বীথি: পর্ব-৮

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

বীথি,

সন্ধ্যা পৌনে ৬টা মতো হবে

বাইরে উজ্জ্বল দিনের আলো, গত চিঠিতে লিখেছি তোকে, এই শহরে ধীরে ধীরে দিনের আলো বাড়বে, মাত্র কয়েক দিনের ভেতরই দেখতে পাব উজ্জ্বল এপ্রিল–মে মাস চলে আসছে।

আজ অফিস থেকে ফেরার সময় এক বেঁটে–মোটামতো সাদা মেয়ে আর আমি একসঙ্গে লিফটে উঠলাম, মেয়েটির হাতে লেটার বক্স থেকে নেওয়া চিঠি, আমার হাতেও তা–ই। মেয়েটি আমার ফ্লোর নম্বর জিজ্ঞেস করে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। বললাম, আমাদের দুজনের হাতেই বিল, কেবল বিলই আসে ডাকবক্সে, তা–ই না বলো?

মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘জানো সময় সময় ভাবি, কেউ আমাকে চিঠি লিখবে, স্বার্থহীন চিঠি। জানতে চাইবে, কেমন আছি? কিন্তু সেটা কখনোই হয় না।’ বলেই মেয়েটা আবার হাসে।

ততক্ষণে আমার ফ্লোর এসে গেছে, আমি নেমে যাওয়ার আগে বললাম, ইউ মেড মাই ডে।

আরও পড়ুন

বিশ্বাস কর বীথি, এই যে তোকে লিখতে বসেছি, এখন রাত সোয়া আটটা বাজে, কাল অফিস আছে, ভোর চারটা–পাঁচটায় ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় যাই ৯টার ভেতর, অফিস থেকে ফিরেই নামাজ পড়ি। আবার ভাবিস না যে নামাজ পড়ি মানেই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করি। নামাজ পড়লে মানসিক প্রশান্তি আসে, তাই পড়ি।

এরপর নাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে পরদিনের জন্য তৈরি হই। কী কাপড় পরব, অফিসে কী কী ব্যস্ততা আছে, কী কী মিটিং আছে, আবহাওয়া কেমন এসবের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক গোছাই। নিজের প্রিয় জায়গা রান্নাঘর, সেখানে দাঁড়িয়ে নাইয়া আমার রাতের খাবার সাজাই। সারা সপ্তাহের খাবার শনি–রোববারেই ঠিকঠাক করে ফ্রিজে রাখা হয়, তাই সপ্তাহের অন্য দিন চুলা ধরানো হয় না।

এই নিয়মে জীবন চলছে পাঁচ বছর ধরে। যত দিন যাচ্ছে, তত যেন নিয়মের কাছে জীবন বাঁধা পড়ে যাচ্ছে, কিন্ত তবু তো মানুষ আমরা সবাই, তা–ই না বীথি?

এই চিঠি শুরু করার আগে তোকে বলছিলাম, আমাদের সব বন্ধুর জীবন লিখব, বিশেষ করে মেয়েদের জীবন, কিন্তু এখন অব্দি নিজের জীবনেরআি কোনো কূল–কিনারা পেলাম না।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
আরও পড়ুন

কেন লিফটের মেয়েটার কথা এমন প্রবলভাবে বুকের ভেতর বাজল যে আমি তোকে এই অসময়ে লিখতে বসে গেলাম? আমার কি কারও চিঠি পাওয়ার কথা ছিল, স্বার্থহীন চিঠি? আমিও কি কোনো দিন স্বপ্ন দেখতাম নিঃস্বার্থভাবে কেউ জানতে চাইবে, কেমন আছ লুনা? আমি কি দেখেছিলাম এমন স্বপ্ন কোনো দিন?

বীথি, নতুন সাদা সিডান গাড়িতে সিডি প্লেয়ারটা বেশ ভালো। বেশ সুন্দর পরিষ্কার আওয়াজ আসে। ভোর পাঁচটায় যখন বাবুকে তালা দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে ৭০–৮০ মাইল গতিতে হাইওয়ে দাবড়ে টরন্টো ছেড়ে ব্রামটনের দিকে যেতে থাকি, তখন গান হয় আমার প্রাণের সঙ্গী।

আরও পড়ুন

গত চার–পাঁচ দিন হলো শুনছি নজরুলসংগীত ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানি, দেব খোঁপায় তারার ফুল// জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল...’ গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়, ‘মোরা আর জনমে হংসমিথুন ছিলাম....’

এসব গান শুনতে শুনতে বুঝতে পারি, অনেক জোরে গাড়ি চালাচ্ছি, চোখ ঝাপসা হচ্ছে, একমুহূর্তের অসাবধানতায় অনেক বড় বিপদ হবে। ঘরে ঘুমন্ত ছেলে। দ্রুত হাতে চোখ মুছে ফেলি। কান্নার বিলাসিতা আমার নয়। বুঝতে পারি এটা বাস্তব, কঠিন জীবন, বাস্তবে কেউ ফুল নিয়ে আসেনি, বাস্তবে আমরা এই মানুষেরা ডলারের হিসাব করেছি। নির্মমভাবে সেই হিসাবে আমি মার খেয়ে ফিরে এসেছি বীথি, এখন সঙ্গী হয়েছে অন্ধ আবেগ।

একসময় এসব ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে যাই জিমে। ট্রেড মিলের গতি বাড়িয়ে দিতে দিতে ভাবি, আরও একটা দিন শুরু হবে আজ।

আদর তোকে বীথি... চলবে..