চন্দ্রাবতী
ফুলেশ্বরী নদীর পানি ফুলে ফেঁপে উঠছে। দুকূল প্লাবিত করে সে ভাসিয়ে দিতে উদ্গ্রীব তার দুই পারের গ্রাম। চন্দ্রবতীর মনও আজ ফুলেশ্বরী নদীর মতো। তার হৃদয়ের চাপা কান্না দুচোখের পাপড়িতে এসে থেমে গেছে। সে বিয়ের শাড়ি পরে আকাশপানে চেয়ে আছে। আজ তার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল দুটো চোখে প্রেমের খেলা হবে, দুটি হৃদয়ের মিলন হবে, কামনার নদীতে জোয়ার আসবে। সেই জোয়ারে ভেসে ভেসে ফুলেশ্বরী নদীর পাড়ে বসে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রেমগীত রচনা হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তার মন। কিন্তু জয়চন্দ্র এ কি করল? চন্দ্রাবতীর প্রেমের এ নিষ্ঠুর অপমান, প্রহসনের গান, হৃদয়ে শত বল্লমের দগদগে ক্ষত। একদিকে সে চন্দ্রাবতীকে বিয়ে করে ঘরে তোলার আশ্বাস দিয়েছে, অন্যদিকে সে বিয়ে করেছে আসমানীকে। চন্দ্র তোর জীবন ব্যর্থ, তুই এক ব্যর্থ নারী। বৃথাই তোর নারীজীবন, বৃথাই তোর রূপ–যৌবন। তোর জীবন জ্বলে যাক বিরহ অনলে। তুই পুড়ে যা, মরে যা, ক্ষয়ে যা। তোর জীবনের আর কিবা মূল্য বাকি?
‘না কাঁদে না হাসে চন্দ্রা নাহি কহে বাণী।
আছিল সুন্দরী কন্যা হইল পাষাণী॥
মনেতে ঢাকিয়া রাখে মনের আগুনে।
জানিতে না দেয় কন্যা জ্বলি মরে মনে॥’
চন্দ্রাবতীর বাবা মেয়ের কষ্টে হু হু করে কাঁদে। বাবাকে কাঁদতে দেখে চন্দ্রের মন শক্ত হয়ে ওঠে। না সে কাঁদবে না। যে করেছে তার প্রেমের অপমান, তার জন্য সে কাঁদবে না। সে পাষাণ হবে। তার চোখে থাকবে না কোনো অশ্রু। সে হবে কঠোর তপস্বী। ভগবানের তপস্যাই হবে তার জীবনের ব্রত।
ওরে মানবের প্রেমে জীবন করসিনারে ক্ষয়
প্রেমে কেবল ছলনা আছে প্রেমের পরাজয়
চন্দ্রাবতী সতী অতি বাসবে নারে আর ভালো
জগতে সবই আঁধার নাইরে কোথা নাই আলো।
সেই ছোট্টকাল থেকে চন্দ্রাবতী ও জয়চন্দ্র খেলার সাথি। তারা একসঙ্গে বড় হয়েছে। এই ফুলেশ্বরী নদীর তীরে খেলেছে, হেসেছে, গেয়েছে। জীবনের স্বপ্নগুলো একই সঙ্গে ডানা মেলেছে। জলেশ্বরী নদীতে কত জলকেলির সুখস্মৃতি, কলাগাছের ভেলায় ভেসে ভেসে কত আনন্দের অনুভূতি, ডিঙিনৌকায় করে কত ভরা জোছনায় ফুলেশ্বরীর অপরূপ রূপে অবগাহন, কত ভরা বরষায় ফুলেশ্বরীর স্রোতে ভেসে ভেসে জীবনের অপার্থিব সৌন্দর্য খুঁজে ফেরা কিংবা কত শীতের সন্ধ্যায় ফুলেশ্বরী নদীর তীরে বসে আগামীর স্বপ্ন বোনা। চন্দ্রাবতীর বাগানে একটিমাত্র গোলাপ ফুটেছিল। সে গোলাপের নাম জয়চন্দ্র। তাকে নিয়েই রচিত হয়েছিল তার স্বপ্নের পৃথিবী। রচিত হয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রেম-সংগীত।
এসো প্রিয় এসো
এসো নীরবে এসো গোপনে
এসো প্রেমের দরিয়ায় ডুবে যেতে
এসো প্রেমের শরাব পিয়ে এ জলপ্রপাতে
আমরা ডুবে যাব একসাথে এক সুরে
প্রেমের গান বাজবে মোদের পবিত্র হৃদয়ে।
জয়চন্দ্রও সাড়া দিয়েছিলো চন্দ্রাবতীর ডাকে। চোখে চোখ রেখে দিয়েছিল নির্ভরতার প্রতিশ্রুতি। বলেছিল, আমার জীবনে যদি কোনো সত্য থাকে, সে তুমি। আমার জীবনে যদি কোনো চন্দ্র থাকে, সে তুমি। সে চন্দ্রের চেয়েও সুন্দর চন্দ্রাবতী। আমার ফুলের বাগানে তুমি ছাড়া কোনো ফুল নেই, আমার আকাশে তুমি ছাড়া কোনো তাঁরা নেই। আমার হৃদয় নদে যে নৌকা বাঁধা আছে, সেখানে তুমিই একমাত্র যাত্রী। তুমি না এলে সে নৌকা সারা জীবন ঘাটেই বাঁধা থাকবে। আমার কোনো পিছুটান নেই। শুধু তোমার অপেক্ষায় বসে আছি—
হে প্রিয়ে
এসো মোর ভাঙা ঘরে এসো এসো
আমার প্রেম দরিয়ায় এসে ভেসো
আমার শুষ্ক হৃদয়ে এনে দাও বরষা
তোমার প্রেমই যেন পাই ভরসা।
চন্দ্রাবতী জয়চন্দ্রের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। আকাশের লালিমার লাল, চন্দ্রের চন্দ্রিমার চন্দন, গোলাবের গোলাবি, সবুজ ঘাসের সবুজতা, রংধনুর সপ্ত রং, জোনাকির আলোক মেখে নিজেকে সাজিয়েছে সে অপরূপ সাজে। কোনো এক শুভ দিনে শুভলগ্নে বিয়ের দিনক্ষণ হয় ঠিক। জয়চন্দ্র কথা দেয় তার সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে বৈদিক ধর্মমতে সমাজের নিয়মকানুন মেনে সে ঘরে তুলবে চন্দ্রাবতীকে। কিন্তু কখন সুরের তাল কেটে গেল, কখন প্রবল বৃষ্টি মাঝে উঠল বেরসিক রোদ, কখন অপরূপ চাঁদের আলো ঢেকে গেল কালো মেঘে তা অজানাই রয়ে গেল। চন্দ্রাবতী বিঁয়ের সাজে বসে আছে। বাড়িভর্তি আমন্ত্রিত অতিথি। কখন আসবে বর কখন আসবে বর—এই তব উৎকণ্ঠা। কখন এসে চন্দ্রাবতীকে বলবে—
আমি এসেছি প্রিয়ে
তোমার অপেক্ষার হলো শেষ
এবার চল তবে আমার ঘরে
আমার শূন্য ঘর দাও পূর্ণ করে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
কিন্তু হায় জয়চন্দ্র আসে না। অপেক্ষার প্রহর আরে কাটে না। সময় বইছে টিক টিক। প্রতিটি ক্ষণ এত ভারী। চন্দ্রাবতী যেন আর বইতে পারে না। বাবা বারে বারে বাহির পানে ধায়। কই বর এল? না বরের দেখা নেই। লগ্ন যে বয়ে যায়। একটি বিষণ্ন কবুতর চন্দ্রের ঘরের কার্নিশে বসে আছে মন খারাপ করা চোখে। তবে কি জয়চন্দ্র আসবে না? তবে কি তার মেয়ে হবে লগ্নভ্রষ্টা! হঠাৎ দূরে কাউকে দেখা যায়। কে আসে, কে আসে? সে কি এনেছে জয়চন্দ্রের কোনো খবর? বাড়ির সবার মনে পুলক জাগে। হয়তো এসেছে জয়চন্দ্রের কোনো খবর। চন্দ্রাবতীর মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। পথিক ধীরে ধীরে উঠানে এসে দাঁড়ায়। তার মুখ ভারাক্রান্ত। তার চোখ বড় বিষণ্ন। তবু তাকে বলতে হবে। সে বলার জন্যই এসেছে। সবাই তাকিয়ে আছে তার মুখপানে। চন্দ্রাবতীর কান তা শোনার অপেক্ষায় আছে রুদ্ধশ্বাসে। সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে সে বলে—জয়চন্দ্র আসবে না! সে বরের বেশে বের হয়েছে আজ। তবে চন্দ্রাতীর জন্য নয়, সে বিয়ে করতে গেছে আসমানীকে। আসমানী মুসলমানের মেয়ে। আসমানীর রূপে সে হয়েছে পাগল। নিজ ধর্ম ছেড়ে সে মুসলমান হয়ে আসমানীকে করেছে বিয়ে। চন্দ্রাবতীর পৃথিবী যেন নিমেষে দুভাগ হয়ে গেছে। সে আর সইতে পারে না। প্রচণ্ড কষ্টে আর্তচিৎকারে জ্ঞান হারায় সে।
জয়চন্দ্র সুখসাগরে ভেসে যায়। ফুলেশ্বরী নদীতে সে আসমানীকে নিয়ে নৌবিহারে ভেসে বেড়ায়। রাত নেই দিন নেই তার নৌকা ভেসে চলে। উত্থাল কামনার জোয়ারে ভেসে ভেসে তার নৌকা ফুলেশ্বরী গভীরে নেচে বেড়ায়। চন্দ্রাবতী দূর থেকে তাদের ভেসে যাওয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কোন অপরাধে জয়চন্দ্র তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এর কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। সে চাঁদের কাছে যায়, ফুলের কাছে যায়, পাখির কাছে যায়, বনের ঘুঘুকে শুধায়, শুধায় ফুলেশ্বরী নদীর জলকে—তোমরা কি কইতে পারো আমার কী দোষ? কোন দোষে আমি পথে পথে ঘুরি? কিবা দোষে আজও আমি কুমারী নারী—
কইতো পারো বনের কোকিল কইতে পারো ভ্রমর
কিবা দোষে প্রেম বিরহে আমি জ্বলব জীবন ভর
কিবা দোষে এ অভাগীর কলঙ্কের দাগ লাগে
কিবা দোষে আমায় ছেড়ে সে আসামানীর ঘরে
ভালো বাসলাম যারে আমি মন প্রাণ দিয়া
কোন বা দোষে আমায় ছেড়ে সে অন্যরে করে বিয়া?
চন্দ্রাবতীর এ কথার জবাব কেউ দেয় না। না ফুল, না পাখি, না ফুলেশ্বরী নদী। তবে তাই হোক। এ নারী জনম আর কোনো পুরুষের না হোক। কোনো পুরুষের ছোঁয়া এ নারী দেহে না লাগুক। আর কোনো ছলনার প্রেমে চন্দ্রাবতী না পড়ুক। ভগবানের স্মরণে কেটে যাক বাকিটা জীবন।
হে ভগবান
পার করো আমারে
আমার সময় যাক কেটে যাক তোমার স্মরণে
তোমার প্রেমেই যেন ডুবে থাকি জীবনে মরণে।
চন্দ্রাবতী নীরব ধ্যানে নিবিষ্টচিত্তে পূজায়–অর্চনায় ব্যস্ত থাকে। জাগতিক জীবনের হিসাব–নিকাশ থেকে গুটিয়ে প্রভুপ্রেমে মগ্ন হয়ে হৃদয়ে স্থিরতা আনে। কখন উঠেছে চাঁদ, কখন ডুবছে সূর্য কখন জোয়ারের পর ভাটা নেমেছে ফুলেশ্বরী নদীতে সে নিয়ে তার কোনো কাজ নেই। তার কাজ শুধু প্রভুর স্মরণ। তার মনে কাব্য জাগে। সে রচনা করে পালা। দস্যু কেনারামের পালা।
জালিয়া হাওরের কাছে বাকুলিয়া গ্রামে খেলারাম ও যশোদার বাস ছিল। দীর্ঘদিন ধরে তাদের কোনো সন্তান না থাকায় তারা সমাজে অনেক অপমানের শিকার হন এবং নিজেদের জীবনে আক্ষেপ করেন। পরে যশোদার গর্ভে সন্তান আসে এবং এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এই পুত্রের নাম রাখা হয় কেনারাম। কেনারাম বড় হয়ে দস্যুতে পরিণত হয়। তার দস্যুতার কারণে পিতা-মাতা আবার দুঃখ-কষ্টের শিকার হন।
চন্দ্রাবতী কাব্য প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায় মলুয়া পালাতে—
মলুয়ার বাবা হীরাধর এবং তার বিত্তবান পরিবারে মলুয়ার জন্ম হয়। পরবর্তীকালে, মলুয়া চাঁদ বিনোদ নামে এক যুবককে ভালোবাসে এবং তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে হঠাৎ করে কাজির ক্ষমতা ও দাপট এসে পড়ে। কাজির ক্ষমতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে মলুয়া ও চাঁদ বিনোদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে মলুয়া তার অটল প্রেম, শক্তি ও আত্মপ্রত্যয় দিয়ে কাজির ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সে নিজের এবং চাঁদ বিনোদের সম্মান রক্ষা করার জন্য সংগ্রাম করে এবং কোনোভাবেই হার মেনে নেয় না। পালার শেষে মলুয়ার জয় হয় এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ও ক্ষমতাশালী কাজির অপশাসনের বিরুদ্ধে এক অসাম্প্রদায়িক মানবিক প্রেমের বিজয় ঘটে। এই গাথাটি মলুয়ার প্রেম ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
চন্দ্রাবতী একসময় রামায়ণ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। যদিও রচনাটি তিনি শেষ করতে পারেননি।
জয়চন্দ্র একসময় বুঝতে পারে আসমানীর প্রতি প্রেম ছিল তার ক্ষণিকের মোহ। সে আসলে ভালোবাসে চন্দ্রাবতীকে। দিন–রাত চন্দ্রাবতীর কথা ভাবে। তার মনে অনুতাপ জাগে। চন্দ্রাবতীর প্রেম তাকে কাতর করে তোলে-
ওগো চন্দ্র তোমার কথা ভাবি মনে মনে
তোমায় ব্যথা দিয়া আমি কাঁদি যে গোপনে
কি করে বুঝাইব আমি আমার অনুতাপ
তোমারে ত্যাগ করিয়া করছি ভীষণ পাপ।
জয়চন্দ্র পাগলপারা হয়ে চন্দ্রাবতীর দরজায় কড়া নাড়ে। চন্দ্র সে ডাকে সাড়া দেয় না। তার কোমল মন আজ কঠিন। সে এখন প্রেমের ঊর্ধ্বে। যে ব্যথা সে কাটিয়ে উঠেছে, সে ব্যথায় আর নতুন করে পড়তে চায় না। জয়চন্দ্রের জন্য তার দরজা চিরতরে বন্ধ। সে তার কেউ না। জয়চন্দ্র হয়তো এক দুঃস্বপ্ন। সে স্বপ্ন সে ভুলে যেতে চায়। জয়চন্দ্রের সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সে ফিরে খালি হাতে।
চন্দ্রাবতী এক সন্ধ্যাবেলায় সন্ধ্যামালতি ফুল নিয়ে নদীর ধারে যায়। ফুলেশ্বরী নদী তীরে নীরব ধ্যানে ক্ষাণিক দাঁড়ায়। কিন্তু একি! নদীর তীরে ভাসছে এ কার নিথর দেহ। চাঁদের মতো সুন্দর তার দেহ। সূর্যের মতো উজ্জ্বল তার মুখশ্রী। হায়! এত জয়চন্দ্র! চন্দ্রাবতীকে না পেয়ে সে আত্মাহুতি দিয়েছে ফুলেশ্বরীর জলে!
কিবা রূপ দেখে চন্দ্র এমনো সুন্দর
নদীর তীরে তারি দেহ করিছে নোঙর
প্রেমানলে পুড়ে পুড়ে গেছে জলে ভাসি
চন্দ্রাবতী কেঁদে কয় আমি সর্বনাশী
না শোনে তারি কথা দিলাম ফিরায়ে
সে শেষে ডুইবা মরল ফুলেশ্বরীর জলে
বৃথাই আমার পূজা অর্চন বৃথাই সাধনা
আমিও মরব ডুইবা তোমায় দিলাম কথা!
চন্দ্রাবতী আর সইতে পারে না। জয়চন্দ্রকে দেখে তার সব শপথ ভেঙে যায়। সে লাফিয়ে পড়ে জলেশ্বরীর অতল জলে!
*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর