মালদ্বীপের কয়েকটি দিন—দ্বিতীয় পর্ব
বোট চলতে শুরু করল, রফিক বোট চালাচ্ছে। রবিন আমাদের সাঁতারের পোশাক ও লাইফ জ্যাকেট পরে ফেলতে বলল। সে শুধু বলেই ক্ষান্ত হলো না, একে একে সবাইকে জ্যাকেট পরতে সাহায্য করছিল। তার কর্তব্যপরায়ণ মনোভাব খুব ভালো লাগল। সবাই যখন তৈরি, তখন সে স্নোকলিং সরঞ্জামগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করল। কীভাবে এগুলো পরতে ও ব্যবহার করতে হয়, তা শেখাতে লাগল। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন গল্পগুজবে সময়টা বেশ ভালো কাটছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর একটি বালুর দ্বীপের কাছে রফিক বোটটিকে থামাল। ফিরোজা ও পান্নার মতো সবুজ জলের মধ্যে সাদা বালুর দ্বীপটি জেগে উঠেছে। দ্বীপটির আয়তন ৪০০ বা ৫০০ মিটারের বেশি নয়, কোরাল দিয়ে তৈরি এই দ্বীপগুলো। আমাদের বোট দ্বীপ থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে নোঙর করেছে। ১০০ মিটার এই জলের পথটুকু আমাদের সাঁতরে বা লাইফ বোটে যেতে হবে। ইন্দোনেশীয় পরিবারটি ইতিমধ্যে সমুদ্রে নেমে দ্বীপের দিকে সাঁতরানো শুরু করছে, তাদের সঙ্গে রফিকও আছে। পরিবারের বাবা কিছুদূর গিয়ে আবার বোটের দিকে ফেরত আসতে শুরু করল, তাকে দেখে রবিন পানিতে নেমে গেল। বোটের কাছে এলে জানতে পারলাম, কিছুদূর সাঁতার কাটার পর সে ক্লান্ত বোধ করে ও ভয় পায়।
পরিবারের অন্য সদস্যদের সাঁতরে দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে রফিক আবার বোটে ফেরত এল। আমরা সমুদ্রের দেশের মানুষ হলেও ভয় করছে, লাইফ বোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। জাহাজটি একদম পাড়ে নোঙর করা যায়নি। কারণ, সমুদ্রতল শক্ত উঁচু–নিচু প্রবালের, যা তলায় লেগে জাহাজটির ক্ষতি হতে পারে। দ্বীপে পৌঁছে সাঁতার কেটে ও ছবি তুলে সময়টা ভালই কাটোল। এর মধ্যে রফিক ও রবিন আমাদের শেখাচ্ছিল স্নোকলিংয়ের সময় ডাইভিং মাস্ক পরে কীভাবে পানির নিচে দেখতে হয়।
ব্যাপারটা যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। ইতিমধ্যে আমি ও রিপন ভাই দুই–তিনবার সমুদ্রের নোনাজল নাকে–মুখে ঢুকিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায় আছি। লাঞ্চ সেরে আরও কিছু সময় দ্বীপে কাটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। এবার কিন্তু সাঁতার কেটেই জাহাজে ফিরলাম সবাই, আর সাঁতারের সময় নজরে এল পানির নিচের অপরূপ জগৎটা। বিভিন্ন বর্ণের মাছ চারদিকে সাঁতার কাটছে। চোখ ফেরানো যায় না, অপরূপ সুন্দর! যেন বিশাল কোনো অ্যাকুয়ারিয়ামে ডুব দিয়েছি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
দ্বীপে থাকা অবস্থায় বাতাসের বেগ একটু বেশি মনে হয়েছিল। জাহাজ যখন সমুদ্রে চলতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারছিলাম প্রকৃতি বুঝি রেগে উঠতে চাইছে! শিপের রোলিং বেশি হচ্ছে, একপশলা হালকা বৃষ্টিও হয়ে গেল। রফিক ও রবিন সতর্ক এবং ব্যস্ত হয়ে গেল জাহাজ সামলাতে। রফিক জানাল, বাতাসের গতিবেগ বেশি আজ স্নোকলিং করা যাবে না, আমরা আগ্রহ দেখালেও তারা কোনো রিস্ক নিতে চাইল না। অগত্যা ফেরার পথ ধরলাম। দুই ঘণ্টার পথ সাড়ে তিন ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে জেটিতে পৌঁছালাম। ইন্দোনেশীয় ভদ্রলোকটি অসুস্থ বোধ করছে।
হোটেল লবিতে ফিরে ঠিক করলাম, হলুমালে দ্বীপটি আজ ঘুরে দেখব। এখনো সন্ধ্যা হতে ঘণ্টাখানেক বাকি, আশা করছি এর মধ্যে হেঁটে শেষ করতে পারব। হোটেলের পাশে সৈকত ধরে দুই বন্ধু হাঁটা শুরু করলাম, আগের রাতে সৈকতটা অনেক নিরিবিলি মনে হলেও এখন দেখছি অনেক মানুষ আছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার গেমের ব্যবস্থা করা আছে, পর্যটকেরা মনোরম সময় পার করছে সৈকতজুড়ে। পুরো সৈকত হেঁটে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগল।
সমুদ্র তীরের শেষ প্রান্ত দিয়ে রাস্তায় উঠে হেঁটে শহর পরিভ্রমণের পরিকল্পনা করলাম। দ্বীপটি মাত্র কয়েক ব্লকে বিভক্ত, প্রতি ব্লকে সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। মালদ্বীপ মূলত মুসলিম–অধ্যুষিত দেশ, তাই পর্যটন তাদের মূল ব্যবসা হলেও থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়া বা অন্যান্য পর্যটন দেশের মতো বার, পাব বা ডিসকো শহরগুলোয় চোখে পড়ে না। তবে সমুদ্রের ওপর ছোট ছোট দ্বীপগুলোয় নির্মিত শত সহস্র রিসোর্টগুলোয় বিদেশি, বিশেষ করে পশ্চিমা পর্যটকদের জন্য এ ধরনের সুযোগ–সুবিধার অভাব নেই।
দ্বীপের প্রায় মাঝখানে একটি বাজার দেখতে পেলাম। বাজার বলতে দুটি সুপারশপ (সুপারশপের মতো বড় নয়), তিনটি খাবারের দোকান, একটি মোবাইল অপারেটরের অফিস ও কিছু ফলের দোকান। কেমন ছিমছাম করে সাজানো সবকিছু আর ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মজার বিষয় হলো, সুপারশপগুলোভর্তি বাংলাদেশি পণ্যে। আরও মজার বিষয় হলো, এসব দোকানের কর্মচারীগুলোর অনেকে বাংলাদেশি। প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি মালদ্বীপে কাজ করেন। মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৩৬ হাজার। মোট জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশিদের অবস্থান বেশ শক্ত বলা যায়! লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজব আর খানেক ঘোরাঘুরিতে সন্ধ্যা নেমে এল। আমরা পুরো দ্বীপটা ঘুরে হোটেলের দিকে ফিরে গেলাম একটা চমৎকার দিনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে।...চলবে