বীথি: পর্ব-৯
বীথি,
আমাদের পিএটিসির সাভারের বাসাটা মনে পড়ে তোর ?
১৯৮৪ সালে আমি যখন ধানমন্ডি গার্লস স্কুল ছেড়ে, তোকে ও তোদের সবাইকে ছেড়ে সাভারে চলে গেলাম, মনে আছে তোর? তুই, ইতু, সোমা কয়েকবার এসেছিলি ঢাকা থেকে বেড়াতে, কিন্তু খুব বেশি আসিসনি। সেই সময় সাভার–ঢাকার যোগাযোগ কি অত ভালো ছিল? সেসব বলার জন্য এই ভোরবেলা লিখতে বসিনি, তোকে মনে করিয়ে দিই, বীথি, তুই আমাদের সাভারের বাসা দেখে বলেছিলি, এ কী, এত লম্বা বেড কেন তোমাদের বাসায়? দুইটা ডাবল বেড জোড়া লাগানো ছিল পাশাপাশি।
আমরা চার বোন এক খাটে ঘুমাতাম পিএটিসির বাসায়। সেই সময় ডিরেক্টরদের চার বেডরুমের বাসা দেওয়া হতো, সরকার অনেক সুবিধা দিয়েছিল যেন কিছু সিনিয়র স্টাফ ওখানে গিয়ে পাকাপাকিভাবে থাকেন। আব্বা তাই করেছিলেন, আমরা চার বোন সরকারি তদবিরে ভর্তি হলাম জাহাঙ্গীরনগর স্কুল কলেজে, বিশেষ করে আমি আর বড়পা, আর বাবা পিএটিসির সেই ফাঁকা ক্যাম্পাসে আমাদের নিয়ে উঠলেন। আমাদের চার বোনের জীবনের সেরা সময় কাটালাম আমরা সেই ক্যাম্পাসে।
জানিস বীথি, এই শহরে এখন ভোর ৫টা, টরন্টোতে এখন সবাই ঘুমিয়ে, কিন্তু আমি উঠে পড়েছি নিয়মমাফিক। ল্যাপটপের নীল আলোর সামনে বসে অতীত ভাবছি। সবচেয়ে প্রিয় কাজ এটা, এই সময়টা বেশির ভাগ সময় কাঁদি, অনেকে বলে, আপনি ভীষণ সুখী মানুষ লুনা, এখনো আপনি কাঁদেন, এখনো দুঃখ, অতীত স্মৃতি, মানবিকতা, ভালো–মন্দ আপনাকে ভাবায়, কী অবাক করা সুখী আপনি ?
আমি বলি, নিশ্চয়ই সুখী, কেন সুখী হব না? আমার সুখী হওয়ার বেশ কয়েকটা বড় কারণ আছে, তার ভেতরে সবচেয়ে বড় কারণ আমার অসাধারণ তিন বোন, এমন বোন যাদের আছে, তাদের কোনো কষ্ট থাকে না। আমরা চার বোন এখনো একসঙ্গে হলেই এক ঘরে ঘুমাই। কনার ডালাসের বাসায় সারাক্ষণ এক কাপড় পরি, একসঙ্গে থাকি, সারাক্ষণ হাসি, আবার হয়তো দেখা যায় কেউ লুকিয়ে কাঁদছি—সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা একজোট। সবার আগে আমরা সবাই সবার ভালোটা চাই, সেটা যে কোনো শর্তে। তোকে কোন উদাহরণ থেকে কোনটা বলব বীথি?
কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে জানিস, আমাদের চার বোনের বয়সই চল্লিশের ওপরে। মাত্র একটা চিঠিতে কি এই বিশাল ব্যাপ্তির কথা লেখা যায়? আমার বোনদের ভেতরে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষ আমি, সবচেয়ে কম যোগ্যতা আমার, সবচেয়ে বেশি স্বার্থপর আমি, কিন্তু তবুও আমি ওদের বোন, কোনো বিনয় নয় বীথি, যাঁরা আমাদের চার বোনকে কাছে থেকে চেনেন, তাঁরা জানেন এই সত্য।
এসএসসি পরীক্ষার আগে ক্লাস টেনে দুই বছর থাকলাম, সেই সময় আম্মা আমাকে আর কনাকে এক ঘরে টেবিল করে দিলেন, কনা আমাকে ম্যাথ করাবে, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কনা একটা করে ম্যাথ পরীক্ষা নিত, আমি পাস করলাম এসএসসি পরীক্ষা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, কোনো প্রোগাম আছে হয়তো, শাড়ি পরব, সবার ছোট বোন শাহিনকে সকাল ৬টার গাড়িতে ঢাকা থেকে নিয়ে আসলাম। ও আমাকে রেডি করে দিয়ে ৮টার বাসে চলে গেল, আমি সবার প্রশংসা কুড়ালাম দিনব্যাপী।
জাহাঙ্গীরনগরে পড়াশোনা করি, বাবা সারা জীবন স্বল্প বেতন পেতেন, মায়ের হাতে বাড়তি টাকা কোনো দিনও থাকত না, বড় বোন আমেরিকা থেকে টাকা পাঠাত, আজকে ২৫ বছর পরে জানি ও বিশ্বাস করি, বড়পা আমাকে রক্তবেচা ডলার পাঠাতেন। এত কষ্ট করে উপার্জন করা টাকা, ভাবলে এখনো গা হিম হয়ে আসে, সেই টাকা দিয়ে আমি অনেক সময় হয়তো বন্ধুদের সিগারেট কিনে দিয়েছি, আল্লাহ কি মাফ করবেন আমাকে কোনো দিন?
আমার যেকোনো বিপদে আমার বোনেরা সবার আগে পাশে দাঁড়িয়েছে, কেবল কথা দিয়ে নয়, তুই তো জানিস বীথি, সত্যিকার বিপদে দাঁড়াতে গেলে সত্যিকার সামর্থ্য থাকতে হয়, আমার বোনেদের সেটা আছে ১০০ ভাগ।
সমাজ কী বলবে, সেই ভাবনা কোনো দিন আমার বোনেরা ভাবেনি, কোনো দিন না। কিন্তু আমি অনেক অনেক পরিবারে দেখেছি, কত তুচ্ছ কারণে বোনে বোনে সম্পর্ক নেই, এক বোন আরেক বোনকে হিংসা করছে, বোনের জামাইদের নিয়ে নোংরা কথা চালাচালিতে জড়িয়ে পড়ে বোনে বোনে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এ শহরেই আছে উদাহরণ, আবার আমাদের চেয়েও ভালো সম্পর্ক আছে হয়তো কারও, কিন্তু আমি এখনো দেখেনি।
প্রতিদিন আমি আর বড়পা অন্তত ১০–১২ বার ফোনে কথা বলি, এর ভেতরে ৩–৪ বার ফোন করলেই শুনতে পাই, বড়পা আর কনা লাইনে আছে, আমি ঢুকে পড়ি কনফারেন্স কলে, অন্য প্রান্ত থেকে শাহিন জয়েন করে বাংলাদেশ থেকে, শুরু হয় হাসি আর আড্ডা, কত বিচিত্র কথা যে ওরা জানে, অনেক সময় আমি চুপ করে থাকি, ওরা দেখতে পায় না, আমার চোখে পানি।
টরন্টো, ডালাস, ফ্লোরিডা, বাংলাদেশ কনফারেন্স কল চলছে, হাসিতে ভেসে যায় ফোন, কখনো কথা হয় জটিল বিষয় নিয়ে বা আমাকে নিয়েই হয়তো কথা হচ্ছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো নিতে হবে আমাকে নিয়েই, কিন্তু আমি কথা বলি না।
কারণ মনেপ্রাণে জানি ও বিশ্বাস করি, আমার যেকোনো সিদ্ধান্ত আমার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি বোনেরা নিতে পারবে, আমি পারব না। আমি সেই ছোটবেলাতেও পারিনি বীথি। এক খাটে যখন সারি বেঁধে ঘুমাতাম, তখন আমি মাঝখানে থাকতাম। কারণ, ভয় পেতাম, আর আজকে? এখন?
এখনো আমি একাই থাকি বীথি, অনেক বেশি হয়তো একা। তিন দেশে তিন বোন থাকে, কিন্তু ওদের ভালোবাসা, শক্তি, সাহস আর প্রেরণা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। অন্তর আলোরিত হতে থাকে সারাক্ষণ।
বুকের গহিনে বোনদের ভালোবাসা সুর হয়ে বাজতে থাকে নিরন্তর, আমার জীবন বয়ে যায় আনন্দধারায়। গতকাল নাকি ন্যাশনাল সিব্লিং ডে ছিল, বড়পা দেখলাম আমাদের চার বোনের একটা ছবি পোস্ট দিয়েছে, ১৯৯০ সালে তোলা ছবি। এসব ডে দিয়ে কি জীবনের গল্প বলা যায় বীথি?
আলো বাড়ছে, সকাল হবে আর একটু পরই, আজকে হাটঁতে বের হব। তোকে আদর। চলবে...