বিষণ্ন পাঞ্জাবি
আলনায় যে পুরোনো পাঞ্জাবিটা ঝুলছে, সেটি এখন আমি আর পরি না। অথচ এই পাঞ্জাবিটা কিনতে গিয়ে পুরো আড়ং চষে বেড়িয়েছি। ঈদের আগে এমনিতেই আড়ংয়ে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। এক পাঞ্জাবিতে এক পাশ দিয়ে হাত দিয়েছি তো উঁকি মেরে অন্য পাশে দেখি আরেক ভদ্রলোক সে পাঞ্জাবিতে হাত দিয়ে বসে আছেন। আমাদের চোখাচোখি হয়। একটু বিব্রতভাব। অগত্যা ভদ্রতাবশত পাঞ্জাবি থেকে হাত সরিয়ে নিই। অনেক খুঁজে খুঁজে একটা আকাশি–নীল রঙের পাঞ্জাবি আমার পছন্দ হয়।
নীল রঙের মধ্যে একটা কাব্য কাব্য ব্যাপার আছে। যেহেতু কবিতাটবিতা টুকটাক লিখি, তাই কবির গায়ে একটা নীল পাঞ্জাবি থাকবে না, তা কী করে হয়। পাঞ্জাবি তো পছন্দ হলো, সমস্যা হচ্ছে ট্রায়াল নিয়ে। ট্রায়ালে দীর্ঘ লাইন। বর্তমানে তেলের পাম্পের লাইনের মতো আরকি! এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। কী করি। সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আরেক ট্রায়ালকর্মী। আরে ভাই ছেলে মানুষ হয়ে এত টেনশন করলে চলে? আসেন আমার সঙ্গে। আমি ভদ্রলোকের পিছু নিলাম। আমরা এক কোনায় এসে দাঁড়ালাম। নেন ট্রায়াল দিয়ে ফেলেন। যেহেতু স্যান্ডো গেঞ্জি আছে নিচে অত লজ্জা কিসের। যেই কথা সেই কাজ। চটপট ট্রায়াল সম্পন্ন করে পাঞ্জাবিটা নিয়ে নিলাম।
বাসায় এসে পাঞ্জাবিটা যত্ন করে রেখে দিই ঈদের নামাজ পড়ার জন্য। ঈদের নামাজ শেষে মহাগুরুত্বপূর্ণ এ পাঞ্জাবি আমার এক সাধারণ পোশাকে পরিণত হলো। নানা প্রোগ্রামে, দাওয়াতে পাঞ্জাবি পরে হাজির। পাঞ্জাবি পরার একটা সুবিধাও আছে। একজোড়া স্যান্ডেল, নরমাল জিনসের প্যান্ট বা পায়জামার সঙ্গে একটা পাঞ্জাবি গায়ে চড়ালেই কাজ শেষ। অথচ শার্ট পরলে নানা সমস্যা। শু পরো, বেল্ট পরো, ইন করো। এত ঝক্কি–ঝামেলার চেয়ে হঠাৎ কোথাও যেতে হলে পাঞ্জাবিই মোক্ষম দাওয়াই।
যাহোক সে আকাশ–নীল পাঞ্জাবি আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেল। বিভিন্ন প্রোগ্রামে পাঞ্জাবি পরা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াতে লাগল। পড়তে পড়তে কখন যে সে পাঞ্জাবি একদিন আলনায় উঠে গেল সে বিষয়টি ঠিক মনে করতে পারছি না। আবার ঈদ আসছে। নতুন পাঞ্জাবি হয়তো কিনব আরেকটা। একদিন শখ করে যে পাঞ্জাবি কিনেছিলাম সেটা পড়ে আছে অবহেলায়–অযত্নে আলনার এক কোনায়। কোনো একদিন হয়তো এখানেও তার জায়গা হবে না। সে চলে যাবে চুলার ধারে লুছনির কাজে কিংবা ঘরের মেঝে পরিষ্কারে।
আচ্ছা আমাদের জীবন তো এমনই। একদিন যে যত্ন নিয়ে এ পৃথিবী আমাদের বরণ করেছে আবার তেমনি একদিন হারিয়েও যাব সবার অগোচরে! গভীর রাতে এসব চিন্তায় ঘুম ভেঙে যায়। নীরবে তাকিয়ে দেখি আলনার কোণে ঝুলছে এক বিষণ্ন পাঞ্জাবি!
* লেখক; সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]