মক্কা–মদিনার ডায়েরি-৪
১১. মদিনার দিনলিপি: জুমার নামাজ আদায় ও বিদায়ের আবেশ
দেখতে দেখতে আমাদের মদিনার দিনগুলো ফুরিয়ে এল। অথচ মদিনায় আমরা আচ্ছন্ন, মদিনার মায়ায় আমাদের মন ভরে আছে। আল্লাহর কুদরতের কাছাকাছি থাকার প্রভাব অতি প্রবল, তার কল্যাণে মন অভিভূত আর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মদিনার শেষ দিনটি জুমার দিন, পরের দিন ফজর নামাজ পড়ে আমরা মক্কায় রওনা হব। জুমার দিনে মসজিদে নববিতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়, একসঙ্গে ১৮ লাখ (১ দশমিক ৮ মিলিয়ন) মুসল্লি ভেতরে আর বাইরে মিলে এখানে নামাজ পড়তে পারেন। বিশাল সমাগমের কথা চিন্তা করে জুমার প্রায় তিন ঘণ্টা আগে আমরা মসজিদে চলে এলাম। এই সময়টা ইবাদত করে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। নুসুক অ্যাপে মসজিদে নববির কোন কামরা খালি আছে আর কোন কামরা ভর্তি হয়ে গেছে, তা দেখা যায়। নামাজের আধঘণ্টা আগে অ্যাপে ঢুকে দেখলাম সব কামরা পূর্ণ হয়ে গেছে, এখন বাইরের জায়গা কিছু খালি আছে। ইমামের চমৎকার খুতবা শুনে তাঁর সঙ্গে জুমা আদায় করলাম, ইবাদতে সবাই আচ্ছন্ন পবিত্রতায় ভরে আছে সবার অন্তর। বেলা বেড়েছে আকাশ ঝকঝক করছে, রোদ চড়েছে, খিদে পেয়েছে, সবাই যথেষ্ট ক্লান্ত। হোটেলে ফিরে অলস দুপুর পার করলাম। মোয়াল্লেম এসে জানিয়ে গেলেন আগামীকাল দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা মক্কা রওনা হব, মক্কায় ওমরাহ হজের সব বন্দোবস্ত করা থাকবে আমরা হোটেল থেকে ইহরাম পরে তৈরি হয়ে বের হব এবং মদিনার মিকাত মসজিদ ‘মসজিদে জুল-হুলাইফা’ থেকে অজু, নামাজ আর ওমরাহর নিয়ত করে রওনা দেব।
আমরা বিদায়ের জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করলাম। আসরের নামাজের জন্য বের হয়ে এশার নামাজ শেষে ফিরে আসার কর্মসূচিও শেষ হবে আজ। মনের কোনো এক গোপন জায়গায় যেন শোকের ছায়া। চারদিকে গভীর স্তব্ধতায় মরু হাওয়ার ঢেউ। অবিশ্বাস্য স্বপ্নের মতো ছিল এই কয়েকটা দিন। রাসুল (সা.) রওজা জিয়ারতের যে আশা আর উদ্দেশ্য ছিল, তা সফল করে চোখের আর মনের যে তৃষ্ণাকে মিটিয়ে ছিলাম মনে হয়েছিল; তা যেন বহুগুণ বেড়ে বুকে চেপে বসল। পুরো মনপ্রাণ দিয়ে দেখেও আমরা কতটুকু দেখতে পারি? একমুহূর্তে দেখা থেকে এক ঘণ্টার দেখা অবশ্যই বেশি। আর এক সপ্তাহ ধরে এই জায়গাটার সঙ্গেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া; তবু যদি চোখের তৃষ্ণা মনের তৃষ্ণা না মেটে! এ জন্যই হয়তো মানুষ বারবার এখানে ফিরে আসে, ফিরে আসতে চায়। কিন্তু চাইলেই কি আসা যায়? এখন প্রত্যাশিত যা দেখার তার সবটাই দেখে নিয়ে তারপর শুধু মনের ওপর দাগ বোলানো। সেই দাগ হয়তো সময়ের সঙ্গে ফিকে হবে।
পরদিন আমাদের কাফেলায় ব্যস্ততা, সবাই বাক্সপেটরা গুছিয়ে নিচ্ছে মক্কার জন্য। এই কদিনে হোটেলের এই ছোট রুমটায় সবার সংসার হয়েছিল। জিনিসপত্র প্রয়োজনে যা বের করা গেছে একে একে সব গোছানো, পরিপাটিভাবে দেশ থেকে গুছিয়ে আনা জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে গেছে। আবার সব গোছাও, কাপড়চোপড়, ওষুধপত্র, মোবাইলের চার্জার, পাওয়ার কনভার্টার, মাল্টিপ্লাগ, গরম পানির কেটলিটা। এই কটা দিন ওতেই পানি ফুটিয়ে টি–ব্যাগ দিয়ে চা খেয়েছি। কত ছোটখাটো জিনিস যে আমরা নিজের একটু বেশি আরামের জন্য বয়ে বেড়াই। মন চায় অভ্যাসের আরাম অথচ এই হোটেলের ছয়তলার একটি রুমে আমরা এত দিন দিব্যি পার করে দিলাম। বিছানা, টেবিল, আলনা আর আমাদের লাগেজে একদম ঠাসা একটা রুম, পা ফেলার জায়গা নেই।
১২. বিদায় আল-মদিনাহ আল-মুনাওয়ারা-মক্কার পথে যাত্রা
ইহরাম পরাটা আমার জীবনে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা, সাদা দুই টুকরো কাপড় দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে নেওয়া। আর এই কাপড়ে আমাকে পাড়ি দিতে হবে মদিনা থেকে মক্কায়, পথে মিকাত মসজিদে নামাজ আদায় আর ওমরাহর নিয়ত করে প্রস্থান। মক্কায় পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ছয় ঘণ্টা। পৌঁছে ওমরাহ পালন করতে হবে। বেশ লম্বা সময় এই ইহরাম পরেই আমাকে থাকতে হবে। আমরা তৈরি হয়ে বসে ছিলাম, মুয়াল্লেম সাহেব আসতেই বাক্সপেটরা নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। আমাদের কাফেলার ১৭ জন যাত্রীর জন্য বেশ বড়সড়ই গাড়ি। অবশ্য মদিনা আসার পর যেখানেই গেছি এ ধরনের বিলাসবহুল বাসে চড়েই রাজকীয়ভাবেই আমরা গেছি। গাড়ি আধঘণ্টা পর মিকাত মসজিদে এসে দাঁড়াল। শত শত এ রকম বাস হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে এখানে আসছে আর নিয়ত করে চলে যাচ্ছে। আমাদের মুয়াল্লেম বারবার সবাইকে সতর্ক করল, কেউ যাতে দল থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।
পরদিন আমাদের কাফেলায় ব্যস্ততা, সবাই বাক্সপেটরা গুছিয়ে নিচ্ছেন মক্কার জন্য। এই কদিনে হোটেলের এই ছোট রুমটায় সবার সংসার হয়েছিল। জিনিসপত্র প্রয়োজনে যা বের করা গেছে একে একে সব গোছানো, পরিপাটিভাবে দেশ থেকে গুছিয়ে আনা জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে গেছে।
পুরুষ আর নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। তাই আমাদের আলাদা হতে হলো, অজু নামাজ শেষে নিয়ত করে আমরা পুরুষেরা মুয়াল্লেমের নির্দেশ করা জায়গায় দাঁড়ালাম, একটু পর কাফেলার নারী সদস্যরাও এসে গেল। আমাদের গাড়ির চাকা গড়াল মক্কার পথে। আমাদের মদিনার মোতোয়ালি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, মক্কার মোতোয়ালি আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছেন। গাড়ি মদিনা শহরের সীমানা পেরিয়েছে বোঝা যায়, বাড়িঘরের চিহ্ন উধাও; মরুভূমি এবং পাহাড়ি এলাকা রাস্তার দুই পাশে, আমাদের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। বিকেলের আলো বার্নিশ করা কাঁসার মতো ঝকঝকে, রাস্তাটা জ্বলন্ত রোদ দিয়ে মাজা। দুই পাশে সারি সারি পাহাড় নিয়ে লম্বা তটরেখা কালচে ধূসর আভায় মোড়া। যত দূর চোখ যায় প্রান্তরজুড়ে সূর্যের ঘ্রাণ, দূরের শ্যাম প্রান্তর ইস্পাতের মতো ঝলসাচ্ছে। সূর্যের গান মরুর আকাশে-বাতাসে। মাঝেমধ্যে কিছু লোকালয় দ্রুত ছুটে এসে আরও দ্রুত বেগে পিছিয়ে যায়, হারিয়ে যায়। এরপর পাথুরে প্রান্তরজুড়ে আরও দ্বিগুণ শূন্যতা।
শীতাতপ গাড়িতে বসে আমরা সূর্যে গুঞ্জিত। ভাবছি আমরা কতটা ক্ষীণ, কতটা দুর্বল। আমাদের শরীর এই উষ্ণ মধুর আলোয় জ্বলে যাবে! অথচ আমাদের রাসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা এখান থেকে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন সমগ্র জাহানে। এই কয়েক দিনে আমাদের শরীর একটা অস্ফুট মধুর ব্যথা। বিরতির জন্য বাস থামল, অনেকটা ধাবার (রাস্তার ধারের রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকান) মতো জায়গাটা। প্রচুর মানুষের ভিড়। সাদা, কালো, ফরসা, লাল, খাট, লম্বা, এশিয়ান, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, আফগান আর কত জাতের মানুষ যে এখানে গুনে শেষ হবে না। বাহারি খাবারদাবার বিক্রি হচ্ছে। তৈরির আগেই শেষ, আবার তৈরি হচ্ছে গরমাগরম খাবার। আমরা আসরের নামাজ পড়ব, অজুর জায়গায় তীব্র ভিড়। সময় নিয়ে অপেক্ষা, তারপর আমাদেরও সুযোগ এল। নামাজ শেষ করে বের হওয়ার সময় কিছু নাশতা আর ফল কিনলাম, গাড়িতে বসে খাওয়া যাবে। যাত্রা আবার শুরু। আরও তিন-চার ঘণ্টা লাগবে এখান থেকে যদি রাস্তায় কোনো সমস্যা না থাকে।
১৩. মদিনা থেকে মক্কায় ভ্রমণপথের অভিজ্ঞতা
আমরা জুসে চুমুক দিচ্ছি অলসভাবে, আর মাঝেমধ্যে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি, রাজকীয় বিলাসিতায় সময় পার করছি। উপভোগ উপচে পড়ছে। বাইরে ধু ধু করছে বাদামি প্রান্তর। ঘাস নেই, গাছ অল্প। চারদিকে তাকালে শুধু উঁচু উঁচু পাথরের পাহাড়, মাঝেমধ্যে খুবই অল্প কিছু বসতি আর মানুষজন। এত ফাঁকা জায়গাও পৃথিবীতে আছে! মদিনা থেকে মক্কার পথে যেতে রুক্ষ মরুভূমি আর পাহাড় ছাড়া বৈচিত্র্যময় প্রায় কিছুই চোখে পড়ে না। বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই নির্জীব বিজন পাথুরে প্রান্তর দেখতে দেখতে ক্লান্তি ভর করেছে, একঘেয়ে লাগছে তখন হঠাৎই এই রুক্ষ পাথরের ভূমিতে নড়ে উঠল জীবনের ছটা। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই গলা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে গেল একটা উট। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভালো করে দেখার আগেই সে চোখের আড়াল হয়ে গেল। তখন কি জানি, ঝাঁকে ঝাঁকে উট পথের পাশ দিয়ে যাবে? কী অদ্ভুত এক জীব লম্বা গলা উঁচিয়ে হেঁটে চলেছে মরুর পথে। জীবনের স্পর্শে প্রাণ ফিরে এল যেন এই মরুর বুকে। মসৃণ রাস্তায় গড়িয়ে চলেছে বিলাসবহুল যান। নেহাতই যেন স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যবর্তী ব্যবধান কমাবে বলে! বুকের ভেতর থেকে যে একটি সূক্ষ্ম নিশ্বাসের ঢেউ কেবলই উঠছে-পড়ছে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই, চোখ মেলে দেখি সন্ধ্যা নেমে এল। সূর্য আজকের জন্য বিদায় বিদায় বলে হেলে পড়ছে। দূরের পাহাড়গুলোর ওপর ঝুলছে হেমন্তের কুয়াশা। আবছা আলোর মধ্যে ভেসে ওঠা বসতি আর লোকালয়গুলো রহস্যময় হয়ে দেখা দিয়ে ছুটে যায়। ওই যে এক কিশোর ছাদের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে, মাটির আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে মালবোঝাই পিকআপ চলে যাচ্ছে। চুপচাপ বসে সবকিছু দেখতে ভালো লাগে। আসলে আমরা যা দেখি তা বাইরের কোনো বস্তু না; নিজের ভেতরের ভালো লাগাটা, যা মনে দাগ কেটে যায়। ভ্রমণ আমাদের দেখতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের মন হয় উদার, দৃষ্টি হয় সূক্ষ্ম আর কেটে যায় সংস্কারের সংকীর্ণতা। তবে এই গুণ এমনিতে জন্মায় না, ধীরে ধীরে রপ্ত করে নিতে হয়।
আমার ছোটবেলার এক বন্ধু ভ্রমণের সময় কেউ ঘুমিয়ে পড়লে খুব বিরক্ত হয়! একটু বড় হয়ে আমরা যখন একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যেতাম, ভ্রমণের সময় ঘুমিয়ে পড়ে এমন কাউকে তার পাশে বসতে দিত না। তার সোজাসাপটা কথা, গাড়িতে যারা ঘুমিয়ে পড়ে তাদের আমি ঘৃণা করি। তার এই ঘৃণার পাত্র অবশ্য আমরা সব বন্ধুই কমবেশি হয়েছিলাম; পাশে বসে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে! তবে এই ঘৃণার কারণে আমাদের বন্ধুত্ব এতটুকু কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে তা মজবুত হয়েছে।
আসলে ভ্রমণ থেকে পূর্ণতম লাভ নিংড়ে নিতে হলে নিজস্ব প্রতিভার প্রয়োজন পড়ে, যেটা সম্পূর্ণরূপে দৈব। কেউ শহর থেকে অদূরে গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ভ্রমণের যে চরম রস নিংড়ে নিতে পারে অন্য কেউ সুদূর সুইজারল্যান্ড বেড়িয়েও সেই রসের স্বাদ পাই না। আর বর্তমান যুগের কথা বিবেচনায় আনলে ভ্রমণের যে ফলাফল পাওয়া যায়, তা আরও চমকপ্রদ! যে জায়গায় ঘুরতে গেলাম ডিজিটাল ডিভাইসে সেই জায়গার কিছু ছবি, নিজের কিছু সেলফি দাও। কী খেলাম, কোথায় গেলাম তার কিছু ছবি, ভিডিও আর অডিও এডিট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দাও। সঙ্গে অবশ্যই চমকপ্রদ স্ট্যাটাস লিখতে হবে। ব্যস; ব্যক্তিভেদে লাইক–কমেন্টের ছড়াছড়ি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এআই ঠিক করবে এই কনটেন্ট কি ছড়িয়ে দেবে, নাকি সাইডে রাখবে। জনপ্রিয় এক পত্রিকার সম্পাদক আক্ষেপ করে আমাকে বলেছিলেন, ‘মানুষ এখন আর বড় কিছু পড়তে চায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জ্ঞান, শিল্প, সংস্কৃতি, বিনোদন সবকিছুর সংজ্ঞা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এখানে ভালো আর মন্দের কোনো বাছবিচার নেই, সব মিলেমিশে একাকার।’
গাড়ি ছুটে চলেছে মক্কার প্রান্তে, বাইরে নিবিড় রাত্রি। কালো কালো অন্ধকারে পৃথিবী ভরে আছে, যে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। জোনাকির মতো কিছু আলো ঝিলকিয়ে চলে গেল, দূরে কোনো লোকালয় হবে হয়তো, এরপর আবার অন্ধকার কথা বলে উঠল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি চুপচাপ, এমন অন্ধকার মনে ধাক্কা দেয়। অনেক পরে চাঁদ উঠল, মেঘ চুইয়ে নেমে এল জ্যোৎস্না। বাসে হেডলাইটে আলোকিত রাস্তা আর রাস্তার দুপাশে ম্লান জ্যোস্নায় জনহীন প্রান্তর! চোখ–মন ডুবিয়ে শুয়ে আছি, আমার বাবা তালবিয়া পাঠ করল, সঙ্গে আরও দু-একজন। আমিও তালবিয়া পড়লাম—লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বাইয়িক...।
১৪. মক্কায় প্রবেশ
মক্কা আর বেশি দূর না, আশপাশে লোকালয় জানান দিচ্ছে শহর সামনে আরও নিবিড়। আলোর ঝলকানি কেড়ে নিল অন্ধকারের রাজত্ব। জেদ্দার উজ্জ্বল আলো সঙ্গে করে আমরা মক্কায় প্রবেশ করলাম। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মক্কার ক্লক টাওয়ার। ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা আপনার, সব নিয়ামত আপনার, সব সাম্রাজ্য আপনার, আপনার কোনো শরিক নেই।’
ক্লক টাওয়ার একবার ডানে হারায়, একবার বাঁয়ে হারায়। এভাবে লুকোচুরি খেলতে খেলতে আমাদের গাড়ি পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আমাদের হোটেল ঠিক করা আছে ইব্রাহিম খলিল রোডের কবুতর মাঠের সামনে। এ রাস্তাটি কাবার একদম কাছে, রাস্তাজুড়ে গাড়ি আর মানুষের প্রচুর ভিড়। হাজারে হাজারে মানুষ কাবা শরিফে নামাজ পড়েন, তাওয়াফ করেন বা ওমরাহ করেন এই রোড হয়ে বের হয়ে আসেন। তাই এ রাস্তায় সব সময় মানুষের ভিড় বিশেষ করে নামাজের আগে ও পরে এখানে মানুষের স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে সেই সময় এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে দেওয়া হয় না। যখন আমরা এসে পৌঁছাই তখন মক্কার সময় সাড়ে ৯টা, এশার নামাজ অনেক আগে শেষ হয়েছে, রাস্তাজুড়ে আমাদের মতো অনেক বাস লাইন ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ হাজী সাহেবদের নিয়ে এসেছেন আবার কেউ হাজি সাহেবদের মক্কা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায়। এ ছাড়া প্রচুর ট্যাক্সি আর কার যাত্রী পরিবহন করছে বা যাত্রী নামিয়ে নতুন যাত্রীর খোঁজে রাস্তায় ভিড় করছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এত ভিড়ের মধ্যে আবার একদল হকার মালপত্র সাজিয়ে বেচাবিক্রি করছেন। কেমন একটা হইচই অবস্থা রাস্তাজুড়ে। তবে এত ভিড়ের মধ্যেও নেই কোনো হর্নের আওয়াজ, নেই কোনো চিৎকার–চেঁচামেচি। সবাই ব্যস্ত যার যার কাজে। হঠাৎ রাস্তায় হুড়োহুড়ি, দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল, আমরা গাড়ি থেকে বাক্সপেটরা নামাতে ব্যস্ত; এ অবস্থায় অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। হকাররা সবাই মালপত্র নিয়ে দৌড়াচ্ছে যে যেদিকে পারছে। হকচকিত হয়ে খেয়াল করলাম অদূরে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়েছে, দুজন পুলিশও গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ানো শুরু করে দিল! একেবারে চোর–পুলিশ খেলা যাকে বলে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত পুলিশ কাউকেই ধরতে পারল না। কিছু সময় পর পুলিশের গাড়িটি চলে যেতে দেখলাম, তৎক্ষণাৎ বাতাস থেকেই যেন হকারগুলো আবার ফিরে এল। বেচাবিক্রিও বেশ হচ্ছে, মানুষ তাদের ঘিরে ধরে সমানে পণ্য কিনছে। একটু আগে যেন কিছুই হয়নি!
মদিনার শান্ত কিছু দিনের পর এখানে নতুন দেশের নতুন দৃশ্যে। সবই এই শহরেরই আনুষঙ্গিক। এখানে ভিড়। এখানে মানুষের স্রোত। এখানে রাস্তাজুড়ে হকারদের চোর–পুলিশ খেলা। স্তব্ধতা নেই, নেই অন্ধকার। এখানে গণ-মনের সংঘবদ্ধ উন্মত্ততা। এখানেই আমাদের কাবা। আমাদের হোটেলের নাম এমাদাদ আল জাহাব, হোটেলে ঢোকার মুখেই বাংলাদেশি খাবারের হোটেল। জমজমাট চলছে তাদের ব্যবসা, তাদের খদ্দেরের ভিড় ঠেলে আমাদের হোটেল লবিতে ঢুকতে হলো। আমাদের মক্কার মোতোয়ালির নাম আলী আসগর। আসগর সাহেব চট্টগ্রামের মানুষ, খুবই সজ্জন আর করিতকর্মা। আমাদের বাস ইব্রাহিম খলিল রোডে ঢুকতেই তিনি বাসে উঠে পড়েন, বাস একদম হোটেলের সামনে দাঁড় করিয়ে দ্রুত সবার লাগেজ আর মালামাল নামিয়ে নিতে সবাইকে সাহায্য করেন। রুম পেতে সময় লাগল না, মোয়াল্লেম সাহেব সবাইকে এক ঘণ্টা সময় দিলেন খাওয়াদাওয়া শেষে অজু করে লবিতে নেমে আসার জন্য।
নতুন রুমে আবার নতুন সংসার, লাগেজ খুলে প্রয়োজনীয় জিনিস বের হলো। দেখতে দেখতে জিনিসপত্রে ঘর ভরে উঠল। কিছু সময় আগেও যে ঘর আমাদের কল্পনার অস্তিত্বে ছিল না, এখন তা বাস্তবের বসতি। আগামী কয়েক দিন এখানেই থাকতে হবে। মদিনার হোটেল রুমের সঙ্গে এই রুমের কী মিল আর কী গরমিল তার হিসাব করতে করতে খাবার চলে এল। খাবার শেষ করে নিচে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। লবিতে একে একে আমাদের কাফেলার সবাই উপস্থিত, মোতোয়ালি সাহেব কাফেলার আরেকজন মোয়াল্লেমের সিরাজুল হুজুরের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। সিরাজুল হুজুরের নেতৃত্বে আমাদের ওমরাহ সম্পন্ন হবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া শেষ হলে আমরা সবাই রওনা হলাম কাবার উদ্দেশ্যে। চলবে...
লেখক: মুহম্মদ কামরুল হাসান সিদ্দিকী, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা