কাতারে রমজান মাসের ইফতারে ফিরে আসে ঐতিহ্যের খাবার

কাতারের বাহারি ইফতারছবি: লেখকের পাঠানো

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে যাঁরা কাতারি নাগরিক, তাঁরা কী খান ইফতারে—এমন কৌতূহল অনেকের। ৩৩ লাখ মানুষের দেশ কাতারে কাতারি নাগরিকের সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ, সর্বোচ্চ ৪ লাখ। ফলে কয়েক যুগ ধরে কালের বিবর্তনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক বিদেশি মানুষের উপস্থিতির সুবাদে নানা রুচি ও স্বাদের মিশেলে গড়ে উঠেছে কাতারের বর্তমানকালের আধুনিক খাদ্য–সংস্কৃতি।

তবে প্রতিবছর রমজান মাস এলে কাতারিরা যেন ফিরে যান পুরোনো দিনের ঐতিহ্যে। রমজানে কাতারি নাগরিকেরা মূলত তিন ধরনের আহার করে থাকেন: সাহ্‌রি, ইফতার ও গাবকা (তারাবিহ নামাজের পর খাওয়া হয়)। বলে রাখা ভালো, কাতারসহ আরব দেশগুলোতে রমজানে মাগরিবের আজান হলে প্রথমে শুধু খেজুর ও পানি খাওয়া হয়। এরপর মাগরিবের নামাজ শেষে মূল ইফতার পর্ব শুরু হয়।

কাতারি ইফতার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছারিদ ও হারিস। দস্তরখানায় কিংবা টেবিলে ইফতারের আয়োজনে অন্য অনেক রকমের বাহারি পদ থাকলেও এ দুই খাবার ছাড়া কাতারিদের ইফতার যেন অসম্পূর্ণ।

কাতারে রমজান মাসের সাহ্‌রি ও ইফতারে মিষ্টি স্বাদের নানা রকম খাবারের প্রাধান্য চোখে পড়ে। বিশেষত রোজার ইফতারে প্রাচীনকালের খাবারগুলো সব বয়সের কাতারিদের পছন্দের শীর্ষে থাকে। পত্রপত্রিকার পাতায় এবং টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয় সেই খাবারগুলো রান্না করার তরিকা এবং নানা রকম উপকারিতা।

ছারিদ প্রসঙ্গে কাতারি শেফ ও প্রশিক্ষক আয়েশা আলতামিমি লিখেছেন, ছারিদ মূলত ‘রুকাক’ নামের পাতলা রুটি দিয়ে বানানো হয়
ছবি: সংগৃহীত

কাতারি ইফতার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছারিদ ও হারিস। দস্তরখানায় কিংবা টেবিলে ইফতারের আয়োজনে অন্য অনেক রকমের বাহারি পদ থাকলেও এ দুই খাবার ছাড়া কাতারিদের ইফতার যেন অসম্পূর্ণ। বিশেষত ছারিদ একদিকে যেমন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার, অন্যদিকে নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর হাদিসে এটিকে সব খাবারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। প্রাচীন আরবে যদিও ছারিদ দুধ দিয়ে বা কখনো মাংসের ঝোলে রান্না করা হতো, তবে কাতারে এটি অধিকাংশ সময় মাংসের ঝোল ও সবজি দিয়ে রান্না করা হয় এবং এতে রুটি ও মাংসের টুকরাগুলো বড় রাখা হয়।

ছারিদ প্রসঙ্গে কাতারি শেফ ও প্রশিক্ষক আয়েশা আলতামিমি লিখেছেন, ছারিদ মূলত ‘রুকাক’ নামের পাতলা রুটি দিয়ে বানানো হয়। কাতারি নারীরা নিজেদের ঘরে তাওয়ার ওপর এই রুটি বানিয়ে সেট হিসাব করে আলাদা ব্যাগে রেখে দিতেন। পরে ছারিদ তৈরির সময় পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী রুকাক রুটি নেওয়া হতো। এরপর সেটির ওপর মাংস, সবজি ও ঝোল ঢেলে দেওয়া হতো।

তবে হারিস সম্পূর্ণ গমের দানা দিয়ে তৈরি করা খাবার। এটি রান্নার সময় খেয়াল রাখতে হয়, যাতে এর দানাগুলো অক্ষত থাকে। হারিসের সঙ্গে খাসির মাংস ব্যবহার করা হয়। যদিও এটির রান্নার পদ্ধতি সহজ; কিন্তু এতে দীর্ঘ সময় লাগে, কারণ হারিস সব সময় অল্প আঁচে রান্না করতে হয়।

আরও পড়ুন
হারিস সম্পূর্ণ গমের দানা দিয়ে তৈরি করা খাবার
ছবি: সংগৃহীত

প্রাচীন যুগে কাতারি নারীরা কয়লার আগুনে হারিস রান্না করতেন। তবে আজকাল তা গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করা হয়, যাতে মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়। হারিস রান্নার আগে গম ভালোভাবে ধুয়ে সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় এবং তারপর অল্প আঁচে প্রায় ছয় ঘণ্টা তা রান্না করা হয়। আগেকার সময়ে হারিস রান্নার শেষে বাষ্প ধরে রাখার জন্য বস্তা দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হতো, যাতে গমের দানা এবং মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়।

আজকাল ইফতার শেষে কাতারি তরুণেরা ছোটেন আধুনিক বার্গারের দোকান ও কফিশপে। আইসক্রিম ও চকলেটের দোকানগুলোতেও ভিড় জমে সন্ধ্যার পর। ফলে ঐতিহ্যবাহী হারিস ও ছারিদের মিশেলে যুগ–যুগান্তর ধরে যে চর্চা কাতারসহ গালফ দেশগুলোতে, আধুনিক স্বাদের আগ্রাসনে তা আর কত দিন টিকবে, সেটি বলা কঠিন।

কাতারে আজকাল নারীরা হারিস রান্নায় সময় কমাতে প্রেশার কুকার ব্যবহার করেন। তবে প্রবীণদের মতে, ভালো হারিস সেটিই, যা অল্প আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা হয়। হারিস তৈরির প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় প্রাচীন ও বর্তমান পদ্ধতিতে আরও কিছু পার্থক্য যোগ হয়েছে। আগে কাতারি নারীরা কাঠের দণ্ড দিয়ে হারিস পিটিয়ে ও গুঁড়া করে মসৃণ করতেন। সে সময় কোনো গৃহিণীর হারিস কতটা ভালোভাবে পেটানো হয়েছে, সেটির ওপরই রান্নার স্বাদ নির্ভর করত। যে যত ভালোভাবে মিহি করতে পারতেন, তাঁকেই হারিসের দক্ষ রাঁধুনি হিসেবে গণ্য করা হতো।

আরও পড়ুন
ইফতার তাঁবুতে বিদেশি কর্মীদের ইফতার
ছবি: লেখকের পাঠানো

কাতারে হারিস ও ছারিদের পাশাপাশি রমজানের ইফতারে আরও থাকে মাদরুবা, মারকুক, কাবাব, বালালিত, খানফুরুস, লুকাইমাসহ নানা আয়োজন, যা মূলত নির্ভর করে আর্থিক সামর্থ্য এবং পরিবারের নিজস্ব পছন্দের ওপর। তবে গত কয়েক দশকে ইফতারে চাহিদা বাড়ছে সমবুসার, বাংলায় যা সমুচা। ইফতারের আয়োজনে এখন ছারিদ আর হারিসের সঙ্গে পনির, মাংস বা সবজি দিয়ে তৈরি সমুচাও যোগ হয়েছে, ‘যা না হলেই নয়’ তালিকায়।

কাতারে অনেক পরিবারের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো আলবারনিউশ বা আলমুহাম্মার। এটি মূলত চিনি মেশানো লালচে রঙের রুটি। অনেক বছর আগে যখন কাতারিদের জীবনধারণের অন্যতম মাধ্যম ছিল সাগরে মুক্তা আহরণ, তখনকার দিনগুলোতে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে সেটির মধ্যে রুটি মিশিয়ে খেতে পছন্দ করতেন তাঁরা। অধিকাংশ সময় এই খাবার মাছের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। তবে বছরের অন্য দিনগুলোতে কমবেশি যেমনই খাওয়া হোক না কেন, এই আলবারনিউশ রমজানে আজও অনেকের কাছে এটি অন্যতম প্রধান পদ হিসেবে পছন্দনীয়।

আরও পড়ুন

তবে কাতারে বিদেশি কর্মীদের জন্য রমজান মাসে শতাধিক তাঁবু স্থাপন করা হয় শহরজুড়ে। এসব তাঁবুতে বিনা মূল্যে ইফতার করেন হাজার হাজার মানুষ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি–বেসরকারি নানা সংস্থার উদ্যোগে এসব তাঁবুতে ইফতার বিতরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে খেজুর, পানি, জুস এবং মূল খাবার হিসেবে মানদি দেওয়া হয়, যা মূলত বড় থালায় মুরগি বা ছাগলের কয়েকটি টুকরা এবং হলুদ রঙের ভাত দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আজকাল ইফতার শেষে কাতারি তরুণেরা ছোটেন আধুনিক বার্গারের দোকান ও কফিশপে। কাতারজুড়ে গড়ে ওঠা নানা রকম আইসক্রিম ও চকলেটের দোকানগুলোতেও ভিড় জমে সন্ধ্যার পর। ফলে ঐতিহ্যবাহী হারিস ও ছারিদের মিশেলে যুগ–যুগান্তর ধরে যে ইফতারের চর্চা হয়ে আসছে কাতারসহ আশপাশের গালফভুক্ত দেশগুলোতে, আধুনিক স্বাদের আগ্রাসনের মুখে তা আর কত দিন টিকে থাকবে, সেটি বলা কঠিন।

আরও পড়ুন