দূর দেশে রোজা–ইফতার–তারাবিহ যেমন

পরিবারের সঙ্গে লেখকছবি: লেখকের পাঠানো

দুই দশক হতে চলল আমেরিকায় আছি। টেক্সাসের ডালাস শহরে। শিকড় গেড়ে ফেলেছি। মা ও শাশুড়ি আমার সঙ্গেই থাকেন। শ্বশুরের চিরস্থায়ী ঠিকানাও এ শহরেই। ধরে নিতে পারি, বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে আমার বাকি জীবনটাও এখানেই কাটবে। এখন এটিই আমার বাড়িঘর।

আমার দুই ছেলে এ শহরেই বড় হচ্ছে। এক মিশ্র সংস্কৃতির পরিবেশে। ওদের অনেকগুলো পরিচয়। মুসলিম, বাংলাদেশি, আমেরিকান। রমজান মাস আমাদের মুসলিম-বাঙালিয়ানা অস্তিত্ব ধরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তবে স্বাভাবিক কারণেই এখানকার রমজান এবং আমাদের দেশের রমজান মাস পালনে বেশ কিছু পার্থক্য আছে।

আমেরিকায় আমার প্রথম দিককার রোজার কথাই বলতে পারি।

তখনো আমি ছাত্র। একা একটা আস্ত অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকি। খণ্ডকালীন কাজ করি, ফুলটাইম স্টুডেন্ট। রোজা রেখে কাজ–ক্লাস করতে কোনো সমস্যা হয় না। ইফতারের সময়ে দেখা যায়, হয় ক্লাসে আছি, না হয় কাজে। ঘড়িতে মাগরিবের সময় হলেই ব্যাগ থেকে বোতলে রাখা আমার লিকুইড ইফতার বের করে টুক করে খেয়ে রোজা ভেঙে ফেলি। সময় বের করে নামাজ এবং তারপর ক্লাস–কাজ, ছুটি হলে ডিনার।

আমার লিকুইড ইফতারের রেসিপি বর্ণনা করা যেতে পারে। ঠ্যাকায় পড়েছিলাম বলে আমার নিজের বুদ্ধি দিয়ে আবিষ্কার করেছি। পরে শুনেছি, ওটাকেই অনেকে মিল্কশেক বলে। আধা গ্লাস দুধের মধ্যে একটা আস্ত কলা, এক–দুইটা খেজুর, কয়েক স্কুপ ভ্যানিলা আইসক্রিম যোগ করে ব্লেন্ড করে নেবেন। ব্যস, সহজ ইফতারি তৈরি। চুমুকেই শান্তি আর শক্তি। অথচ দেশে যখন পরিবারের সঙ্গে থাকতাম, তখন পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, জিলাপি, কাবাব ইত্যাদি আইটেম না হলে মনমেজাজ খারাপ হয়ে যেত। এগুলো ছাড়া কি ইফতার চলে?

প্রবাসজীবন অনেক বাহাদুরের বাহাদুরি মিটিয়ে দেয়।

তো যা বলছিলাম, যখন কাজ বা ক্লাস থাকতো, তখন এটাই ছিল আমার ইফতার। আর যখন ছুটির দিনে ইফতার করতে হতো, তখন মসজিদ ছিল একটা ভরসার নাম। বেশির ভাগ মসজিদেই উইকেন্ডে ইফতারের ব্যবস্থা থাকত। তখন মসজিদের সংখ্যাও ছিল কম এবং একটির চেয়ে আরেকটির অবস্থানও ছিল বেশ দূরত্বে। মসজিদের ইফতার মূলত খেজুর আর পানি। ভাগ্য খুব ভালো হলে থাকবে একটা সিঙারা বা সমুচা। রোজা ভেঙে ইফতার করে মাগরিবের নামাজ জামাতে আদায় শেষে বক্স ডিনারের ব্যবস্থা। সেখানে আইটেম বলতে বিরিয়ানি বা পোলাও, নানরুটি, ঝোল করে রান্না চিকেন বা গুরুর কাবাব এবং একটি ভেজিটেবল আইটেম। সঙ্গে চা। ভাগ্য ভালো থাকলে ডেজার্টের ব্যবস্থাও থাকবে। অমৃতসম স্বাদ!

শয়ে শয়ে মানুষের জন্য চমৎকার খাওয়ার ব্যবস্থা। সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে ইফতারির বক্স নিচ্ছেন, তারপর পার্কিং লটে পাতা চেয়ার–টেবিলে অথবা মসজিদের ভেতরেই প্লাস্টিকের মাদুরে আসন পাতছেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই।

আমেরিকায় মসজিদে সব শ্রেণির মানুষই ইফতার করতে আসেন। আমাদের দেশে যেমন দেখি, কেবল গরিব মানুষেরাই মসজিদে ইফতার করেন, এখানে সেটা নয়। লোকজন নিজের পরিবার নিয়ে মসজিদেই ইফতার করছেন। কারণ আধ্যাত্মিকতা।
আরও পড়ুন
প্রথম আলো ফাইল ছবি

এখানে উল্লেখ করা জরুরি, মসজিদে সব শ্রেণির মানুষই ইফতার করতে আসেন। আমাদের দেশে যেমন আমরা দেখি, কেবলমাত্র গরিব মানুষেরাই মসজিদে ইফতার করেন, এখানে সেটা নয়। লোকজন নিজের পরিবার নিয়ে মসজিদেই ইফতার করছেন। মূল কারণ আধ্যাত্মিকতা। ইফতারে কয়টা আইটেম থাকে, স্বাদ বেশি না কম—ইত্যাদি মুখ্য বিষয় নয়। বাড়িতে ইফতার করে মসজিদে জামাত ধরা কঠিন। তাই মসজিদেই ইফতার সারা। আর সবাই মিলে একসঙ্গে একই ইফতার করলে খাবারের স্বাদ এমনিতেই বেড়ে যায়—সঙ্গে মনটাও খুব শান্ত হয়ে আসে।

একজন চিকিৎসক, একজন আইনজীবী, একজন কোটিপতি ব্যবসায়ীর পাশে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার, দিনমজুর, একজন ছাত্র বসে ইফতার করছেন। চায়ের কাপ, পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছেন। এক বাটি থেকে সবাই খেজুর তুলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলছেন। আফ্রিকান, আরব, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, ককেশিয়ান—সব বর্ণের মানুষই এক টেবিলে বা একই মাদুরে বসা। এখানে কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নন।

আমি যেন চোখের সামনে দেখি, আমাদের প্রিয় নবীজী (স.) হজরত বিলাল (রা.), হজরত খাব্বাব বিন আল আরাতের (রা.) হাত ধরে বিশ্ববাসীর কাছে ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘আল্লাহর সামনে বাদশাহ, ফকির, আমির গরিবে কোনো তফাত নেই!’

আরও পড়ুন
আমেরিকায় দেশি–বিদেশি নানান পদের খাবার খেয়ে তৃপ্ত হই। খাদ্যে কোনো ভেজাল নেই। তবু মন হাহাকার করে নানি–দাদির হাতের নারকেল বা গুড়ের পিঠার জন্য। মামাদের সালাম করে পাওয়া সালামি, সেটা দিয়ে শখের কোনো কিছু কেনা। ওসব যেন কোনো এক ভিন্ন জন্মের স্মৃতি। ব্যাকুল হয়ে মন সেই জন্মে ফেরত যেতে চায়।

আরেকটা ভালো দিক হচ্ছে, এই ইফতার সবার জন্যই উন্মুক্ত। আপনি ভিন্নধর্মের মানুষ হলেও আপনাকে স্বাগত জানানো হয়, আপনি মুসলিমদের সঙ্গে বসেই ইফতার করবেন।

কিছু মসজিদ রমজান মাসজুড়েই ইফতারের আয়োজন করে। আমাদের আশপাশেই প্রচুর ধর্মান্তরিত মুসলিম থাকেন, যাঁদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো মুসলিম নেই, তাঁরা ইফতার করতে মসজিদে আসেন। তাঁদের ইসলামি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন টের পাওয়াতেই এই আয়োজন।

সংগত কারণেই নারী-পুরুষ আলাদা বসার ব্যবস্থা, তবে কে রোজা রেখেছে, কে রাখেননি, না রাখলে কেন রাখেননি, সেটা নিয়েও কাউকে মাথা ঘামাতে দেখা যায় না। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে শিশুদের আনাগোনা। মসজিদ ভরে ওঠে শিশুদের কোলাহলে। শিশুদের জন্য মসজিদের ভেতরেই আলাদা রুমের ব্যবস্থা থাকে, যেখানে বাবা–মায়েরা তাঁদের বাচ্চাদের নিয়ে নামাজে দাঁড়ান। যদি নামাজের মধ্যে কোনো শিশু রুম থেকে বেরিয়ে মূল জামাতে এসে মুসল্লিদের সামনে মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়, কাউকে ভ্রু কুঁচকাতে দেখা যায় না। উল্টো বাচ্চাটার বিব্রত বাবা–মায়ের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্তের হাসি হাসেন। বাচ্চারা যদি শৈশব থেকেই মসজিদে যেতে ভয় পায়, তাহলে বড় হয়ে মসজিদে আসবে?

আরও পড়ুন

আমার জন্য এ দেশে এসে পবিত্র রমজান মাসে আরেকটা বড় ধাক্কা ছিল এই যে প্রতিটা মুসলিম দোকানে দেখলাম বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। বছরের অন্যান্য সময়ে যে চালের দাম প্রতি বস্তা ২০ ডলার থাকে, দেখা যায় রমজান মাসেই সেটার দাম হয়ে যায় ১৫ ডলার। ছোলা-বুট-ডাল-মাংস-তেল-মসলা ইত্যাদি সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেই বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। কেন? যাতে রোজাদার মানুষের কষ্ট কম হয়। স্বানন্দে পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আমেজে রমজান মাসটা উপভোগ করতে পারেন। রিজিকের মালিক আল্লাহ, তিনিই লাভের ব্যবস্থা করে দেবেন এবং সত্যিই সত্যিই তাঁদের বছরের সবচেয়ে বড় লাভটা এই রমজান মাসেই হয়।

আমাদের দেশের বাজার সংস্কৃতির ঠিক উল্টো।

তারাবিহর সময়ে এ দেশের মসজিদগুলো আসলেই উৎসবের স্থান। আমি বর্ণনা করতে পারব না, এটি অভিজ্ঞতার ব্যাপার। ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত তারাবিহ, তা নিয়ে এ দেশেও তর্কবিতর্ক হয়, তবে কেউ যদি ৮ রাকাত পড়ে বেরিয়ে যান, ওনাকে অন্যদৃষ্টিতে দেখা হয় না। প্রতিটি মসজিদে ২০ রাকাতেরই ব্যবস্থা থাকে। প্রথম আট রাকাত পড়ে কেউ চলে যেতে চাইলে যেতে পারে।ন কোনো সমস্যা নেই।

দীর্ঘ এক মাস রোজা শেষে আসে ঈদ।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিশ্বের সব সংস্কৃতির প্রতিনিধিই এদেশে আছেন। কাজেই চাঁদরাতে মেলার আয়োজনটাও হয় তেমনই নানান সংস্কৃতির মিশেলেই। আর সব দেশের মেলার মতোই চাঁদরাত মেলাতেও পোশাক-গয়না-খাবারই মুখ্য পণ্য হিসেবে থাকে। শিশুরা নানান খেলনা নিয়ে খেলে, নানা বয়সী মেয়েরা হাতে মেহেদি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, পুরুষেরা ভিড়ের বাইরে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে চায়ের পেয়ালা হাতে আড্ডা দেন—ছোট পরিসরে নিজেদের দেশকে ফিরিয়ে আনার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আরকি।

তবে যা–ই বলি না কেন, বাংলাদেশের রোজা আর ঈদের সঙ্গে প্রবাসের তুলনা করা অন্যায় হবে। তা আমাদের যত পরিবার-আত্মীয়ই আমাদের আশপাশে থাকুক না কেন; দেশের মাটি, দেশের মানুষ না থাকলে ঈদটা ঈদের মতো লাগে না। যখন মন চায় নতুন জামা নতুন জুতা কিনতে পারি, বিশ্বের নামীদামি ব্র্যান্ড এখন কোনো বিষয়ই নয়, দামদরেরও ঝামেলা নেই—কিন্তু কেউ আমাকে শৈশবের ঈদের আগের রাতে নতুন জুতা আর জামা বালিশের পাশে নিয়ে শোবার অনুভূতি দিতে পারে না।

ঈদের নতুন জামা কাউকে দেখানো যাবে না, দেখালেই পুরোনো হয়ে যাবে—আমার বাচ্চাদের এই ছেলেমানুষি আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে না পারায় নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। বাবার কাঁধে চেপে বা একটু বড় হওয়ার পরে হাত ধরে লাখো মানুষের ভিড় ঠেলে ঈদের জামাতে যাওয়া, নামাজ শেষে বাবাকে সালাম করে বুক জড়িয়ে কোলাকুলির অনুভূতি আমি কি আর এই জীবনে পাব? বাবা তো চলে গেছেন সেই এক যুগের বেশি আগে।

আমরা প্রত্যেকেই দামি গাড়িতে চেপে ঝা–চকচকে রাস্তাঘাট ধরে আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে যাই, অথচ মনটা পড়ে থাকে বাংলাদেশের সেই ভাঙা রাস্তার পুরোনো গাড়ি বা রিকশার ঝাঁকুনিতে। সাইকেল চালিয়ে কোনো এক বন্ধুর বাড়িতে একত্র হওয়া এবং তারপর দল বেঁধে বাকি বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে যাওয়া। সড়কের ধুলা, শব্দদূষণ, রাস্তাঘাটের অচেনা মানুষের আনন্দিত মুখ—জীবনের ঠিক কোনো বাঁকে হারিয়ে গেছে তাঁরা? আগে জানলে কি হারাতে দিতাম?

এখানে দেশি–বিদেশি নানান পদের খাবার খেয়ে তৃপ্ত হই। খাদ্যে কোনো ভেজাল নেই। স্বাদে অতুলনীয়। তবু মন হাহাকার করে নানি–দাদির হাতের নারকেল বা গুড়ের পিঠার জন্য। মামাদের সালাম করে পাওয়া সালামির টাকা, সেটা দিয়ে শখের কোনো কিছু কেনা—ওসব যেন কোনো এক ভিন্ন জন্মের স্মৃতি। ব্যাকুল হয়ে মন সেই জন্মে ফেরত যেতে চায়।

আরও পড়ুন