বীথি: পর্ব-১০

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

দুই দিন ধরে একটি প্রবাদ মনে পড়ছে—‘শিখেছ কোথায়? ঠেকেছি যেথায়।’

বাংলা সহজ মানে হলো জীবনে চলার পথে যেখানে ঠেকে গিয়েছিলাম, সেখানেই শিখেছি।

জানিস, আমি যখন এই শহরে আসি তখন ছোট বোন কনাকে বলেছিলাম, ‘টরন্টো শহরের রাস্তাঘাট আগামী ১০ বছরেও চিনব না।’

ও বলেছিল, ‘মেজপা, তুই মাত্র ১০ দিনেই চিনে যাবি সবকিছু।’

আজকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, নর্থ আমেরিকায় সবচেয়ে কঠিন কাজের একটি হচ্ছে নিজেকে হারিয়ে ফেলা বা হারিয়ে যাওয়া। চেষ্টা করলেও কাজটা করা কঠিন। কথাগুলো মনে পড়ছে আরও গভীর কারণে। পাঁচ-ছয় দিন হলো আমার আর নাইয়ার কানাডিয়ান পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্য পাসপোর্ট অফিসে যাওয়া–আসা করছি। বিভিন্ন ফরম আর নানা ধরনের পেপারের কথা ওরা বলে, তাই সব কাগজ গুছিয়ে রাখি। তবু এমন কিছু ওরা আজকে বলল, যা আমার প্রস্তুতিতে ছিল না।

পাসপোর্ট অফিস নাইয়ার বাবার লিখিত পারমিশন নিয়ে বাংলাদেশের কানাডিয়ান হাইকমিশন অফিস থেকে পাঠিয়ে দিতে বলল। কারণ, নাইয়ার বায়োলজিক্যাল ফাদার ওদের কাছে ইম্পর্ট্যান্ট তথ্য। নাইয়ার বাবাকে ফোন করে আমি ১০ মিনিটের ভেতরেই কাজটা করতে বলেছি এবং আমি জানি ওর বাবা যথাসময়ে এই পেপারস পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমার প্রসঙ্গ এসব নয়। আমার প্রশ্ন আরও গভীরে। এরা দেশটাকে অপারেট করে কোন জায়গা থেকে?

বিশ্বাস কর বীথি, ২০০৮ সালে আমি আর নাইয়া কানাডার নাগরিকত্ব পাই। সে সময় আমি ওদের যা যা পেপারস দিয়েছিলাম, ওরা ওই মুহূর্তে সব খুঁটিনাটি এমনভাবে পেজ বাই পেজ কপি করে রেখেছে যে তুই নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবি না। এরপর বলল, ২০০৮ সালের চেয়ে এখন সিআইসি (সিটিজেনশিপ ইমিগ্রেশন কানাডা) বাচ্চাদের ব্যাপারে আরও ১০ গুণ বেশি সতর্ক হয়েছে। সুতরাং আমাকে আরও ডকুমেন্ট প্রোভাইড করতে হবে এবং ওদের চোখ থেকে সামান্য একটা বিষয়কেও কেউ এড়াতে পারবে না। আর একবার যদি ওরা কারও ব্যাপারে কোনো ফলস বা মিথ্যা ইনফরমেশন পায়, তাহলে তো ধর বাকি জীবনে ওই মানুষকে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই কবরে যেতে হবে।

বিদেশে আসার পরপর অনেক গল্প শুনতাম, কিন্তু সেগুলো মেলাতে পারতাম না। বেশির ভাগ গল্প আমাদের বড় বোন বা বড়পা করত। যেমন আমেরিকাতে নাকি বলা হয়, বিশেষ করে পাত্র চেয়ে যখন কথা বলা হয় তখন বলে ডাক্তার বনাম ইঞ্জিনিয়ার বনাম আমেরিকা, কানাডার লিগ্যাল পেপারস—কোন ছেলের দাম বেশি বা কোন ছেলে বেশি দামি পাত্র হিসেবে।

খুব নির্ভয়ে বলি বীথি—অনেক কাছের মানুষ বলেছে, আপনি বিয়ে করছেন না কেন? আপনি তো চাইলে বাংলাদেশের যেকোনো ধরনের ছেলেকে বিয়ে করতে পারেন। আপনার তো লিগ্যাল পেপারস আছে, তাই না?

আরও পড়ুন

আমি বিদেশে আসার পর প্রথম তিন বছর কোনো দিকে না তাকিয়ে নাইয়াকে নিয়ে শুধু সেটেল করতে চেয়েছিলাম। স্বপ্ন ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল কী করে নিজের সংস্থান করব।

এখন যখন ভাবি, তখন অনেকেই বলে, আপনি আবার ভাবুন, আপনার তো লিগ্যাল পেপারস, তাই না? ভাবটা এমন, ওরা আমার ব্যাপারে কেবল কানাডিয়ান পাসপোর্টটা দেখতে পারছে, আমি যেন কোনো মানুষই না।

বেশ কয়েক বছর ধরে অনেককে বলেছি, তাহলে তো আমার জন্য কেউ আমার জীবনে আসবে না, তাই না? তাদের আসতে হবে কানাডায় বা আমেরিকায়।

অনেকে হয়তো আমাকে মুখের সামনে কিছু বলত না, পেছনে বলে, লিগ্যাল পেপারসই তো আপনার যোগ্যতা।

এখন আমার আরও বয়স হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমি সিআইসির ফান্ডেই চাকরি করি।

আরও পড়ুন

শুধু বাংলাদেশ না, সারা পৃথিবীর কত কত মানুষ এসব দেশে এসে ভাগ্য গড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, তাদের সঙ্গেই আমাকে প্রতিদিন ওঠাবসা করতে হয়, তাদের জীবনের টানাপড়েনের সঙ্গেই রুটিরুজি আমার।

তাই বড়পা যখন বলে, কী বলিস লুনা, লিগ্যাল কাগজ আছে, এমন পাত্র তো ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ারের চেয়েও দামি! কী করব আমি ডাক্তার দিয়ে, যদি সারা জীবন ট্যাক্সি চালাতে হয়?

বীথি, কথা শুরু করেছিলাম, এই শহরের আইনকানুন নিয়ে। কিন্তু অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম। তুই তো জানিস, আব্বা প্রথম জেনারেশন ঢাকায়।

আমি এমন কোনো ক্লাস বিলং করি না, সেখানে ক্রাইসিস ছাড়া মানুষদের দেখি। এই শহরে এমন মানুষও আছেন হয়তো, যাদের কাছে আমেরিকা/কানাডা ডাল বরাবর। যাদের জীবনে এসব কথা শোনার কোনো দরকারই পড়েনি।

কিন্তু আমি কি তেমনভাবে বড় হয়েছি? ওই যে তোকে বলেছিলাম, মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপোড়েন পেছন থেকে টেনে ধরে। আমি সেখানেই শিখি, যেখানে আটকে যাই। তবু কি শিখি ঠিকমতো বীথি?

অফিস থেকে যখন লম্বা পথ ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরতে থাকি, আমার সিডিতে গান বাজে। আমি পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি—একটা জীবনে অসংখ্য ভুলের পাহাড় বীথি। এই একটামাত্র জীবনে এত এত ভুল করলাম? এই ভুলের নৌকাতে আমি একা, নাকি অনেকেই আছে আমার সঙ্গে! খুব জানতে ইচ্ছে করে রে।

আদর তোকে। চলবে...

আরও পড়ুন