মক্কা মদিনার ডায়েরি-৫

মক্কার কবুতর চত্বরছবি: লেখকের পাঠানো

১৫. মক্কার দিনলিপি: মসজিদুল হারামে প্রবেশ ও ওমরা পালন

হোটেল থেকে হেঁটে মসজিদুল হারামের সীমানায় পৌঁছাতে আমাদের সাত–আট মিনিট সময় লাগল, সবাই এশার নামাজ শেষে ৭৯ নম্বর গেট দিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলাম। ছোট শিশুর বিস্ময় যেন ভর করেছে আমার মনে, কেবল আত্মবিস্মৃত আচ্ছন্ন হয়ে এগিয়ে চলেছি। আমাদের অনুভূতিময় জীবনে কিছু দৃশ্য, ভাব আর কল্পনা যখন বাস্তবে সামনে আসে আমরা স্পন্দিত হই, অনুরণিত হই, হই মর্মরিত আর রোমাঞ্চিত। আমরা মহান আল্লাহ তাআলার নিকট নিজেকে নিঃসঙ্কোচে সমর্পণে প্রস্তুত। সবাই দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করলাম, এই নিয়ামতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম, আল্লাহকে শুকরিয়া জানালাম। আর কিছু দূর এগোতেই চোখের পর্দায় ভেসে উঠল কাবা, মুহূর্তে যেন মিটল চোখের চিরকালের তৃষ্ণা। আমরা সমস্বরে বললাম, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আমরা দোয়া পড়লাম, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালাম।

দাঁড়িয়ে আছে কাবা-শান্ত, পবিত্র, অবিনশ্বর। ঢেউ উঠেছে আমাদের মনে, আমরা আল্লাহর ঘরের একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে। হাজরে আসওয়াদকে ইশারায় চুমু দিয়ে আমরা ওমরার তাওয়াফ শুরু করলাম। সাত তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইব্রাহিম আর কাবা ঘর সামনে রেখে দুই রাকাত তাওয়াফের সুন্নাত নামাজ আদায় করে জামজমের পানি পান করলাম। এবার সাফা মারওয়া সাঈ করার জন্য সাফা পাহাড়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিয়ত করে সাঈ শুরু করলাম। সাতবার সাঈ শেষ করে মারওয়া প্রান্তে দোয়া শেষে মাথা মুণ্ডনের জন্য মসজিদুল হারাম থেকে বের হয়ে এলাম। আমরা পুরুষেরা মাথা ন্যাড়া করলাম আর নারীরা চুলের অগ্রভাগ সামান্য কেটে ওমরা সম্পন্ন করলেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হোটেল রুমে ফিরতে রাত দুইটা। দুই ঘণ্টা পরেই তাহাজ্জুদ নামাজের আজান দেবে। শুয়ে আছি কিন্তু ঘুম নেই চোখে, সারা শরীর খুব ক্লান্ত। সারা দিনের ভ্রমণ আর ওমরা পালনের আনুষ্ঠানিকতা, পরিশ্রমের ধকল শরীরজুড়ে কিন্তু মস্তিষ্ক অস্থির। মোবাইলের মাই হেলথ অ্যাপ ৩০ হাজার স্টেপ হাঁটার রেকর্ড দেখাচ্ছে! আমরা কত দুর্বল, কতটা ক্ষীণ আমাদের মানসিক আর শারীরিক শক্তি! ওই সময়ের কথা ভাবছি, যখন যন্ত্রযান সহজলভ্য ছিল না। মানুষ পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে, নদী-সমুদ্রপথে মক্কায় পৌঁছাত! তখন মানুষ কি কষ্টই না করত। গরমে–শীতে–অনশনে–পরিশ্রমে দীর্ঘপথ কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত একদিন দূর থেকে দেখতে পেত মক্কার আভাস, তাদের জীবনের সেই মুহূর্তের অতি মহার্ঘ রোমাঞ্চ স্মৃতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। পুরোনো একটি কথা আছে, যদি অর্জন থেকে সার্থকতা চাই, তবে সেই অর্জন হবে দুঃখসাপেক্ষ। যার জন্য কষ্ট করতে হলো না, তাকে বেশি মূল্য না দেওয়াটা মানুষের স্বভাব। ভ্রমণের ক্লেশেই নাকি গন্তব্য মহিমান্বিত হয়। কষ্ট করে যেখানে পৌঁছাতে হয়, সেটাই তীর্থ। আজকালকার মানুষের জীবনে এ অভিজ্ঞতা যদিও অসম্ভব, তবে সত্যটা হলো বিশ্বাসীর অন্তরে দূর থেকে দেখতে পাওয়া মক্কা বা মদিনার আভাস এখনো মহার্ঘ। হোক না তা নিতান্ত আরামে বা ন্যূনতম পরিশ্রমে। যন্ত্র দূর করেছে শরীরের ক্লেশ, কিন্তু সাধনার দুঃখ মানুষের সব সময় রবে। মনের সাধনা পূর্ণ করতে মানুষ স্রষ্ঠার সান্নিদ্ধ খুঁজবে চিরকাল।

আরও পড়ুন
মসজিদুল হারাম–এর ভেতর অংশের নকশা ও কারুকাজ
ছবি: লেখকের পাঠানো

১৬. মক্কার দিনলিপি: প্রার্থনা ও কিছু আত্মোপলব্ধি আর বাংলাদেশি ভাইয়েরা

মাঝরাতের তন্দ্রার মধ্য দিয়ে গড়িয়ে যায় সময়ের ঘড়ি। কাবার মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠে তাহাজ্জুদ নামাজের আজান ভেসে আসছে। মসজিদুল হারামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে আসি হোটেল থেকে। সমগ্র রাস্তাজুড়ে ব্যস্ততা। খাবার হোটেল, খেজুরের দোকান, উপহার সামগ্রীর দোকান, রাস্তার হকার সবাই বেচাবিক্রিতে ব্যস্ত। মক্কা আর মদিনার বেশির ভাগ ব্যবসায়ী বাংলাদেশি, বিশেষত, দক্ষিণ চট্টগ্রামের। রাস্তার ছোট দোকান থেকে সুপারশপ, হোক মালিক বা কর্মচারী বাংলাদেশি থাকবেই। আবার মসজিদে নববি আর মসজিদুল হারামের পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত বেশির ভাগ কর্মীও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা এভাবে ছড়িয়ে আছে সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদসহ ছোট–বড় সব শহরে, সব জায়গাতে। নিজের অবয়বের সাথে মিল আছে এমন মানুষ বিদেশবিভুঁইয়ে খুঁজে পেলে ভালো লাগে। শুধু দেশের মানুষ না, এমন কি উপমহাদেশের মানুষগুলোও মনে হয় কত আপন। মন খুলে কথা বলার মানুষ পাওয়া গেলেই মনে বিশ্বাসের ছায়া জেগে ওঠে। সতর্ক না থাকলে অবশ্য মাঝেমধ্যে ঠকতেও হয়!

সূর্য যেন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে ক্লক-টাওয়ারের চূঁড়ায়, নিচে পবিত্র কাবা ঘরের চারপাশে আমরা তাওয়াফ করছি। আমরা তাওয়াফ করার জন্য চলে এসেছি। এই সময় গরম একটু বেশি। মক্কায় এসেছি ওমরা করেছি, তাওয়াফ করেছি, সায়ী করেছি কিন্তু পবিত্র কাবা ঘরকে এখনো ছুঁতে পারিনি।

সতর্কতা ব্যক্তিজীবনে আত্মরক্ষার বর্ম, সেটা বাদ দিলে বিপদের সম্ভাবনা। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রের বাইরে আমাদের অনুভূতিপ্রবণ জীবনে ভাব, কল্পনা আর মানের বিশেষ প্রতিক্রিয়ার কাছে হার মানতে হয়। আত্মসচেতনতার কণ্টকিত বেড়া তুলে, লোকসানের ভয়কে জয় করে শিশুর মতো মিশতে পারলে জগৎব্যাপী বহু মানুষকে বন্ধুরূপে পাওয়া যায়। বহু অনাত্মীয় হয়ে ওঠে আত্মীয়র চেয়ে আপন। তবে এর মানে এই নয় যে সতর্কতা বর্জনীয়। সতর্কতা আর আন্তরিকতা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলাটাই হলো সাধনা। মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে করতে ফজরের নামজের আজান হয়। সুন্নাত আদায় শেষে ইমামের সাথে ফরজ নামাজ আদায় করলাম, এরপর জানাজার নামাজ। মক্কা ও মদিনার ইমাম সাহেবদের সুললিত কণ্ঠে কোরআন পাঠের প্রশংসা যতই করি না কেন কম মনে হবে! যাঁদের মসজিদে নববি আর মসজিদে হারামে নামাজ আদায়ের অভিজ্ঞতা আছে, আশা করি তাঁরা আমার সাথে একমত হবেন।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। অথচ ‎বিশ্ব সৃষ্টির পটভূমিকায় নিজেকে কত নগণ্য মনে হয় মাঝে মাঝে। এমন মানুষ পৃথিবীতে বোধ হয় কমই জন্মেছে যে তার জীবনে নিজের তুচ্ছতার উপলব্ধিতে অভিভূত হয়ে পড়েনি। কিন্তু সে উপলব্ধি ক্ষণিকের বলে ধন্যবাদ ঈশ্বরকে। ওই যে দূর আকাশের মিটি মিটি তারা, প্রতি তারাই নাকি একটি সূর্য, যা আমাদের সূর্যের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বড়! আমাদের আবিষ্কৃত সবচেয়ে শক্তিশালী দুরবিনের নাগালের বাইরেও কত আকাশ আর কত সূর্য ও গ্রহপুঞ্জ তার হিসাব মানবজাতি কি কখনো পাবে? আমাদের মাথার ওপর এই তেজোদীপ্ত সূর্য সমস্ত সৃষ্টির বিচারে একটি দেশলাই কাঠিমাত্র। আর আমি অধম, হায়রে! এই মক্কায় মানুষ কত হাজার বছর ধরে আসছে। কে যে কিসের আকাঙ্ক্ষায় আসছে, কী প্রার্থনা করছে, সে কথা তাদের মনের গভীরে থাকে। তাদের প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে কি না, জানা যায় না, তবু হাজার বছর ধরে এই পথ ধরে মানুষ আসছে। কোনো কল্যাণকর প্রার্থনা আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না, তিনি বলছেন তোমরা চাও আমার কাছে, আমি দেব।

আরও পড়ুন

১৭. মক্কার দিনলিপি: মসজিদুল হারামের স্থাপত্য ও ধর্মীয় প্রেরণা

হোটেলের নিচে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁটি আজ হঠাৎ সরকারি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিল। রেস্তোরাঁটির বেচাকেনা বেশ ভালোই ছিল। আমাদের হোটেলের পাশের ঘরটি ভেঙে ফেলা হবে। হোটেলের কারণে জায়গাটি জনবহুল হয়ে থাকে, ভাঙার সময় যতে দুর্ঘটনা না ঘটে, তাই এই ব্যবস্থা। হোটেলটির খাবারদাবার ভালোই ছিল। এই কয়েক দিন আসরের নামজ শেষ করে রুমে যাওয়ার সময় ওদের রুটি বা পরোটা আর সাথে চিকেন/মাটন কারি অথবা মাংসের কিমা কিনে নিয়ে যেতাম, বিকেলের চা–এর সাথে নাশতাটা জমজমাট হয়ে উঠত। এই রেস্তোরাঁর সামনের দিকে রাস্তার সাথেই আরও দুটি বড় রেস্তোরাঁ, একটি বাংলাদেশি অন্যটি পাকিস্তানি, এক মাস আগে বন্ধ করা হয়েছে। ওই রেস্তোরাঁগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় ছিল, উপমহাদেশের অনেক ইউটিউবারের ভিডিওতে এই রেস্তোরাঁগুলো আমি দেখেছি। এই রেস্তোরাঁগুলো যে দালানে ছিল, সেটিই মূলত ভেঙে ফেলা হবে। একতলা এই দালান ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ হবে। মক্কার হেরেম শরিফের সাথে এই ইব্রাহিম খলিল রোডটি যেন অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।

হেরেম শরিফ ও এর আশপাশ এলাকায় বিশাল নির্মাণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত এই এলাকার চেহারা পরিবর্তিত হয়ে আরও সুন্দর ও পরিকল্পিত রূপ নিচ্ছে। ভ্রমণপ্রত্যাশীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। পুরোনো ভবন ভেঙে নতুনভাবে স্থাপত্য তৈরির ধুম লেগেছে কাবার চতুর্দিকে। একই অবস্থা দেখে এলাম মদিনায় মসজিদে নববির আশপাশেও। মসজিদে নববি আর মসজিদুল হারামের স্থাপত্য নির্মাণশৈলী অসাধারণ। মক্কা আর মদিনায় যে নির্মাণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে, তা শেষ হলে এগুলোর স্থাপত্যশৈলী পৃথিবীর সেরা হবে, তা অনুমান করা যায়। ধর্মীয় এই মহান স্থানগুলোতে এমনই হওয়ার কথা।

আরও পড়ুন
মসজিদুল হারামের নতুন বর্ধিত অংশের সিলিং–এর কারুকাজ ও ঝাড়বাতি
ছবি: লেখকের পাঠানো

কাবা শরিফকে ঘিরে গড়ে ওঠা মসজিদের কাঠামো বিভিন্ন যুগ, বিশেষ করে উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানীয় এবং বর্তমান সৌদি রাজবংশের সময়ে বারবার সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়েছে, যা এখনো চলমান। মসজিদের কেন্দ্রে থাকা কাবার মূল কাঠামো প্রতিবছর কালো রেশম ও স্বর্ণখচিত নতুন গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয়। কাবাকে ঘিরে রাখা উন্মুক্ত এলাকা তাপ-নিরোধক মার্বেল পাথর দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রখর সূর্যের তাপেও উত্তপ্ত হয় না। শীর্ষে চাঁদ–তারা মুকুটখচিত উসমানীয় প্রভাবযুক্ত ইসলামিক স্থাপত্যের সাতটি মিনার আর পরবর্তী সময়ে সৌদি রাজবংশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী হিজাজি স্থাপত্যের মিনারগুলো বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদের সঠিক মর্যাদাকে প্রকাশ করছে। অভ্যন্তরীণ দেয়াল ও সিলিংয়ে জটিল নকশা এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শৈলীর অলংকরণ, বিশেষ করে আরবি ক্যালিওগ্রাফির ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা মসজিদের পবিত্রতা ও সরলতাকে মহিমান্বিত করেছে। সিলিংয়ে ঝোলানো ঝাড়বাতিগুলো এই সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ। মসজিদুল হারামের একাধিক নামাজ ফ্লোরে সুবিশাল প্রবেশদ্বার, এসকেলেটর, লিফট, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্ত করা আছে। নামাজ ফ্লোরের ভেতরে ও বাইরে পানি পানের বন্দোবস্ত করা আছে। অজু করার জায়গা, টয়লেট, হাম্মাম কোনো কিছুই অপ্রতুল নয়। সরকারি বাহিনী আর স্বেচ্ছাসেবক বিশাল এই গণজমায়েত নিয়ন্ত্রণে সারাক্ষণ কাজ করে যাচ্ছেন।

মসজিদুল হারাম-এর স্থাপত্য নকশার একাংশের ছবি
ছবি: লেখকের পাঠানো

পৃথিবীর ইতিহাসে স্থাপত্যের প্রধান প্রেরণা ধর্মই জুগিয়েছে। ইসলামি বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য অনুসারে, পবিত্র কাবা ঘরই হলো মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত পৃথিবীর প্রথম ঘর, বিশেষত, প্রথম উপাসনালয়। এর ভিত্তিপ্রস্তর মানবজাতির ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই প্রোথিত। মানব সৃষ্টির বহু আগে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা প্রথম কাবা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেন বায়তুল মামুরের আকৃতিতে। ‘বায়তুল মামুর’ হলো একটি স্বর্গীয় বা আধ্যাত্মিক স্থাপনা, যা ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে সপ্তম আকাশে অবস্থিত এবং এটি পৃথিবীর কাবা ঘরের ঠিক ওপরে রয়েছে। এটি ফেরেশতাদের কিবলা ও ইবাদতের কেন্দ্র। তাফসির ও সিরাত গ্রন্থগুলোতে কাবার আদি নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

মসজিদে নববি আর মসজিদুল হারামের স্থাপত্য চরম নৈর্ব্যত্তিক, তা শতকোটি মুসলমানের, যা মুসলিম জাতির আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এই গৃহগুলোর নির্মাণ শুধু শিল্পীর কলাচাতুর্য নয়, সাথে আছে সমস্ত জাতির প্রার্থনা ও উদ্দীপনা। উদারতম অর্থে ধর্মই এর মূল প্রেরণা।

ধর্মীয় প্রেরণায় স্থাপত্য নির্মাণ করে ইতিহাসে খলনায়ক হন ইয়েমেন এবং দক্ষিণ আরবের রাজা আব্রাহা। আব্রাহা ও তার হস্তী বাহিনীকে আবাবিল পাখি দিয়ে ধংস করে আল্লাহর ঘর কাবা-আল্লাহ কীভাবে রক্ষা করেছিলেন, তা আমরা সবাই জানি।

১৮. মক্কার দিনলিপি: তাওয়াফ ও হাজরে আসওয়াদ

রেস্তোরাঁটি বন্ধ হওয়ার পর আমাদের হোটেলের প্রবেশপথে যেন শূন্যতা ভর করেছে। সব সময় ভিড়, ব্যস্ততা আর হট্টগোলের জায়গাটিকে কেমন যেন অসহায় নির্জনতা তার নীরবতা গ্রাস করে ফেলেছে। এখন আলস্য ভর করেছে পথটিজুড়ে। এভাবেই বুঝি হঠাৎ পরিবর্তন আসে জীবনের প্রতিটি গলিতে। হোটেলের প্রবেশমুখে এখন আস্তানা গেড়েছে বেশ কিছু বিড়াল, সংখ্যায় পনেরো-বিশের কম হবে না। কোনো মানুষ হেঁটে যাওয়ার সময় করুণ গলায় মিও মিও করছে, দেখলে মায়া লাগে। এত দিন হোটেলের উচ্ছিষ্ট খেয়ে তাদের চলে যেত, এখন হয়তো মঙ্গা ভর করেছে তাদের পৃথিবীজুড়ে। মক্কা-মদিনার গলিতে গলিতে সব বিড়াল। এখানে! কুকুর দেখি না কোথাও। আহ্লাদী, লোমফোলানো, জবুথবু, সাদা-কালো, ছোট-বড়, সব বিড়াল রাজকীয় চালে গলিতে হাঁটছে, পাচিলে ঘুরছে। ইতিমধ্যে ভাঙা শুরু হয়ে গেছে পরিত্যক্ত দালানটির, ইউনিফর্ম পরে নির্মাণ কোম্পানির নিরাপত্তাকর্মী দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। চারপাশে হলুদ ফিতায় ঘের দেওয়া হয়েছে সতর্কতার জন্য, যাতে কেউ অসতর্ক হয়ে ওই জায়গায় ঢুকে না পড়ে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

সূর্য যেন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে ক্লক-টাওয়ারের চূড়ায়, নিচে পবিত্র কাবা ঘরের চারপাশে আমরা তাওয়াফ করছি। আমি আর রুনা আজ সকালের নাশতা সেরে তাওয়াফ করার জন্য চলে এসেছি। এই সময় গরম একটু বেশি। মক্কায় এসেছি, ওমরা করেছি, তাওয়াফ করেছি, সাঈ করেছি কিন্তু পবিত্র কাবা ঘরকে এখনো ছুঁতে পারিনি, হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করা হয়নি। মাকামে ইব্রাহুম ছুঁতে পেরেছি কিন্তু কাবার চোখাট ছুঁয়ে আল্লাহর কাছে মনের আকুতি জানানো হয়নি। মনের এই ইচ্ছেগুলো পূর্ণ করা আজকে আমাদের মূল এজেন্ডা। তাওয়াফ শেষ করে প্রথম চেষ্টায় রোকনে ইয়েমেনি স্পর্শ করলাম, কাবার গিলাফ ধরে মুখে স্পর্শ করলাম। যদিও বিষয়টা এত সহজ না, প্রচুর মানুষের ভিড় ঠেলে, গায়ের জোর কাজে লাগিয়ে তা করতে হলো। এবার হাজরে আসওয়াদ চুমু দেওয়ার পালা। প্রচণ্ড শক্তি আর উদ্যম সাথি করে ভিড় ঠেলে আমরা এগিয়ে গেলাম, তীব্র চাপ মানুষের। কে কার আগে যাবে, এখানে চরম শক্তিপ্রয়োগ আর ধৈর্যের জোর পরীক্ষা চলছে। বেশ কিছু সময় চেষ্টা করে আমাদের পিছিয়ে আসতে হলো। হতাশ হয়ে চেয়ে রইলাম স্বর্গের পাথর হাজরে আসওয়াদের দিকে। অপেক্ষা না করে মুলতাজাম অংশে কাবার চোখাট ধরে প্রার্থনার জন্য এগিয়ে গেলাম, আমরা সফল হলাম। কিছু সময় অপেক্ষা করে এবার একা অগ্রসর হলাম হাজরে আসওয়াদের দিকে। তীব্র চাপ আর ঠেলাঠেলি শেষে পৌঁছে গেলাম একদম কাছে, আমার সামনে মাত্র একজন আছে। সে হাজরে আসওয়াদ চুমু দিল কিন্তু চুমু শেষ করে ভিড়ের জন্য বের হতে পারছে না! যতই সে বের হতে চায়, পেছনের ঠেলায় আবার হাজরে আসওয়াদের ওপর গিয়ে পড়ে। তীব্র ধাক্কায় মনে হচ্ছে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে আমার সামনে বিশালদেহী একজন ঢুকে পড়েছে, নিরাশা ভর করল মুহূর্তের জন্য। মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলাম, শরীরের সব শক্তি যখন শেষ হয়ে যাচ্ছে মনে হলো, ঠিক সেই মূহূর্তে আমি বেহেশতের পাথর হাজরে আসওয়াদের সামনে। পাথর স্পর্শ করলাম, চুমু দিলাম। এখানে আকাশে-বাতাসে মানুষের নীরব বন্দনা। শক্তি প্রদর্শনের সাড়ম্বর বিজ্ঞাপন নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টামাত্র। চলবে...

লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা