উত্তরে থাকি, দক্ষিণে যাই—শেষ পর্ব
১.
এবার আর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল না। সেরীন টার্নস্টাইলে অমনি কার্ড পাঞ্চ করতেই আমি ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। কিন্তু বিপত্তি ঘটল সেরীনের বেলায়। কার্ড পাঞ্চ করলেও দরজা খুলল না। এবার সমস্যা কোথায়?
আমি চলে এসেছি টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশনের ভেতরে, সেরীন দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। মাঝখানে টিকিট পাঞ্চ করার টার্নস্টাইলগুলো। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে সেরীন আবার পাঞ্চ করে কার্ডটা। ‘কার্ডে তো পয়সা নাই!’ টার্নস্টাইলের অপর প্রান্ত থেকে সেরীন জানান দেয়।
ওহ্! মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে যাওয়ার সময় সাবওয়েতে উঠতে গিয়ে বারবার পাঞ্চ করে সব ডলার খুইয়ে ফেলেছিলাম। পাশেই প্রয়োজনীয় ডলার লোড করার মেশিন আছে। কী আর করা! সেরীন মেশিনে গিয়ে ডলার লোড করে ভেতরে এল।
স্টেশনটার ভেতর দাঁড়িয়ে চোখ কপালে ওঠার দশা। এত বড় একটা সাবওয়ে স্টেশন হতে পারে! আমাদের চারপাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে মানুষ ছুটে যাচ্ছে। যেন সবাই দৌড়াচ্ছে, ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, দৌড় না দিলে এক্ষুনি ছেড়ে যাবে।
আমরা শান্তভাবে সাইনগুলো দেখতে থাকি। জ্যাকসনহাইটসে কোন ট্রেন যাবে, তার নিশ্চয়ই কোনো নির্দেশিকা থাকবে। না হলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেব।
২.
আমরা এসে ঢুকেছি টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশনে। নিউইয়র্ক সিটির ব্যস্ততম এবং প্রধান সাবওয়ে কমপ্লেক্স এই টাইমস স্কয়ার-৪২ স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশন। ম্যানহাটানের কেন্দ্রস্থলে এর অবস্থান। এখান থেকে খুব সহজে পুরো শহরে যাতায়াত করা যায় এবং এটি গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল ও পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত। এই স্টেশন ২৪/৭ খোলা থাকে এবং পর্যটকদের জন্য মিডটাউন ম্যানহাটানের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।
আমরা তো ই–ট্রেন ধরব। সাইনবোর্ডে দেখো ‘ই–ট্রেন’ কোন প্ল্যাটফর্মে আসবে?
গত কয়েক দিন আমরা মূলত ই–ট্রেনেই চলাচল করেছি। সেটি মাথায় রেখেই সম্ভবত সেরীন ‘ই–ট্রেনে’র কথা বলে। কিন্তু পথ ভুল করে সময় খোয়াতে চাই না বলে রিস্ক নিতেও ইচ্ছা করল না। সবাই এত দ্রুত ছুটছে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। সত্যি বলতে কি, কাউকে থামিয়ে দিয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করার চেয়ে মানুষের এই ছুটে চলা, ব্যস্ততা দেখতেই ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল এক পাশে আয়েশ করে বসে মানুষের এই ত্রস্তব্যস্ত ছুটে চলা, হন্তদন্ত পা ফেলার দৃশ্যটা সম্ভবত সারা দিন ধরে দেখলেও বিরক্তি আসবে না। কিন্তু তার তো উপায় নেই!
একজন ভদ্রমহিলাকে তাঁর চলার গতি অনেকটা থামিয়ে দিয়েই জানতে চাইলাম, জ্যাকসন হাইটসের ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে পাব। তিনি হাঁটার গতি খানিকটা কমিয়ে কিন্তু হাঁটতে হাঁটতেই সেলফোনে গুগল করতে লাগলেন। ‘ই–ট্রেন’ ধরতে পারো—বলেই ছুটে গেলেন। আমরা আবার ই–ট্রেনের প্ল্যাটফর্ম খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
ই–ট্রেনের প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে গিয়ে আসলে চোখ আটকে গেল অন্য জায়গায়। সাবওয়ে স্টেশনটাও দেখি আর্ট গ্যালারি হয়ে আছে! টরন্টোর ‘মিউজিয়াম সাবওয়ে স্টেশনের’ ভেতরে ঢুকলেও মনে হবে কোনো একটা আর্ট গ্যালারিতে ঢুকে পড়েছি। স্টেশনের ভেতরে প্ল্যাটফর্মের দেয়ালে দেয়ালে নানা রকম চিত্রকর্ম আঁকা। আপনি ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন, আপনার সামনে, পেছনের দেয়ালে, মাঝখানের পিলারে—সর্বত্র কেবল চিত্রকর্ম আর চিত্রকর্ম।
টরন্টোর ডাউন টাউনের মিউজিয়াম স্টেশনটির ঠিক বাইরেই ‘রয়্যাল অন্টারিও মিউজিয়াম’—রম নামেই যাকে সবাই চেনে। কানাডার সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের খ্যাতনামা মিউজিয়াম এই রম। ‘আর্ট গ্যালারি অব অন্টারিও’ তেমন একটা দূরে নয় এই স্টেশন থেকে। সম্ভবত সেই কারণেই মিউজিয়াম স্টেশনটিকে আক্ষরিক অর্থেই মিউজিয়াম বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশনেও এই রকম শিল্পকর্ম কেন? টাইম স্কয়ারের দর্শনার্থীদের যাতে ফেরার সময়টায়ও শিল্পের ছোঁয়া লেগে থাকে, সেই রকম কারণ কি! কে জানে? টরন্টোর মিউজিয়াম স্টেশনে কেবল চিত্রকর্ম আছে, আর এইখানে টাইম স্কয়ার স্টেশনে আছে অনেকগুলো স্থায়ী শিল্পকর্ম বা আর্ট ওয়ার্ক।
এই শিল্পকর্মগুলো ব্যস্ত এই স্টেশনটিকে একটি ভূগর্ভস্থ গ্যালারিতে পরিণত করেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে ব্যস্ততার মধ্যেও খানিকটা শিল্পের ছোঁয়া দিতে এই আয়োজন মুগ্ধ করল খুবই।
স্টেশনটার ভেতর দাঁড়িয়ে চোখ কপালে ওঠার দশা। এত বড় একটা সাবওয়ে স্টেশন হতে পারে! আমাদের চারপাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে মানুষ ছুটে যাচ্ছে। যেন সবাই দৌড়াচ্ছে, ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, দৌড় না দিলে এক্ষুনি ছেড়ে যাবে। আমরা শান্তভাবে সাইনগুলো দেখতে থাকি। জ্যাকসন হাইটসে কোন ট্রেন যাবে, তার নিশ্চয়ই কোনো নির্দেশিকা থাকবে। না হলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেব।
-কী! আর্ট দেখলে হবে? ট্রেন খুঁজতে হবে না!- সেরীনের তাড়া খেয়ে আবার ছুটতে থাকি। এবার একজনকে পেয়ে যাই, যিনি খানিকটা ধীরেসুস্থে হাঁটছেন।
-জ্যাকসন হাইটসে যাওয়ার ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে পাব?
–প্রশ্ন শুনে তিনি তাঁর ধীর লয়ে হাঁটার গতি আরও খানিকটা কমিয়ে দিলেন। আমাদের দুজনের আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন।
-‘আমার সঙ্গে আসেন। ৭ নম্বর টেন ধরবেন।
–হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলেন।
-আপনি জ্যাকসন হাইটসে যাবেন? প্রশ্ন করি।
-না, তবে এই ট্রেনেই যাব। পথে নেমে পড়ব।
এবার বেশ স্বস্তি নিয়ে তাঁর সঙ্গে হাঁটতে থাকি। লোকটার মধ্যে বাড়তি কোনো কৌতূহল নেই। আপন মনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। আবার ট্রেনে এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই তাতে উঠে পড়েন। পেছন ফিরে নিশ্চিত হয়ে নিলেন, আমরা উঠেছি কি না।
ট্রেনে যেতে যেতে জানা গেল, তিনি বাংলাদেশি, নিউইয়র্কে আছেন বছর তিনেক ধরে। স্বল্পভাষী মানুষটার সঙ্গে খুব বেশি আলাপ এগুলো না। তাঁকে অনেকবার ধন্যবাদ জানালাম সহযোগিতার জন্য। মাঝপথে তিনি নেমে গেলেন। আমরা ৭ নম্বরে ট্রেনে বসে থাকলাম জ্যাকসন হাইটসে যাওয়ার জন্য।
৩.
এর মধ্যে আনোয়ার শাহাদাত বেশ কয়েকবারই ফোন করেছেন। তিনি জ্যাকসন হাইটসে চলে এসেছেন, ট্রেন থেকে নেমে ফোন করলেই তিনি এসে উঠিয়ে নেবেন।
আনোয়ার শাহাদাতের সঙ্গে আমার দেখা হবে বলতে গেলে ৩৫–৩৬ বছর। সর্বশেষ দেখা হয়েছিল মতিঝিলের রাস্তায়। আমি তখন মফস্সল (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তো মফস্সলই, নাকি!) থেকে ঢাকায় আসা নতুন রিপোর্টার। সাপ্তাহিক সুগন্ধায় কাজ করি। আনোয়ার শাহাদাত তখন সাংবাদিক হিসেবে আলোচিত। দীর্ঘদেহি, ফর্সা ঝকঝকে তরুণ। সাঁই সাঁই করে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ান। একদিন মতিঝিলের রাস্তায় মোটরসাইকেল থামিয়ে বাস, রিকশা না পেয়ে হাঁটতে থাকা তরুণ এই রিপোর্টারকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তারপর আর তাঁর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে বলে মনে পড়ে না। কোনো একসময় তিনি আমেরিকায় বসতি গেড়েছেন, সেই তথ্য জানা ছিল, এ পর্যন্তই।
অনেক বছর পর ফেসবুকের সুবাদে তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। রাজনীতি, সাহিত্য নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলাপচারিতা চলে টেলিফোনে। তাঁর প্রতি আমার বরাবরের অনুযোগ শক্তিশালী গল্পকার আনোয়ার শাহাদাত তাঁর পাঠকদের বঞ্চিত করছেন। তাঁর আরও বেশি বেশি লেখা উচিত। এই অনুযোগ জানিয়ে তাঁর কোনো এক জন্মদিনে আমি ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছিলাম।
নিউইয়র্কে আনোয়ার শাহাদাত সাংবাদিকতার চেয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। উচ্চতর ডিগ্রিও নেন। কিন্তু আমি আসলে খুঁজতাম সাংবাদিক কিংবা চলচ্চিত্রকার আনোয়ার শাহাদাত নয়, গল্পকার-উপন্যাসিক আনোয়ার শাহাদাতকে। একদিন গল্প লেখা এবং প্রকাশ নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে দেখা গেল, দেশ ছেড়ে নিউইয়র্কে বসতি গড়ার পর তিনি যতগুলো গল্প লিখেছেন, প্রায় সব কটিই প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায়।
বছর কয়েক আগে তিনি টরন্টোয় এসেছিলেন। সেই সময়টায় আমি ফ্লুতে আক্রান্ত। কোভিড–পরবর্তী সময়ে ফ্লু নিয়ে একজন পর্যটকের সঙ্গে দেখা করার ঝুঁকিটা আমি নিতে চাইনি। এর ফলে টরন্টোয় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। নিউইয়র্কে এসে তাঁকে না দেখে তো আর ফিরে যাওয়া যায় না।
৪.
জ্যাকসন হাইটস থেকে গাড়িতে উঠিয়ে নিউইয়র্কের সন্ধ্যেবেলার ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে আনোয়ার শাহাদাত ছুটতে লাগলেন। ৩০–৩৫ বছর পর দেখা হওয়ার আলাদা কোনো অনুভূতি হলো না কেন? মনে হলো, প্রতিদিনই আমাদের দেখা হয়, আজও হচ্ছে। ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ কি তাহলে বাস্তবিক যোগাযোগের অভাবটা কোনো না কোনোভাবে পূরণ করে ফেলে!
-শোনেন, আমরা একটা রাইড দেব। জানি, নিউইয়র্ক শহর আপনারা দেখে ফেলেছেন, তবু একটু দূর থেকে রাতের নিউইয়র্ক শহর, ডাউনটাউনের আলাদা যে একটা রূপ তৈরি হয়, সেটা আপনাদের দেখতে হবে তো!
–গাড়ি চালাতে চালাতে পরিকল্পনার কথা জানালেন আনোয়ার শাহাদাত।
-কস্কিউসকো ব্রিজ থেকে ডাউনটাউন ম্যানহাটান দেখার অভিজ্ঞতাটা আপনারা কিছুতেই ভুলতে পারবেন না। তিনি বলতে থাকেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমি ও সেরীন—দুজনেই আসলে আনোয়ার শাহাদাতের সঙ্গটাই চেয়েছি, তাঁর সঙ্গে গল্প করতে চেয়েছি। সেটি কোনো রেস্তোরাঁয় বসে হোক আর নিউইয়র্কের ব্যস্ততম রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের ফাঁকফোকর দিয়ে গাড়িতে চলতে চলতেই হোক।
জ্যাকসন হাইটস থেকে বেড়িয়ে কুইন্স ব্রুকলিন এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুটতে থাকলেন তিনি। গাড়ি চলতে চলতে আমরা আলাপে ডুবে যাই। বাংলাদেশের রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের আলোচিত নানা লেখক আর বইয়ের কথা। সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের রাস্তায় জ্যাম আরও বেড়ে যায়। আমাদের তাতে সমস্যা হয় না। আমরা তুমুল আড্ডায় মেতে থাকি।
কস্কিউসকো ব্রিজে উঠে গাড়ির গতি আরও কমিয়ে দেন তিনি। আলোঝলমল ব্রুকলিন শহরটাকে যেন অন্য রকম লাগছে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রাখার জো নেই। আমরা এগোতে থাকি, আর দূর থেকে নিউইয়র্ক শহরের সৌন্দর্য পান করতে থাকি। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে এক্সিট নিয়ে আবার একই পথে ফিরে আসা। ফিরতি পথে ব্রুকলিন আর ঐতিহাসিক ফ্রিডম টাওয়ারের দৃশ্যটা যেন চোখধাঁধিয়ে দেয়। ভিন্ন রকম এক মুগ্ধতার স্মৃতি নিয়ে আমরা আবার শহরের সাধারণ রাস্তায় ঢুকে যাই। আনোয়ার শাহাদাত তো আমাদের না খাইয়ে ছাড়বেন না। এবারের গন্তব্য এস্টোরিয়ার ‘আলাউদ্দিন সুইট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’
৫.
এয়ার কানাডা নোটিফাই করল—ফ্লাইট ডিলে। সন্ধ্যা পৌনে আটটায় নির্ধারিত টাইম ছিল লাগোর্ডিয়া থেকে ফ্লাইট ছাড়ার। আপাতত দুই ঘণ্টা পিছিয়ে গেল। এই টাইমেও যাবে কি না, সন্দেহ আছে। বেশ কিছুদিন ধরেই আমেরিকান এয়ারলাইনসগুলো সময়সীমা ঠিক রাখতে পারছে না। কেবল এয়ারলাইনসই নয়, পুরো আমেরিকাতেই একধরনের অস্থিরতা চলছে। বাজেট নিয়ে অচলাবস্থার কারণে পুরো সরকারই অচল হয়ে পড়েছে। কর্মিসংকটে হাজার ফ্লাইট বিলম্বে ছাড়ছে, বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কী যে একটা অবস্থা! অক্টোবরের শুরু থেকেই এ অবস্থা শুরু হয়েছে। নভেম্বরে এসে পড়েছে। এখনো কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
আমাদের এবার টরন্টোয় ফিরে যাওয়ার পালা। গোলাপ এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবে। তাকে অবশ্য বারণ করেছিলাম, আরও এক দিনের ছুটি নেওয়ার দরকার কী! আগের দিন আনোয়ার শাহাদাতও বলেছিলেন, তিনি এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবেন। আমরা বলেছি, নিজেরাই এয়ারপোর্টে চলে যাব। কিন্তু গোলাপ তো আর কথা শোনার বান্দা নয়!
শেষ দিনে কোনো একটা শপিং মলে যেতে চেয়েছিল সেরীন। নঈম ভাই ( নঈম নিজাম) প্ল্যানও বাতলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু শংকর ফোন করলো, সে আসছে। নিউইয়র্কে এসে শংকরের সঙ্গে দেখা না করে ফিরে যাওয়া যায় না। শংকর জানাল, সে খানিকটা দূরে থাকে এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আসছে, কাজেই হয়তো খানিকটা সময় লেগে যাবে। শংকরের সঙ্গে দেখা হলে আমারও ভালো লাগবে। আমরা দুজনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের গ্র্যাজুয়েট। শংকরও ঢাকায় সাংবাদিকতা করত। ডেইলি স্টার, পরে মর্নিং সান। একসময় লন্ডনে চলে যায়। এখন নিউইয়র্কে বসবাস। আমি শংকরের অপেক্ষায় থাকি।
এর মধ্যে ফোন বাজে। ‘সাগর ভাই, নিচে নামেন।’
-রায়পুরার মেয়ে তাপসী সরকার। স্বামী–কন্যাদের নিয়ে বাসার সামনে নিচে অপেক্ষায়। তাপসীর সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে ৩০ বছরের বেশি সময় পর। মফস্সল শহরের যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাপসীরা ছিল অপরিহার্য শিল্পী। নিউইয়র্কে আসার পর কয়েকবারই ফোন করেছে তাপসী, কিন্তু তার বাড়িতে যাওয়ার সময় বের করা যাচ্ছিল না।
আমিনুজ্জামান বুলবুল, আমাদের ছোটোবেলার বন্ধু, রায়পুরায় কত সময় আমাদের একসঙ্গে কেটেছে। সে আসছে দেখা করতে। নিউইয়র্কে এসে কোথায় থাকব, তা নিয়ে বুলবুল অস্থির হয়ে পড়েছিল। নিউইয়র্কে তাঁর স্ত্রী–কন্যারা থাকলেও সে নিজে থাকে কানাডা সীমান্তবর্তী বাফেলোর কাছে একটা জায়গায়। ওখানে তাঁর চাকরি। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়িতে থাকতে পাছে সংকোচ বোধ করি, সে জন্য ছোট ভাই কল্লোলের বাসা ঠিক করে ফেলেছে আমাদের থাকার জন্য। ফরিদা (ফরিদা আকতার) সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত দেন, আমি ফরিদা আপার বাসায় থাকছি।
শেষ দিনে আড্ডাটা নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে ফেলে আমাদের। কত বছর পর প্রিয় কতোগুলো মানুষের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তা–ও ক্ষণিক সময়ের জন্য, একেবারে শেষ বেলা। সত্যি বলতে কি, আমাদের সিদ্ধান্তই ছিল আমেরিকায় আমরা কেবল ঘুরে বেড়াব, দাওয়াত খেয়ে সময় পার করে দেব না। তবু শান্তির সঙ্গে দেখা করতে তার বাসায় যেতে হয়েছে। খালেদা ইয়াসমিন শান্তি আমার সেই ছোটবেলার বন্ধু, হাতিরদিয়া স্কুলের সহপাঠী। তার সঙ্গেও সর্বশেষ দেখা হয়েছে ২০–২৫ বছরের কম নয়। শান্তির বাসায় সুস্বাদু সব খাবার আর তার সঙ্গে আড্ডাটা আমার জন্য মূল্যবান এক স্মৃতি। আর আজ আড্ডা হচ্ছে ফরিদা আপা-নঈম ভাইদের বাসায়। বিদায়ী আড্ডা! আড্ডায় আড্ডায় প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্যে কখন যে সময় উড়ে যায়। গোলাপের ফোন আসে, ‘রেডি হয়ে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেব।’ আশ্চর্য! ফ্লাইট ছাড়ার দুই ঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়া সময়টাও প্রায় শেষ হয়ে আসছে!
৬.
গোলাপ চলে এসেছে আমাদের এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিতে। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফারজানা ইয়াসমিন। চমৎকার একটা মেয়ে ফারজানা। লাগোয়ার্ডিয়া এয়ারপোর্টে ডেলটা এয়ারলাইনসে চাকরি করেন। কী যে অতিথিপরায়ন, আর চমৎকার রান্না! নরসিংদীর পিঠা থেকে শুরু করে নানা রকমের খাবার যত্ন করে রান্না করে খাইয়েছে ফারজানা। এবার বিদায় জানাতে গোলাপের সঙ্গে চলে এসেছে।
ফরিদা আপা–নঈম ভাইকে বিদায় জানাতে কষ্ট হচ্ছিল। কী অসাধারণ আন্তরিকতা দুজনেরই। আরেকটা কথা, নিজের বাড়িতেও এতটা স্বাধীনতা পাওয়া যায় না, যেটা তাঁরা দুজন এক দিন আমাদের দিয়ে রেখেছেন।
লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে নামতেই ফারজানার কয়েকজন সহকর্মী এগিয়ে আসেন। তাঁরা এই বিমানবন্দরেই কাজ করেন। ভেতরে ঢুকে যাওয়ার আগে আমরা খানিকটা দাঁড়াই। গোলাপ, তাঁর স্ত্রী ফারজানা, আমরা। এই মুহূর্তটা যে কত কষ্টের!
ফারজানার ভিনদেশি সহকর্মী তাড়া দেন। তাঁর ট্রলিতে আমাদের ছোট্ট ব্যাগ। তিনি আমাদের একেবারে ফ্লাইটে ওঠার অপেক্ষমাণ জায়গাটা পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। তাঁকে অনুসরণ করে আমরা হাঁটতে থাকি। একজন পাসপোর্ট স্ক্যান করে ব্যাগটা সিকিউরিটি চেকের ভেতরে দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে বলেন। পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলেন, লোকজন নেই, কিসের সিকিউরিটি চেকআপ। এয়ার কানাডার ফ্লাইটের অপেক্ষার এলাকাটায় আমাদের পৌঁছে দিয়ে ফারজানার সহকর্মী চলে যান। আমি আর সেরীন সেখানে অপেক্ষায় থাকি। নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগেই আমরা চলে এসেছি। বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে।
৭.
সেরীন আর আমি বসে আছি। এখনো এয়ার কানাডার টরন্টোগামী যাত্রীরা আসতে শুরু করেনি। কাচের দেয়ালের ফাঁক গলিয়ে লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দরের ভেতর দিয়ে নিউইয়র্কের আকাশটায় ইতিউতি চোখ ঘোরাতে থাকি। টের পাই, সেরীনের চোখও নিউইয়র্কের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে, জানি না। হঠাৎ একসঙ্গেই দুজনে চোখ ঘুরাই। পরস্পরের চোখে চোখ আটকে থাকে। ‘আমরা ফিরে যাচ্ছি!’- প্রায় একসঙ্গেই শব্দ করে বলে উঠি দুজন। (শেষ)