বেঁচে থাকার শিল্প

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

সময়ের স্রোতে মানুষের রুচি বদলায়, অভিজ্ঞতার আলোয় ভাবনার জগতে নীরব রূপান্তর ঘটে, মননের স্বাদে পড়ে সূক্ষ্ম বাঁক। এই বদলের দীর্ঘ অভিযাত্রায় ভ্রমণ এসে ধরা দেয় এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে। একসময় ভ্রমণ মানে ছিল অল্প সময়ে যত বেশি সম্ভব জায়গা দেখে ফেলা। এখন বুঝি, ভ্রমণ আসলে গন্তব্যের হিসাব নয়, বরং অল্প কিছু জায়গায় দীর্ঘ সময় থেকে তাদের রূপ-রস-গন্ধে ধীরে ধীরে ভিজে যাওয়ার নাম, বিচিত্র মানুষের মুখ আর মনের সঙ্গে পরিচয়ের নাম।

এবারের বেলজিয়াম যাত্রা যেন সেই উপলব্ধিরই এক শান্ত, পরিপূর্ণ অনুশীলন। বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রিয় বন্ধু আলম ভাইয়ের আমন্ত্রণে রওনা হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বহিরাগতদের থাকার সীমাবদ্ধতার কারণে আশ্রয় মিলল আরেক বন্ধু, লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রাজু ভাইয়ের বাসায়। রাজু ভাইয়ের আতিথেয়তায় ছিল আন্তরিকতার উষ্ণতা, আর আমাদের তিনজনের ভাবনা ও দর্শনের মিল রাতের পর রাত গল্পকে টেনে নিয়ে গেছে ভোরের আলো পর্যন্ত।

আরও পড়ুন

রাজু ভাই থাকেন এক বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার প্রশস্ত ফ্ল্যাটে। ভদ্রমহিলার নাম ইনগ্রিড ল্যাংগর, বয়স সাতাশি, অথচ চলাফেরায়, কথাবার্তায়, দৃষ্টিতে এখনো এক আশ্চর্য স্বচ্ছতা। তাঁর জীবনের গল্প যেন এক নিঃশব্দ উপাখ্যান। ২৩ বছর বয়সে বিয়ের ঠিক আগে হারিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় মানুষকে। সেই স্মৃতিকে হৃদয়ে বহন করে তিনি আর কোনোদিন সংসারের পথে পা বাড়াননি। সে সময়ের পৃথিবীতে এমন একাকী, অবিচল সিদ্ধান্ত যে কতটা কঠিন ছিল, তা ভাবলেই বিস্ময় জাগে।

তাঁকে দেখে, তাঁর দিনযাপনের ছন্দ দেখে মনে হয়েছে, একা বাঁচাও একধরনের শিল্প। প্রতিদিন সকালে তিনি এক ঘণ্টা রেডিওতে শোনেন পৃথিবীর খবর। রাজনীতির কোলাহলে তাঁর বিরক্তি আছে, কিন্তু শিল্প, সাহিত্য আর দর্শনের প্রতি কৌতূহল আজও অমলিন। খবর শোনা শেষে নাশতা, তারপর বই। তাঁর ফ্ল্যাট যেন বই আর ছবির এক নীরব রাজ্য।

রাজু ভাইয়ের উৎসাহে তাঁর ড্রয়িংরুমে ঢুকে মনে হয়েছিল, যেন সময়ের দুই তীর এক ঘরে এসে মিলেছে। টেবিলের এক পাশে আধুনিক ল্যাপটপ, অন্য পাশে বইয়ের স্তূপ। দেয়ালে চিত্রকলা, চারদিকে রুচির নিঃশব্দ সাক্ষ্য।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

এ বয়সেও ভদ্রমহিলা নিজে গাড়ি চালান। রাজু ভাইয়ের হাসপাতালে যাওয়ার কথা শুনে তিনি নিজেই প্রস্তাব দিলেন নিয়ে যাওয়ার। রাজু ভাইয়ের সামনে তখন উভয়সংকট। রাজু ভাই ভদ্রমহিলাকে না বলতে পারছেন না, আবার ভাবছেন, এই বয়স্ক ভদ্রমহিলার গাড়িতে উঠলে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই তাঁকে না আবার অন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়! কিন্তু গাড়িতে উঠে তাঁর স্থির, নিখুঁত চালনা দেখে বিস্ময় চাপা রাখতে পারেনি। তিনি এখনো নতুন বন্ধু বানান, সুযোগ পেলে বেরিয়ে পড়েন আড্ডায়, জীবনকে হালকা করে রাখেন।

নিজের রান্না নিজেই করেন, আর সন্ধ্যাবেলায় রাজু ভাইয়ের সঙ্গে বসে কথা বলেন নানা বিষয়ে। রাজু ভাই বলছিলেন, এই ফ্ল্যাটে ওঠার আগে নাকি তাঁকে ছোটখাটো এক সাক্ষাৎকারও দিতে হয়েছিল। মানুষ বিচারেও তাঁর চোখ এখনো তীক্ষ্ণ।

কিছুদিন আগে শরীরে একটু দুর্বলতা টের পেয়েছিলেন। ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি। চার্চে গেলেও কারণে অকারণে তাঁর ঘুম আসে। এটি নিয়ে তিনি খানিকটা বিব্রত ও চিন্তিত। নিজেই গাড়ি চালিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। বললেন, তাঁর লক্ষ্য এক শ বছর বাঁচা। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার হেসে বললেন, শরীরের হিসাব বলছে, এক শ বারো বছরও অসম্ভব নয়। সেদিন ফিরে এসে শিশুর মতো আনন্দ নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এখনো অনেক দিন বাঁচব।’

আরও পড়ুন

এই ভ্রমণ আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে, মানুষের জীবন আসলে আশারই আরেক নাম, আর বেঁচে থাকা একধরনের নীরব সাধনা, এক শিল্প। চারপাশের বিষাক্ত নিশ্বাসের মধ্যেও যে জীবনকে ভালোবেসে নেওয়া যায়, তা পারা মানুষদের জন্যই কবিগুরু লিখেছিলেন—

আমি যা পেয়েছি তাই সাথে নিয়ে ভেসে যাই,

কোনোখানে সীমা নাই ও মধু মুখের—

শুধু স্বপ্ন, শুধু স্মৃতি, তাই নিয়ে থাকি নিতি,

আর আশা নাহি রাখি সুখের দুখের।

আমি যাহা দেখিয়াছি, আমি যাহা পাইয়াছি

এ জনম-সই,

জীবনের সব শূন্য আমি যাহে ভরিয়াছি

তোমার তা কই।

*লেখক: সুব্রত মল্লিক, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার, পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য।

[email protected]

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন