গাঁয়ের পাগল

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

প্রতিটি গ্রামেই একজন পাগল থাকে। পাগলের পাগলামি গ্রামের মানুষেরা খুব উপভোগ করে। তার চলনবলন সবকিছুই গ্রামের মানুষের কাছে এক বিরাট কৌতূহলের বিষয়। চলুন কয়েকজন পাগলের সঙ্গে হেঁটে আসি।

১.

অফিসে খুব ব্যস্ততার মধ্যে আছি। কাল মাসিক মিটিং। এদিকে সকাল থেকে কম্পিউটারটা নষ্ট। ফটোস্ট্যাট মেশিন তো থেকেও নেই। কিন্তু এসব অজুহাত দিয়ে কাজ বন্ধ রাখার উপায় নেই। কিছুক্ষণ আগে কম্পিউটার ঠিক করানো হয়েছে। হন্তদন্ত করে কোনোরকম রেজোল্যুশনটা প্রিন্ট করলাম। এখনই স্যারকে দেখিয়ে একবার ঠিকঠাক করিয়ে নিতে হবে। রেজোল্যুশন গুছিয়ে ‘মে আই কাম ইন স্যার?’ বলে অনুমতির অপেক্ষা না করেই স্যারের রুমে প্রবেশ করলাম। কিন্তু স্যার কোথায়? চেয়ারে তেরো–চৌদ্দ বছর বয়সের একটা ছেলে বসে আছে! কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ‘এই ছেলে, তুমি এখানে কেন?’

—হে হে হে!

ছেলেটির দাঁতগুলো হলদেটে। বোঝা যাচ্ছে, অনেক দিন দাঁত মাজে না। গায়ে একটা নেভি ব্লু শার্ট। পরনে হাফপ্যান্ট। পায়ে কোনো স্যান্ডেল নেই। ধমকে উঠলাম আমি—

—কী বলছি? আমার কথা কানে যায় না? তুমি এখানে ঢুকলে কী করে?’

—হে হে হে!

—ভারী বিপদ তো! কে তুমি?

—হে হে হে! আমি স্যার!

বলে কী? আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়।

—তুমি এখানে কী করে ঢুকলে?

—হে হে হে! আমি চাকরি পাইছি। আমার বেতন কই? পাঁচটা টাহা দেন।

এ তো দেখছি আস্ত পাগল (আমি বিড়বিড় করে বললাম)। ‘কালু, ওই কালু।’ আমি উচ্চস্বরে ডাকলাম। হন্তদন্ত হয়ে কালুর প্রবেশ।

—এই ছেলে এখানে ঢুকল কী করে? (কিছুটা রাগতস্বরে)

কালু ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভয়ানক খেপে গেল। বলল,

—স্যার, এই হালায় তো পাগল।

—পাগল!!

—হ, স্যার। এই হালার পো, চেয়ারতন উঠ, নাইলে পিডাই হাড্ডিগুড্ডি সব ভাইঙ্গা দিমু।

—হে হে হে। উডুম না!

—হালার পো হালা, এত বড় সাহস! স্যারের চেয়ারে বইছস, আবার কছ, উডুম না। খাড়া, তোর পাগলামি ছুডাইতাছি।

কালু ধপাধপ ছেলেটির পিঠে নির্দয়ভাবে কয়েকটা কিল–ঘুষি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে চেয়ার থেকে নামিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। যন্ত্রণায় ছেলেটি কাঁদছিল। আমি তাড়াতাড়ি ফাইলগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম।

এর পর থেকে ছেলেটাকে প্রায়ই দেখতাম। কোর্টের বারান্দায়, রাস্তায়, দোকানে, হোটেলের সামনে। একদিন দেখলাম, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাচ দেখাচ্ছে। তার নাচ দেখে দর্শকেরা খুব আমোদিত। অনেকে হাততালি দিচ্ছে। ছেলেটার মুখ দিয়ে বেশির ভাগ সময় লালা পড়ে। গেঞ্জির সামনের দিকটা ভিজে থাকে প্রায়ই। একদিন দেখি আবার গান গাচ্ছে—

‘সোনা বন্ধু, তুই আমারে করলি যে দিওয়ানা, মনে তো মানে না, দিলে তো বুঝে না...’

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী রে, তুই স্কুলে যাস না?’

—আমি তো সব পারি।

—কী পারছ?

—এগারো এগারো বাইশ, আমগো বাইত্তে যাইস; কুত্তা মড়া ভাইজ্জা দিলে কড়কড়াইয়া খাইস।

—এগুলো তো পচা কথা।

—আমি নামতাও পারি। চৌরারার ঘরের নামতা।

—কী রকম?

—চৌরা একে চৌরা, তিন চৌরা মাউরা, চার চৌউরা ঘাউরা।

—এটা তো আরও বাজে কথা।

—হে হে হে। আমি আরও জানি।

—আর কী জানিস?

—গাছতলায় ঘুরিফিরি, যদি একখান চিল দেহি, চিলের পাছায় হালডি মারি।

—এই তোর পড়াশোনা?

—হ, স্যার। আমি আর পড়ুম না, চাকরি করুম, আমারে বেতন দেন।

বলেই হাত বাড়িয়ে দেয়।

আমি পাঁচ টাকা দিয়ে বিদায় করি।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা । ই-মেইল: [email protected]

একদিন অফিস থেকে বের হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেছে। মেইন রোডে এসে দেখি কোনো মানুষ নেই। এর মধ্যে ছেলেটা দেখি একা একা একটা কুকুরের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করছে।

—কী রে, বাড়ি যাবি না?

—নাহ।

—কেন?

—অহন গেলে মায় মারব।

—মারবে না, তুই যা।

—হে হে হে, আপনেরে মায় পাডাইছে, না?

বলেই সে দৌড়ে চলে যায়।

একদিন কলেজ মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে বের হচ্ছি। দেখলাম, এক সম্ভ্রান্ত লোক কিছুটা অন্ধকারে পাগলটাকে ডাকছে—

—বাড়িত চল, বাপ।

—না না তুমি যাও।

বলেই সে দৌড় দেয়। লোকটি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি লোকটিকে বললাম,

—এটা কে?

—আমার পোলা।

—আপনি কী করেন?

—আমার বাজারে চাউলের আড়ত।

—আপনার অবস্থা তো ভালোই। ছেলের চিকিৎসা করাননি?

—করছি, ভাই। ছোট বেলাতনই পাগলামি স্বভাব। অনেক ডাক্তার দেখাইছি। কোনো কাম হয় নাই। দিন দিন অর পাগলামি বাড়তাছে। আমার একটাই পোলা। চেষ্টার ত্রুটি করি নাই, কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। দোয়া কইরেন আমার পোলাডার লইগ্যা।

—আচ্ছা। আমার ছোট্ট জবাব।

আমি যখন খুব ছোট, এক হিন্দু মহিলা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার আব্বু ছিলেন কোর্টের পেশকার। তিনি মাকে বলতেন, ‘এই পেশকারের বউ, আমারে দুগা ভাত দেও।’ বলে ঘরের বারান্দায় বসে বকবক করতে থাকতেন। ‘আমারে শান্তিতে থাকতে দিবি না। তগো অলক্ষ্মী আমি ছোডাইমু। হারামি ঘরে হারামির দল।’ এর ভেতরই মা ভাত এগিয়ে দেন। তিনি বলতেন, ‘ভাত দিছ ভালো কতা। গ্লাসটা ধুইছ ঠিকমতন? কলেরতন ঠান্ডা পানি আনো। দুধ আর কেলা থাকলে দিয়ো। অনেক দিন নাইকল কুড়ানি খাই না। তুমাগো গাছে নাইকল আছেনি?’

—আমাগো নাইকলগাছ নাই।

—এ পেশকারে বউ, মিছা কতা কছ ক্যা? মিছা কতা কছ ক্যা?

—আসলেই নাই।

তিনি আর কোনো কথা বলেন না। চুপচাপ খেতে থাকেন। এমন সময় আমি লুঙ্গি পরে তার খাবারের সামনে দিয়ে গেছি। তিনি খেপে উঠলেন, ‘কী রে, তুই আমার খাওনের সামনে লুঙ্গি ঝাড়া দিলি ক্যান?’

—কই লুঙ্গি ঝাড়া দিলাম?

—দিছস।

—না, দিই নাই।

—এডুক পোলাপান, অহনই মিছা কতা কছ। খাড়ো, তর বাহেরে কইতাছি। পেশকারের পোলা অহনই মিছা কতা হিগছে।

আমি পুরাই হতভম্ব। ছোটবেলায় তাঁকে প্রায়ই দেখতাম। তিনি নাকি ভালো বংশের মেয়ে। তাঁর ভাই ডাক্তার। কোনো কারণে তাঁর বিয়ে হয়নি। কী কারণে তাঁর মাথা এমন বিগড়ে গেছে, সেটা অবশ্য আমার জানা হয়নি।

আমার চাকরি হওয়ার পর তাঁকে প্রায়ই অফিস পাড়ায় দেখতাম। আমার অফিসও তিনি চিনেছিলেন। মাসের এক তারিখে আমাদের বেতন হতো। সেদিন গিয়ে আমার রুমে বসে থাকতেন, ‘এই পেশকারের পো, তোর বাপে আমারে আগে টাহাপয়সা দিত। এখন তুই দিবি। দে, বিশ টাকা দে।’

আমি খুশিমনেই দিতাম। আমার এলাকার লোক হওয়ায় একটা মমত্ববোধও কাজ করত। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। তিনি আমার প্রশ্রয় পেয়ে অফিসের অন্য সবাইকেও বিরক্ত করতেন। একসময় আমিও তাঁকে এড়িয়ে চলা শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে রাগও করতাম। তাই তিনি আসা কমিয়ে দিয়েছিলেন। একদিন শুনি, তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। খুব খারাপ লাগল আমার। অফিসের সবাই আফসোস করলাম। কিন্তু কয়েক দিন বাদে দেখি, তিনি আমার সামনে এসেছেন। বললাম, ‘আপনি নাকি মারা গেছেন?’

—কে কইছে তোরে?

—না, শুনলাম আরকি।

—হারামির দল পোংডামি কইরা এগুলান কয়।

যাক! তিনি বেঁচে আছেন দেখে ভালো লাগল। আবার তাঁকে টাকা দিলাম। আবার নিয়মিত অফিসে আসতেন। আবার এ কী কাণ্ড! পরে রাগ করায়, এখন আর খুব একটা দেখি না। তাঁকে প্রায়ই রাস্তাঘাটে দেখি। সদর হাসপাতালের মেঝেতে রাতে ঘুমান। রোগ–শোক নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন।

‘গরুরে বাঁধলাম কড়ইগাছে, মনরে বাঁধি কই?

চাঁদরে ধরতে চাইছি আমি, হাতে পাই না ভাই।

পাগলের গান শুনে তুমি হাসো রে যত খুশি,

তোমার হাসির ভেতর লুকায়, পাগলেরই দুঃখদশা।’

গান শুনে বাইরে এসে দেখি, আমাদের এলাকার রেফাজদ্দিন ছৈয়াল। দুপুরবেলা হন্তদন্ত হয়ে কোত্থেকে যেন এসেছে। সব সময় মুখে একটা রাগী রাগী ভাব থাকত। বাচ্চাদের ওপর একটু বেশি রাগ ছিল তার। বাচ্চাদের কাজ ছিল দূর থেকে তাকে খেপানো। এ জন্য বাচ্চা দেখলে দূর থেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকত। আমরা অবশ্য তার গান খুব পছন্দ করতাম।সে এমন সব অদ্ভুত গান করত, যেগুলো সচরাচর শোনা যেত না। দুয়ারের পাশে মাটির ওপর বসে গান জুড়ে দিত। গান শোনা হলে ১০ টাকা দাবি করত। মাঝেমধ্যে খাবার চাইত। তার ছেলেরা অবস্থাসম্পন্ন। বাড়িতে আর্থিক কোনো সমস্যা ছিল না। তবু সে বাড়িতে থাকতে চাইত না। রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান শোনাত। ফসলের খেতে সে গান গাইত। গ্রামের কৃষকেরা মন দিয়ে তার গান শুনত।

‘ধানখেতে সোনা হয়, তবু পেটে ভাত নাই,

গরিবেরে সবাই দেখে, কেমনে বাঁচে, জানে নাই।

আল্লারে ডাকি ডাকি, চোখের পানি ঝরে,

এই দুনিয়ার সুখ-দুঃখ সবই তো তার হাওয়ার ঘরে।’

ধান কাটা শেষ হয়ে এলে কৃষকের বাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত চলত ধান মাড়াইয়ের কাজ। সেখানে হাজির হতো রেফাজউদ্দিন। সে গাইত—

‘মনরে খুঁজিস কই, ঘরেই তোর আল্লা রয়,

তোর অন্তরে দরজা খোলা, তুই দেখিস নাই।

মানুষ ভজে, মানুষ চিনে, মানুষে পাই আল্লা,

আমি পাগল হইয়া হেসে বলি, সবই তার খেলা।’

যখন সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতো, তখন অলস দুপুরে গ্রামের চায়ের দোকানের পাশে সে গাইত—

‘রাজা যাবে শ্মশানে, ভিখারি যাবে সঙ্গী,

এই দুনিয়ার সব খেলায়, আল্লা এক রঙ্গী।

ধনীদের ঘর অন্ধকার, গরিবের মনে আলো,

আমি পাগল গান গাইয়া, দেখাই সে কালো-সাদা চাল।’

অনেক দিন হয়, তাকে আর আগের মতো দেখা যায় না। বয়স হয়েছে। সারা দিন ঝিম মেরে বাড়িতে পড়ে পড়ে ঘুমায়।

*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর