হলদে পরির দেশ-৪
এবার আমরা গিয়েছিলাম সিঙ্গাপুর। সুযোগটা হুট করেই এসেছিল। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মেডিকেল ভাইরোলজি সংস্থা আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল ভাইরোলজি কংগ্রেসে আমাকে ইয়াং ইনভেস্টিগেটর অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত করেছে। পাশাপাশি সুযোগ হয়েছিল, আমার গবেষণার ফলাফল এই বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপন করার। কংগ্রেসের ভেন্যু সিঙ্গাপুর এক্সপো, যা মোট তিন দিন চলবে—মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার। পরিকল্পনা করলাম, অনেকটা ‘রথ দেখা আর কলা বেচার’ চিন্তা করে, সম্মেলনের দুই দিন আগেই সপরিবারে রওনা দেব। আগে আশেপাশে ঘোরাঘুরি সেরে, এরপর পুরো মনোযোগ দেব নিজের কাজে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী থাকার জায়গা ঠিক করলাম—হোটেল ল্যাভেন্ডার, যেখানে সিটি ভিউ রুম নেওয়া হলো। সিঙ্গাপুর সাব-ট্রপিক্যাল দেশ হওয়ায় আবহাওয়া অনুকূল না–ও থাকতে পারে। গুগল চেক করে দেখলাম, আমার ধারণাই ঠিক—আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে, আমার থাকার সময়টায় বৃষ্টি হবে। তাই হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিলাম, যেন আমাদের রুম যতটা সম্ভব ওপরের তলায় দেওয়া হয়—যদি সত্যি সত্যিই বৃষ্টিতে আটকে যাই, অন্তত রুম থেকেই শহর দেখা যাবে। যাত্রার জন্য বেছে নিলাম চায়না এয়ারলাইন্স। সকাল আটটায় ফ্লাইট রওনা দেবে, সব ঠিকঠাক থাকলে বেলা একটার দিকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে পৌঁছে যাব। হোটেল আর বিমান টিকিট বুকিং দেওয়ার পর ছুটলাম তাইপেতে অবস্থিত সিঙ্গাপুর বিজনেস অ্যান্ড কালচারাল সেন্টারে। এই অফিস আসলে একপ্রকার অঘোষিত দূতাবাস—ভিসাসংক্রান্ত সব কাজ এখান থেকেই করা হয়। আমি, তৃষা আর আয়ান—আমাদের তিনজনের ভিসার আবেদন করলাম অক্টোবরের ২৮ তারিখ দুপুরে। একদিন পর ৩০ তারিখ সকালে ভিসা কনফারমেশন মেইলও পেয়ে গেলাম! সবকিছু হাতে পাওয়ার পর এবার আমাদের অপেক্ষার পালা।
আয়ান একটু বড় হয়ে এই প্রথম বিমানে চড়তে যাচ্ছে। চরম মাত্রার উত্তেজিত। প্রতিদিন বাসার ওপর বিমান উড়ে যায়। যখন শোনেছে আর কিছুদিন পর বিমানে চড়তে যাচ্ছে, তার খুশির মাত্রা দেখে। এরই ভেতর স্কুল থেকে একদিন আয়ানের টিচার তৃশাকে মেসেজ পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
-আয়ান কি ফরেন ট্রিপে যাচ্ছে তোমাদের সাথে?
-হ্যাঁ। তুমি কীভাবে জানলে? তৃশা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
-আয়ান জানাল!
পাঁচ বছর বয়সী ছেলের উত্তেজনা কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম—আমরা জানানোর আগেই সে নিজ থেকেই স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে নিয়েছে!
যাত্রার আগেই মোটামুটি সব গুছিয়ে ফেললাম। আমাদের বাসায় দুটো নিমগাছের বনসাই, কামিনীসহ কয়েকটি ফুলগাছ আছে। পাশের বাসার এক চাইনিজ দম্পতিকে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম আগামী ছয় দিনের জন্য। অপেক্ষার দিনগুলো দ্রুতই কেটে গেল। নভেম্বরের ১৭ তারিখ, রবিবার ভোরে আমাদের ফ্লাইট। একদিন আগে, শনিবার সন্ধ্যায় চলে গেলাম নেইলি সিটিতে, মোস্তাফিজ ভাইয়ের বাসায়। নেইলি থেকে এয়ারপোর্ট যেতে গাড়িতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। ভোর পাঁচটার দিকে রওনা দিলাম। বাইরে বেরিয়ে দেখি গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মোস্তাফিজ ভাই আর ভাবি এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে এলেন। আমাদের নিয়ে চায়না এয়ারলাইন্সের বিমানটি যথাসময়েই যাত্রা শুরু করল। হালকা বৃষ্টি তখনো চলছে। তাইওয়ান থেকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান সোজা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে, মাঝখানে প্রায় ছয় ঘণ্টার উড়াল পথ। আমরা জানালার পাশের সিট পেলাম। কখনো সাগরের নীল জল, কখনো মেঘের রাজ্য, আর কখনো মুভি দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। অবশেষে পাইলট ঘোষণা করলেন, আর কিছুক্ষণ পর আমরা চাঙ্গি এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে যাচ্ছি। আমরা সিটবেল্ট বেঁধে নিলাম। বিমানটি নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে মেঘের স্তর যেন ঘন থেকে ঘনতর হতে শুরু করল। বেশ অনেকক্ষণ পর, মেঘের ফাঁক গলে সমুদ্রে চলমান জাহাজের দেখা পেলাম—ওপর থেকে দেখে মনে হলো যেন ছোট ছোট নৌকা!
এয়ারপোর্টে নামার পর ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট স্ক্যান ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলাম। ট্যাক্সি আগেই বুকিং দেওয়া ছিল। লাগেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারকে নক দিলাম। জানালো, সে বাইরে অপেক্ষা করছে। আর দেরি না করে ছুটলাম ট্যাক্সির খোঁজে। বাইরে বের হয়েই মাথায় হাত! এখানে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, থামার কোনো লক্ষণ নেই। গাড়ি আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে হোটেলের দিকে। দুপাশে বৃষ্টিমাখা শহর। ভেজা গাছপালায় কেমন যেন বাংলাদেশের রঙ। দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। চল্লিশ মিনিটের মধ্যে হোটেলে পৌঁছে গেলাম। আগেই জানিয়েছিলাম, যতটুকু সম্ভব ওপরের তলায় রুম বরাদ্দ রাখার জন্য। আশাহত হইনি—আমাদের রুম বারো তলায়। জানালার পর্দা সরাতেই চোখের সামনে চলে এলো সিঙ্গাপুর শহরের বড় একটা অংশ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বেলঅ তিনটা। তাইওয়ানে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম ভোর পাঁচটায়। দীর্ঘ ভ্রমণের পর এখন মাথা ঝিমঝিম করছে। কফি খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।
সিঙ্গাপুর এসে প্রথম যে জিনিসটা অনুভব করলাম, তা হলো তাপমাত্রা। তাইওয়ানে শীত আসতে শুরু করেছে, তার ওপর প্রচুর বাতাস থাকে। এখানে তা নেই—বরং একটু ভ্যাপসা গরম। আশপাশের পরিবেশ তেমন নতুন লাগছে না, সম্ভবত দীর্ঘদিন চাইনিজ টেরিটরিতে বসবাসের কারণে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় প্রথম দিন হোটেলের বাইরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পাশের দোকান থেকে একটি মোবাইল সিম ও তিনটি ইজেড (EZ) কার্ড কিনে নিলাম। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের জন্য এটি খুবই উপকারী। ২০২০ সালে প্রথমবার তাইওয়ানে এই কার্ডের সঙ্গে পরিচিত হই। সেখানে এর নাম Easy Card। প্রয়োজন মতো রিচার্জ করে বিভিন্ন কনভেনিয়েন্ট স্টোর থেকে কেনাকাটা করা যায়, পাশাপাশি বাস-ট্রেনসহ সব ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্টেও ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুরে খাবারের সমস্যা নেই—প্রচুর হালাল খাবারের দোকান রয়েছে। তাই রাতের খাবার অনলাইনেই অর্ডার দিলাম। যা–ই হোক, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সারা দিনের ধকলের পর টানা ছয়-সাত ঘণ্টা ঘুম হলো। ফজরের সময় ঘুম ভাঙল। নামাজ শেষ করে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম—আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে, গতকালের ঘন মেঘের কোনো চিহ্ন নেই।
সকাল সকাল নাস্তা সেরে বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্য লিটল ইন্ডিয়া। সেখান থেকে বাংলাদেশি এলাকায় দুপুরের খাবার খেতে যাব। গুগল ম্যাপে হোটেল থেকে দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার দেখাচ্ছে। তাই হেঁটেই রওনা দিলাম। লিটল ইন্ডিয়া মূলত প্রবাসী ভারতীয়দের এলাকা। সত্যি বলতে, যেমনটি ভাবছিলাম, বাস্তবতা তার চেয়ে আলাদা। এলাকা অত্যন্ত কোলাহলপূর্ণ, অপরিষ্কার ও শব্দদূষণে ভরা। এখানে একটা সম্পূর্ণ ভারতীয় সংস্কৃতির আমেজ পাওয়া যায়, তবে গিঞ্জি পরিবেশ ও সারি সারি দোকান দেখে বোঝা কঠিন যে এটি কীভাবে পর্যটন এলাকা হতে পারে! যারা এখানে ঘুরতে এসেছে, তাদের বেশিরভাগই ভারতীয়, তবে অল্প কিছু সাদা চেহারার বিদেশিও দেখা গেল। আমাদের বাংলাদেশিরাও লিটল ইন্ডিয়ার আশপাশে বসবাস করে। সেখানে অনেকগুলো বাংলাদেশি রেস্তোরাঁও পেলাম। খাবারের দাম বেশ সস্তা—এক প্লেটে এত বেশি ভাত দেয় যে তা তিনজনের জন্য যথেষ্ট! তবে ওই এলাকায় বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হয়নি। পুরো জায়গাটা একটা বিশ্রী গন্ধে ভরা, যা সহ্য করা মুশকিল। আমরা যদিও কিছুটা অভ্যস্ত, তবে আয়ান বারবার বলতে লাগল, ‘ডার্টি, ডার্টি!’ আমরা তখনো ফিরছি না দেখে একপর্যায়ে সে কান্না শুরু করে দিল।
অবশেষে লিটল ইন্ডিয়া ও প্রবাসী বাংলাদেশি এলাকা ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রাতের বেলা চলে গেলাম ম্যারিনা বে-এর মারলিন পার্কে, যা সিঙ্গাপুরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। এখানে রয়েছে বিখ্যাত মারলায়ন মূর্তিটি—সিংহ ও মৎস্য আকৃতির প্রতীকী ভাস্কর্য, যার মুখ দিয়ে অনবরত পানি বের হচ্ছে। প্রতিদিন হাজারো বিদেশি পর্যটক এটি দেখতে আসে। মারলায়ন নিয়ে একটি মজার লোককথা প্রচলিত আছে। বহু বছর আগে, একবার এই দ্বীপে প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড় ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্র থেকে সিংহ-মৎস্য আকৃতির এক রহস্যময় জন্তু উঠে আসে। জন্তুটি ঝড়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে আতঙ্কিত অধিবাসীদের রক্ষা করে। সেই থেকেই মারলায়ন সিঙ্গাপুরবাসীর গর্ব ও বীরত্বের প্রতীক।
পার্কে বিদেশি পর্যটকদের মারলায়নের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে দেখা যাচ্ছে। আমরাও অপটু হাতে কিছু ছবি তুললাম। এ সময় চোখ আটকে গেল অপরপাশের ৫৪ তলা ভবনের দিকে। ভবনটি বিভিন্ন রঙের আলোয় ঝলমল করছে। দেখে মনে হয়, পাশাপাশি তিনটি সুউচ্চ ভবনের মাথায় একটি বিশাল আকৃতির নৌকা বসিয়ে রাখা হয়েছে। রাত ৯টার দিকে শুরু হলো লাইট শো। প্রাকৃতিক জলাধার ঘিরে এত সুন্দর একটি বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে, এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না! মুহূর্তের জন্য মনের পর্দায় আমাদের হাতিরঝিলের ছবিটি ভেসে উঠল। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ঢাকার হাতিরঝিলকেও এমন রূপ দেওয়া সম্ভব। যদি তা করা যেত, তবে এটি দেশের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠত। হঠাৎ আশেপাশের মানুষের হৈ-হুল্লোড়ে বাস্তবতায় ফিরে এলাম। রাত ১১টা বাজে। এবার হোটেলে ফিরতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম মেট্রো স্টেশনের দিকে।
প্রথম দিন কনফারেন্স শেষে ঘুরতে গেলাম জুয়েল চাঙ্গি। এটি মূলত চাঙ্গি এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-১–এর ভেতরে অবস্থিত ১৩০ ফুট উঁচু ইনডোর ওয়াটারফল। প্রথম দেখাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। কী এক স্থাপত্যের বিস্ময়! জুয়েল চাঙ্গি ১৩৫,৭০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। ওয়াটারফলের পাশাপাশি এখানে রয়েছে শিসেইডো ফরেস্ট ভ্যালি—পাঁচতলা উচ্চতার ইনডোর গার্ডেন। এছাড়া সর্বোচ্চ তলায় রয়েছে ক্যানোপি পার্ক। এক কথায়, অবসর কাটানোর জন্য এটি এক অনন্য জায়গা। গুগল থেকে জানতে পারলাম, প্রতিদিন প্রায় ৩,০০,০০০ দর্শনার্থী জুয়েল চাঙ্গি দেখতে আসে। আর এটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি! আগেই লাইট শোর সময় জেনে নিয়েছিলাম। শো শেষে চলে গেলাম বাস ধরতে। চমৎকার এই স্থাপত্য দেখতে দেখতে কখন যে তিন ঘণ্টা কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা পেরিয়ে গেল।
পরদিন বিকেলে গেলাম সিঙ্গাপুর ফ্লায়ার দেখতে। হোটেলের সামনেই বাসস্টপ ছিল। সেখান থেকে দোতলা বাসে চড়ে বসলাম। চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল বিকেল। আমরা বসলাম দোতলায়, একদম সামনের সিটে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, সিঙ্গাপুর ফ্লায়ারে উঠব ঠিক সন্ধ্যার আগমুহূর্তে। আগেই শুনেছিলাম, এখানে ক্যাপসুলে চড়ে পুরো সিঙ্গাপুর শহরের একটি প্যানোরামিক ভিউ দেখা যায়। দৃশ্য নাকি সত্যিই অপূর্ব লাগে, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়। একদিকে শহরের হাইরাইজ ভবনগুলোতে জ্বলে ওঠে রঙিন আলো, অন্যদিকে সিঙ্গাপুর প্রণালির বিশালাকার জাহাজগুলো আলোকিত হয়। সন্ধ্যার ঠিক আগে টিকিট কেটে চললাম ক্যাপসুলে উঠতে। প্রবেশ পথে একটি ছোট মিউজিয়াম পেলাম। সেখানে অডিও-ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর শহরের বিবর্তনের ছোটখাটো তথ্য তুলে ধরা হয়েছে—১২০০ সালের আদি সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে বর্তমানের আধুনিক সিঙ্গাপুর পর্যন্ত। আমরাও দেখতে দেখতে ক্যাপসুলের দিকে হাঁটা ধরলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পথিমধ্যে একজন এসে ছবি তোলার প্রস্তাব দিল। জানাল, বারকোড স্ক্যান করে ছবি ডাউনলোড করা যাবে। যদিও পরে বুঝতে পারলাম এটি একটি স্ক্যাম। না বুঝে আমরা রাজি হয়ে গেলাম। ফিরে আসার সময় ৭০ সিঙ্গাপুর ডলার দিয়ে ছবিগুলো কিনতে হলো। তবে স্মারক হিসেবে ছবিগুলো মন্দ ছিল না।
যাহোক, আমরা একটি ক্যাপসুলে চড়ে বসলাম। সপ্তাহের মাঝামাঝি হওয়ায় তেমন ভিড় ছিল না। আমাদের সঙ্গে আরেকটি চাইনিজ পরিবার ছিল। পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে মোটামুটি আধা ঘণ্টা লেগেছিল। কিছুক্ষণ চলার পর স্পিকারে ঘোষণা এল যে আমরা এখন টপ লেভেলে আছি। ১৬৫ মিটার উচ্চতা থেকে চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরো শহরের অপূর্ব এক প্যানোরামিক দৃশ্য। চোখের সামনে আধুনিক নগর স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ! শুধু সিঙ্গাপুরের মনোমুগ্ধকর নগর দৃশ্যই নয়, বরং ইন্দোনেশিয়ার কিছু দ্বীপ এবং মালয়েশিয়ার পাহাড়গুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ঠিক যেমনটি শুনেছিলাম!
একদিন রাতের বেলা ঘুরতে গেলাম আরব স্ট্রিটে। এখানে প্রচুর খাবারের দোকান। যদিও আমাদের উপমহাদেশের লোকজনই বেশি মনে হয়েছে। এখানে দেশি-বিদেশি দুই রকমের লোকজনকেই দেখা গেলো। এই এলাকার ল্যান্ড মার্ক হলো সুলতান মসজিদ। শত বছরের পুরনো। সোনালি গম্ভুজ যেনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে পুরনো মালয় সালতানাতের কথা। সিঙ্গাপুর মুসলিমবান্ধব দেশ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬% ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
চলে আসার আগের রাতে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো। রাতে গেলাম সুইমিংয়ে। অনেকক্ষণ পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করার পর একেবারেই ক্লান্ত। রুমে ফিরে সোজা ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল—ফায়ার অ্যালার্ম বাজছে! দ্রুত হোটেল থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। মুহূর্তেই চোখ থেকে ঘুম উধাও। আমাদের রুম ছিল ১২ তলায়। আয়ানকে কোলে নিয়ে তাড়াহুড়া করে ইমার্জেন্সি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। বাইরে এসে দেখি শতাধিক টুরিস্ট দাঁড়িয়ে, সবার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। প্রায় এক ঘণ্টা পর জানানো হলো, সমস্যার সমাধান হয়েছে। আসলে, কোনো এক ভারতীয় টুরিস্ট ভোররাতে সিগারেট জ্বালিয়েছিল, সেখান থেকেই এই বিপত্তি।
ঘুরাঘুরি আর কনফারেন্স—সব মিলিয়ে পাঁচ দিন চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেল। এবার বিদায়ের পালা। এই কয় দিন সিঙ্গাপুরে ঘুরতে মূলত পাবলিক বাস ও মেট্রোরেল ব্যবহার করেছি। যতটুকু বুঝলাম, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট প্রায় একই মানের, তবে তাইওয়ান আরও শান্ত ও পরিচ্ছন্ন। সিঙ্গাপুরের অনেক গলির রাস্তায় কোনো ট্রাফিক সিগনাল নেই, অথচ তাইওয়ানের গলিতেও সেগুলো দেখা যায়। তা ছাড়া, তাইওয়ানের মানুষ অনেক বেশি শান্ত স্বভাবের ও আন্তরিক। সিঙ্গাপুরে তেমনটা অনুভব করিনি—হয়তো অনেক বিদেশির বসবাসের কারণেই এমন মনে হয়েছে। শহরের ভেতর খোলা জায়গা বা পার্ক তেমন চোখে পড়েনি, অন্যদিকে তাইওয়ানের শহরগুলোতে বাচ্চাদের খেলার জায়গা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। সিঙ্গাপুরের রাস্তায় প্রচুর ভারতীয় ও বাংলাদেশিকে দেখেছি। ভারতীয়দের ছোট-বড় দোকান, শপিং মল থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কাজ করছে, কিন্তু বেশিরভাগ বাংলাদেশিকে দেখেছি রাস্তায়—ক্লিনিং, কনস্ট্রাকশনসহ নানা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেখে মিশ্র অনুভূতি হলো। শিক্ষা যে কীভাবে জীবন ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে, তা আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলাম। তাইওয়ানে আমাদের চারপাশে অনেক ভারতীয় আছে, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষাগত মান ও চাকরির অবস্থান সমান। বিশ্বে কোটি কোটি বাংলাদেশি থাকলেও, যদি সবাই যথাযথ শিক্ষা নিয়ে বিদেশে কাজ করত, তাহলে হয়তো আমাদের দেশের রেমিট্যান্স ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত।
সিঙ্গাপুর ভ্রমণ শেষে তাইওয়ানে এসে পৌঁছালাম রাত আটটায়। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই ঠান্ডার ঝাপটা অনুভব করলাম, যেন শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত ১২টা বেজে গেল। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। আমাদের বাসাটি পাহাড়ের একটু ওপরে, জানালা দিয়ে পুরো জুনান শহর দেখা যায়। শহরটি সাগরের পাশে হওয়ায় বাতাস সব সময়ই তুলনামূলক একটু বেশি বয়। আজও তেমনই হচ্ছে। কাচের জানালায় ধাক্কা দেওয়া বাতাসের অস্তিত্ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এই পরিবেশে মন্দ লাগছিল না। কয়েকদিনের কাটানো সময়গুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারলাম না।
লেখক: বদরুজ্জামান খোকন; পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার, ভাইরাল ভ্যাক্সিন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ন্যাশনাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান