বিহ্বল সময়: পর্ব–৫

মেক্সিকো সাগরপাড়ে এয়ারবিএনবির বারান্দা থেকে। ছবিটি ভোরের দিকে তোলাছবি: লেখকের পাঠানো

টেবিলের পাশে যে দুটো চেয়ার রাখা থাকে সেখানে বসে ছিল বার্বাডোস থেকে দেড় মাস হলো আসা বাখারী। সিঙ্গেল মা সঙ্গে তিন সন্তান—এর ভেতরেই দরজা খুলে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশি নারী আয়শা—পুরো নাম আয়শা মুহাম্মদ (সাউথ সুদানের স্বামী মুহাম্মদের শেষ নাম লাগানো)। টেবিলে রাখা ডাউস ডেস্কটপে চোখ রেখেই বলি, আয়শা আপা পাশের চেয়ারে বসেন, সময় লাগবে। আয়শার মাথা হিজাবের মতো করে ঢাকা, কথা না বলে বসে পড়ে আপা। ঘড়িতে তখন সকাল দশটা বিশ, সোমবারের একটা সপ্তাহ শুরু হয়েছে।

বাখারী বেরিয়ে গেলে আয়শার দিকে না তাকিয়েই। বলি, ‘কী বলব বলেন, সেই সকাল সাড়ে আটটা থেকে বাথরুমে যেতে চাচ্ছি, কিন্তু টেবিল থেকে নড়তে পারছি না।’

এই বলে আয়শার মুখের দিকে তাকানোর আগেই বলতে থাকে, ‘আপা কতদিন এই রকম হইছে, দেশে গার্মেন্টসে কাজ করার সময় বাথরুমে যাইতাম না আপা, যদি পিশাব লাগে। এর চেয়ে যদি দুইটা কাপড়ে বেশি টান দিতে পারি। তাও তো আপা কতদিন লাইন চিপের (লাইন চিফ) লাত্থি খাইছি, থাবড় (থাপ্পড়) খাইছি, যদি টার্গেটমতো কাপড় দিতে না পারছি তাইলে গালি দিছে সুপারভাইজার, কত বিশ্রী সব গালি। যা মুখে উচ্চারণ করা যায় না।’

এই যে আপনি কইলেন, বাথরুমে যাইতে পারতেছেন না—এই কথাতেই দেশের কথা মনে পইড়া গেল আপা, কি জীবন ফালাইয়া আইছি। আয়শার কথা আর থামে না, ততক্ষণে আপার দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসেছি—কাজের কথা মাথায় নেই, বাথরুমের কথাও মনে নেই, দশ হাত দূরে বসে হাউজিং কাউন্সিলর আরও একজনকে সার্ভ করছে, সেটাও মাথায় নেই। আমি আপাকে বলি—কী বলতেছেন আপা? এসব সত্য ঘটনা? (মনে মনে গার্মেন্টসের চেহারা ভাসানোর চেষ্টা করি, না আমি কোনোদিন বাংলাদেশে গার্মেন্টসের ভেতরে ঢুকিনি, কী পরিবেশ, সেটাও চামড়ার চোখে দেখিনি) খুব উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করি—কী বলেন আপা? একটু বুঝায়ে বলেন—কাজের জায়গায় লাত্থি মারবে কেন?

ওই তো—লেবাননে মাইনসের বাড়িতে কাম করতাম আপা—হ্যাগো বাসায় টানা তিন বছর থাকছি, বাসা থাইকা বাইর হইতে দিত না। সেই বাড়ির মালিক, তার মায়েরে দেখাশোনা, গোসল করানো, সব ঘরের কাম সব করতাম আপা, কিন্তু এক মিনিট চোখের আড়াল করত না, কড়া পাহারায় রাখত। কারও লগে কথা কই নাকি, অন্য কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করন যাইব না—আপা এসব কথা বলতে গেলে আপনার অফিস করা লাগত না।

আপার মুখের ছিপি পুরোপুরি খুলে গেছে। তাঁর এখন হিতাহিত জ্ঞান নেই। বলতে থাকেন, ‘ক্যারে আপা, মারব না ক্যান—ধরেন ১০০ কাপড়ের টার্গেট দিছে, কিন্তু কাপড় মেশিন থন বাইর হইছে আশিডা, এখন এই যে বিশডা যে কম থাকল, এর জন্য লাইন চিফের ওপরে আরও ওপর থাইকা চাপ আসে, সেই চাপ শেষে আমাগো ওপরে আইসা পড়ে।’ কত অপমান, কত অত্যাচার পার হইয়া যে মাসে ৪ হাজার টাকা পাইতাম আপা, সেই কথা কি বলতে পারমু পুরাডা?

আরও পড়ুন

সেই দুঃখেই তো দেশ থাইকা লেবাননে পালাইয়া গেছিলাম আপা । আপনি বিশ্বাস করবেন, যেদিন আমি দেশ ছাইড়া আসি সেদিন রাত ১১টায় গার্মেন্টস থাইকা বাইর হইয়া দেখি নিচে দালাল দাঁড়ানো। কয়, ‘তোর ফ্লাইট রাত বারোটায়, আমার লগে এখনই এয়ারপোর্টে যাওন লাগব’—আমরা একসঙ্গে পাঁচজন মাইয়া—২০১০ সালে ২৫ হাজার টাকা দিয়া দালাল ধরছিলাম। এরপর বাকি ৩৫ হাজার টাকা লেবানন থাইকা শোধ করছি আপা, মোট ৬০ হাজার টাকা। এরপর সেই দিন ওই গার্মেন্টস থাইকা সরাসরি দালাল আমাগো প্লেনে উডায়ে দিছে, ‘আমার চার বছরের বাচ্চা মায়ের কাছে ছিল আপা, আজকে ১৩ বছর মাইয়া, বাপ, মা কাউরে দেখি নাই আপা’—আয়শার দুই চোখে তখন সাগরের নোনা জল।

এরপর আপা? লেবাননে কী করলেন? ক্যামনে থাকলেন?

ওই তো—লেবাননে মাইনসের বাড়িতে কাম করতাম আপা—হ্যাগো বাসায় টানা তিন বছর থাকছি, বাসা থাইকা বাইর হইতে দিত না। সেই বাড়ির মালিক, তার মায়েরে দেখাশোনা, গোসল করানো, সব ঘরের কাম সব করতাম আপা, কিন্তু এক মিনিট চোখের আড়াল করত না, কড়া পাহারায় রাখত। কারও লগে কথা কই নাকি, অন্য কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করন যাইব না—আপা এসব কথা বলতে গেলে আপনার অফিস করা লাগত না।

আরও পড়ুন
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সেই আয়শা কোন পথে কানাডায় পিআর নিয়ে এসে পৌঁছাল? কী করে এই টেবিল অবধি এল? নাম সাইন করতে পারে না, কিন্তু আগামী এক বছরে আয়শার হাতে কানাডিয়ান পাসপোর্ট থাকবে—এই সত্য কি আমার জানা ছিল? না ছিল না।

আয়শার কথা কি পরের পর্ব অবধা টানব? প্রচুর বলার আছে আয়শাকে নিয়ে—২০২২ সালের মে মাসের ১৭ তারিখে আয়শা এসেছে শেল্টারে, মাত্র দেড় পাতার চিঠিতে কী করে লিখি? আজ এইটুকুই থাকুক।

সহসাই আবার ফেরার ইচ্ছা থাকল।

ওহ হ্যাঁ, কাল আবার আয়শার সঙ্গে মিটিং আছে। চলবে...

*লেখক: লুনা শিরীন, টরন্টো, কানাডা

আরও পড়ুন