মালদ্বীপের কয়েকটি দিন—তৃতীয় পর্ব

সমুদ্রের পানির ওপর একটি নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরে ভাসমান সুমিং ট্র্যাকছবি: লেখকের পাঠানো

চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দ্বিতীয় দিনের শুরু হলো পৃথিবীর চমৎকারতম সমুদ্রসৈকতে। আজকে আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনাও দারুণ, রিসোর্ট ভিজিট। আমাদের হোটেল সকাল ১০টায় বোটে করে কোনো একটি ফাইভ স্টার রিসোর্টে দিয়ে আসবে, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সেইখানে বেড়াব এবং ফিরে আসব। যদি রিসোর্টে থাকতে চাই তবে আলাদা ভাড়া গুনতে হবে, আমাদের জন্য যে রিসোর্টটি পরিকল্পনা করা হয়েছে সেটির নাম আদারান ওশেন ভিলাস।

হোটেলের রেস্টুরেন্টে সকাল ৯টায় নাশতা শেষ করে আমরা লবিতে অপেক্ষা করছি, আদারান ওশেন ভিলাস আমাদের জন্য স্পিডবোট পাঠাবে, সেটি জেটিতে এলে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের গাড়িতে আমাদের জেটিতে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ জেটি থেকে সব দায়দায়িত্ব আদারান ওশেন ভিলাস কর্তৃপক্ষের। ১০টায় আমরা জেটিতে রওনা হলাম, খুব সুন্দর একটি স্পিডবোট আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমরা দুই বন্ধু ছাড়াও ইন্দোনেশীয় পরিবারটি আজও আমাদের সঙ্গী, তার সঙ্গে যোগ হলো দুই ফিলিপিনো রমণী এবং একজন জাপানিজ ভদ্রলোক। আজও বাতাসের বেগ একটু বেশি, একটু চিন্তিত বোধ করলাম গতকাল ফিরে আসার বিলম্বিত সময় এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের রুদ্র রূপের কথা ভেবে। আমাদের বোট বেশ গতি নিয়ে ঢেউগুলো অতিক্রম করতে শুরু করল, ডাবল ইঞ্জিনের এই বোটটি বাতাসের বেগ আর ঢেউয়ের মাতলামি মোটেই পাত্তা না দিয়ে ছুটে চলল রিসোর্টের দিকে।

আমাদের রেস্টের জন্য কোনো রুম দেওয়া হলো না। তবে ছায়াঘেরা সৈকতের পাশজুড়ে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য সৈকত–চেয়ারে আপনি ইচ্ছেমতো নিজেকে জুড়িয়ে নিতে পারেন। অথবা সময় কাটাতে পারেন রিসোর্টজুড়ে গড়ে তোলা সাতটি মিনি বারে বসে পানীয় বিলাসে। আবার অসংখ্য ওয়াটার গেম থেকে আপনার পছন্দেরটি খুঁজে নিয়ে মেতে উঠতে পারেন চমৎকার সব দুঃসাহসিক অভিযানে, যেমন ওয়াটার বাইকিং, প্যারাগ্লাইডিং, ডিপ ওয়াটার ডাইভিং ইত্যাদি।

আমরা সুস্থ আর নিরাপদভাবেই পৌঁছে গেলাম রিসোর্টে। সাগরের বুক চিরে গড়ে ওঠা দ্বীপটিকে এত সুন্দর পরিকল্পনায় গড়ে তোলা হয়েছে যে জেটিতে নেমেই মনটা আনমনা হয়ে গেল। প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গন অনুভবে ক্লান্ত মন চনমনে হয়ে গেল, মনে হতে লাগল আর কোথাও যাব না, এইখানে পড়ে রইব যুগ–যুগান্তর! আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে রিসোর্টের অফিসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, পুরো পথটি পাম, নারকেল আর ফুলের গাছের সারিতে মায়াবী অপরূপ সাজে সজ্জিত। মাঝে মাঝে কিছু পাখির কূজন, কী এক দারুণ অনুভূতি বলে বোঝানো আমার মতো লেখকের পক্ষে বেশ জঠিল।

আমাদের বসানো হলো একটি কনফারেন্স রুমে, রিসোর্টের মার্কেটিং ম্যানেজার নিজের পরিচয় দিয়ে সংক্ষেপে রিসোর্টের সুযোগ–সুবিধাগুলো বর্ণনা করে গেলেন। এর মধ্যে ওয়েলকাম ড্রিংক সার্ভ করা হয়েছে। আমাদের হাতে একটি বিশেষ ধরনের ব্যান্ড পরিয়ে দেওয়া হলো।

হোটেল রুম থেকে সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য
ছবি: লেখকের পাঠানো
আরও পড়ুন

আমাদের রেস্টের জন্য কোনো রুম দেওয়া হলো না। তবে ছায়াঘেরা সৈকতের পাশজুড়ে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য সৈকত–চেয়ারে আপনি ইচ্ছেমতো নিজেকে জুড়িয়ে নিতে পারেন। অথবা সময় কাটাতে পারেন রিসোর্টজুড়ে গড়ে তোলা সাতটি মিনি বারে বসে পানীয় বিলাসে। অবার অসংখ্য ওয়াটার গেম থেকে আপনার পছন্দেরটি খুঁজে নিয়ে মেতে উঠতে পারেন চমৎকার সব দুঃসাহসিক অভিযানে, যেমন ওয়াটার বাইকিং, প্যারাগ্লাইডিং, ডিপ ওয়াটার ডাইভিং ইত্যাদি। তবে এর জন্য আপনাকে টাকা গুনতে হবে। বাড়তি টাকা খরচের মতো অবস্থা আমাদের নেই, তাই দুই বন্ধু মিলে সমুদ্রের পাশে দ্বীপের ছায়াঘেরা একটি স্থানে বিচ চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। কিছু সময় রেস্ট নিয়ে পুরো দ্বীপটা ঘুরে দেখতে বের হলাম, ওদের কটেজগুলো বেশ সুন্দর। দ্বীপের ভেতরে এবং সমুদ্রের ওপরে তৈরি করা দুই ধরনের কটেজ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ভাড়া দেয়, পানির ওপর গড়ে তোলা কটেজগুলো অনেক ব্যয়বহুল। প্রতি রাতের ভাড়া ৮০০-১৬০০ ডলার পর্যন্ত। আর দ্বীপের ভেতরে পামগাছ, নারকেলগাছ আর পুষ্পশোভিত বাংলোগুলো পেয়ে যাবেন ২০০-৫০০ ডলারে। ফাইভ স্টার সুবিধা–সংবলিত রিসোর্টি ঘুরে দেখে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে দুই বন্ধু গিয়ে বসলাম একটি মিনি বারে, আমাদের জন্য জুস চাইলাম, অরেঞ্জ জুস সার্ভ করা হলো, বরফমিশ্রিত জুসগুলো ক্লান্তি দূর করে দিল এক নিমিষে। বারটেন্ডার জানতে চাইলেন আর কোনো ড্রিংস চাই কি না, আমরা না–সূচক মাথা নেড়ে বিল চাইলে জানালেন, যেকোনো সফট ড্রিংস আমাদের জন্য ফ্রি। রিসোর্টের যেকোনো বার থেকে যেকোনো সময় আমরা এই ফ্রি ড্রিংস পান করতে পারব, এর জন্য কোনো পয়সা লাগবে না, ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা বার থেকে বিদায় নিলাম।

উদ্দেশ্যহীন ঘুরাঘুরি, সৈকত–চেয়ারে আরাম আয়েশ আর সমুদ্রস্নান সময়টাকে আদরের সঙ্গে পার করছিল। সিদ্ধান্তে এলাম ডাইনিংয়ের পাশে দেখে আসা সুইমিংপুলে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে ক্ষুধাটাকে চাঙা করে তবে ভূরিভোজে যোগ দেব। সুন্দর খোলামেলা ডাইনিংয়ের মাঝে বুফে সার্ভ করা আছে, নিজের ইচ্ছা এবং প্রয়োজনমতো নিয়ে খাওয়া যায়। রিপন ভাইয়ের বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা হলো; কিন্তু এত সব খাবারের মধ্যে বিরিয়ানি খুঁজে না পেয়ে সাদা ভাত, চিকেন, টুনা ফিশ, সালাদ আর মিক্স ভেজিটেবল দিয়ে খানার পর্ব শেষ করলাম। এরপর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম শেষে চা পর্ব, এর মধ্যে দিনের পর্দা নামতে শুরু করেছে, আমাদের হোটেলে ফেরার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন

ঘাটে ফিরে স্পিডবোটে চেপে বসলাম আমরা জনা দশেক যাত্রী। আমরা দুজন বাঙালি, ইন্দোনেশীয় পরিবারটি আর যোগ হয়েছে জাপানি দুই ভদ্রলোক। অন্ধকার নেমে এসেছে, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ঘাটটিকে এক অপরূপ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করেছে, পানির নিচে পর্যন্ত লাইট দিয়ে আলোকিত করা। পানির নিচে মাছের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য—সে এক অপূর্ব অনুভূতি। হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হলাম, পানির নিচে দুটি মাছের তীব্র গতিতে ছুটোছুটি আমাদের যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করল। একটি হাঙর তীব্র গতিতে একটি কোরাল ফিশের পেছনে ছুটছে, শিকারি এবং শিকার! শিকারির জয় হলো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলের কল্যাণে এ ধরনের শিকার দৃশ্য অনেক দেখা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে এই শিকারি এবং শিকারের গতি ও আচরণ সত্যি অসাধারণ, অকল্পনীয় এবং ভীতিকর। চলবে...

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]