাইনে ফলস একই নদীর দুটি ভিন্ন অথচ সমান বিস্ময়কর রূপ।
৪ অক্টোবর স্টুটগার্টের হেলেনবাড থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে দুপুরে আমরা পৌঁছালাম ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও মনোমুগ্ধকর হ্রদ, এই লেক কনস্ট্যান্স (বোডেনজি)-এর তীরবর্তী ঐতিহাসিক বন্দরনগরী লিনডাউয়ে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া—এই তিনটি দেশের সীমানাজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৫৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল হ্রদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৩ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ১৪ কিলোমিটার। এই হ্রদটি ইউরোপের অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময়। লেক কনস্ট্যান্সের কোনো একক ‘শহর’ নেই; এটি তিনটি দেশ—জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়াজুড়ে বিস্তৃত।
আমাদের এই ভ্রমণে লেক কনস্ট্যান্সের তীরে অবস্থিত জার্মানির লিনডাউ ও অস্ট্রিয়ার ব্রেগেঞ্জ—দুটি শহরের সৌন্দর্য আমরা এক দিনেই উপভোগ করেছিলাম। শেনজেন ভিসা থাকার কারণে অস্ট্রিয়া যাত্রার আগে আমাদের কোথাও ভিসা ও পাসপোর্ট দেখাতে হয়নি, কোনো ইমিগ্রেশনের অফিসও দেখিনি। আল্পস পর্বতমালার হিমবাহ গলে নেমে আসা রাইন নদীর জলেই গড়ে উঠেছে এই হ্রদ, আর সেই রাইন নদীই পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে অল্প দূরেই সৃষ্টি করেছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত রাইনে ফলস। তাই লেক কনস্ট্যান্স ও রাইনে ফলস একই নদীর দুই ভিন্ন অথচ সমান বিস্ময়কর রূপ দেখতে এখানে আগমন।
লিনডাউয়ে পৌঁছে মনে হলো, প্রকৃতি যেন এখানে আপন হাতে সৌন্দর্যের এক অনুপম ক্যানভাস এঁকেছে। বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি, দূরে বিশাল আল্পস পর্বতমালার আবছা রেখা, সারিবদ্ধ পালতোলা নৌযান, আর মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে ঘেরা বন্দর। এই লিনডাউ শহর থেকেই আমরা পর্যটন জাহাজে চড়ে লেক কনস্ট্যান্সের বুকে ভেসে অস্ট্রিয়ার মনোরম বন্দরনগরী ব্রেগেঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি।
লিনডাউ, কনস্ট্যান্স, মির্সবুর্গ, ব্রেগেঞ্জসহ বহু ঐতিহাসিক ছোট ছোট শহর এই হ্রদের তীর ঘিরে গড়ে উঠেছে। গ্রীষ্মে হাজার হাজার পর্যটক নৌবিহার, পালতোলা নৌকা, সাইকেলভ্রমণ ও জলক্রীড়ার জন্য এখানে ছুটে আসেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
লিনডাউ বন্দর থেকে যখন আমরা পর্যটন জাহাজে উঠলাম, তখন বিকেলের আকাশ ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল। বিশাল হ্রদের বুক চিরে জাহাজ এগিয়ে চলল অস্ট্রিয়ার বন্দরনগরী ব্রেগেঞ্জের দিকে। চারদিকে শুধু জল আর জল। দূরে ছোট ছোট পালতোলা নৌকা, মাঝেমধ্যে সাদা রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন ছবির মতো লাগছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়া বদলে গেল, কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল, শুরু হলো বৃষ্টি, সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। শান্ত লেক মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে উঠল। জাহাজের ডেক ভিজে গেল বৃষ্টির পানিতে, ঢেউয়ের ছিটা এসে মুখে লাগছিল। এর মাঝেই আল্পস পর্বতমালার পাদদেশের বন্দরে নামলাম। আমাদের শিশু পর্যটক রূপকথার স্টলারটির চারদিক ঢেকে আমরা শহরের দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমাদের শরীর ওভারকোট দিয়ে আবৃত থাকায় বৃষ্টি ও ঠান্ডা বাতাস তেমন কাবু করতে পারেনি।
আমাদের ইচ্ছা ছিল ব্রেগেঞ্জ শহরের লেকপাড়, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিখ্যাত সি-প্রমেনাড ধরে আরও কিছুটা সময় হাঁটব; কিন্তু বৈরী আবহাওয়া সে সুযোগ দিল না। ভিজতে ভিজতেই আমরা আশ্রয় নিলাম লেকের তীরের একটি নান্দনিক রেস্তোরাঁয়।
কাচের বিশাল জানালার ওপারে তখন এক অন্য রকম দৃশ্য। বৃষ্টির ফোঁটায় ঝাপসা হয়ে আসা লেক কনস্ট্যান্স, বন্দরে নোঙর করা পালতোলা নৌকা, দূরে মেঘে ঢাকা আল্পস পর্বতমালার আবছা রেখা এবং ঝোড়ো বাতাসে দুলতে থাকা গাছপালা—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। সেই মনোমুগ্ধকর পরিবেশে অনিত ও তুলতুলের পছন্দে আমরা অস্ট্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করলাম। খাবারের সঙ্গে আমাকে দেওয়া হলো ভোরালবার্গ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিয়ার। শত শত বছরের ব্রিউয়িং ঐতিহ্যে তৈরি সেই সোনালি পানীয়ের স্বাদ যেন বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টি আর শীতল আবহাওয়াকে আরও অর্থবহ করে তুলেছিল। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বৃষ্টিভেজা বিকেলে সেই উষ্ণ রেস্তোরাঁয় বসে খাবার উপভোগ করার অনুভূতি আজও মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।
বৃষ্টি কিছুটা কমলে আমরা ত্বরিত গতিতে টার্মিনালে ফিরে এলাম। লেক কনস্ট্যান্সের বুকে ঝোড়ো বাতাস তখনো বইছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পরে আমরা আবার পর্যটন জাহাজে লিনডাউয়ের উদ্দেশে রওনা দিলাম। জাহাজে পর্যটকদের কোনো কমতি ছিল না। ভ্রমণপিপাসু অস্ট্রেলিয়ার একটি পরিবারের সঙ্গে জাহাজের ছাদে গল্প করে সময় কাটালাম। লেক কনস্ট্যান্সের বুক চিরে জাহাজ এগিয়ে চলেছে, বাতাসের তীব্রতায় বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে জাহাজের গায়ে, জাহাজটি দোল খাচ্ছিল। প্রকৃতির রুদ্র রূপের মধ্যেও সেই সন্ধ্যাটিই ছিল অপূর্ব সুন্দর। লিনডাউ বন্দরে ফিরতেই বৃষ্টি থেমে গেল। হেঁটে অনেক দূরে পার্কিং করা গাড়িতে এসে উঠলাম। সামনে প্রায় ২০০ কিলোমিটারের পথ।
গাড়ির পেছনের সিটে নিজের ছোট্ট কার সিটে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল আড়াই মাসের রূপকথা। কখনো গভীর ঘুমে ডুবে যাচ্ছিল, আবার কখনো গাড়ির হালকা দোলায় চোখ দুটো আধখোলা করে চারপাশে তাকিয়ে আবার মৃদু হাসির মতো এক অভিব্যক্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিল। তার ছোট্ট দুটি হাত কখনো মুঠো হয়ে থাকত, কখনো আবার নিঃশব্দে খুলে যেত। তুলতুল মাঝেমধ্যে পেছনে ফিরে সন্তানের গায়ের কম্বল ঠিক করে দিচ্ছিল, কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেখছিল সব ঠিক আছে কি না। অনিতও রিয়ারভিউ মিররে মাঝেমধ্যে একঝলক তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছিল, তাদের আদরের ছোট্ট মেয়েটি নিশ্চিন্তেই আছে। গাড়ির ভেতরে তখন এক অপূর্ব প্রশান্তি। বাইরে ব্ল্যাক ফরেস্টের ঘন অরণ্য, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর শরতের রঙিন প্রকৃতি; ভেতরে একটি শিশুর শান্ত নিশ্বাস। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে ছোট্ট রূপকথাকে নীরবে আশীর্বাদ করছে।
আরও কিছু দূর এগিয়ে যখন গাড়ি পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে নিচের উপত্যকার দিকে নামছিল, তখন রূপকথা ধীরে ধীরে জেগে উঠল। জানালার কাচ দিয়ে ভেসে আসা হাইওয়ের রাস্তার আলোছায়ার খেলায় সে বিস্ময়ভরা চোখে চারদিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো সে কিছুই বুঝতে পারছিল না, তবু তার নিষ্পাপ দৃষ্টিতে যেন পুরো পৃথিবীটাই ছিল নতুন। তার সেই কৌতূহলী চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি বন, প্রতিটি পাহাড় আর প্রতিটি আকাশ একদিন হয়তো তার মনে থাকবে না; কিন্তু বাবা-মা ও নানা-নানির সঙ্গে কাটানো এই নিরাপদ, স্নেহময় ভ্রমণের উষ্ণতা অদৃশ্য স্মৃতির মতো রূপকথার জীবনের গভীরে রয়ে যাবে।
*লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ