দ্বীপের দেশে রমজানে ভ্রাতৃত্বের অনন্য গল্প

ছবি: লেখকের পাঠানো

পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া—হাজারো দ্বীপের সমাহারে গঠিত এক বিস্ময়কর রাষ্ট্র। তাই একে অনেকে ‘দ্বীপের দেশ’ বলেও আখ্যা দেন। ভ্রমণ আমার নেশার মতো। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছি, কিন্তু আমার ভ্রমণের আসল আকর্ষণ শহরের চাকচিক্য নয়—গ্রামের সরল জীবন, মানুষের সহজ ভালোবাসা, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য আমাকে বেশি টানে। সেই টানেই এবার পা রাখলাম পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায়।

ইন্দোনেশিয়ার বিমানবন্দরে নেমেই কিছুটা অপ্রিয় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। বাংলাদেশিদের প্রতি কড়াকড়ি আর অযথা হয়রানি চোখে পড়ার মতো। তবু সব বাধা পেরিয়ে বন্ধুর আমন্ত্রণে পৌঁছে গেলাম তিমুর প্রদেশের মালাং জেলার কেপাঞ্জেন থানার অন্তর্গত তামানায়ু গ্রামে।

আমার বন্ধু আসাদির সঙ্গে পরিচয় দক্ষিণ কোরিয়ায়, আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। আমি প্রায় আটটি দেশের ভাষা জানি—তার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ান ভাষাও সাবলীলভাবে বলতে, পড়তে ও লিখতে পারি। তাই যখন তাদের ভাষায় অনর্গল কথা বলতাম, আসাদি অবাক হয়ে বলত—তুমি তো আমাদের চেয়েও ভালো ভাষা বলো!’

ইফতারের সময় গেলাম গ্রামের মসজিদে। ছোট্ট মসজিদ হলেও আয়োজনে কোনো কমতি নেই। বড় বড় থালায় খেজুর, ভাত, সামুদ্রিক মাছ ভাজি, গরুর মাংস, কেক, কলা, তরমুজ আর বিভিন্ন কোমল পানীয় সাজানো। যার যা ইচ্ছা, বেছে নিয়ে খাচ্ছে।

সুরাবায়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম আসাদির গ্রামে। শান্ত, নিরিবিলি, ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর—গ্রামের পরিবেশ মন ছুঁয়ে গেল। বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম, তবে কিছু খ্রিষ্টান ও হিন্দুও আছে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবগুলো সবাই মিলেই আনন্দের সঙ্গে উদ্‌যাপন করেন—এ যেন সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আরও পড়ুন

রমজান মাস চলছিল। দেখলাম—বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ছোট্ট শিশুরাও রোজা রাখছে। আজান হলেই সবাই জামাতে নামাজ পড়তে মসজিদে ছুটে যায়। অবাক হলাম জেনে যে জন্মের পর থেকেই অধিকাংশ শিশুকে প্রথমে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। ফলে কোরআন তেলাওয়াত তাদের কণ্ঠে যেন সুরের ঝরনা। সাহ্‌রির সময় ঘুম ভাঙল মসজিদ থেকে ভেসে আসা মধুর কোরআন তেলাওয়াতে। সে সুর হৃদয়কে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল।

সাহ্‌রির খাবার আমাদের দেশের মতো নয়। কিন্তু আমার খুব পছন্দের নাসি গোরেং, লে লে পিচেল, বাচো, আর গরুর মাংস দিয়ে ঝাল তরকারি—সব মিলিয়ে ভীষণ সুস্বাদু আয়োজন।

ইফতারের ইন্দোনেশিয়ার মানুষ
ছবি: লেখকের পাঠানো

দিনভর রোজা রেখে আসাদি আমাকে মোটরবাইকে করে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে গেল। সবার আন্তরিকতা আর আপ্যায়নে আমি মুগ্ধ। বিকাল চারটার পর থেকেই গ্রামের রাস্তায় ইফতারের সাজসাজ রব। নারীরা নিজ হাতে বানানো রঙিন পানীয়, পিঠা, পায়েস, জুস আর নানা রকম খাবার নিয়ে বসেছেন। গ্রামের মানুষ যার যার সাধ্য অনুযায়ী কিনছে। আর একটি বিষয় চোখে পড়ল—প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মোটরবাইক, এমনকি মহিলারাও স্বাচ্ছন্দ্যে বাইক চালাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

ইফতারের সময় গেলাম গ্রামের মসজিদে। ছোট্ট মসজিদ হলেও আয়োজনে কোনো কমতি নেই। বড় বড় থালায় খেজুর, ভাত, সামুদ্রিক মাছ ভাজি, গরুর মাংস, কেক, কলা, তরমুজ আর বিভিন্ন কোমল পানীয় সাজানো। যার যা ইচ্ছা, বেছে নিয়ে খাচ্ছে।

সবচেয়ে যে দৃশ্যটা আমাকে ছুঁয়ে গেল—গ্রামের নারী-পুরুষ দল বেঁধে পিঠা-পায়েস আর ইফতারসামগ্রী নিয়ে মসজিদে আসছেন। ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই একসঙ্গে বসে এক থালা থেকে ইফতার করছে। এ যেন ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা আর সাম্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা।

ছবি: লেখকের পাঠানো

আমি যখন তাদের মাঝে বসে সাবলীল ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় কথা বললাম, সবাই অবাক হয়ে গেল। কৌতূহল, আনন্দ আর আন্তরিকতায় ভরিয়ে দিল আমাকে। অনেকে আবার বাড়িতে দাওয়াতও দিলেন। ইফতারের পর তরমুজের জুস খেয়ে প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল। মনে হলো—ভ্রমণ শুধু নতুন দেশ দেখা নয়, নতুন মানুষের ভালোবাসা ছুঁয়ে দেখার নাম।

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]