খিম্পো শহরের ইজেন বাইতুল আমান মসজিদে এক অনন্য উদ্যোগ

প্রথম আলো ফাইল ছবি

পবিত্র রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য কেবল ইবাদতের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, তাকওয়া ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রশিক্ষণপর্ব। এই মাসে রোজা মানুষকে যেমন আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়, তেমনি ক্ষুধার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানবিক সহমর্মিতা ও সামাজিক সংহতির বোধ জাগ্রত করে। প্রবাসজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যখন রমজানের চেতনার সংযোগ ঘটে, তখন তা এক নতুন তাৎপর্য লাভ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংগি প্রদেশের অন্তর্গত খিম্পো রাজধানী সিউলের অদূরে অবস্থিত একটি শিল্পনগরী—আজ প্রবাসী মুসলিমদের এক সক্রিয় কমিউনিটির কেন্দ্রবিন্দু। এখানে অবস্থিত ইজেন বাইতুল আমান মসজিদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পবিত্র রমজানকেন্দ্রিক এক ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক উদ্যোগ।

আরও পড়ুন

বহুজাতিক ইফতার: এক উম্মাহ, বহু সংস্কৃতি—

রমাদানের প্রতি শনি, রবি ও সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এখানে নিয়মিত ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিদিনের ইফতারে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২০০-এর অধিক, আর অনেক সময় তা ৪০০ জনের বেশি ছাড়িয়ে যায়।

সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী বিষয় হলো, এটি কেবল একটি জাতিকেন্দ্রিক আয়োজন নয়, বরং একটি বহুজাতিক মিলনমেলা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, কোরিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা এখানে একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আজানের ধ্বনিতে সবাই একত্র হন একই দোয়ায়, একই বিশ্বাসে।

এই দৃশ্য যেন কোরআনের সেই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন—‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।’

সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী বিষয় হলো, এটি কেবল একটি জাতিকেন্দ্রিক আয়োজন নয়, বরং একটি বহুজাতিক মিলনমেলা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, কোরিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা এখানে একসঙ্গে বসে ইফতার করেন।

অর্থনৈতিক ত্যাগ ও দায়বদ্ধতার নজির—

এই ইফতার কার্যক্রমের আর্থিক দিকটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদিনের ইফতার আয়োজনের ন্যূনতম ব্যয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে অনেক দিন তা ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে ব্যয়ও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় পুরো অংশই বহন করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দক্ষিণ কোরিয়ার আট–নয়টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি মুসলিম ভাইয়েরা সম্মিলিতভাবে মূল অর্থের জোগান দেন। পাশাপাশি বহু ব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট-বড় অনুদান প্রদান করেন।

এই সম্মিলিত অর্থায়ন কেবল দান নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ইমানি সংহতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে কর্পোরেট পর্যায়ে কর্মরত বাংলাদেশিরা নিজেদের আয়ের একটি অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করছেন—যা আধুনিক পটভূমিতে একধরনের সামাজিক ও নৈতিক বিনিয়োগ।

আরও পড়ুন

মসজিদ: প্রবাসে কমিউনিটি সেন্টার—

ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি ছিল সামাজিক নেতৃত্ব ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র। খিম্পোর এই মসজিদও সেই ঐতিহ্য ধারণ করছে। ইফতারের আগে সংক্ষিপ্ত নসিহত, তাকওয়ার আলোচনা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য—এসব কার্যক্রম অংশগ্রহণকারীদের আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ করছে। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ প্রবাসের সাংস্কৃতিক পরিবেশে ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখা সহজ নয়। নারী মুসল্লিদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় ভূমিকা—সব মিলিয়ে এটি একটি আদর্শ ও সুসংগঠিত মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাসজীবনে মানসিক শক্তির উৎস—

প্রবাসজীবন প্রায়ই একাকিত্ব ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষদের জন্য রমজান বিশেষভাবে আবেগঘন সময়। এমন পরিস্থিতিতে ২০০–৪০০ মানুষের সম্মিলিত ইফতার যেন এক বিকল্প পরিবার। একই জায়গায় বসে খাবার ভাগাভাগি করা, দোয়ায় একে অপরকে স্মরণ করা, তারাবিহ একসঙ্গে আদায় করা এবং ইসলামি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া—এসব কার্যক্রম প্রবাসী মুসলিমদের মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।

আরও পড়ুন

বিশ্বায়নের যুগে ইতিবাচক উপস্থাপন—

দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন ইসলামের মানবিক ও সামাজিক সৌন্দর্য তুলে ধরে। এখানে সংখ্যায় মুসলিম কম হলেও সংগঠনে তাঁরা দৃঢ়। খিম্পু থেকে এই উদ্যোগ প্রমাণ করে—ঐক্য, সংগঠন ও আন্তরিকতা থাকলে প্রবাসেও রমজানের বারাকাহ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।

রমজানের প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মসংযমের মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন এবং ব্যক্তিগত তাকওয়াকে সামাজিক কল্যাণে রূপান্তর করা। খিম্পো শহরের ইজেন বাইতুল আমান মসজিদ কর্তৃক এই আয়োজন সেই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। ২০০–৪০০ মানুষের সম্মিলিত ইফতার, বহুজাতিক অংশগ্রহণ, লক্ষাধিক টাকার স্বতঃস্ফূর্ত অর্থায়ন—সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং প্রবাসে মুসলিম ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক। আল্লাহ–তাআলা এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার নিয়ত কবুল করুন এবং এই চমৎকার সম্প্রীতির বন্ধনকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও কল্যাণময় করুন।

লেখক: সাইয়েদ আল আমিন আল আযহারি, ইমাম ও খতিব, ইজেন বাইতুল আমান মসজিদ, দক্ষিণ কোরিয়া।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]