বিয়োগব্যথার ভৈরবী
গতকাল ভোরে মাইনাস এক ডিগ্রির তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে, আলো–আঁধারের লুকোচুরিতে ভেজা নরম ভোরের মধ্যে জানালা খুলে উবারে উঠলাম। গাড়িতে ঢুকতেই হিটিংয়ের উষ্ণতা যেন শরীর–মনজুড়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল। চালক ভদ্রলোক সেই উষ্ণতার সঙ্গেই আমাকে মিশিয়ে দিলেন—একটি স্মিত হাসিতে, স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘আমি অনুমান করতে পারি—আপনি লন্ডনে যাচ্ছেন।’
হঠাৎ বিস্ময়ে ভ্রু তুলতেই তিনি বললেন, ‘ভোরের পথিকদের পথ সাধারণত লন্ডনের দিকেই যায়।’ আমি বললাম, ‘ঠিকই ধরেছেন, ফ্রান্সের ভিসা জমা দিতে যাচ্ছি।’
তারপর প্রশ্ন–উপপ্রশ্নের মতো আমাদের কথাবার্তা প্রবাহিত হতে লাগল।
‘আপনি কি ছাত্র?’
‘হ্যাঁ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে পিএইচডি করছি।’
‘নিজের টাকায়?’
আমি জানালাম, ‘না, ফুল ফান্ড পেয়েছি।’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এই কথা শোনামাত্র তিনি যেন একটু রসিকতাভরা বিস্ময় নিয়ে বললেন, ‘তাহলে তো আপনি বেশ বুদ্ধিমান! ব্রিটিশরা যেখানে পয়সা খরচ করতে চায় না, সেখানে আপনি তাদের টাকায় পড়াশোনা করছেন, আবার লিভিং অ্যালাউন্সও পাচ্ছেন!’
আমি নরম হাসিতে বললাম, ‘বুদ্ধিমান না, তবে চেষ্টা করেছি। সৃষ্টিকর্তা হয়তো দরজা খুলে দিয়েছেন।’
এরপর তিনি বললেন, ‘যদি অনুমতি দেন, আপনাকে একটা পরামর্শ দেব।’
আমি বললাম,
‘নিশ্চিন্তে বলুন।’
তখনই তিনি আস্তে আস্তে নিজের জীবনের দরজা খুলে দিলেন—
এক দীর্ঘশ্বাসমাখা দরজা।
‘আমি ইয়েমেন থেকে পড়তে এসেছিলাম। সেই আগমন আজ ৩৩ বছরের ইতিহাস। তখন মনে হয়েছিল—এ শহরই আমার ভবিষ্যৎ, এ দেশই আমার বর্ণিল জীবনের প্রতিশ্রুতি।’ তিনি একটু থেমে গাড়ির জানলার দিকে তাকালেন। যেন জানলার ওপারের দিগন্তে তার অতীত ছায়া হাতে ডাকছে।
‘কিন্তু আজ মনে হয়—এখানে থেকে যাওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি মা–বাবার সেবা করতে পারিনি, তাদের শেষনিশ্বাসের সময় কাছে থাকতে পারিনি। এই অনুতাপ প্রতিদিন আমাকে ভেতর থেকে ক্ষয়ে ফেলে।
দেশে ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব—সবাই আছে, কিন্তু কত বছর হলো তাদের দেখি না!
এখানে একদিন করে আমার নির্জনতা লম্বা হয়, দীর্ঘ হয়, ভারী হয়।
তিনি আরও বললেন, ‘এখানে ছেলেমেয়েরা নিজের মতো থাকে। স্বাধীনতা তাদের জন্মগত অধিকার। আমি যখন আমার মা–বাবাকে ছেড়ে এসেছিলাম, তখন ভাবিনি—একদিন আমার সন্তানরাও আমাকে ছেড়ে যাবে। কিন্তু এটাই তো জীবনের অবধারিত বৃত্ত। আজ আমি সত্যিই একা।’
তার কণ্ঠে নির্জনতার সুর বাজছিল।
‘জানো,’ তিনি বললেন,
‘যৌবনে নাইট ক্লাবে যেতাম, নাচগান করতাম। তখন মনে হতো জীবন রঙের ঝরনাধারা।
আজ মনে হয়—সে রংগুলো শুকিয়ে গেছে। আমার দিনগুলো রংহীন, প্রান্তরের শুকনা ঘাসের মতো।’
আমি নীরবে শুনছিলাম—মানুষের গল্প কখনো কখনো সংগীতের মতো, তাতে লুকিয়ে থাকে এক অদেখা ছন্দ।
গাড়ি আমাদের গন্তব্যের কাছে এলে তিনি বললেন, ‘শোনো, পিএইচডি শেষ করে তোমার দেশে ফিরে যেও। নিজের মা–বাবাকে সেবা করো, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া–প্রতিবেশী—তাদের সঙ্গে থাকো। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন আফসোস নিয়ে চোখ বন্ধ করতে না হয়।’
আমরা বাস স্টেশনে পৌঁছে গেছি।
তিনি ক্ষমার সুরে বললেন,
‘অনেক কথা বলে ফেললাম, কিছু মনে কোরো না।’
আমি বললাম,
‘মনে করার কী আছে? বরং মনে হচ্ছে—যদি বাস স্টেশনটা আর একটু দূরে হতো, তাহলে আপনার গল্প আরও কিছুক্ষণ শোনার সৌভাগ্য হতো। কারণ আমরা মানুষের মুখ দেখি, পরিচয় দেখি—কিন্তু মানুষ যে কত গল্প বয়ে বেড়ায়, তার ভেতরের রং আমরা কত কম দেখি!’
আমার কথা শুনে তিনি যেই স্নিগ্ধ হাসিটা হাসলেন—তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ এক জীবন,
বুকের ভাঁজে জমে থাকা হারানোর আর ফিরে–না–পাওয়ার ব্যথা, এবং নিঃশব্দে বাজতে থাকা বিয়োগ–ব্যথার ভৈরবী।
*লেখক: সুব্রত মল্লিক, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার, পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য।