কাঞ্চনজঙ্ঘার সন্তান: লেপচা ও লেপচা জগৎ
আমার কেনা হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই ‘দেখা না দেখা’ ছিল নিতান্তই এক ভ্রমণকাহিনি। লেখক যেখানে যা দেখেছেন, ছবির সঙ্গে সঙ্গে তার কিছু বর্ণনা দিয়েছেন আর মাঝেমধ্যে কিছু জায়গার ইতিহাসও লিখেছেন। এ বইটি পড়েই বুঝলাম, কোনো একটা জায়গা ভ্রমণ করলে শুধু চোখের দেখা নয়—সেই জায়গার ইতিহাস, মানুষ, ঐতিহ্য সম্পর্কে যদি একটু জানা থাকে, তাহলে সেই দেখার মজাটাই অনেক বেড়ে যায়।
এই ভূমিকা টানার আসল কারণ হচ্ছে দার্জিলিংয়ের ছোট্ট গ্রাম লেপচা জগৎ। দার্জিলিং ভ্রমণের সবকিছু যখন ঠিক করছিলাম—মানে কোথায় থাকব, কোথায় কোথায় যাব—তখন কী মনে করে যেন প্রথম রাতটা এই লেপচা জগতেই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। সাধারণ পর্যটকের চোখে আমাদের কাছেও তখন এটা ছিল নিতান্তই পাইনবনে ঘেরা, ছিমছাম, হাতে গোনা কয়েকটা হোম স্টে নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট গ্রাম—যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। নিদারুণ, কিন্তু অফবিট একটা পর্যটন স্থান। এর বেশি কিছু তো আমাদের বর্তমান পর্যটকদের জানা লাগে না। আমরা শুধু জানতে চাই—কোথায় কত খরচে কেমন খাওয়া-থাকা যাবে, কোথায় ভালো সেলফি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়ার জন্য স্টোরি বা রিলসের ছবি-ভিডিও ভালো আসবে। বলতে দ্বিধা নেই, আমরাও সেই মানসিকতা নিয়েই দার্জিলিংয়ের প্রথম রাত ও পরের ভোর দেখার জন্য লেপচা জগৎকে বেছে নিয়েছিলাম।
তখন কে জানত, এই জগৎ যাদের—মানে লেপচারা (লেপচা জগৎ = লেপচাদের জগৎ)—তারাই হচ্ছে এই তল্লাটের, মানে পুরো সিকিমের (দার্জিলিং একসময় যার অংশ ছিল, এর বিস্তারিত একটু পরেই বলব) সবচেয়ে আদি বাসিন্দা। কাজী দাওয়া সামদুপ (আরে, আমিও তো কাজী—এ তো আরেক গবেষণার বিষয় হয়ে গেল!) নামের একজন লেখক ১৯০৮ সালে সিকিমের ছগিয়াল রাজা থুতুব নামগ্যাল ও রানি ইয়েশি ডোলমা কর্তৃক রচিত একটি পাণ্ডুলিপি ‘The Royal History of Sikkim’ অনুবাদ করেন, যেখানে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তার মানে দার্জিলিংসহ পুরো সিকিমে মানব পদরেখা এই লেপচাদের দিয়েই শুরু।
‘The Lepcha: English Encyclopaedical Dictionary’তে বলা হয়, লেপচাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের আদি মাতা-পিতা যথাক্রমে ‘নাযং নিউ’ ও ‘ফোদং থিং’—যাদের সৃষ্টি হয়েছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ দিয়ে। লেপচাদের ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, ফোদং থিং ও নাযং নিউর বৈবাহিক সম্পর্কের আগেই সাতটি সন্তান জন্ম নেয়। যেহেতু অধর্মের যোগে এই সাত সন্তান জন্মেছিল, তাই তারা হয় ডিমন বা রাক্ষস বা অপদেবতা—লেপচা ভাষায় ‘মুং’। এরা মানবজাতির জন্য বিভিন্ন দুর্ভাগ্য, রোগ ও অশুভ পরিস্থিতির প্রতীক। পরবর্তী সময়ে ফোদং থিং ও নাযং নিউ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন তাঁদের থেকে যে সন্তানদের জন্ম হয়, তারা পবিত্র এবং বর্তমানের ‘রং কুপ’ বা লেপচা জাতির পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত। লেপচারা নিজেদের ‘মুতাঞ্চি রং কুপ’, অর্থাৎ ধরিত্রী মাতার কাঞ্চনজঙ্ঘার (স্নো পিক বা তুষারচূড়া) সন্তান বলে পরিচয় দেয়। এ কারণেই কাঞ্চনজঙ্ঘা আজও সর্বাধিক পবিত্র স্থান। শুধু পরিচয়েই নয়, তাদের কাজকর্মেও বোঝা যায়—সন্তানের যেমন মায়ের প্রতি ভালোবাসা থাকে, প্রকৃতির প্রতিও তাদের ঠিক তেমনই ভালোবাসা। অনেক লেপচা বর্তমানে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলেও এখনো তাদের ধর্মের অনেকটা জুড়ে রয়েছে প্রকৃতিপূজা। নিজেদের এই ভূমিকে তারা বলে ‘Mayel Lyang’ বা পবিত্র ভূমি।
লেপচাদের আলাদা স্বতন্ত্র লিপিসহ ভাষাও রয়েছে, যাকে ‘রং’ বা ‘কাখা’ লিপি বলা হয়। আমরা যে হোম স্টেতে ছিলাম, এর নাম হচ্ছে ‘সালাখা’। লেপচা ভাষায় যার অর্থ হলো ‘আলো’ বা ‘জ্যোতি’।
লেপচাদের আলাদা স্বতন্ত্র লিপিসহ ভাষাও রয়েছে, যাকে ‘রং’ বা ‘কাখা’ লিপি বলা হয়। আমরা যে হোম স্টেতে ছিলাম, এর নাম হচ্ছে ‘সালাখা’। লেপচা ভাষায় যার অর্থ ‘আলো’ বা ‘জ্যোতি’।
‘The Lepchas: Culture and Religion of a Himalayan People’ বইয়ে পাওয়া যায়—লেপচা রাজা বা প্রধানদের বলা হতো ‘পানু’। যাঁরা সপ্তম শতাব্দী থেকে পর্যায়ক্রমে এই দার্জিলিং অঞ্চলের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। ১৩ শতাব্দীতে লেপচাদের প্রধান থেকং টেক পানু (Thekong Tek) এবং তিব্বতি ভুটিয়া যুবরাজ খ্যে বুমসার (Khye Bumsa) মধ্যে Treaty of Blood Brotherhood চুক্তি হয়। এ চুক্তির ফলে সিকিমের আদিবাসী লেপচা এবং নবাগত ভুটিয়াদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় লেপচারা ১৬৪২–এ স্বেচ্ছায় নামগ্যাল বংশের রাজত্ব মেনে নেয় এবং দার্জিলিংসহ পুরো সিকিমের প্রথম রাজা বা ছগিয়াল হিসেবে সিংহাসনে বসেন খ্যে বুমসার পঞ্চম প্রজন্মের বংশধর ফুন্টসোগ নামগ্যাল। ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ অবধি এই নামগ্যাল বংশের অধীন ছিল পুরো সিকিম। তবে লেপচাদের শেষ প্রধান ছিলেন ভুটিয়া বিদ্রোহী ‘পানু গেবু আচায়ক’, যিনি ১৬৬০ থেকে ১৬৭৬ সাল পর্যন্ত আধুনিক কালিম্পং এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ভুটানসংলগ্ন অঞ্চলে লেপচাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য লড়াই করেছিলেন। এই শেষ রাজার বিষয়ে অনেক মিথ ও কানাঘুষা ছিল—বিশেষ করে ভুটিয়াদের মধ্যে—তিনি জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তাই গেবু আচায়ককে ভুটিয়ারা ডেমন কিং বা শয়তান রাজা বলেও ডাকত। অন্যদিকে লেপচাদের কাছে তিনি ছিলেন জাতির ঐক্য ও সাহসিকতার প্রতীক। লোককথা অনুযায়ী, বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে তাঁকে আলোচনার জন্য ডেকে এনে প্রতারণা করে হত্যা করা হয়েছিল এবং এর মধ্য দিয়েই নিজেদের জমিনে লেপচাদের নিজস্ব শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
এখন আসি দার্জিলিংয়ের কথায়। ‘লিং’ মানে জায়গা এবং ‘দর্জে’ মানে বজ্র—অর্থাৎ ‘দর্জেলিং’ মানে বজ্রের ভূমি বা বজ্রাস্ত্রের স্থান। ‘পাহাড়ের রানি’ নামে পরিচিত দার্জিলিং বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি বিভাগের একটি জেলা, যার ইতিহাস জুড়ে রয়েছে বহুবার হাতবদলের গল্প।
নেপালের গোর্খা রাজবংশ বারবার সিকিমে আগ্রাসন চালাত নিজেদের পরিধি বিস্তারের জন্য। অষ্টাদশ শতাব্দীতে গোর্খারা সিকিমে আক্রমণ করে এবং দার্জিলিংসহ কয়েকটি অঞ্চল নেপালের দখলে চলে যায়। সিকিমের ছগিয়ালদের সঙ্গে ব্রিটিশদের ভালো সম্পর্ক থাকায় ব্রিটিশরা ১৮১৪ সালে নেপালের সঙ্গে অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধে নেপালকে পরাজিত করে এবং ১৮১৬ সালে Treaty of Sugauli-এর মাধ্যমে নেপাল দার্জিলিংসহ সিকিমের দখল করা অংশ ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়।
নাগরিক সংবাদে, ভ্রমণকাহিনি, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এরপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮১৭ সালে সিকিমের রাজা ছগিয়ালের সঙ্গে Treaty of Titalia স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মাধ্যমে সিকিমের ভেতর দিয়ে কলকাতার সঙ্গে খোলাবাজার–ব্যবস্থার শর্তে নেপালিদের দখল করা অংশ সিকিমকে ফেরত দেওয়া হয়। ফেরত তো দেওয়া হলো, কিন্তু বাংলা ছবির ভিলেনের মতো ব্রিটিশদের নজর পড়ে থাকে দার্জিলিংয়ের দিকে। কিন্তু কেন? কী ছিল এই দার্জিলিংয়ে?
বিখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটি ভ্রমণকাহিনিবিষয়ক বই ‘পায়ের তলায় সর্ষে’র ‘অজানা নিখিলে’ অনুচ্ছেদে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃক দার্জিলিং দখল নেওয়ার নেপথ্য এবং কীভাবে নেয়, সেটার বর্ণনা দেন।
Treaty of Titalia-এর ১০ বছর পর নেপাল ও সিকিমের মধ্যে আবার গোলমাল শুরু হয়। তখন ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক দুজন অফিসার—ক্যাপ্টেন জর্জ লয়েড এবং জে ডব্লিউ গ্রান্টকে পাঠান মধ্যস্থতা করতে। তাঁরা দার্জিলিংয়ে প্রায় ছয় দিন কাটান এবং কলকাতার গরম ও ঘাম থেকে মুক্তি পেয়ে ইউরোপের মতো আবহাওয়ার লোভে পড়ে যান। ১৮২৯ সালে তাঁরা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে রিপোর্ট দেন যে দার্জেলিংয়ে ব্রিটিশদের জন্য একটি স্যানেটরিয়াম তৈরি করা দরকার। এখানকার আবহাওয়া ও পরিবেশ ব্রিটিশদের অবকাশ যাপনের জন্য খুবই উপযোগী।
ব্রিটিশরা তো যেই ভাবা সেই কাজে পারদর্শী ছিল। ১৮৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন সিকিমের ছগিয়াল থুগপুদ নামগ্যালের সঙ্গে একটি ‘Deed of Grant’ বা দানপত্র চুক্তি করে তারা। হিন্দুস্তানি-ফারসি লিপিতে অনূদিত এবং ইংরেজি ভাষায় লেখা চুক্তিটি ছগিয়াল থুগপুদ না বুঝেই সই করে ফেলেন। নিঃশর্ত উপহার হিসেবে সিকিম থেকে আলাদা হয়ে ব্রিটিশ কোম্পানির হাতে চলে যায় দার্জিলিং। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭–এ ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লে দার্জিলিং চলে আসে ভারত নামের আরেকটি দেশের অধীন। কিন্তু মজার বিষয় হলো—তখন সিকিম ভারতের অংশ ছিল না। সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে, ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার অনেক পরে।
পরিশেষে লেপচা জগতের সেই প্রথম রাত ও ভোরের কথা মনে পড়লে এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে—হোম স্টের ব্যালকনি থেকে জীবনে প্রথমবারের মতো দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশালতা, পাইনবনের নীরবতা, আর চোখ-মুখ ছুঁয়ে চলা মেঘের ভেলার স্নিগ্ধতা। এর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে লেপচাদের অতিথি আপ্যায়ন, তাদের সরলতা ও কর্মঠ জীবনযাপন। আর যখন তাদের প্রাচীন দীর্ঘ ইতিহাস, হারিয়ে যেতে বসা পরিচয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেই নিঃশব্দ গল্পগুলো জানতে পারি, তখন এই মুগ্ধতা যেন বেড়ে যায় শতগুণ।
কাজী ইমদাদুল ইসলাম অনিক
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার