সুখের অসুখ

অলংকরণ: আরাফাত করিম

বাংলা মুলুকের এক রাজা। বিচিত্র তাঁর স্বভাব। বিচিত্র তাঁর খেয়াল। তাঁর নেই কোনো অভাব। কিন্তু একটা চাওয়াই এত দিন অপূর্ণ ছিল। তাঁর বংশ রক্ষার কেউ ছিল না। অতঃপর সে অভাবও ঘুঁচে গেল। তাঁর বিশাল রাজপ্রাসাদ আলোকিত করে জন্ম নিল এক রাজপুত্র। রাজার পুত্র বলে কথা। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবীর কোনো দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, বেদনা, আফসোস, অপূর্ণতা তাঁর পুত্রকে স্পর্শ করবে না। সে থাকবে সদা চঞ্চল, উৎফুল্ল। দুঃখ নামক শব্দ তার কাছে থাকবে অপরিচিত। তার জীবন ঘিরে থাকবে শুধু সুখ আর সুখ৷ দুঃখের দাঁড়কাক কখনো তার বারান্দায় এসে দাঁড়াবে না। সেখানে থাকবে শুধু সুখের পায়রা। সে ফুলের সঙ্গে দিন কাটাবে, পাখির সঙ্গে মিতালি গড়বে। বন ময়ূরীর মতো পেখম মেলে জীবনের সব সৌন্দর্যকে উপভোগ করবে। পাহাড়ি ঝরনা হয়ে উচ্ছল আনন্দের হাসি ঝরাবে। তার আকাশে শুধুই সুখের লহরী খেলা করবে। পৃথিবীর যত সুখ আছে, আনন্দ আছে, তা সে উপভোগ করবে।

রাজা তাঁর পুত্রের সুখের জন্য এক অভিনব ব্যবস্থা করলেন। বাংলা মুলুক হচ্ছে ছয় ঋতুর দেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর পুত্রের জন্য তিনি ছয়টি প্রাসাদ বানাবেন। প্রাসাদগুলোর নামও হবে বাংলা ঋতুর নামে। একেক ঋতুতে একেক প্রাসাদে সে থাকবে। রাজপুত্র বড় হয় ওদিকে পাল্লা দিয়ে প্রাসাদও নির্মিত হতে থাকে। গ্রীষ্মের প্রাসাদের রং সাদা। যাতে করে সূর্যের তাপ সাদা রঙে এসে বাঁধা পায়। থাকবে বিশাল হাম্মামখানা। মেশক আম্বরের সঙ্গে বরফ মেশানো শীতল পানি। রাজপুত্র প্রচণ্ড দাবদাহে ক্লান্ত হয়ে হাম্মামখানায় গোসল করবে। প্রাসাদের চারপাশজুড়ে থাকবে বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন ফলের বাগান। থাকবে হিমচাঁপা, জারুল, জিনিয়া, কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, হিজল ফুলের বাগান। গ্রীষ্মের বিকেলগুলোয় টানা পাখার বাতাসে বসে সূর্যের ম্লান আলোয় রাজপুত্র এসব ফুল দেখে মুগ্ধ হবে। বর্ষা ঋতুর প্রাসাদটি থাকবে হাওর এলাকায়। পুরো প্রাসাদজুড়ে থাকবে জলরঙের নানা কারুকাজ। বর্ষায় চারদিকে থাকবে অথৈ পানি। একটা ময়ূরকণ্ঠী নাওয়ে চড়ে সে প্রাসাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াবে। পানির ওপরে ফুটবে লাল নীল সাদা শাপলা। পানকৌড়ির দল ভেসে বেড়াবে। রাজপুত্র মুগ্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকবে।

বর্ষায় ফুটবে কদম ফুল। প্রাসাদের ছাদ থেকে সে কদম ফুলগুলো স্পর্শ করা যাবে। শরৎকালের প্রাসাদটি হবে আকাশি নীল রঙের। প্রাসাদ থেকে একটু দূরে থাকবে ঘন কাশবন। কাশবনে ফুটবে সাদা ফুল। শরতের বাতাসে কাশফুলেরা দোলা দেবে। সে দোলায় রাজপুত্রের মনেও দোলা লাগবে। প্রাসাদের পাশে থাকবে শিউলি ফুল। শিশির ভেজা ভোরে প্রাসাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকবে শিউলি ফুলেরা। প্রাসাদের অদূরে থাকবে সবুজ আমন ধানের খেত। আমন ধানের সবুজ পাতারা রাজপুত্রের মন সজীবতায় ভরিয়ে দেবে। হেমন্তের প্রাসাদটি হবে সোনালি রঙের। ধানের পাতা পাকলে যে রং ধারণ করে, অনেকটা সে রঙের। রাজপ্রাসাদের ভেতরে থাকবে নানা রকম হেমন্তকালীন ফলের বাগান। চালতা, ডালিম, কামরাঙা, আমলকী। রাজপুত্র মাঝেমধ্যে চালতাপাতার নকশা দেখে মুগ্ধ হবে। একটা পাতায় যে এত বিচিত্র কারুকাজ থাকতে পারে, তা ভাবতেই তার বিস্ময়ের উদ্রেক করবে। হেমন্তকালে প্রাসাদ চত্বরে ফুটবে কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, ছাতিম, দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, রাজঅশোক ফুল।

হেমন্তের নতুন ধানের চাল দিয়ে প্রাসাদে হবে পিঠা উৎসব। গ্রাম বাংলার যত ধরনের পিঠা আছে, সব তৈরি হবে এখানে। সকালে রাজপুত্র যখন মাঠে হাঁটতে বেরুবে, তখন হালকা কুয়াশার চারপাশ ঘিরে থাকবে। ঘাসের ডগায় শিশির কণার ওপর ভোরের সূর্যের আলো দীপ্তি ছড়াবে। রাজপুত্র এ শিশির কণা দেখে মুগ্ধ হবে। শীতকালীন প্রাসাদটি হবে অনেকটা পাকা খেজুরের মতো। প্রাসাদের চারপাশে থাকবে অনেক খেজুরগাছ। শীতের হিম হিম সকালে গাছিরা হাঁড়ি থেকে রস নামাবে। রাজপুত্র গরম কয়লার চুল্লির পাশে বসে আয়েশ করে সে রস পান করবে। প্রাসাদের সামনে হবে নানা রকম শীতকালীন সবজির চাষ। প্রাসাদের পাশে একটা প্রকাণ্ড দীঘি থাকবে। সুদূর বরফের দেশ হতে সেখানে আসবে অতিথি পাখির দল। পাখিদের মেহমানদারির জন্য এখানে থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা। অতিথি পাখির কলগানে মুখর হবে পুরো রাজপ্রাসাদ। এমনি করে শীত চলে যাবে। গাছে পাতারা জেগে উঠবে। প্রকৃতিতে আসবে নতুন চঞ্চলতা, নতুন গান, নতুন সুর। বাংলার জমিনে নামবে বসন্ত। বসন্ত! কিবা তার রূপ কিবা তার ঐশ্বর্য! বসন্তের জন্য যে রাজপ্রাসাদটি তৈরি হবে, তার রং হবে বিচিত্র বহু বর্ণিল। বাংলা প্রকৃতিতে যত ফুল ফোটে, সব ফুলের রং থাকবে এ প্রাসাদের গায়। চারদিকে হবে বাসন্তী উৎসব। বসন্তের পাখিরা রাজপুত্রকে গান শোনাবে। সবার গান ছাপিয়ে একটি কোকিল ডেকে যাবে কু-উ, কু-উ। রাজপুত্র মুগ্ধতার আবেশে সে গান শোনাবে। এমনি করে ষড়ঋতুর বাংলা মুলুকে রাজপুত্রের দিন কাটতে থাকবে। সে যেদিকে তাকে সেদিকেই সুখ। সেদিকেই আনন্দ, পাখির কলতান, প্রজাপ্রতির ওড়াউড়ি। সুখের বিপরীত যেকোনো শব্দ থাকতে পারে তা রাজপুত্র বুঝতে পারবে না। সে ভাববে মানুষের জীবনের সবটাই বুঝি সুখ। এখানে দুঃখের কোনো স্থান নেই।

রাজপুত্র এখন যুবক। সে পড়াশোনা ও কূটনীতিক জ্ঞানে ইতিমধ্যে পারদর্শিতা অর্জন করেছে। রাষ্ট্রের বড় পণ্ডতদের কাছে সে বিদ্যা অর্জন করেছে। বীর যোদ্ধাগণ তাকে অস্ত্র চালনা শিখিয়েছে। এখন সে সিংহাসনে বসার উপযুক্ত হয়েছে। রাজপুত্র শিকারে যেতে চাচ্ছে। বাংলা মুলুক হচ্ছে মায়া হরিণের দেশ। সে হরিণ শিকার করতে চায়। কিন্তু এ হরিণ অত্যন্ত লাজুক ও দ্রুতগামী প্রাণী। যেমন তার সৌন্দর্য, তেমনি তার ক্ষিপ্রতা। সহজে ধরা দিতে চায় না। এ অধরাকে ধরার নেশা প্রবল হলো তার। একদিন মহাসমারোহে হরিণ শিকার করতে চলল সে। রাজা রাজপুত্রের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত সৈন্য সঙ্গে পাঠালেন। এদিকে শিকার করতে করতে রাজপুত্র গহিন জঙ্গলে চলে এল। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কোনো মায়া হরিণের দেখা নেই।

মায়া হরিণের দেখা না পেয়ে রাজপুত্র কিছুটা আনমনা হয়ে ঘোড়া চালনা করছিল। সঙ্গে থাকা সৈন্যরাও শিকারকার্য সমাপ্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরই মধ্যে ঘটে যায় ঘটনাটা। একটা মায়া হরিণ রাজপুত্রের সামনে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। রাজপুত্র তীর–ধনুক নিয়ে মায়া হরিণের পিছু নিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সঙ্গে থাকা সৈন্যরাও বিমূঢ় হয়ে গেল। তারা রাজপুত্রের পিছু নেওয়ার আগেই রাজপুত্র হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এদিকে রাজপুত্র মায়া হরিণের পিছু রুদ্ধশ্বাসে ধাওয়া করছে। মায়া হরিণটি যেন বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। কিছুতেই তার নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজপুত্র কোনদিকে ছুটে চলছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে পেরিয়ে যাচ্ছে মাঠের পর মাঠ। বনের পর বন। ছোট ছোট নালা। ঘন ঘন শালবন। ঝোঁপঝাড়। হরিণটি তাকে নিয়ে যেন খেলছে। একটা সময় সে আর হরিণের নাগাল পায় না। হাল ছেড়ে শিকারে ক্ষান্ত দেয় সে। কিন্তু একি এ কোন এলাকায় এসে পড়েছে সে। একদম অচেনা এক অজপাড়াগাঁ। তার সঙ্গী সাথিরাই–বা কোথায়? রাজপুত্র এখন কোথায় যাবে, কী করবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছে তার। কিন্তু সে পানি পাবে কোথায়। সে ঘোড়া একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে পানির সন্ধান করতে থাকে। কিন্তু কোথাও পানি নেই। সে ক্ষুধা–তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট্ট কুটিরের দেখা পায়। সে কুটিরের দরজায় গিয়ে আস্তে টোকা দেয়। এক বৃদ্ধ লোক কুটিরের দরজা খুলে দেয়। রাজপুত্র বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে অপলক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে। বৃদ্ধকে দেখে মনে হয় শত শতাব্দীকালের এক জীবন্ত ইতিহাস যেন রাজপুত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে অস্ফুট স্বরে বলে, পানি হবে। বৃদ্ধ বলে, আসুন আসুন ভেতরে আসুন। এ গরিবখানায় আপনাকে স্বাগতম। গরিব! গরিব আবার কী জিনিস। এমন শব্দ তো সে কখনো শোনেনি। রাজপুত্র ঘরে গিয়ে দেখে খাটপালঙ্ক কিচ্ছু নেই। নেই কোনো আসবাবপত্র। ঘরের এক কোণে একটি পাটি বিছানো। একটি মাটির কলস, মাটির গ্লাস আর মাটির একটা থালা। সে বুঝতে পারে না একজন মানুষের ঘরে এত কম জিনিসপত্র থাকবে কেন? নিন পানি পান করুন। রাজপুত্র পানি পান করে। তার তৃষ্ণা দূর হয়। আচ্ছা আমাদের পরিচয় তো হলো না। আমি এ রাজ্যের রাজপুত্র। বৃদ্ধ হাসল। খোদার কী লীলা! রাজপুত্র এসেছে মিসকিনের ঘরে। যে একজন গরিব–দুঃখী মানুষ। রাজপুত্র অবাক হয়। কিছুটা কৌতূহলও তার মধ্যে কাজ করে। আচ্ছা গরিব–দুঃখী, বিষয়টা আমাকে বুঝিয়ে বলবেন কী? এ শব্দ দুটি আজকে আমি প্রথম শুনলাম। আমি এত দিন জানতাম মানুষ মাত্রই সুখী, মানুষ মাত্রই ধনী। কিন্তু গরিব মানুষ, দুঃখী মানুষ এটা আমার কাছে নতুন। রাজপুত্র আপনি সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয়েছেন। কিছুদিন পর এ রাজ্যের রাজা হবেন, রাজ্য শাসন করবেন অথচ সুখ–দুঃখের পার্থক্য বোঝেন না, গরিব–ধনীর মানে জানেন না তবে কেমন করে আপনি এ রাজ্যের হাল ধরবেন? আমাকে আর লজ্জা দেবেন না, দয়া করে আমাকে বুঝিয়ে বলুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি অনেক জ্ঞানী মানুষ, আপনার জ্ঞান হতে আমাকে কিছু দান করুন। বৃদ্ধ আবার হাসে। জ্ঞান সোনাদানা নয় যে দান করা যায়, জ্ঞান অর্জন করতে হয়। কঠোর সাধনা করতে হয়। রাজপুত্র আপনি শুধু আলো দেখেছেন, অন্ধকার দেখেননি, ভোগ করছেন, ত্যাগ করছেন। কিন্তু মনে রাখবেন এ পৃথিবীর চারভাগের একভাগ হচ্ছে হাসি আর বাকি তিনভাগ হচ্ছে কান্না।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আপনি কান্না না দেখে হাসির মর্ম কীভাবে বুঝবেন। তেমনি দুঃখ না বুঝলে সুখকে কীভাবে অনুভব করবেন? আমি আসলে জন্মের পর থেকে রাজপ্রাসাদের গণ্ডির বাইরে যাইনি তাই এসব বিষয়ের সঙ্গে আমি পরিচিত নই। আমায় মাফ করবেন। না না আপনার কোনো দোষ নেই, আপনি রাজার ছেলে, আপনি এসব জানবেন কী করে। তবে রাজ্য চালাতে হলে আপনাকে এসব জানতে হবে। আপনার রাজ্যে বহু মানুষ খেতে পায় না, চিকিৎসার অভাবে বহু মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়, ঘরের অভাবে বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। এ খোঁজ আপনাকে রাখতে হবে। রাজপুত্রর মনে হয় এত দিন সে একটা কল্পনার জগতে বাস করেছে, কিন্তু এ বৃদ্ধ তাকে বাস্তব জগতে নিয়ে এসেছে। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়। আচ্ছা আপনার কাছে সাধারণ কাপড় আছে থাকলে আমায় দান করুন। বৃদ্ধ তাকে আর প্রশ্ন করে, না সে একসেট সাধারণ পোশাক রাজপুত্র দান করে। তবে বিদায়। হয়তো আমাদের মধ্যে আবার দেখা হবে। রাজপুত্র আস্তে আস্তে বৃদ্ধের কুটির থেকে বের হয়ে যায়।

রাজপুত্র এরপর আর প্রাসাদে ফিরে যায়নি। অনেক খুঁজেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। ঘোড়ার ওপর রাজপুত্রের পোশাক পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু রাজপুত্রের দেখা পাওয়া যায়নি। বাংলা মুলুকের রাজা শোকে পাথর হয়ে গেলেন। পুত্রশোক নিয়েই ভগ্ন মনোরথে তিনি রাজকার্য পরিচালনা করতে লাগলেন। অন্তঃপুর যেন শ্মশানে পরিণত হলো। সেখানে শুধু রানীর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসত।

অনেক দিন পর রাজ্যে এক সন্যাসীর আগমন ঘটল। সে সকাল থেকে সন্ধ্যা শুধু ঘুরে বেড়ায়। সে মানুষের দুঃখের কারণ বোঝার চেষ্টা করে। কিসে মানুষের সুখ, কি করলে মানুষ দুনিয়ায় কুটিলতা থেকে মুক্তি পাবে, সুখ কি শুধুই দৈহিক, নাকি আত্মার প্রশান্তি, এসব প্রশ্ন সে খুঁজে বেড়ায়। সে মানুষের বাহ্যিক এবং আত্মিক দুই ধরনের সুখেরই সন্ধান করেছে। বাহ্যিক সুখ আর্থিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সম্পদ যখন মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে জমা হতে থাকে, তখন সমাজের বৃহত্তর অংশ অভাব অনটনে ভোগতে থাকে। সমাজের উঁচু শ্রেণির গুটিকয় মানুষের ভোগস্পৃহা বৃহত্তর অংশকে বঞ্চিত করে। তাই সমাজে প্রয়োজন সম্পদের সুষম বণ্টন। অর্থের ঘূর্ণায়মানতা বাড়তে হবে। কারও হাতে অলস অর্থ পড়ে থাকবে না। ধনীদের সম্পদে গরিবদের অংশ নির্ধারণ করে দিতে হবে। অনৈতিক পথে অর্থ অর্জনের পথকে প্রতিরোধ করতে হবে। তবেই সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আর মানুষের আত্মিক সংকটের পেছনে সন্যাসী রিপুর প্রভাবকে দায়ী করেছেন। মানুষের অন্তহীন লোভ, লালসা, কাম, ক্রোধ, অনৈতিকতা ইত্যাদি নানাবিধ মানুসিক উপাদান মানুষের অভ্যন্তরীণ অশান্তির জন্য দায়ী। এ তত্ত্ব সে রাজ্যময় প্রচার করতে থাকে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এদিকে রাজার কানে সন্যাসীর এ কর্মকাণ্ড রাজ্যের গোয়েন্দারা পৌঁছে দেয়। রাজা ভাবেন কোন অশুভ দুরভিসন্ধি নিয়ে সন্যাসী তাঁর রাজ্যে আগমন করেছে। তিনি অবিলম্বে সন্যাসীকে গ্রেপ্তার করে তাঁর দরবারে হাজির করার আদেশ দেন। রাজ্যের সেনাপতির নির্দেশে সৈন্যরা সন্যাসীকে রাজদরবারে হাজির করেন। সন্যাসী বয়সে তরুণ, কিন্তু তার লম্বা চুল ও দাড়ি–গোঁফের নিচে তার চেহারা ঢাকা পড়েছে। রাজা মুহূর্তে সন্যাসীর দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। রাজপুত্র বেঁচে থাকলে হয়তো তার বয়সীই হতো। সে ক্ষণিকের ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এখন সে বিচারক। বিচারককে ভাবাগের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়। ওহে সন্যাসী, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আপনি রাষ্ট্রের নাগরিকদের রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলে ক্ষেপিয়ে তুলছেন কেন? মহামান্য রাজা আমি তো রাষ্ট্রের ক্ষতি হোক তেমন কিছু বলিনি, বরং আমার কথায় আছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রকৃত মুক্তি। রাষ্ট্রের নাগরিকদের কথা ভাবার কাজ রাষ্ট্রের, সে ভাবনা আপনার নয়। কিন্তু রাজা তো জনগণের কথা ভাবছেন না। তিনি ভাবছেন তাঁর এবং ক্ষমতাবানদের ভোগবিলাসের কথা। কিন্তু জনগণ যে ঠিকমতো খেতে পায় না, সে খোঁজ রাজা রাখেন না। সন্যাসী, আপনি আমার ক্রোধের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আপনার ক্রোধের পরোয়া আমি করি না। আমি আমার বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ। আপনি রাজার সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলছেন, তাই আপনাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। কাল প্রত্যুষে এ দণ্ড কার্যকর হবে। সন্যাসীর মুখে মৃদু হাসি। আপনার হাসির কারণ। হাসছি এ কারণে যে আপনি আলোকিত মানুষ কিন্তু সে আলো আপনার বিবেককে আলোকিত করতে পারেনি। ভোগ বিলাস আপনার বিবেকের দরজায় পর্দা ফেলে দিয়েছে। আপনার সন্তানের বয়সী একজনকে আপনি মৃত্যুদণ্ড দিলেন। অথচ তার অপরাধ সে সত্য প্রচার করেছে। আমার সন্তান! রাজা যেন কেমন আনমনা হয়ে যায়। ততক্ষণে সন্যাসীকে নিয়ে সৈন্যরা রাজদরবার ত্যাগ করেছে।

আরও পড়ুন

এক বৃদ্ধ পরের দিন ভোরবেলা রাজদরবারের ফটকে এসে দাঁড়িয়েছে। সে রাজার সঙ্গে দেখা করতে চায় কিন্তু সৈন্যরা কিছুতেই তাকে দরবারে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এত ভোরে রাজার সঙ্গে দেখা হবে না। কিন্তু তাকে দেখা করতেই হবে। অগ্যত বিশেষ দূতের মাধ্যমে রাজার কাছে খবর পাঠানো হয়। রাজা বৃদ্ধকে দেখা করার অনুমতি দেন। বৃদ্ধ রাজদরবারে প্রবেশ করে। কী চাই আপনার? আপনার ছেলেকে বাঁচান! আমার ছেলে? কোথায় সে? যাকে কাল আপনি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সে আমার ছেলে! রাজা যেন হাহাকার করে উঠে। আচ্ছা আপনার কথা পরে শুনব, আগে তাকে বাঁচাতে হবে। রাজা বিশেষ দূতকে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড থামানোর আদেশ নিয়ে জল্লাদের কাছে যেতে বলে। এবার বলুন বিস্তারিত। বৃদ্ধ সব খুলে বলে রাজার কাছে। শিকারে হারিয়ে যাওয়ার পর কী হয়েছিল, কীভাবে সন্যাসী হয়েছিল সবকিছু। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু নিজে সুখে থাকা নয়, রাজ্যের জনগণকেও সুখে রাখা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সন্যাসী ওরফে রাজপুত্র দরবারে প্রবেশ করে। রাজা আবেগের আতিশয্যে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে। এমনি করে বাবার কাছে কেউ পরিচয় লুকায়। আব্বাজান আপনি আমাকে চিনতে পারেননি এ অভিমান থেকে আমিও পরিচয় দিইনি। আর আপনার সত্য অস্বীকার করা আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি বাবা। আমাকে মাফ করে দিস।

পরের দিন মহা ধূমধামে রাজপুত্রের রাজ্যাভিষেক ঘটে। বৃদ্ধকে রাজার বিশেষ উপদেষ্টা করা হয়। অতপর রাজ্যজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্য ও ন্যায়ের শাসন।

* লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের, কার্যালয়, শরীয়তপুর।

আরও পড়ুন